Saturday, July 31, 2010

মিথ্যার রাজ্যে ভ্রমণোত্তরে বিশেষ এক জ্ঞাপন

"Advertising is legalized lying": H.G. Wells
এ লেখা বিজ্ঞাপন বিষয়ে আমার জ্ঞানপনা জাহিরের চেষ্টাজাত নয়। বাংলাদেশে বা পৃথিবীর অন্য কোথাও বিজ্ঞাপন কতদূর এগিয়ে গেছে, মুগ্ধতাজনিত কারণে সে বিষয়ক বিস্ময়-সমুদ্রে ভেসে তার কোনো রূপরেখা আঁকবার চেষ্টাও এখানে ধরা নেই। একজন সাধারণ সমাজসদস্য হিসেবে বিজ্ঞাপনকে আমি যেভাবে দেখি, বিজ্ঞাপন যেভাবে আমাকে ও আমার পরিপার্শ্বকে নির্মাণ করে উঠতে চায় লেখাটি তারই একটি স্থিরছবি ধারণ করবার প্রয়াস পেয়েছে মাত্র। এতে রচয়িতার মনে বিজ্ঞাপনের যে ছবি ডুবে-ভাসে তার একাংশের ভাষিক উপস্থাপনচেষ্টার অধিক আর কিছু লভ্য নয়। এর অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা যাঁর, তাঁর এ রচনাপাঠ এখানেই রহিত হওয়া উচিত।

আমরা সবাই জানি, বিজ্ঞাপন হলো কোনো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে বিশেষভাবে জ্ঞাপন, বিদিতকরণ, জানানো ইত্যাদি, যার মাধ্যমে সাধিত হয় প্রচার। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন এক ধরনের প্রচার, যদিও মনে রাখতে হয় যে, প্রচারমাত্রই বিজ্ঞাপন নয়। যে প্রচারের সঙ্গে সরাসরি অর্থযোগ নেই, মুনাফা অর্জন যার অন্বিষ্ট নয়, তা নিছক প্রচার, বিজ্ঞাপন নয়। আজকাল অবশ্য মিডিয়ার বরাতে বিজ্ঞাপন ও প্রচারের প্রভেদও ঘুচতে লেগেছে দেখা যায়। যারা মিডিয়াকে প্রচুর বিজ্ঞাপন দেয়, তারা এর মাধ্যমে তো প্রচারিত হয়ই, আবার তাদের এটা-সেটা নিয়ে মিডিয়া খাতিরবশত নানা সংবাদও প্রচার করে, যাতে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড-এর উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আরো প্রচার পায়। যদিও যে ইভেন্টকে ঘিরে সংবাদ গড়ে ওঠে, তা প্রায়শ সংবাদ হবারই যোগ্যতা রাখে না। অনেকটা প্রায় শালা-দুলাভাইসুলভ সম্পর্কসূত্রে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান মিডিয়ার কাঁধে ভর করে দেদারসে পক্ষপাতমূলক প্রচারও চালাতে পারে, চালাচ্ছেও। আর আমরা আমপাবলিক এহেন দ্বিপাক্ষিক দহরমমহরমে হরদম বিভ্রান্ত হচ্ছি।

বিজ্ঞাপন হঠাৎ আবির্ভূত আজ বা কালের কোনো প্রপঞ্চ নয়, এর ইতিহাস সুপ্রাচীন। ধারণা করা হয়, যখন থেকে পণ্য বিনিময়ের সূত্রপাত, বিজ্ঞাপনের সূত্রপাত তার সমসাময়িককালেই। মাধ্যম হিসেবে তখন হয়ত ব্যবহৃত হতো মৌখিক ঘোষণা, যে রূপটার প্রায় অবিকলই আমরা অধুনার ফেরিওয়ালাদের মধ্যে দেখি। মৌখিক ঘোষণা থেকে ক্রমশ লিখিত, চিত্রিত ও চলচ্চিত্রিত হয়ে বিজ্ঞাপন আজকের অবস্থায় উপনীত হয়েছে। ব্রিটানিকা কনসাইজ এনসাইক্লোপিডিয়া মতে, সপ্তদশ শতকে লন্ডনের একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে প্রথম বিজ্ঞাপন ছাপা হয়, অষ্টাদশ শতকে যার বিস্তার ব্যাপকতর হয়। বিজ্ঞাপন ভয়ানক মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে বেশিদিনের কথা নয়। শুরুর দিককার বিজ্ঞাপন নামক নীরিহ প্রপঞ্চটি কোন কোম্পানির কোন পণ্যটি কিনলে লাভজনক হতে পারে সেটা তুলনা করে ওঠবার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করত মাত্র। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক বিজ্ঞাপন সর্বগ্রাসী রূপ পরিগ্রহ করেছে। ১৯২২-এ শুরু হয় বেতার কার্যক্রম, আর তার হাত ধরাধরি করে শুরু হয় বেতার-বিজ্ঞাপনও। ১৯৫০-এ শুরু হয় টেলিভিশন কার্যক্রম, যা মাত্র ১ দশকের মধ্যে সিংহভাগ সচ্ছল মানুষের ঘরে ঘরে জায়গা করে নেয়। এর ভিতর দিয়ে বিজ্ঞাপনও ঢুকে যায় মানুষের শোবার ঘরে। ভিসিআরের উদ্ভাবন বিজ্ঞাপনে আরো গতি ও বিস্তার আনে। ১৯৮০-তে সূচিত ভিসিআর মাত্র একদশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ পরিবারে প্রবেশাধিকার আদায় করে নেয়। গড়পরতা বছর বিশেকের ব্যবধানে আমাদের দেশের মানুষও রেডিও-টিভি-ভিসিআরের ভোক্তা হয়। আর সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তা হতে শুরু করে এসব মিডিয়ায় প্রচারিত নানা বিজ্ঞাপনেরও। এসব প্রচারমাধ্যমের সহায়তায় নতুন নতুন কলাকৌশলযোগে আধুনিক বিজ্ঞাপন কেবল পণ্য বা সেবাসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেই ক্ষান্ত হয় না, সম্ভাব্য ভোক্তাশ্রেণির মনে আকাঙ্ক্ষা ও অভাববোধকে উসকে দিয়ে চাহিদার সঞ্চার করে।

বিজ্ঞাপনের ফলে নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবাগ্রহণকারীরা সংখ্যায় বাড়ে। আর এটা তো খুবই সরল হিসেব যে, পণ্য বা সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়া নানামুখী স্ফীতিরই একটি ইঙ্গিত। যার ফলে উৎপাদক বা সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন এবং মুনাফা বাড়ে, যার জন্য বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত সমুদয় বেগবান তৎপরতা।

মানুষের মন সাধারণত সংরক্ষণশীল। একটা অভ্যাসে স্থিত হলে সহজে তারা তা বদলাতে চায় না। ঘুরেফিরেও ওমুখো হয়ে থাকে। এই স্থিতাবস্থাটায় কৌশলে আঘাত করে সম্ভাব্য ভোক্তাশ্রেণির মনোভূমির দখল নিতেই বিজ্ঞাপনদাতারা মরিয়া তৎপরতা চালায়। তারা চায় আপনি পড়বেন-শুনবেন-দেখবেন, পছন্দ করবেন, পণ্য বা সেবা সম্পর্কে জানবেন এবং ক্রয় করবেন। কাজটা নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং। তাই ঢালা হয় অঢেল কড়ি। যত কড়ি তত আওয়াজ, তত রঙ, তত ব্যাপ্তি। এতে বারবার নানাভাবে সামনে এসে দাঁড়ায় ব্র্যান্ডনেম। কতক্ষণ না-পড়ে-শুনে-দেখে থাকবেন আপনি? পড়তে-শুনতে-দেখতে আপনাকে হবেই। শুধু পড়া-শোনা-দেখাই বা বলি কেন, বাধ্য হবেন এমনকি মুখস্থ করে ফেলতেও। এটাই পদ্ধতি। একসময় আপনি চাবেন ওই পণ্যের ক্রেতা-গ্রাহক হতে। অবচেতনের ইশারায়ই নির্বাচন করবেন সেই পণ্যটা, যেটার নাম বারবার শোনা, যার একটা কথা বা সুর আপনার ভালো লেগেছিল, যার একজন মডেল আপনার চিত্তসমুদ্রে সন্দেশের ঢিল ছুড়ে মেরেছিল কোনো একদিন।    

যেহেতু বিজ্ঞাপন নির্মাতাকে বিদ্যমান বাজারের প্রেক্ষিতে একটি প্রতিযোগিতায় নামতে হয় নতুন একটি পণ্যকে বাজারে প্রতিষ্ঠা দেবার জন্য, তাই বিস্তারিত পরিকল্পনা করেই তাদের মাঠে নামতে হয়। নতুন একটি পণ্যকে বাজারে প্রতিষ্ঠা দিতে এমনকি মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাকেও বদলে দিতে হয়। বিজ্ঞাপন এ কাজ সাফল্যের সঙ্গে করেও থাকে। তখন দেখা যায়, যে পণ্য মানুষের জানাশোনার আওতার মধ্যেই ছিল না, মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই সেটা ছাড়া তাদের আর চলছেই না। এক্ষেত্রে মোবাইল ফোনের উদাহরণ টানা যায়। মাত্র বছর কয়েকের মধ্যে দেশে কী বিপ্লবটাই না ঘটে গেল! মনোভূমির চর দখলের এই কাজটা অনেক চ্যালেঞ্জিং বলেই বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে চমক দেখাতে হয় আইডিয়ায়, দক্ষতা দেখাতে হয় প্রতিলিপি ও জিঙ্গেল বিন্যাসে। নির্মাণে ছাপ রাখতে হয় সৃজনশীলতার। সবিশেষ, এই সামগ্রিক কর্মকলাপের বেড় দিয়েই তাদের মানুষের মনোহরণ-বাণিজ্যে সাফল্য দেখাতে হয়।

অনেকটা এসব কারণেই, বিজ্ঞাপনকে অনেকে আর্ট অর্থে শিল্প বলতে প্রলুব্ধ হন। কিন্তু এর উদ্দেশ্যের দিকে ঘনিষ্ঠভাবে তাকালে ওই বলাবলিটায় রহিত হতে হয়, কারণ বিজ্ঞাপন নিতান্তই বাণিজ্যিক, ব্যবসায়িক; যে সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা শিল্পের ব্যাপ্তির সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়। জানা কথা যে, বিজ্ঞাপনের কায়কারবার নানাপ্রকার শিল্পোপাদান নিয়েই। কাব্য, সংগীত, চিত্রকলা বিজ্ঞাপনচিত্রে হামেশাই ব্যবহৃত হয়। আর অভিনয়, নাচ-গান তো এর সঙ্গে ওতপ্রোতই। এর প্রযুক্তি নাটক-সিনেমার, যা সরাসরি শিল্পনামধেয়। এতদসত্ত্বেও, অর্থাৎ শিল্পসহবাসী হয়েও এটি উদ্দেশ্যের দোষে শিল্পকর্ম নয়। অবশ্য ইন্ডাস্ট্রি অর্থে বিজ্ঞাপনজগৎকে বিজ্ঞাপনশিল্প বলবার মতো অবস্থা এখন এদেশেও বিদ্যমান। এ খাতে এখন কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ, লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান। যে কারণে মেধাবী, প্রতিভাবান, সৃজনশীল তরুণ চিত্রনির্মাতা ও লেখকরা এখন এ খাতে স্থিত। যাঁদের হাত অনেক ভালো নাটক-সিনেমা বানাতে কী সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করতে পারত, তাঁদের হাত এখন নিয়ত ব্যস্ত বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনে। অবস্থা এমন পালটে গেছে যে, নাটক-সিনেমা বানিয়ে হাত পাকলে তবেই কেবল বিজ্ঞাপননির্মাতা হিসেবে ডাক বা সাফল্য পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়, একসময় যার উলটোটাই সত্য ছিল।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিজ্ঞাপনের যা কিছু লাভালাভ তা পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও তদসংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তা, বিজ্ঞাপননির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণসংশ্লিষ্টজন, বিজ্ঞাপন প্রচারকাজে যুক্ত গণমাধ্যম এবং নির্দিষ্ট পণ্যের বিক্রেতার ভাগেই বর্তায়। এর বাইরে বাদবাকি সমস্ত ভোক্তাশ্রেণিই বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতির কড়ি গোনেন। ভোক্তাশ্রেণির দৃষ্টিতে দেখলে নানাভাবে সাধারণের শান্তি বিনষ্ট করাই যেন বিজ্ঞাপনের কাজ। যার কোনো কিছুরই অনটন নেই, বিজ্ঞাপন তাকেও প্রতিমুহূর্তে জানান দেয় যে, তোমার এটা নেই, ওটা নেই। যাদের এটা-ওটা আছে, তাদের চেয়ে তুমি ব্রাত্য, হীন। তার মনের মধ্যে তখন জন্ম নিতে থাকে প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা, তাতে জন্ম হয় চাহিদার। আর এই চাহিদাই তাকে চুবিয়ে মারে অতৃপ্তির লাভাস্রোতে। এই অতৃপ্তি থেকে বাঁচতে তাকে অপ্রয়োজনেও অর্থ ঢালতে হয়। এ তো গেল একদিক। অন্যদিকে সাধারণের চোখ-কানকে বিজ্ঞাপনের দ্বারা অনবরত পীড়িত হতে হয়। বিজ্ঞাপন ব্যাপক শব্দ ও দৃশ্যদূষণ ঘটায়। বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড-ব্যানারের বাধা এড়িয়ে সহজে মুক্ত আকাশ দেখবার সাধ্য শহরে অন্তত কারো হয় না আর। বিজ্ঞাপনে এখন ঢেকে থাকে চোখসমেত আমাদের বিস্তারিত মুখ। টিভি-রেডিওতে কান পাতা যায় না বিজ্ঞাপনের উচ্চণ্ড আওয়াজে। টিভির সামনে বসে বিরতিহীন বিজ্ঞাপনের ফাঁকে দর্শকদের একাধটু অন্যকিছু দেখতে-টেখতে হয়। দর্শক যেন টাকা দিয়ে টিভি কেনেন কেবল বিজ্ঞাপন দেখবার জন্যই। দয়া করে বোনাস হিসেবে চ্যানেলগুলো একটু নাচ-গান, নাটক-সিনেমা, সংবাদ-কথিকা দেখিয়ে তাদের ধন্য করে।

অবিশ্বাস্য লাগলেও আমাদের দেখতে হচ্ছে, প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মতো পত্রিকার কোনো একদিনের পুরো মলাট কোনো বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি হয়ে যেতে, যেটা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতেও অত্যন্ত গর্হিত ব্যাপার। এতদিন টিভিতে আমরা ৫ মিনিট বিজ্ঞাপনের পরে ৭ মিনিট সংবাদ দেখতাম। এখন যতক্ষণ সংবাদ, ততক্ষণই বিজ্ঞাপন। নতুন কায়দা বেরিয়েছে। তাতে বিজ্ঞাপন ঢুকে গেছে সকল প্রান্তে, সকল ক্রান্তিতে। শিরোনাম এবং বিরতিটুকুও বিক্রি হয়ে গেছে। বিক্রি হয়ে গেছে সংবাদের বিভিন্ন বিভাগ-উপবিভাগ।

সংবাদকে যত স্লটে ভাগ করা যায়, ততই যেহেতু লাভ, সেজন্য ভাগ করা যায় না যা তাও ভাগ হয়ে গেছে। অর্থ সংবাদ থেকে বাণিজ্য সংবাদকেও আলাদা করা হয়ে গেছে। বিজ্ঞাপনে বিরক্ত দর্শক এতদিন বিজ্ঞাপন শুরু হলে অন্য চ্যানেলে গিয়ে বিজ্ঞাপনের বিড়ম্বনা থেকে নিজেদের চোখ-কানকে রক্ষা করতেন, এখন আর সে সুযোগ নেই। এক গবেষণা তথ্য জানান দেয় যে, প্রায় ৩০ শতাংশ টেলিভিশন দর্শক সজ্ঞানে বিজ্ঞাপন এড়িয়ে চলার মানসিকতা রাখেন। এই তথ্যসূত্রে বিজ্ঞাপনসংশ্লিষ্টরা হয়ত বাকি ৩০ শতাংশ দর্শককেও কাবু করবার ফন্দি এঁটেছে। এখন বটমস্ক্রিনের নিউজস্ক্রল এলাকাও একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিকিয়ে দেয়া হয়েছে। তার মানে সংবাদ প্রচারকালে যতক্ষণ স্ক্রিনে চোখ রাখা হবে, ততক্ষণই প্রত্যেকে বিজ্ঞাপন দেখতে বাধ্য হবেন। অর্থাৎ আমার-আপনার জন্য পালাবার আর পথ নেই। সংবাদপত্র, টেলিভিশন কেউই আর সে সুযোগ দেবে না আমাদের। বিলবোর্ড-ব্যানারও আর দেবে না সাধ করে আকাশ দেখবার সুযোগ। আমরা ইতোমধ্যে হারিয়ে ফেলেছি বিজ্ঞাপন দেখা না-দেখা বিষয়ক আমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতা। এখন একমাত্র পত্রিকা না-পড়া, টিভি না-দেখা, ঘর থেকে বাইরে না-বেরোনোর সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতাটাই কেবল অবশিষ্ট আছে আমাদের। কিন্তু এ-ও কি সম্ভব কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে?

বলছিলাম সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিকিয়ে যাওয়ার কথা। এটা কেবল আমাদের দেশের বাস্তবতা না। পৃথিবীর অনেক দেশেই বিজ্ঞাপন গণমাধ্যমের আয়ের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই সন্দেহ হয় যে, বিজ্ঞাপনদাতারাই হয়ত পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে গণমাধ্যমের গতিপ্রকৃতি। প্রশ্ন জাগে, বিজ্ঞাপনের ওপর সিংহভাগ নির্ভরশীল গণমাধ্যমসমূহ কতদূর সাহস রাখে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারের? এটা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হবার উপক্রম। একাধটু যা হয়, তা নিছক শত্রুতাবশত। ‘ক’ নামক প্রতিষ্ঠান যখন ‘খ’ নামক সংবাদমাধ্যমকে বিজ্ঞাপন দেয় না, তখন ‘খ’ নামক সংবাদমাধ্যম তক্কেতক্কে থাকে ‘ক’কে নাজেহাল করবার জন্য। এই-ই একমাত্র শর্ত, যখন ‘খ’, ‘ক’কে ছিলিয়ে লবণ লাগিয়ে দেবার চেষ্টা করে। কারণ তো স্পষ্ট, জেদ উসুল করা। ভাবখানা এমন যে, আমাদের বিজ্ঞাপন দাও না, দেখো তোমাদের কেমন ডোবানো ডুবাই! এই হলো ঘটনা! তো, এ সংস্কৃতিতে কার লাভ? ওই দু’পক্ষেরই মাত্র। বাকি সবাই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত। আমরা জানতে পারি না সমাজ-রাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থা, যেটা জানাবার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দেদারসে কড়ি কামিয়ে চলেছে গণমাধ্যমগুলো। নির্দিষ্ট কোনো সত্য চেপে যাওয়ায় বা হালকাভাবে জানানোয় বা উলটো করে দেখানোয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রও।

পণ্যের গুণে না-হলেও কোটি কোটি টাকা মূলধন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের দাপটে ইতোমধ্যে দেশের ছোটোপুঁজির ক্ষুদ্রশিল্পের রীতিমতো বারোটা বেজে গেছে। ‘সবলের কাছে দুর্বল হেরে যাবে’, প্রকৃতিবিজ্ঞানের এই সূত্রে যত সত্যই উচ্চারিত হোক না কেন, পুঁজির বাঘ যখন অকাতরে টপাটপ হরিণ-খরগোশ গিলে যেতে থাকে, যখন মাৎস্যন্যায়ে ছেয়ে যায় বাণিজ্যিক খাত। তখন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়, তা নানা অস্থিরতার জন্ম দেয়। ব্যবসায়িক অসততা ও নকল পণ্য উৎপাদনের যে ব্যাপকতা এখন দেশের বড়ো মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এর সর্বঘনিষ্ঠ কারণটি কে জানে হয়ত ওই অস্থিরতায়ই লুকিয়ে আছে! শুধু তাই নয়, আমার ধারণা বাজারমূল্য বৃদ্ধিতেও বিজ্ঞাপনবাহুল্যের বিশেষ ভূমিকা আছে। উৎপাদকগোষ্ঠীর একটা ফাঁকিবাজি হিসেব আছে, যা দেখিয়ে জানানো হয় যে বিজ্ঞাপন পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে না, বরং উৎপাদন বাড়ে বলে পণ্যমূল্য কমে। আসলে এর সবৈব মিথ্যা। কারণ ক্রেতাদের সামনে এমন কোনো উদাহরণ নেই যে, দীর্ঘদিন বিজ্ঞাপিত হবার পর পণ্যের ব্যাপক বাজার তৈরি হলে শুরুর চেয়ে কম মূল্যে কোনো নির্দিষ্ট পণ্য ক্রয় করা যায়। ধরা যাক পণ্যটা ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী, আর এর উৎপাদক ইউনিলিভার। সারাদেশের সবকটা চ্যানেলে, সবকটা পত্রিকায় শত শত ঘণ্টা বিজ্ঞাপন প্রচার করে, দু’তিন মাস সময় ধরে অনুষ্ঠিত সুন্দরী বা মডেল আহরণ জাতীয় অনুষ্ঠানের স্পন্সর হয়ে, লক্ষ লক্ষ টাকা মাসোহারা দিয়ে কর্মকর্তা পুষে বছরে এরা উৎপাদন খরচের অধিক যে পরিমাণ টাকা বাড়তি ব্যয় করে, সন্দেহ কী যে, সে টাকা উৎপাদন খরচের সঙ্গে যোগ করেই এরা পণ্যমূল্য নির্ধারণ করে! আমাদের জানামতে, তাদের টাকার গাছ নেই, তারা বাণিজ্য করতে নেমেছে, সমাজসেবা করতে নয়। বাণিজ্যের শর্তানুযায়ী তারা যা বিনিয়োগ করবে, তা মুনাফাসহ উঠিয়ে নেবে। এ নিয়মের ওখানেও ব্যত্যয় ঘটবার কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন ও স্পন্সরশিপের কোটি কোটি টাকা আমাকে-আপনাকে তথা ভোক্তাশ্রেণিকেই গুণতে হয়। একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, এরা পণ্যের গায়ে যে মূল্য লিখে সে মূল্য নিয়ে কোনো মহল থেকেই কখনো কোনো প্রশ্ন ওঠে না। মাস পরে দশ টাকা বাড়লে তা নিয়েও না। মিডিয়া তাদের পুকুরচুরি নিয়েও কখনো টু-শব্দটি করতে আগ্রহী নয়। এর কারণ আগেই বলা হয়েছে। অন্যদিকে পিঁয়াজ-রসুনের দোকানি কেজিতে পাঁচ টাকা বাড়ালে তা নিয়ে মিডিয়ায় ব্যাপক হৈচৈ হয়। কারণ এরা বিজ্ঞাপন দেয় না। এবার ধরা যাক, পিঁয়াজ-রসুনের দোকানির বাসায় একটা ১৪ ইঞ্চি রঙিন কংকা টিভি আছে। কাজের ফাঁকে তার দুই মেয়ে টিভি অনুষ্ঠান দেখে। ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন দেখে তাদেরও ফর্সা হবার ইচ্ছে হলো। মেয়েরা একটা ক্রিম কিনবার বায়না জানালে দোকানি মুখ ঝামটা দিলেও মেয়েদের মায়ের সুপারিশে শেষপর্যন্ত তাকে রাজি হতে হলো, এটা মনে করে যে, যদি ঠিকই ওরা একটু ফর্সা হয় তো বিয়ে দিতে সুবিধে হবে! ষাট টাকা দিয়ে তাকে মাঝারি সাইজের একটা টিউব কিনতে হলো। তো, এই যে অতিরিক্ত ষাট টাকা অকারণে খরচ হলো, এই টাকাটা ওঠাবার জন্য ওইদিন যদি কোনো কোনো ক্রেতার কাছে দোকানি পিঁয়াজের দাম কেজিতে দুই টাকা বেশি হাঁকে, তাহলে দোষটা কার? ইউনিলিভারের নয়? ঘটনাটা যে এরকম করেই সবসময় ঘটে তা নয়। তবে দিব্যি দিয়ে বলা যায় যে, পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে এরকম একটা বৃত্তীয় কারণসূত্রও নিহিত আছে, যার একটা বড়ো ফ্যাক্টর বিজ্ঞাপনবাহুল্য।

অনেকে বলেন, বিজ্ঞাপনের একটা বড়ো সমস্যা এর বাড়িয়ে বলবার প্রবণতা। যেটা যা নয়, সেটাকে সে অভিধা দেয়া। আমাদের বিজ্ঞাপন দিনকয়ের ব্যবধানে টাক মাথায় চুল গজিয়ে বয়স কমিয়ে দেয়, বদখত মেদভুড়ি কমিয়ে সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়, শ্যামলা ত্বক ফর্সা করে সাফল্য এনে দেয়, ব্রন-মেছতার দাগ মুছে রমণীয় করে দেয়, শারীরিক উচ্চতা বাড়িয়ে সুদর্শন বানিয়ে দেয়, ফাটা সম্পর্ক জোড়া লাগিয়ে অটুট করে দেয়, ভালোবাসা গাঢ় করে মধুময় করে দেয়! এসব বিবৃতিতে কার্যত কোনো সত্যই নিহিত নেই, বরং যা রীতিমতো প্রতারণার পর্যায়ে গণ্য হবার যোগ্য। কিন্তু এরা হরদমই এসব বিবৃত করে যাচ্ছে। দেশের কোথাও কেউ নেই এসব দেখভাল করবার। থাকলে এরকম মিথ্যা দিনের পর দিন উচ্চ ভলিউমে বলা-কওয়া সম্ভব হতো না। মিথ্যা বলা, বাড়িয়ে বলা এক্ষেত্রে একরকম রেওয়াজেই পরিণত হয়ে গেছে যেন। আমাদের দেশের কোনো কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনে স্পর্শকাতর ‘হালাল’ শব্দটাও ব্যবহার করতে শোনা যায়। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে এভাবে বাণিজ্য করবার মতো জঘন্য ঘটনা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে সম্ভব বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে সবই সম্ভব। এমনকি ইউরোপ আমেরিকায় প্রত্যাখ্যাত কোনো কোনো বিজ্ঞাপনও এদেশে দেদারসে চলছে, যেমন হরলিকস। এজন্য কারো কোনোরূপ প্রশ্নের মুখেই পড়তে হচ্ছে না। হয়ত পড়তে হবেও না কখনো। এসব দেখে শুনে আমার নিজস্ব কিছু বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে। গড়পরতা সব বিজ্ঞাপনের দিকে আঙুল তুলে আমি বলতে পারি, ‘এটা বিজ্ঞাপন, এর ৪০ ভাগকে মাত্র সত্য হিসেবে নিও, বাকি ৪০ ভাগ প্রোপাগান্ডা আর বাদবাকি ২০ ভাগ মিথ্যা’-- এরকম একটা বিশ্বাস নিয়েই হয়ত আমাকে বাঁচতে হবে, যতদিন না কেউ বিশ্বাসযোগ্য কোনো জরিপতথ্য দিয়ে আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারছেন। এজন্যই আমি ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞাপনবাহুল্যে কুখ্যাত(!) কোনো পণ্য ক্রয়েই বিশেষ আগ্রহ বোধ করি না, যার ক্রয়োপযোগী অন্য বিকল্প আছে।

পাশ্চাত্যের আরেক গবেষণা তথ্য থেকে জানা যায়, প্রায় ৩০ শতাংশ দর্শক টিভিতে প্রচারিত অন্য অনুষ্ঠানাদির চাইতে বিজ্ঞাপন বেশি উপভোগ করে। কেন করে? কী এমন উপাদান বিজ্ঞাপনে রয়েছে, যা টিভিতে প্রচারিত অন্য অনুষ্ঠানগুলোতে নেই? এর উত্তর খুঁজে পাওয়া গেলে হয়ত সমাজে বিজ্ঞাপন কেমন প্রভাব রাখে তার একটা হদিশ করা যেত। অবশ্য এ জরিপে অংশগ্রহণকারীদের লিঙ্গভিত্তিক তথ্য সহজলভ্য নয়, যেটা লভ্য হলে আরো কিছু দিকেরও সুরাহা হতো। তবু কি অনুমান একদমই করা যায় না, অন্তত স্বচক্ষে কিছু বিজ্ঞাপনচিত্র দেখবার অভিজ্ঞতা থেকে? যায়। এর কারণ সম্ভবত কাম্য নারী/পুরুষের আকর্ষণীয় উপস্থাপনা, যা তরুণ-তরুণীকে সুযোগ করে দেয় ‘ব্র্যান্ডের বাঁদী’কে ঘিরে ফ্যান্টাসিতে মেতে ওঠবার। সকলেই জানেন, বিজ্ঞাপন নারীর শরীরী সৌন্দর্য ও যৌনতাকে পুঁজি করে তাকে পুরুষের কাম্যবস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে, তা তাকে যে ধরনের চরিত্রেই হাজির করা হোক না কেন। এমনকি বিজ্ঞাপনের ‘মা’কেও দর্শকের কাছে প্রকৃত ‘মা’ মনে হয় না, শরীরী নারীই মনে হয়। ওর উপস্থাপনাটাই এমন হয় যে, তাতে মায়ের অনুভূতি ঠিকঠাক খোলে না। পণ্যের রংয়ে রঙিন করে বিজ্ঞাপনে নারীমডেলকে পণ্যের কায়দায় যেভাবে নাড়াচাড়া করা হয়, তাতে পুরুষ নারীকে একটা নাড়াচাড়ার বস্তু হিসেবেই ভেবে নিতে পারে আলবত। এসব মডেলের মধ্যে নারীদর্শকও মজে যায় শুনেছি। তাদের কাছে মডেলনারী হয়ে ওঠে অনুকরণীয় আদর্শ, আর মডেলপুরুষ হয়ে ওঠে কাম্যজন!

উল্লিখিত ৩০ শতাংশের মনস্তত্ত্ব বিজ্ঞাপনের জেন্ডার নির্মাণ কৌশলের পুরোপুরি অনুকূলে। বিজ্ঞাপন যেভাবে হাসতে বলে এরা সেভাবে হাসে, যেভাবে সাজতে বলে সেভাবে সাজে। এমনকি যেভাবে তাকাতে বলে বিপরীতলিঙ্গীর প্রতি, সেভাবে এরা তাকায়ও। এসবের ভিতর দিয়ে পুনঃসামাজিকীকৃত হয় নারী-পুরুষ সম্পর্ক বিষয়ক সমাজে বিদ্যমান চিরাচরিত একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে নারী কেবল নাচে-গায়, সাজে-রাঁধে, সেবা-সহায়তা করে, কাপড় কাচে, হাঁড়ি-বাসন মাজে, বাচ্চা লালনপালন করে। বিজ্ঞাপনে নারী কমই বিমান চালায় বা অফিস পরিচালনা করে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পণ্যের ঘনিষ্ঠ পরিচয় উপস্থাপন করবার পাশাপাশি বিজ্ঞাপন নারীর এহেন স্টেরিওটাইপড চেহারাছিরিও সমাজে জ্ঞাপন করে যেতে থাকে অবিরাম, যা নারী-পুরুষের মধ্যে সমতাপূর্ণ সম্পর্কোন্নয়নের যাবতীয় উদ্যোগের বিপরীতে বিরামহীনভাবে নেতিঢেউ প্রবাহিত করে যেতে থাকে। এ কারণেও বটে, অনেকে ঝেড়ে কেশে বলেন, বিজ্ঞাপন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনবরত ছড়িয়ে যাচ্ছে মনন কলুষ। এ দৃষ্টিতে একে দায়িত্বজ্ঞানহীন একটি প্রকল্পের অধিক কিছু ভাবা যায় না বস্তুত।

সম্প্রতি নির্মিত কোনো কোনো বিজ্ঞাপনে নারীর এই স্টেরিওটাইপড ইমেজ ভেঙে বাইরে বেরোবার চেষ্টা করা হচ্ছে দেখে ভালো লাগে। রান্নাঘরে পুরুষকেও পাঠানো হচ্ছে দেখে হতাশা কিছু কমে। কিন্তু এই ভালো লাগা স্থায়ী হয় না রাঁধুনি মা দিবস বা পন্ডস নারী দিবস জাতীয় প্রোমোশনাল প্যাকেজ কিংবা ইউনিলিভার/স্কয়ারের পয়সায় ঢাকঢোল পিটিয়ে সুন্দরীর হাট বসানোর কথা ভেবে। শেষপর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে এরা আমাদের? বড়ো অসহায় লাগে, কেবলই অসহায় লাগে। আধিপত্যশীল এই বিজ্ঞাপনের দাপটের কাছে অসহায়তা বোধ করাই সম্ভবত আমাদের পরম নিয়তি। যেমনটি মূর্ত হয়ে উঠেছে শঙ্খ ঘোষের সুবিখ্যাত কবিতা মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনেও। আমাদের ব্যক্তিগত কিছুই যেন আর অবশিষ্ট নেই, যেখানে ঢুকে যায় নি বিজ্ঞাপনের আগ্রাসী দাপুটে হাত। কবিতাটি পাঠশেষে একটা নিরাময়অযোগ্য বিপন্নতাবোধের জন্ম হয়। ক্ষুব্ধতাও জাগে মনে, কিন্তু বিপ্লবের বাসনা জাগবার ফুরসৎ হয় না। কার বিরুদ্ধে বিপ্লব? বিশ্বায়ন? বাজার? পুঁজি? অসম্ভব লাগে প্রায়। তবু চলুন আরো একবার বিপন্ন হবারই চেষ্টা হোক, যদি কোনো নিরাময় চিন্তা বেরিয়ে আসে কোনোদিক থেকে! বলা তো যায় না কিছু!

মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে
একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি
তোমার জন্য গলির কোণে
ভাবি আমার মুখ দেখাব
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।

একটা দুটো সহজ কথা
বলব ভাবি চোখের আড়ে
জৌলুসে তা ঝলসে ওঠে
বিজ্ঞাপনে, রংবাহারে।

কে কাকে ঠিক কেমন দেখে
বুঝতে পারা শক্ত খুবই
হা রে আমার বাড়িয়ে বলা
হা রে আমার জন্মভূমি!

বিকিয়ে গেছে চোখের চাওয়া
তোমার সঙ্গে ওতপ্রোত
নিওন আলোয় পণ্য হলো
যা-কিছু আজ ব্যক্তিগত।

মুখের কথা একলা হয়ে
রইল পড়ে গলির কোণে
ক্লান্ত আমার মুখোশ শুধু
ঝুলতে থাকে বিজ্ঞাপনে।


(শঙ্খ ঘোষ, মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে)


ম. হাসান সম্পাদিত 'দ'-এ সেপ্টেম্বর ২০১০-এ প্রকাশিত

Sunday, November 15, 2009

আনাড়ীর কবিদর্শন

এক দু’পৃষ্ঠার একটি গদ্য লিখে একজন কবির প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে তোলা যেন সম্ভব কোনো কাজ, তাও যেই সেই কোনো কবি নন, স্বয়ং বিনয় মজুমদারকে : বাংলা কবিতাঙ্গনে কবিতার শহীদ বলে খ্যাত জীবন্ত কিংবদন্তী হয়ে যিনি অদ্যাবধি শিমুলপুর আলোকিত করে আছেন-- কবিতার পাঠককে আরো কিছু বিস্ময় উপহার দেবার জন্যে। কিন্তু তবু আমরা কলম ধরি। ধরি, হাতেকলমে এটি প্রমাণ করবার জন্যে যে গোটা কয়েক পৃষ্ঠায় একজন লেখকের কোনো চিন্তার, চরিত্রের, প্রকৃতির প্রান্তটিকে স্পর্শ করা যায় মাত্র। দশজন মিলে দশদিক থেকে প্রান্ত স্পর্শ করলে সম্পূর্ণ কবির অনেকখানিই নিকটে পৌঁছা হয়ে যায়, যেতে পারে। এরকম স্পর্শে স্পর্শে কবির স্বর্ণাবয়বটি ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। আর কবির স্পষ্ট হওয়া মোটেই কবির জন্যে নয়, দরকার পাঠকের এবং প্রকারান্তরে আগামী কবিতার জন্যেই। আমরা যখন একজন কবির বিষয়ে কিছু লিখতে উপগত হই, তখন অতসব ভেবে না-নিলেও সাধিত কর্মটি অগোচরে এ ফলাফলটুকুই সম্ভব করে তোলে মাত্র। তবু কাজটি করতেই হয়, ফুল নামধেয় কাঁটার উৎপাত অরণ্যানীতে এত বেড়ে গেছে যে, আদপে যারা ফুল তাদেরকে নানাদিক থেকে দেখে চিনে ফেলা প্রয়োজন-- তাতে ক’টিমাত্র দল, পাপড়ি দৃশ্য নাকি অদৃশ্য, বর্ণিল নাকি বর্ণহীনতাই তার সৌন্দর্য-স্মারক, গন্ধ আছে কি না, থাকলে তার জাতকুল শনাক্তযোগ্য কি না ইত্যাদি। নইলে কাঁটারাও ফুলের পোশাকে সজ্জিত হয়ে ফ্যাশন শোর মতো পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ভ্যাংচাতে থাকবে-- আর প্রকারান্তরে ভুল অভিলক্ষে অভিমুখীনতাকে চিহ্নিত করে বিভ্রান্ত দর্শক কাম উপভোগকর্তা, রক্তপাতের কারণকে রক্তমূল্যে সংগ্রহ করার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এজন্যে আমার আপনার ভাবিত হবার কী আছে, যেখানে উপভোগকর্তা নিজেই নিজের জন্যে বিপদ কিনে আনছে? এর জবাব এরকম যে, ভাবিত হবার মূল্যমানের কারণ আছে। কেননা নিষ্ঠ কবিতাকর্মীরা, যারা নিজেরা ফুলোপম গন্ধ বিলাবার জন্যে অনেক কামনাবিলাসিতাকে উপেক্ষার চাবুক কষে সদা প্রস্ফূটিত হয়ে চলেছেন অরণ্যানীছায়ে, প্রকৃত ফুলচিহ্নিতকরণের সূত্রাদি সন্ধানে ব্যর্থ হলে পরবর্তী গন্ধলোভীরাও এদের শনাক্ত করতে পারবে না। তাতে আগাগোড়া ঘাটতিরই সমূহতা বাঙ্ময় হয়ে উঠবে। যে পথে ধাবন কেবলই ঘাটতির নিশ্চয়তা বিধান করছে, সে পথ বাঁয়ে রেখে হাঁটাই কাজের কথা-- কেনই বা অযথা দাঁড়াবে একজন গিয়ে বিষবৃক্ষতলে? তাই--

বিনয় মজুমদারকে

অবশেষে রাত্রিও পেছনে হটে ঘুম যায় চূড়ায় আভাসে
স্ত্রীপুত্রসমেত-- একা শুধু ঢালে শুয়ে পাতাদের
পতন যন্ত্রণাগুলি ছুঁয়ে ছেনে দেখ আর ঘাসের সুগন্ধে
ধোও মুখ-- দূরে পড়ে আছে যারা স্বজন সুহৃদ
পাহাড়ের পদ-সন্নিকটে-- ‘পথ নেই খুঁজে বার কর’ বলে
দলেবলে মেতে আছে নিবিড় বিপ্লবে
তাদের সকাশে দ্রুত জটিল এক সবুজ বার্তাবাণী
পৌঁছে দাও বাতাসে ঝাঁকিয়ে মাথা বিশাল বৃক্ষের...
ফলে দূর বিন্দুসাথে যে পথ রচিত হয় ট্রান্সন্যাচারাল
সে পথ কুসুমরঙা তুমুল প্রবাহে ভাসে
গণের প্রবল চাপে আকাঙ্ক্ষা উত্তাপে
একার বাসনা বীণা পিষে ফেলে
জলের স্বভাবে গলে কলকল ধেয়ে আস নিচে

এবং

খ্যাতিলোভী কবিযশোপ্রার্থীদের

সুবিন্যস্ত আলোময় এহেন নক্ষত্ররাজি দিয়ে আকাশের
নিজের কী লাভ হলো কবে

বাতাসের স্বয়ম্বর নাতনিরা সবে অকৃপণ
আঁচলে পুঁটুলি করে অম্লজান বয়ে এনে
বিনিময়ে কোনোকিছু না চেয়েই
আযৌবন বিলিয়ে গেল বখাটে যুবাদের

ধড়মড় পাড় ভেঙে নদীরই বক্ষ বাড়ে
জলের তা কোনকালে কোন কাজে লাগে

আর শুধু ভাষা শিখে মোচড় আঁকতে শিখে
অনুভূতি গেলে ঢেলে ছাঁচে ফেলে কথা লিখে বিনিময় চাও
যাও তবে যাও
ক্ষণজীবী খ্যাতি পেলে সস্তায়-- আজলায় তুলে নিয়ে
চেটেপুটে খাও

পাশাপাশি এসব ভাবতে হয়, কারণ খ্যাতির কাঙ্ক্ষায় প্রতি মুহূর্তে আকুপাকু করে যেসব কবিযশোপ্রার্থী; সামাজিকতা রক্ষায় তারা বিনয়ের কবিতাকে যতই সেরা বলুক, মর্ম দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে না, পারা সম্ভব নয়। শিল্পের জন্যে ন্যূনতম স্যাক্রিফাইস যে এক জীবনে করতে পারে নি, মানুষ কেন নিকটে কুকুর গেলেও তার কিছুই উড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে না, প্রকৃত সারস তো দূর অস্ত। এই প্রকৃত সারস নিজের ভিতরে ধারণ করতে হলেই একজনকে নানারকম হাতছানি উপেক্ষা করে একাকী এসে দাঁড়াতে হয় সংঘের বিপরীতে। কারণ সংঘ সর্বদা স্বার্থের নিমিত্তে গঠিত হয়, সংঘ সর্বদা সংঘের দিকেই হাঁটাচলা করে, সংঘ নৈঃসঙ্গের পক্ষে কোনো যুক্তি বিস্তার করতে দেয় না। সে সম্ভাবনাটুকুই নস্যাৎ করে দেয় বরং। বিনয় মজুমদার যে অগ্নিমেধা নিয়ে নির্মোহ একাকিত্বকে কেবল কবিতার জন্যে বরণ করে নিয়েছেন, সে মেধা নিয়ে বিষয়ভাবনায় মত্ত হলে বিনয় কর্তৃক উপেক্ষিত সংঘের অনেকেই তার কর্তৃক আহরিতব্য সম্ভাব্য বিষয়ৌজ্জ্বল্যের কাছে মলিনতম হয়ে যেতেন। সংঘহীনতা সত্যের যতটা নিকটে পৌঁছবার সাহস যোগায়, আর কিছু ততটা নয়। যেকোনো হীনতা, তা যদি অন্য কোনো তুমূল ও যথার্থ প্রাপ্তিকে ধরে আনবার জন্য প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে, তবে কেন একজন বিনয় মজুমদার হৈচৈয়ের থেকে লক্ষ যোজন দূরে ‘বিনোদিনী কুঠি’র নিবিড় প্রকোষ্ঠে সেধিয়ে যাবেন না? সেটা যুগপৎ বিনয় এবং বাংলা কবিতার পাঠকের জন্যে ইতিবাচক হয়েছে। তিনি নিজে খ্যাতির কাঙ্ক্ষায় মরিয়া হয়ে যান নি বলে খ্যাতিই এখন তাকে শীতের ওম জোগাচ্ছে চারপাশ থেকে।

শুধু কবিতার জন্যে এই বেঁচে থাকা-- এইভাবে ভাবতে পারা গেলে আপনা-আপনি একটি ধ্যানযোগ ঘটে যায় কবিচিত্তে। এই ধ্যানযোগই কবির বক্তব্যকে পৌঁছে দেয় অভাবিত দার্শনিক উচ্চতায়। কবির আত্মোপলব্ধিই তখন সর্বকালীনতা ও সর্বজনীনতা প্রাপ্ত হয়ে যায়। অমর কবিতার অভীষ্ট বোধকরি সেটাই। এরকম ধ্যানযোগই ঘটেছে বিনয় মজুমদারের ফিরে এসো, চাকা এবং অঘ্রানের অনুভূতিমালার ছত্রান্তরে। এখানে তাঁর পর্যবেক্ষণসমূহ জীবনের এমনি সব বাঁক-কোণ ছেয়ে গেছে যে, ওসব টেক্সট উপলব্ধিযোগ্য সত্যের একেকটি নন্দনভাণ্ডারে রূপ পরিগ্রহ করেছে।

২.
বিনয় মজুমদার কর্তৃক আহরিত সত্যরাশি তুলনারহিত। এই অনুসন্ধেয় সত্যরাশি বলার ভঙ্গির অসাধারণত্বে হয়ে উঠেছে জ্ঞানালোক জারিত একেকটা কাব্য-ধর্মাধ্যায়-- যুগপৎ ব্যক্তির এবং বস্তুর। হতে পারত যে, আহৃত সত্যমালাকে গৌণ করে দিয়ে মেদে মেদে শরীর নির্মাণ করেছেন তিনি কবিতার-- অন্য অনেক কবিপ্রবীণের মতো। কিন্তু যখন হুবহু মুখস্থযোগ্য বাক্য রচনা করতে চাবেন একজন কেউ, তখন পঙক্তিসমূহ এমন হওয়া চাই, যা একজন পাঠক সহজেই তার জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে পারেন, ব্যক্তির প্রেমানুভূতি যার থৈ সহজেই স্পর্শ করতে পারে। এখানে বিনয় মজুমদার কর্তৃক নির্ধারিত কবিতার সংজ্ঞাটি সামনে আনা যেতে পারে। তাঁর মতে, কবিতা হচ্ছে চিরস্মরণীয় সেই বাক্যসমষ্টি, যা হুবহু মুখস্থ করা যায়; এবং এ-ও তিনি জানিয়ে রাখেন যে, এ সংজ্ঞাটি অমর কবিতার। সেক্ষেত্রে কবিতায় প্রাবাদিক পঙক্তি রচনাও দোষান্যায়ের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে সক্ষম হয়। এখানে বিনয় মজুমদারের ফিরে এসো, চাকার কতিপয় পঙক্তি উৎকলন করা যেতে পারে। অনুসন্ধিৎসু পাঠক চাইলে এসব আরেকবার পড়ে নিতে পারেন--

...সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে
চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা

সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কতো বেশি বিপদসংকুল
তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ

সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে

মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়

আলোকসম্পাতহেতু বিদ্যুৎ সঞ্চার হয়

সফল জ্যোৎস্না চিরকাল মানুষের প্রেরণাস্বরূপ

জীবনধারণ করা সমীরবিলাসী হওয়া নয়

ঘন অরণ্যের মধ্যে সূর্যের আলোর তীব্র অনটন বুঝে
তরুণ সেগুন গাছ ঋজু আর শাখাহীন, অতি দীর্ঘ হয়;

বৃক্ষ ও প্রাণীরা মিলে বায়ুমণ্ডলকে সুস্থ, স্বাস্থ্যকর রাখে

সকল ফুলের কাছে এতো মোহময় মনে যাবার পরেও
মানুষেরা কিন্তু মাংস রন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে

বর্ণাবলেপনগুলি কাছে গেলে অর্থহীন, অতি স্থুল বলে মনে হয়

                     উপবিষ্ট মশা উড়ে গেলে
তার এই উড়ে যাওয়া ঈষৎ সঙ্গীতময় হয়

বিনিদ্র রাত্রির পরে মাথায় জড়তা আসে, চোখ জ্বলে যায়।

সকল সমুদ্র আর উদ্ভিদজগৎ আর মরুভূমি দিয়ে
প্রবাহিত হওয়া ভিন্ন বাতাসের অন্য কোনো গতিবিধি নেই

প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগুলি ক্রমে জ্ঞান হয়ে ওঠে

শয়নভঙ্গির মতো আড়ষ্ট স্বকীয় বিকাশ
সকল মানুষ চায়--

বিদেশী চিত্রের মতো আগত, অপরিচিত হলে
কিংবা নক্ষত্রের মতো অতি পরিচিত হলে তবে
আলাপে আগ্রহ আসে;

...গাঙচিলগুলি জাহাজের সঙ্গে-সঙ্গে চলে,
অথবা ফড়িং সেও নৌকার উপরে ভেসে থাকে
ডানা না-নেড়েই এত স্বাভাবিক, সহজ, স্বাধীন

সর্বদা কোনো না কোনো স্থানে, ঝড় হতে থাকে

ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে
পুনরায় কেশোদ্গম হবে না;

সূর্যপরিক্রমারত জ্যোতিষ্কগুলির মধ্যে শুধু
ধূমকেতু প্রকৃতই অগ্নিময়ী;

                                              বাতাসের
নীলাভতা-হেতু দিনে আকাশকে নীল মনে হয়

কিছুটা সময় দিলে তবে দুধে সর ভেসে ওঠে

ক্বচিৎ কখনো কোনো ফোঁড়া নিষিদ্ধ হলেও
যে-কারণে তার কাছে অগোচরে হাত চলে যায়

সন্তপ্ত কুসুম ফুটে পুনরায় ক্ষোভে ঝ’রে যায়।

                             প্রাকৃতিক সকল কিছুই
টীকা ও টিপ্পনী মাত্র, পরিচিত গভীর গ্রন্থের

চিৎকার আহ্বান নয়, গান গেয়ে ঘুম ভাঙালেও
অনেকে বিরক্ত হয়;

মুগ্ধ মিলনের কালে সজোরে আঘাতে সম্ভাবিত
ব্যথা থেকে মাংসরাশি, নিতম্বই রক্ষা করে থাকে।

বিনয় মজুমদার কর্তৃক আবিষ্কৃত এইসব প্রাবাদিক সত্যগুচ্ছকে মোটাদাগে চারভাগে ভাগ করে দেখা যেতে পারে-- এর বাইরেও আরো অজস্র সূক্ষ্ম বিভাজন সম্ভব তো বটেই। আপাতত এই চারটি গবাক্ষপথে তাকালেও আলোর রঙ বৈচিত্র্যটা অনেকটাই উপলব্ধিতে আসে বলে মনে হয়।

১.    জৈবনিক
২.    প্রাকৃতিক
৩.    জ্যোতির্লৌকিক
৪.    বৈজ্ঞানিক

বলা বাহুল্য যে, তাঁর কর্তৃক আবিষ্কৃত এসব সত্যের চিরন্তনতা সর্বক্ষেত্রে প্রশ্নাতীত নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও পদ্ধতিগতভাবে লব্ধ জ্ঞান বলে বিজ্ঞান ক্রমপরিবর্তনের পথে সদাই ধাবিত। ফলে জনৈক পর্যবেক্ষকের কাছে আজ যা অসম্ভব বা মিথ্যা-- কাল তাই-ই সম্ভব ও সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যেতে পারে। বিনয় মজুমদার তাঁর গায়ত্রীকের একটি  কবিতায় জানিয়েছিলেন যে, ‘...আজো মানুষেরা প্রসবের আগে শিশু পুরুষ কি মেয়ে,/ মৃত কি জীবিত হবে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা রাখে না।’ এটি একটি বৈজ্ঞানিক মিথ্যা হিসেবে আজ পরিগণিত। কারণ বিজ্ঞান আজ এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। আবার অঘ্রানের অনুভূতিমালায় বিনয় মজুমদার কিছু জ্যোতির্লৌকিক তথ্য উপস্থাপন করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে বিনয় নিজের জবানীতেই তার অসারতার কথা বলেছেন। ওখানে সপ্তর্ষী নক্ষত্রমণ্ডলি অঘ্রান মাসে ওঠে বলা হয়েছে। আসলে ওঠে গ্রীষ্মকালে। এ গ্রন্থেই উল্লিখিত একটি প্রাকৃতিক সত্য-- ‘সকল বকুল ফুল শীতকালে ফোটে/ ফোটে শীতাতুর রাতে’-- অথচ বকুল ফুল কখনোই শীতকালে ফোটে না, ফোটে বসন্তকালে। আবার প্রচুর পরিমাণে জৈবনিক ও প্রাকৃতিক যেসব সত্য বিনয় মজুমদার তাঁর রসোত্তীর্ণ প্রবাদপ্রতিম বাক্যে ধারণ করেছেন, তার চিরন্তনতা প্রশ্নাতীত বলে মনে হয়। আসলে সেসবও প্রশ্নাতীত নয়। যেমন, ‘ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে/ পুনরায় কেশোদ্গম হবে না’। প্রকৃতপক্ষে ক্ষতস্থানে প্রচুর পরিমাণে কেশ না-গজালেও ক্ষতের প্রান্ত ঘেষে একটি দুটি দীর্ঘ লোম গজায়। অনেকের দেহই তার প্রমাণ বহন করছে। কিন্তু ‘ঘন অরণ্যের মাঝে সূর্যের আলোর তীব্র অনটন বুঝে/ তরুণ সেগুন গাছ ঋজু আর শাখাহীন অতি ধীর্ঘ হয়’-- আজিও চিরন্তন।

বলে রাখা ভালো যে, কেবল চিরন্তনতার অনুসন্ধানই কবিতার অভীষ্ট হবে এরকম কোনো কথা নেই। সময়ের ব্যাবধানে গায়ত্রীকে থেকে উল্লিখিত কবিতার বৈজ্ঞানিক সত্য আজ মিথ্যায় পর্যবসিত হয়েছে-- তাতে কবিতার তেমন যায় আসে নি কিছুই। কবিতার সৌন্দর্যের জায়গায় তা কোনো ব্যত্যয় ঘটিয়েছে, এমন নয়। কিন্তু যে কবিতার ধরনটিই এমন যে পাঠোত্তরে মনেই হয় তা আমাকে কিছু সত্যের অন্তত রজ্জুটা হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে-- সে কবিতার কবির এ ব্যাপারে সতর্ক থাকাই সমীচীন বলে আমার মনে হয়। নইলে পাঠককে অকারণে বিভ্রান্ত করা হয়ে যেতে পারে।

বিনয় মজুমদার জানাচ্ছেন, পাঠক যে কবিতা পড়ে, বারবার যে কবিতার কাছে ফিরে যায়, পড়ে পড়ে মুখস্থ করে ফেলে-- এর পেছনে ভূমিকা রাখে আনন্দ লাভাকাঙ্ক্ষা। কবিতায় রচিত বাক্য পাঠকের কাছে আনন্দপ্রদ হয় বলেই পাঠক বারেবারে কবিতামুখী হয়।

এরূপ বিরহ ভালো; কবিতার প্রথম পাঠের
পরবর্তী কাল যদি নিদ্রিতের মতো থাকা যায়
স্বপ্নাচ্ছন্ন, কাল্পনিক; দীর্ঘকাল পরে পুনরায়
পাঠের সময় যদি শাশ্বত ফুলের মতো স্মিত
রূপ, ঘ্রাণ ঝ’রে পড়ে তাহলে সার্থক সব ব্যথা

এই যে নিদ্রিতের মতো আচ্ছন্ন, বুঁদ হয়ে থাকা তা আনন্দের কারণেই। ‘কবিতা ও আনন্দ’ নামক প্রবন্ধে বিনয় মজুমদার কবিতা থেকে পাঠক কর্তৃক আনন্দ পাবার ১৪টি উপায় শনাক্ত করেছেন। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই চতুর্দশ উপায় বিনয় মজুমদারের নিজের কবিতাকেই ব্যাখ্যা করছে। এ বৈশিষ্ট্যগুলো বিনয়ের কবিতারই বৈশিষ্ট্য। আবার একইসঙ্গে এগুলো অমর কবিতারও বৈশিষ্ট্য।

বিনয় মজুমদারের মতে, অমর কবিতায় নিম্নোক্ত গুণগুলো থাকা দরকার-- মধুর ঘটনা, অন্যের জীবন কাহিনি জানবার উপকরণ, সত্য, জ্ঞানোপকরণ, দর্শন, জুগুপ্সা, ব্যঞ্জনা, ধাঁধার সমাধান, আবিষ্কার, প্রয়োজনীয়তা, সহজে মনে রাখার মতো বিন্যাস, সারাজীবন ধরে গবেষণার সুযোগ, নীতিকথা এবং রহস্য।

এর সবকটি কিংবা কোনো একটি কিংবা কোনো-কোনোটি একটি কবিতায় উপস্থিত থাকলে সে কবিতা পাঠকের জন্য আনন্দ বিধান করতে সক্ষম এবং সেটি অমর কবিতার দিকে অল্পবিস্তর অগ্রসরমাণ। কবিতায় এই অমরত্বের সন্ধান দেবার জন্যই বিনয় মজুমদার এর ছত্রে ছত্রে উল্লিখিত আনন্দোপকরণসমূহের সুষম বিন্যাস ঘটিয়েছেন। সুতরাং বিনয় মজুমদার ফিরে এসো, চাকা কিংবা অঘ্রানের অনুভূতিমালায় যা দিয়েছেন, পরবর্তী কয়েক পুরুষ ধরে আমরা তাতে আনন্দোপকরণ খুঁজে পাবার জন্যে বারেবারে অবগাহনের আয়োজন করব ও প্রকৃতই অবগাহনের খেলায় মেতে উঠব, প্রায়শই ডুব দিয়ে উঠিয়ে আনব নবতর আরো আরো প্রকৃত মাণিক্যের সন্ধান। আমরা তাঁর কবিতার কাছে ফিরে যাব রথ হয়ে, চাকা হয়ে-- যদিও কেউই আমরা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক নই। সে কেবল একজনই ছিলেন, আছেন; কিন্তু বিনয়ের কবিতার কাছে তিনিও কোনো কোনো বিশেষ মুহূর্তে ফিরে ফিরে যান কি না, তা আমরা জানি না।

রচনাকাল : ২০০০

অনিকেত শামীম সম্পাদিত লোক-এর বিনয় মজুমদার সংখ্যায় ফেব্রুয়ারি ২০০১-এ প্রকাশিত।

Saturday, November 14, 2009

কবিতার গান হয়ে ওঠা

খ. সুরের জগৎ কথার থেকে পৃথক।
গ. তবু এমন কথা আছে যাকে সাজালে সুরের রাজ্যে সহজে যাওয়া যায়।

কথা ও সুর : ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

আধুনিক বাংলা গান বিষয়ে আমি এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ লিখতে উদ্যত হই নি, কিংবা স্রেফ সাইম রানার গান বিষয়েও কোনো প্রবন্ধ লিখবার কোশেশ এটা নয়। এই লেখার অভিমুখ নিতান্তই অগভীর, কেবল আজকের গীতবৈঠকে গীত হবার জন্য তাঁর দশটি নির্বাচিত কবিতাকে ঘিরেই এর আবর্তন। ফলে এর প্রতি কোনো ধরনের অত্যাশা পোষণ হতাশার কারণ হতে পারে।

এই নিবন্ধকারের জানা আছে যে, সাইম রানা একজন কবি। আমি নিজেও কবিতার প্রতিবেশী বলে বিষয়টা অনেকটা কাছে থেকেই জানা। কিন্তু রানা যে একজন সংগীত সাধকও, সেটা আমি জানি না অথবা খুবই দূর থেকে জানি। কারণ কখনোই তাঁর কণ্ঠে সুরে বাঁধা কোনো কথা শুনবার সৌভাগ্য আমার হয় নি। আজই মাত্র আমার সামনে তেমন একটা সুযোগ অবারিত হতে যাচ্ছে। আমার কৌতূহলটা তাই সেখানেই বেশি। লিরিকগুলো আগে দেখা-পড়া থাকায় হয়ত এই এপিসোডটা আমার কাছে বেশ উপভোগ্য হবে, কেননা প্রায়-ন্যাংটো, উলোঝুলো ও ভাব-বক্তব্যের ভারবাহী কথার শরীরে সুর চাপালে সৌন্দর্য কীভাবে পূর্ণতা পায় বা লুপ্ত হয়, কীভাবে ডানে-বামে মোড় নেয় তা মিলিয়ে নিয়ে নিজের জানাবোঝাটায় কিছু হয়ত যোগ করার সুযোগ তৈরি হবে।

আজকের গীতবৈঠকের সংকলনে মুদ্রিত সাইম রানার কবিতাগুলো আমি বারকয় পড়েছি। এগুলোকে কবিতাই বলছি, কারণ সুর লাগবার আগ পর্যন্ত এগুলো তাই-ই, গান নয়। প্রথমবারের পড়াটা ছিল, যাকে বলে চোখ বুলানো, কোথাও ধাঁধিয়ে যাবার মতো কিছু ঠেকে যায় কি না তার অন্বেষণ। ঠেকে নি। কেমন সব চেনা চেনা শব্দ-বাক্য, চেনা ছবি, চেনা ফ্রেইজ। সপ্তাহখানেক সংকলনটা অবহেলায় পড়ে থাকে। ছুঁই না, ছোঁবার টান অনুভব করি না বলে। শুক্রবার যখন বেশ ঘনিয়ে আসতে থাকে, তখন ভেতর থেকে ক্রমশ নাগরিক হয়ে ওঠা আমার মনটা তাড়া দেয়, সেটা এই বলে যে, তুমি এই মর্মে আয়োজকদের কথা দিয়েছ, কবিতাগুলো সম্পর্কে একটা মিতভাষ্য অন্তত উপস্থাপন করবে। আমি আতঙ্কিত বোধ করি। তবে সেটা সহজেই কাটিয়ে ওঠা যায়। এক রাতে অন্য সব কাজকে লজিক্যালি গৌণ ঠাওরিয়ে সংকলনটা নিয়ে ফের বসা হয়। একটা একটা করে কবিতা পড়ি আর চোখ বন্ধ করে মাথার ভিতর কবিতাটাকে খেলাতে চাই। খেলে তো খেলে না। তারপর আবার পড়ি, কখনো বা আবার। দেখি যে ভিতরে এক ধরনের প্রতিক্রিয়ার জন্ম হচ্ছে। এক দুই শব্দে লেখাটার পাশেই ওই প্রতিক্রিয়াগুলো লিখে ফেলি। দশটি লেখাই যখন পড়া শেষ হয়, তখন ভিতরে একটা সমন্বিত চাপ তৈরি হয়, যা দশটি লেখার ভিত্তিতে সামগ্রিক একটা প্রতিক্রিয়াও উগরে দিতে চায়। একটা নোটখাতায় তাও টুকে ফেলি।

এরও তিন ঘণ্টা পরে বসি কম্পিউটারে। পটভূমি রচনার পর থমকে যাই, কীভাবে এগোবো সেটা ভেবে। সহসা সিদ্ধান্ত নেই যেভাবে চিন্তা এগিয়েছে সেভাবেই না হয় হোক লেখাটা। অর্থাৎ, পাঠোত্তরে প্রতিটা কবিতার পাশে প্রথম জন্ম নেয়া যে প্রতিক্রিয়াটি লেখা হয়েছিল তাই-ই একে একে বিন্যস্ত করি। লিখি--
  1. লড়াই-সংগ্রাম ছাপিয়ে ওঠা ক্লিশে এক আশা
  2. এবারও ভোর হয়, কোকিলেরা গেয়ে ওঠে পুরাতন ব্যথা ভুলে
  3. যা কিছুকেই তিনি মহান বলে ভাবেন, মহিমান্বিত করতে চান, তা-সবকেই তিনি বিশালতার উপমায় উপমায়িত করেন
  4. শিশুসুলভ সরল আবেগ উসকে ওঠে, দীর্ঘ জীবনের আকুতি প্রকাশ পায় শিশির প্রতীকে
  5. দুঃখমোচনের সাংগীতিক প্রেসক্রিপশন, যেখানে আবারো উঁকি দেয় আশা নামের ফুলঝুরি
  6. নদী-নৌকায় মাখামাখি ভাঙাগড়ার জীবনচিত্রে মূর্ত বাংলার রূপ
  7. ‘তুমি আসবে বলে’, ‘তুমি হাসবে বলে’-- এই জাতীয় ফ্রেইজ লিখতে অসতর্কতাজনিত একটা সাহস লাগে
  8. (...)। (সেসব কবিতাই গানের জন্য উৎকৃষ্ট, যাকে গদ্যে রূপ দেয়া যায় না।)
  9. অতিকে স্পর্শ করা খোলা কল্পনার উৎকর্ষ
  10. চিরছবির সংকলন। নীরবে কেয়াগাছের পাতা নড়ছে, ঋতু বদলাচ্ছে, এসব ঘটনার বয়স কখনোই বাড়ে না। কিন্তু মানুষের বয়স বাড়ে, আর বয়স বাড়া মানে ক্রমশ ফুরিয়ে যাওয়া-- মৃত্যুতে।   
এবার নোটখাতার দিকে তাকাই। সেখানে লেখা আছে, সাইম রানার এসব কবিতায় নতুন বোধ বা ছবির আবিষ্কার কই? কেবল পৃথিবীর নিয়ম রেখাকে ঘোড়ার ক্ষুরের মতো করে দেখা, কিংবা চোখের ভিতর পায়রার জল খেয়ে আশা মেটানো, কিংবা আয়ুর গ্লাসে মৃত্যু রাখা, কিংবা মেঘের বিছানায় হরিদ্রা কন্যার বেশে প্রভাতের ঘুমিয়ে থাকা, কিংবা জলের তারের কাঁপনে মেঘলা কুমারীর কেশে তান বাজানো-- এমন কয়েকটি জায়গা ছাড়া বাকি সব চিরচর্চিত বিষয়, বলনকেতায়ও যেসব প্রায় অনতুন। অর্থাৎ যেসব ছবি বা ছবিকল্প এখানে আঁকা হয়েছে, সেসব খুবই চেনা, তা সে গ্রামীণ বা নগর যে বাস্তবতা থেকেই নেয়া হোক বা যে বাস্তব ভিত্তিতে দাঁড়িয়েই কল্পনা করা হোক। লক্ষণীয় যে, গ্রামীণ ছবির উপস্থিতি বেশি হলেও সাইম রানার ভাব মূর্ত করবার ভঙ্গিটা অতিশয় নাগরিক বলে পুরো গ্রামীণ প্রেক্ষাপট ছুঁয়ে থেকেও তাঁর কবিতা লোককবিতা হয়ে ওঠে না বা বলতে পারি লোকগানের আত্মীয় হয়ে ওঠে না।

সাকুল্যে আমার পর্যবেক্ষণ এটুকুই। কিন্তু গীত হবার জন্য লিখিত কোনো কবিতাগুচ্ছ, অর্থাৎ লিরিক বা গীতিকবিতা সম্পর্কে এই-ই কি কখনো শেষ কথা হতে পারে, না হওয়া উচিত? যেখানে বলা হয় যে ‘সুরের জগৎ কথার থেকে পৃথক’, সেখানে এসব কথা তো শেষপর্যন্ত গীতঘনিষ্ঠ, সংগীতবান্ধব কোনো সম্ভাবনার কথা শোনায় না। এই টেক্সট কি সেসব সম্ভাবনা রহিত? অবশ্যই নয়। বরং সেদিক থেকে দেখলে এ ধরনের টেক্সটই প্রার্থিত। কীভাবে? আমাদের সংগীতচিন্তায় সামনের সারিতে বিবেচ্য বিশিষ্টজন ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘কথা ও সুর’ প্রবন্ধে জানাচ্ছেন, ‘শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতায় দুর্বোধ্য কথার বদলে পুরাতন ও পরিচিত কথারই প্রয়োগ দেখা যায়।’ কেন এমন হয় বা হতে হয়? কারণ কবিতা বুঝতেই যদি বেগ পেতে হয়, তবে সেটা উৎকৃষ্ট গীতিকবিতা হবার যোগ্যতা হারায়। এক্ষেত্রে তাঁর চূড়ান্ত কথা হলো, ‘যে শব্দ যত পরিমাণে অর্থ কিংবা বস্তুকে অতিক্রম করবার শক্তি ধারণ করে সেই শব্দ তত পরিমাণে গীতে সহায়ক, এবং সেইপ্রকার শব্দবাহী, শব্দবিন্যস্ত কবিতাই ততটা পরিমাণে সুর রচনার উপযুক্ত বাহন।’ কবিতাগুলো আমাদের পড়া আছে বলে আমরা কিছুটা জানি আবার সুরের সহযোগ পেয়ে কবিতার কথাগুলো কীভাবে এক্ষেত্রে উতরেছে তা আমরা এখনো জানি না বলে আপাতত এরকম একটি সিদ্ধান্তে দাঁড়ানোই সংগত যে, রানা হয়ত এই কবিতাগুলোর কথা এমনভাবেই সাজিয়েছেন, যার ভিতর দিয়ে সুরের রাজ্যে সহজে যাওয়া যায়।

সাইম রানা তাঁর সংগীতকর্মে সব্যসাচী। নিজেই তিনি গীতিকার-সুরকার এবং গায়ক। ফলে তাঁর সুরারোপের কৌশলকে, তাঁর গায়কীকে আলোচ্য গীতিকবিতাসমূহের পাশে রেখে কথা না বলে কেবল লিরিক নিয়ে শব্দে শব্দে আমরা যত কথাই সাজাই না কেন, তা সর্বার্থে অসম্পূর্ণতাকেই মূর্ত করে তুলবে। সুতরাং একটি অবশ্য-অসম্পূর্ণতাকে বেশিক্ষণ জাপটে ধরে না থেকে বরং কান পাতা যাক সেই কোনো জাদুতে, যা ব্যবহারিক জীবনের ভাবগুলির তুলনায় স্বভাবগতভাবেই অস্পষ্ট অথচ জীবনকে ছাপিয়ে থাকার ধর্মে যা আচ্ছন্ন।

৭ মার্চ ২০০৮
গীতবৈঠক, সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র

শাদাপৃষ্ঠা ভরাটকরণ প্রকল্পের অধীনে দেয়া কবিতাময় ছিন্ন-সন্তরণ

ক্ষণজন্মা ও স্পর্শকাতর ভাববস্তুর উৎকৃষ্ট অনুবাদ হচ্ছে কবিতা। যখন তখন এ ভাবের উদয় যেমন হয় না, যখন তখন চাইলেই এর অনুবাদও করা যায় না।

হয় না, কারণ, নির্দিষ্ট কবিব্যক্তিটির জৈবনিক নানা স্থূলক্রিয়ায় সময় ক্ষেপণ করতে হয়; কবি তাই অনুভূতির সূক্ষ্মতা সর্বদা বহনসক্ষম হন না। ভোঁতা অনুভূতিযোগে স্পর্শকাতরতা আঁচ করা কীভাবে সম্ভব! এ সময়কালে কবি অনুপস্থিত থাকেন ভাবদেশের স্বতোক্রিয়া নিরীক্ষণের কাজে। আর যায় না, কারণ, কবিতার ভাষা, যাতে সম্পন্ন করতে হয় অনুবাদক্রিয়া; তা সর্বক্ষণ দখলে থাকে না কোনো কবির। যেকোনো ভাষায় ভাবের যেকোনো প্রকাশই যেহেতু কবিতা নয়-- কাজেই কবিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হয় অনুবাদযোগ্য ভাষা। যিনি কবি, সূক্ষ্ম ভাবোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট কবিতাভাষাও এসে ধরা দেয় তাকে। এজন্যে আলাদা কোনো প্রয়াস অদরকারি। একটি কবিতা লিখবার পূর্বশর্ত তাই ক্ষণোদয়া ভাবের মৌলিক বিন্দুটিকে সূক্ষ্ম অনুভূতির জারকরসে সিক্ত করে, ততধিক সূক্ষ্ম যত্নে ভাষার আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারা এবং আনুষঙ্গিক ব্যঞ্জন সহযোগে শব্দসুতোয় তা গেঁথে ফেলবার জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠা।

কল্পনা কবিতার শ্বাসযন্ত্র বা ফুসফুস। এর দীনতা হাঁপানি রোগীর মতো অসুস্থ কবিতার জন্ম দেয়। কল্পনার চারুদেহে ভর করেই কবিতা হিসেবে দাঁড়িয়ে ওঠে বলবার কথাবস্তু; যার শিকড় প্রোথিত অকল্পনায়, বাস্তবে। এই অকল্পিত বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার মিশেলটা যত সমসত্ত্ব হয় কবিতার অর্জনমান হয় ততটা উৎকৃষ্টতর। মিশ্রণটি অসমসত্ত্ব হলেও ভালো কবিতা হওয়া সম্ভব, যদি থাকে কবিব্যক্তির উচ্চাঙ্গের পরিমিতি-জ্ঞান।

কল্পনা করবার ক্ষমতা আসে অভিজ্ঞতা থেকে। আর অভিজ্ঞতা আসে দেখা-শোনা-পড়া ইত্যাদির ভিতর দিয়ে। অভিজ্ঞতা হলো এক ধরনের ছাপ, যা মস্তিষ্কে কমবেশি স্থায়ী হয়। তার আলোকেই গড়ে ওঠে নানা কল্পিত ধারণা। কোনো কল্পনাই সুতরাং অভিজ্ঞতার বাইরের কোনো শূন্য জায়গা থেকে বেড়ে ওঠবার ফুরসৎ পায় না। মানুষ ঈশ্বর কল্পনা করেছে তার অভিজ্ঞতা থেকেই। মানবীয় সেই গুণসমূহই ঈশ্বর ধারণার ওপর আরোপ করা হয়েছে, যা উৎকৃষ্ট; যার কোনো কোনোটি মানুষের মধ্যে বর্তমান থাকলে আমরা সেই মানুষকে মহৎ, অসীম ও অলৌকিক গুণসম্পন্ন বলে জ্ঞান করি।

কল্পনা ক্ষমতা যার যত বেশি, তিনি ততবড়ো শিল্পী; আর উৎকৃষ্ট ও বিচিত্র কল্পনা করতে পারেন তিনিই, যিনি বিচিত্র অভিজ্ঞতার অধিকারী। কিন্তু আরো কথা থাকে-- এই যে অভিজ্ঞতা, যা কবির কল্পনা করবার পরিধিকে বাড়িয়ে দেয়, তা কবিতায় প্রযুক্ত হতে পারে কেবল তখন, যখন তা পরিশুদ্ধ হয়ে আসে অনুভূতিদেশ থেকে। এর অন্যথা হলে হয়ত পদ্য সৃজন সম্ভব, কিন্তু কবিতা অবশ্যই নয়।

ছন্দ কবিতার জন্য জরুরি; কিন্তু ধ্বনিময়তা সৃষ্টি হওয়া তার চেয়েও জরুরি। প্রচলিত কোনো ছন্দের ধারে-কাছে না-গিয়েও উৎকৃষ্ট কবিতা সৃজন সম্ভব। আবার ছন্দের সফল প্রয়োগেও একটি কবিতার সৃজন সম্ভব নাও হতে পারে। নেপথ্যে ভূমিকা রাখে এই ধ্বনির কারিশমা, ধ্বনি-আবহ সৃষ্টি হওয়া না-হওয়া। যুগপৎ ছন্দসাফল্য এবং ধ্বনিগত সাম্য সৃষ্টি হলে তা সবচে’ উত্তম। এ রকমটা অত ঘন ঘন হয় না। হওয়া সম্ভবও নয়। কদাচিৎ এমনটি ঘটে, যে কারণে ভালো কবিতা কদাচিৎ লিখিত হয়। যিনি ভালো কবি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন, তাঁর হাতেও সব সময় ভালো কবিতা এজন্যেই লিখিত হয় না। অন্যদিকে কোনোই স্বীকৃতি নেই, এমন কবির হাতেও সৃষ্টি হতে পারে একটি মহৎ কবিতা।

অনেকদিন থেকে যিনি কবিতা লিখেন, তিনি কবিতার বহিরাবয়বের এমন একটি ছাঁচ রপ্ত করে ফেলেন যে, চাইলেই তিনি কিছু শব্দকে ওই নির্দিষ্ট ছাঁচের মধ্যে ফেলে একটা অর্থবোধকতা সৃষ্টি করতে পারেন। খেটেখুটে তাকে অলঙ্কৃত করে তুলতে পারেন। হাতুড়ি-বাটালি-কাঠ পেলে যেকোনো কাঠমিস্ত্রি মানসিক যেকোনো অবস্থায় যেমন একটি চেয়ার বা টেবিল বানিয়ে ফেলতে পারেন, এ-ও অনেকটা তেমনি। কখনো কখনো প্রায় কবিমাত্রই এরকম কবিতামতো রচনা লিখে ফেলেন বটে-- কিন্তু সবসময় কবি বুঝতে পারেন না যে সেটি নির্জীব চেয়ার-টেবিল হয়েছে, না কবিতা। সেটা সম্ভব হলে চারপাশে কবিতামতো ব্যর্থ রচনার সংখ্যাধিক্য অবশ্যই চোখে পড়তো না। এটি বুঝতে পারার জন্য যে ধ্যান যোগ হতে হয়, তার অভাব না-ঘটলে চেয়ার-টেবিল নয় কবিতাই সৃজন সম্ভব। যিনি কবি তিনি কখনো কখনো কথিত এই ধ্যানময়তা থেকে চ্যুত হয়ে যান বটে, আবার ধ্যানমগ্নও তিনি হতে পারেন। তবে অকবি ধ্যানস্থের ভান করলেও ধ্যান তাতে ধ্যানস্থ হবার সুযোগ পায় না।

শেষপর্যন্ত একটি কবিতায় কী লিখিত হবে, কবি নিজেও তা জানেন না। একটি শব্দ, একটি বাক্য লিখিত হয়ে যাবার পর সেই শব্দ এবং বাক্যই চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে নিয়ে আসে আরেকটি শব্দ এবং বাক্যকে। এভাবে চলতে চলতে একসময় কবিতাটি সম্পূর্ণতা পায়। তখন শব্দ আরেকটি শব্দকে, বাক্য আরেকটি বাক্যকে ওই কবিতাটিতে আর প্রবিষ্ট হবার সুযোগ দেয় না, প্রয়োজন থাকে না বলে শেষ শব্দটি সম্পূর্ণ প্রবেশ পথ জুড়ে বসে থাকে। খতম হয় কবিতা কবিতা খেলা। এই যে একটি সম্পূর্ণ কবিতার সৃজিত হয়ে যাওয়া, পরিপূর্ণ ধ্যান যোগ হলে কখনো কখনো কবি ঠাহরও করতে পারেন না, কখন কীভাবে তাঁর দ্বারা অসাধ্যটি সাধিত হয়ে গেল। কবিতার এই সৃজিত হবার প্রক্রিয়ায় কবির অবচেতন মন এমনভাবে কাজ করতে থাকে যে, মস্তিষ্কের নির্দেশ পাবার পূর্বেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিখিত হয়ে যায় একেকটি শব্দ বা বাক্য। কখনো বা সম্পূর্ণ কবিতাটিই। অলৌকিকতা বলে কিছু নেই, কিন্তু মনে হয় এটি সংঘটিত হলো কোনো অলৌকিক প্রক্রিয়ায়ই। কবিতার জন্ম মুহূর্তটি এমন বলেই তাতে বাসা বাঁধতে পারে এত এত রহস্যের ঘনঘোর।

যিনি স্বভাষা বা বিভাষা শুদ্ধরূপে পড়তে-লিখতে-বলতে পারেন, তিনিই পাঠক নন। অন্তত কবিতার পাঠক তো ননই। কবিতার পাঠকের চালিত হতে হয় নির্দিষ্ট কবিতাটির সৃজন-প্রক্রিয়ার অধীনে আচ্ছন্নের মতো। যে গুণপনা থাকতে হয় কবির, তা কবিতার পাঠকেরও। যিনি এতসব গুণের অধিকারী, তিনি কবিতা না-লিখলেও কবি। হয়ত তিনি লিখেন না, কিন্তু লিখতে পারতেন। এরকম লোকের সংখ্যা প্রকৃতই কম, যিনি কবি নন অথচ কবিতার পাঠক। শেষপর্যন্ত কবিতার পাঠক কবিরাই। কবিই বাঁচিয়ে রাখেন কবিকে। আসলে একজন কবিতাকর্মীর সারাজীবন কবিতা লেখা, কবিতার পাঠক হয়ে ওঠবারই এক দীর্ঘমেয়াদি কষ্টকর পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারা মানেই কবি হয়ে ওঠা। যিনি কবি হয়ে উঠলেন কিন্তু পাঠক হয়ে উঠলেন না-- তার কোর্স অসম্পূর্ণ। কোর্স সমাপনীর কোনো সনদ তার কখনোই জুটবে না। তিনি সারাজীবন অধমই রয়ে যাবেন। একজন সম্পূর্ণ পাঠক, একজন অসম্পূর্ণ কবির চেয়ে উত্তম।

রচনাকাল : ২০০০

Sunday, August 16, 2009

বালখিল্যকথন

কবিতা হলো কবির জীবনের একটা পরিস্রাবিত দ্রবণ, পরিপার্শ্বের তাপে গলা, যে-দ্রবণে মিশে এসে সমুদয় ভালোমন্দ অর্জনের ভাঁপ, ক্লেদ-গ্লাণিসহ। এসবের ভিতর দিয়ে যাওয়া, ডান-বাম দেখে, পাশ দিয়ে কে যায় না-যায় তার তল্লাশ জারি রেখে। যেসব জিনিসকে মানুষ উপেক্ষা করে আসে, যেসবকে রেখে আসে পরে কাজে দেবে ভেবে, সেসবের দূরাভাও থাকে। প্রান্ত ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পানির মতো প্রয়োজনীয়তা সকল, সেসবকে যথাসম্মান দিয়েও বর্জ্যপ্রায় পরিত্যাজ্য বস্তু ও বস্তুভাবনার চরাচর চুঁইয়ে নেমে আসা অবিরল জলের দিকেও মাঝেসাঝে তাকাতে হয় ফিরে। কাকে নিতে হবে কাকে রাখতে হবে এসব ঠিক করে দেয় মেজাজ, যেটা সমাজঘটনা দিয়ে মোড়া। যে সুবিধা, যে অসুবিধা বিরাজ করে ভূয়ে, যখন যাপন করেন কবি, কবিতায় তার নিঃশ্বাসধ্বনিটাই বাজে। মানুষ দেখে দেখে শেখা মহাকালবোধ, এইখানে চুপিসারে এসে মেশে।

ভয়ের রক্তচক্ষুকে যুক্তির আঙুল দেখিয়ে থামিয়ে রাখা, অথচ ভেসে থাকা গোপন এক ভীতিভাবে। সভ্যতার নিঠুরাবেশে যতসব হুংকার দিকপাশে বাজে, নাতিদূরে ঘোরঘাটে খেলে ওঠে যতসব সন্তরণ লীলা, এসবেরও আঁচ রাখতে হয়, কোথায় কোথায় ভীতি সেই কথা সামনে না-এনে। ঘোর সেই পাললিক পরিসর নেচে ওঠে ধ্যানমগ্নতায়। পাঠককে গ্রস্ত করে ঘোর, আনে সম্মোহন। শুকনো পাতার সাথে উড়ে উড়ে ঝরে পড়ে পালকের আগে। মেঘসম্ভব গাম্ভীর্য ভেঙে বৃষ্টিধারা বয়।

বেদখল হয়ে যাওয়া ভূমির বেদনা রোদের আঁচে তাতিয়ে নিয়েও বড়োসড়ো অভিযোগ কাঁধে নেয়া, তার ভার। ঘরের ভয় ও পথের ভয় আলাদা-আলাদা, ওইসব হাতের চউলে নিয়ে দেখা। সামনে তাকিয়ে দেখা কারা কারা পথে নেমে গেছে, লাল-নীল। নানাদিকে হাত উঠিয়ে থাকা। পথ বন্ধ হয়ে থাকে পুরো, বড়ো নির্যাতন সয়ে তবু ওর দিকে যেতে হয়। আমোদে-আহ্লাদে যাওয়া দরকার যেইদিকে, সেদিকের প্রেমকুঁড়ি গাছ, তার ডালপাতা মূলটুল স্থান করে নেয় যথারীতি। সব করে নিতে হয় নিজেই প্রস্তুত। যারা অপেক্ষা করে থাকে যত্নের, কত তারা ধরে মিছে সত্য, তুলে আনতে হয় ওরে ধরে, তারপর শুরু হয় বাগানবিলাস। অধিগত নয় যেটা, তাকে ঘিরে অপচয় বাড়ে, তবে এরও নিগূঢ় আঁচড় থাকে মিলেমিশে, যদিও দরকারি এর থেকে দূরে বাস করা, নিজের মতো করে, ঘাড়টাকে যথারীতি ত্যাড়া করে রূপার কপাটে দিয়ে খিল।

হয়ত শোনা গেল ধনচে শিশুর কোলাহল, একপাশে থেকে যেতে পারে কোনো প্রেমময় কথার ঝিলিকও। তাকানো দরকার নেই জেনেও তাকানোর মরশুমে চোখে চোখে গেঁথে নেয়া জিওল ভাবনা। খটখট-ঘটঘট হয়তবা দূরে ঠেলে রেখে যায় সবিশেষ কামভাব, অবদমনের কোনো দমনচেষ্টায় বুঝি থরে থরে সাজানো থাকে এইসব কর্মের ডালা। যে ধ্যানে পৌঁছা যায় না, সে ধ্যানের ভিতর দিয়ে আসা মনে মনে। সেরকম ধ্যানের মায়ায় বুঝি লাল চেলি ভুলে গিয়ে অকুল-আশার গলে মালা দেয়া। অজ্ঞতা ছায়ার মতো লেড়েল্যাপ্টে থাকে, বোধকরি থাকতেও হয়। এই সবকিছু মিলেমিশে বিচিত্র রূপগুণ নিয়ে যেটা আসে, সেটাই কেবল হয় মহাকালমুখী, কোনো-না-কোনোভাবে।

২.

এই-ই সব, যেন এই-ই সব। যদি হয়ও তা, এ ধারার তরল বর্ণনার চেয়ে তা করে ওঠা কঠিন। আর শুধু করে ওঠাই বা বলি কেন? বলাটাই বা সহজ হবে কী প্রকারে, যে বলা প্রকৃত বলা? যদিও প্রকৃতটা বলা এক্ষেত্রে নিতান্তই অসম্ভব, কারণ কবিতা শিল্প। শিল্পের কীভাবে এমন সংজ্ঞা হতে পারে যা সর্বজনীন? স্বপ্রণীত সংজ্ঞাযোগে ধারকাছ দিয়ে হয়ত যাওয়া যায় তার, কিন্তু শতভাগ ঠিক ঠিক জায়গাটা শনাক্ত করা যায় না এর। আমরা তবু চিনতে চাই একে স্ব স্ব অভিজ্ঞতা ও জানাবোঝা দিয়ে। বুঝতে চাই যে, কোনপথে হাঁটলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় ও হাঁটার ভঙ্গিটা ঠিক কী হলে রচিত কবিতায় ভর করে এসে সুন্দর।

স্থান-কাল-পাত্রভেদে সর্ববাদীসম্মত সংজ্ঞাহীন সুন্দরের মান ও মানে বদলে যায়। সুতরাং একজন কেউ যখন সুন্দরকে চিনাতে যান, কবিতার সুন্দর, তখন তা প্রধানত হয় ওই কথকেরই মতো। আর যাঁরা যাঁরা নির্দিষ্ট কথকের মতো করে ভাবেন, বা দেখেন কথকের ভাবনার মধ্যে তাঁর/তাঁদের ভাবনার কোনো খোরাক আছে সামনে এগোবার, বা ধরা যাক এমন কেউ যিনি ঠিক উলটো করে ভাবেন বা ভাবতে চান কথকের চেয়ে; কথককে ছাড়া আর কেবল তাঁর তাঁর কাছে এসব বলাবলির কোনো মানে থাকলে থেকেও যেতে পারে।

৩.

‘ভাষাই বড়ো ব্যর্থতা ব্যর্থ লেখকের’— এ কথায় মনেপ্রাণে আস্থা না-রাখবার কোনো কারণ ঘটে নি এখনো। লক্ষ করলে দেখা যায় যে, কোনো কোনো লেখক অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা অনেক অর্থপূর্ণভাবে বলেছেন, কিন্তু ভাষাগত বিশেষত্ব ও বাগসংহতি না-থাকায় তা পাঠককে ছুঁতে পারে না। কবিতায় ভাষার ব্যবহার হতে হয় অব্যর্থ ও যথাযথ। যোগাযোগসহজতা তার একমাত্র বিবেচনা নয়। বিবেচনায় থাকে উচ্চারণসহজতা, প্রত্যাশিত গাম্ভীর্য সৃষ্টির লক্ষ্য ও অর্থ প্রসারণ চেষ্টাও। অবিবেচকের মতো অবান্তর শব্দনিক্ষেপ কবিতাকে সিদ্ধির কূলে পৌঁছতে দেয় না, বরং চরে আটকিয়ে দেয়। পুরো কবিতার শব্দবিন্যাস সামঞ্জস্য ও সংগতিপূর্ণ হওয়া লাগে। তবেই কেবল তা সংগীতের দিকে এগিয়ে যায়।

ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। ভাষার এই পরিবর্তনের গতিটা কোনদিকে সেটা আন্দাজ করা গেলে সবচে’ সুবিধা। যেহেতু একজন কবিতাকর্মী আজকের জন্যই কবিতা লিখেন না, বরং লিখেন আগামীর জন্য, কাজেই আগামীতে ভাষার যে সম্ভাব্য রূপটি দাঁড়াতে যাচ্ছে তা যদি কেউ ঠিকঠাক ধরে উঠতে পারেন, তাহলে তিনিই আগামী সময়ে বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। একজন কবির কবিতা যতদিন প্রাসঙ্গিক ততদিনই তিনি পঠিত হন, এবং ততদিনই তিনি জীবিত। ততদিনই তাঁর লেখার নব নব দরোজা উন্মোচনের সম্ভাবনা থেকে যায়। আর্কাইভড হওয়া একজন লেখকের কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়, প্রত্যাশাও নয়।

লেখককে প্রাসঙ্গিক রাখে কেবল ভাষা নয়, তাঁর বক্তব্যও। নিহিত বক্তব্যকেও সমকালোত্তরণের স্পর্ধা রাখতে হয়। যা আজ লেখা হলো তা আজ তো সমকালীনই, কিন্তু কাল যদি তা পশ্চাৎপদ বিবেচিত হয়, তবে তা ভাষায় প্রাসঙ্গিক হলেও সার্বিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। আজকের বার্তাকে যদি তাবৎ ক্ষমতাযোগে মহাকালের করে তোলা যায়, তবে সেটা প্রসঙ্গ হয় আগামীদিনের। এজন্য ভাবনাচিন্তায় আধুনিক হতে হয়, বিজ্ঞাননিষ্ঠ হতে হয়, নতুনকে গ্রহণ করবার মানসিকতাসম্পন্ন হতে হয়, কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে হয়। এ হলে ছোঁয়া যায় চিরসমকাল। অর্থাৎ কবির মহাকালকে লক্ষ্যে রেখে শব্দচয়ন, শব্দসজ্জা ও বাক্য নির্মাণ করতে হয়। এটা যে যত ভালো করতে পারেন, তিনি তত বেশিদিন বেঁচে থাকেন। এ বাঁচা শারীরিকভাবে নয়, পাঠকের মধ্যে নান্দনিকভাবে বাঁচা।

পাঠকদের একটা অংশের সঙ্গে কবির যে দূরত্ব তৈরি হয়, তার একটা কারণ মহাকালকে অভীষ্ট ভাবা। এটা সংগতও। এ অবস্থা কারো ক্ষেত্রে খুবই প্রকট আকার ধারণ করে, কারো ক্ষেত্রে অপ্রকট। কিন্তু এ কখনো নয় যে, পাঠকঅপ্রিয় কবিমাত্রই মহাকালের সওদাপাতিতে ব্যস্ত। পাঠকঅপ্রিয়দের একটা বড়ো অংশই অল্পপ্রাণ কবি অথবা অকবি। পাঠকপ্রিয়দের মধ্যে এ সংখ্যা আরো বেশি।

৪.

একটা বহুশ্রুত প্রবাদ আছে আমাদের সংস্কৃতিতে, ‘ঝিকে মেরে বউকে শেখানো’ বা ‘বউকে মেরে ঝিকে..’,। এই প্রবাদোপরিতলে যে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট, কবিতায় প্রতীক ওই কাজটিই করে। যে বস্তুকে বা যাকে বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে তার কথা না-বলে বর্ণিত বস্তু বা ভাব বা ঘটনার বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঠিকঠাক ঘটে এমন কিছু দ্বারা মূলকে প্রতিস্থাপিত করাই প্রতীকায়ন। আড়াল সৃষ্টির জন্য এবং সৌন্দর্য নির্মাণের জন্য এটির দরকার হয়। শিল্পে প্রতীকের ব্যবহার খুব প্রচলিত ঘটনা। সঠিক প্রতীক ব্যবহার করতে পারা বিষয় ও বিষয়সংশ্লিষ্ট জগৎ সম্পর্কে অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে। প্রতীককে হতে হয় সুপ্রযোজ্য। একটি প্রতীকের অযথার্থ ব্যবহার একটি কবিতাকে মাঠে মেরে ফেলতে পারে। সব পাঠক সব প্রতীককে ঠিকঠাক ধরতে পারবেন সেরকম ভেবে ওঠা অসংগত। কিন্তু নিবিড় পাঠে তা অধিকাংশ অভিজ্ঞ পাঠকের কাছে গ্রাহ্য হয়ে ওঠা উচিত। ব্যবহার যথার্থ হলে তা না-হবারও কারণ খুব থাকে না। অবশ্য কবি যে অর্থে প্রতীকটি ব্যবহার করেছেন ঠিক সেটাই না-বুঝে পাঠক অন্য কিছুকে বুঝলে মহাভারত ক্ষণিকের জন্যও অশুদ্ধ হয় না, যেহেতু পাঠকই কবিতার ‘মানে’কে জন্ম দেন তাঁর তাঁর মতো করে। কবিতার অর্থ পাঠকভেদে বদলে যেতে পারে, এটাই কবিতার শক্তি। এমনকি বলা চলে স্থিত মানের রচনা কোনো কবিতাই নয়। সেটাই কবিতা, যে টেক্সটের মানে পাঠে পাঠে বদলায়। এটা দূর করবার চেষ্টা কবিতার কবিতাত্ব নিয়ে খানিক সংশয়কে বরং উদ্বেলিত করা।

কবির সময়ে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অনেক কারণ থাকে, যা তাঁকে আড়াল সৃষ্টি করতে বাধ্য করে। এ তাঁর নিজ অস্তিত্ব রক্ষার্থে তো বটেই, শিল্পের কৌমার্য রক্ষার্থেও দরকার। কবির আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নানা ঘটনার দ্রষ্টা হয়ে উঠতে হয়। আর এসবের ভিত্তিতে সামাজিক মানুষ হিসেবে তিনি নানা প্রেরণাও লাভ করেন, আবেগাপ্লুুত হন। কিন্তু খুব সরাসরি তিনি তা বলতে পারেন না। বললে তাঁর উপরে নানা খড়্গ নেমে আসার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া শিল্প হিসেবে কবিতার সব কথা সবভাবে গ্রহণ করবার সক্ষমতা নেই, এটা মনে রাখতে হয়। এত অনর্থক ভার বইতে পারে না কবিতা। যে কারণে কবিকে বক্তব্য আড়াল করতে নানা প্রতীকের আশ্রয় নিতে হয়।

ভাষা সংকেতও আদতে প্রতীক। ভাষার প্রতিটি শব্দ এক বা একাধিক বস্তুর প্রতীক। কলিম খান অবশ্য বলেন, বাংলাভাষার শব্দভাণ্ডারের সবচে’ বড়ো সম্ভার সংস্কৃত ভাষা ছিল ক্রিয়াভিত্তিক। তৎসম শব্দসমূহের মাধ্যমে এ গুণ বাংলা ভাষায় স্বতঃস্থানান্তরিত। ক্রিয়াভিত্তিক ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এর মূল অর্থ হয় ধাতুর। নির্দিষ্ট ধাতু থেকে উদ্ভূত সমস্ত শব্দের অর্থই নিয়ন্ত্রণ করে ধাতুর অর্থ। শব্দব্যাখ্যান কর্মের যে ছবি সামনে আনে, সেই কর্মের বৈশিষ্ট্যই নির্ধারণ করে শব্দটির গঠন কী হবে। এ মতে শব্দের অর্থ বাইরে থেকে আরোপিত নয়, ভিতর থেকে উৎসারিত। পরে মুনাফালক্ষ্যী বিনিময়কে শব্দার্থজাত ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে অধিক লাভজনক করবার জন্য শব্দকে সুনির্দিষ্ট মানেবাহী করে তুলতে কিছু শব্দের অর্থকে সুনির্দিষ্ট করে ফেলা হয়। যে কারণে কোনো-কোনো শব্দের ধাতুমূলগত অর্থ অজস্র হলেও শোনামাত্র কেবল এক-দুটি প্রাণী, বস্তু বা বিষয়কে বোঝায়। এটা স্বাভাবিকভাবে অজস্র অর্থ হওয়াকে আস্বাভাবিকভাবে সীমিত পরিসরে বেঁধে ফেলানো। এর মানে প্রসারিত অর্থকে সংকুচিত করে ফেলা, যেভাবে আমাদের বাংলা ভাষাও, অন্যসব ভাষার মতো প্রতীকী ভাষা হয়ে উঠেছে। সব ভাষাই সময়ের সাথে বদলে যায়, ভিতরে ও বাইরে। সংকুচিত হয় প্রসারিতও হয়। এর অনেকগুলো কারণ থাকে, কলিম খান মুনাফালক্ষ্যী বহির্দেশিয় বেণিয়াদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কারণটিকে নেতিবাচকভাবে দেখেছেন। সংকোচনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।

অমুনাফালক্ষ্যী শিল্পসৃজনের প্রয়োজনেও যে শব্দের অর্থ কালে কালে বদলে যায়, এটাকে তিনি সংকোচনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন নি। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ নামক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে অভিধানকে ভিত্তি করে কলিম খানের ক্রিয়াভিত্তিক ভাষাতত্ত্ব দাঁড়িয়েছে, সেটি সংকলনকাল পর্যন্ত বিভিন্ন মুদ্রিত দলিলে যে সমস্ত অর্থে যেভাবে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তার একটা যথাসম্ভব ভালো ডকুমেন্টেশন, সেখানে সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের উদাহরণসহ প্রাপ্ত অর্থসমূহ নথিভুক্ত হয়েছে। ভাষাসংশ্লিষ্ট সকল সেক্টরেই শব্দের মানে বদলায়, নতুন মানে সংস্থাপিত হয়; এবং শুধু লিখিতভাবে নয় এটা হয় মৌখিকভাবেও। সচল ভাষামাত্রেরই ক্ষেত্রে এরকমটা ঘটে। ভাষা যত বিচিত্র কাজে ব্যবহৃত হয়, তত বিচিত্র হয় এর জগৎ, সমৃদ্ধি। সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম সবচে’ বড়ো সেক্টর, যেখানে এই কাজটা হয় সবচে’ বেশি। এখানে প্রতিনিয়ত শব্দের মানে নড়েচড়ে যায়, প্রসারিত হয়। প্রসারণার্থে শব্দের এই প্রয়োগেরও সাহিত্যে প্রতীকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার কথা, যে ধরনের প্রতীকের ব্যবহার রচনাকে কবিতা করে তোলে। একজন কবিতাকর্মী একইসঙ্গে ভাষাকর্মী। তাঁর একটা কাজ এ-ও যে তিনি ভাষাকে সম্প্রসারিত করেন। ভাষার সম্প্রসারণ ব্যবহারিকভাবে ঘটাতে গিয়ে তিনি একটি কবিতা করলেন এরকম নয়, বরং কবিতা করতে-করতে একইসঙ্গে ভাষাকে সম্প্রসারিত করছেন। কবিতাটি যখন শিল্প হয়ে ওঠে, তখন এই ভাষাকৃতিটা উপজাত।

শব্দে নতুন প্রাণসঞ্চারের এই কাজটি কবিতাকর্মীর একটি মুখ্য কাজ। শব্দ যদি নতুনভাবে খেলে ওঠে, অর্থটা যদি একটু মুচড়ে যায়, তাহলে পাঠক নড়েচড়ে বসে। ক্লিশে মানেযুক্ত করে ক্লিশে শব্দের ব্যবহার মৃত রূপকের ব্যবহার, যা আবার প্রতীকও। কবিতায় পাঠক মৃত রূপকের রাশি-রাশি লাশ দেখতে পছন্দ করেন না।

মিথ হিসেবে খ্যাত লৌকিক পুরাণ বা পৌরাণিক লোকশ্র“তিকেও প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। পৌরাণিক একেকটি চরিত্র বা ঘটনা অতীতের একটা চরিত্র বা ঘটনার গল্পকে ছোট শব্দশরীরের মধ্যে ধরে রাখে। গোটা কবিতায় একটি শব্দ হয়ে ব্যবহৃত হলেও ওর অনেক দীর্ঘ অদৃশ্য ফুটনোট থাকে। শব্দটি ওই ফুটনোটের প্রতীক। একজন কবি অবিকল অর্থেই শব্দটি কবিতায় ব্যবহার করলে ধরতে হবে তিনি মৃত রূপক বা ক্লিশে প্রতীক ব্যবহার করলেন। মিথের এরকম ব্যবহার গতিশীল নয়, নয় প্রগতিশীলও। হাজির করতে হয় এর নতুন বয়ান। পুরোপুরি অথবা অংশত, যেটা প্রাসঙ্গিক। ধরা যাক দেবী দুর্গাকে দশ হাতে কাজ করা গার্হস্থ্যকর্মী সক্রিয় নারীর রূপে দেখা হলো। এ প্রয়োগটিকে পাঠক আরো দূর পর্যন্ত কল্পনা করে নিতে পারবেন, যে, এতকিছুর পরও একজন গার্হস্থ্যকর্মী নারী ‘কর্মী’ স্বীকৃতিটা পর্যন্ত অর্জন করতে পারে না এবং এর জন্য কোনো অর্থমূল্য দাবি করতে পারে না। কাজগুলো অনর্থক না-হয়েও না-অর্থক হওয়ার কারণে এই যে পুরুষতান্ত্রিক বঞ্চনা, এটা তখন হয়ে যেতে পারে ওই নির্দিষ্ট প্রয়োগের একটা তাৎপর্যপূর্ণ আলোকপাত। মিথের এই মুক্তিটা কবিতায় প্রার্থিত।

৫.

আবেগ কবিতার জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ একটা অদৃশ্য ঘটনা যে একে ছাড়া শিল্পসৃষ্টি, বিশেষ করে কবিতা লেখা অসম্ভবপ্রায়। অবশ্য আবেগ ব্যতিরেকেও কবিতামতো দেখতে রচনা তৈরি করা সম্ভব, যেটা অতি অবশ্যই হয় যান্ত্রিক, অতএব কবিতা নয়। এ ধরনের রচনা তৈরিকে পেশাদার কাঠমিস্ত্রির একের পর এক টেবিল-চেয়ার বানানোর সাথে মিলিয়ে দেখা যায়। যতক্ষণ ব্যবহারোপযোগী কাঠ আছে, হাতুড়ি-বাটালি আছে, বাইস আছে, ততক্ষণ কাঠমিস্ত্রি অবিরাম বা সবিরাম চেয়ার-টেবিল বানিয়ে যেতে পারেন। একটি চেয়ার ও টেবিলের শিল্পকর্ম হয়ে ওঠবারও অবকাশ থাকে, কিন্তু পেশাদারি উন্মাদনায় ভেতরের টান ছাড়া নির্মিত চেয়ার-টেবিল তা হয় না। একইরকমভাবে একজন কবিতাকর্মীকে কাগজ-কলম-পরিসর দিলে যখন-তখনই তিনি ছন্দোবদ্ধ কবিতামতো লেখা তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সেটা পেশাদারি উপায়ে তৈরি চেয়ার-টেবিলের মতোই যান্ত্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্যমার্কা একটা ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। পেশাদার ঔপন্যাসিকদের হাতে যেরকম ফল ফলতে থাকে অবিরাম। তাঁরা হলেন বারোমাসী ফলগাছ। বছরে হরদিনই সেসব গাছে ফল থাকে।

সত্যিকার কবিতা রচিত হতে গেলে তার মধ্যে আবেগের পরিমিত প্রকাশ ঘটতে হয়। এই প্রকাশ ঘটায় আবার ইন্সপিরেশন বা প্রেরণা। দাঁড়ালো তাহলে এই যে, যে-প্রেরণার গুত্তো খেয়ে বিষাদ, ক্রোধ বা আনন্দ জাতীয় আবেগ উসকে উঠবে, তার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সৃজিত মানেযুক্ত রচনার কবিতাবস্তু হয়ে ওঠবার অবকাশ থাকে। অর্থাৎ আবেগ যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি অত্যাবশ্যক তার সুনিয়ন্ত্রণ। ধরা যাক, কোনো কারণে অত্যধিক ক্রোধ সঞ্চারিত হলো মনে। ঠিক তৎক্ষণাৎ একটি কবিতা রচনায় উপগত হলে এটির কবিতা হয়ে ওঠবার সম্ভাবনা লোপ পায়। ক্রোধটাকে সামগ্রিকতার ওপরে দাঁড়াবার জন্য সময় দিতে হয়, তাতে তা আর ব্যক্তিগত ক্রোধ থাকে না, হয়ে ওঠে সর্বজনীন, সাধারণ। এই সর্বজনীন ক্রোধ যদি কোনো একটি রচনা উৎপাদনের নেপথ্যে ভূমিকা রাখে, তবে তার মাধ্যমে সৃজিত রচনাটি কবিতা হলেও হতে পারে, এমনকি খুলে যেতে পারে তার সর্বজনীন হয়ে ওঠবার সম্ভাবনাও। চীনা একটি প্রবাদ আছে এরকম যে, রাগান্বিত অবস্থায় কখনো চিঠির জবাব দিতে নেই। কেন? ওই একই কারণে। নইলে যাকে জবাব লেখা হচ্ছে, তার প্রতি অবিচার হয়ে যাবার সম্ভাবনা শয়ে প্রায় শ’। রাগ প্রশমিত হয়ে যখন ব্যাপারটা সূক্ষ্ম ক্রোধানুভূতিতে রূপান্তিত হয়, তখন তার পক্ষে সম্ভব সামগ্রিক অবস্থার মূল্যায়ন করা ও মত স্থাপন করা। ওই প্রাবাদিক সত্যটা কাজেই এখানেও নিহিত।

কবিতায় তাৎক্ষণিকতার এই বিপদাপদ সম্পর্কে কবিমাত্রেরই সচেতন থাকা আবশ্যক জ্ঞান হয়। এর মানে কি এই যে সুতীব্র উন্মাদনার ভিতরে আনন্দ, বেদনা বা অন্য কোনো অনুভূতির কথা লেখাই যাবে না? না, তা নয়, একদমই নয়। লেখা যাবে। কারো কারো হাতে এভাবেও উৎকৃষ্ট রচনা বেরিয়ে আসা সম্ভব বৈকি, তবে এতে নিকৃষ্ট রচনা তৈরি হবার ঝুঁকিই বেশি থাকে বলে মনে হয়। সুতীব্র উন্মাদনাজাত রচনার খসড়াকে কবিতায় রূপ দেবার জন্য অনেক কাল ফেলে রাখাই সঙ্গত। এটা কতদিন, তার কোনো সুস্পষ্ট সীমা নেই। তবে এরকম বলা যায়, যতদিন ওই নির্দিষ্ট অনুভূতি, যা নেপথ্য কাণ্ডারি হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল, তা একটা সামগ্রিকতার ওপরে না-দাঁড়ায়, ততদিন। নির্দিষ্ট সময় পর ওই খসড়ার একটা নিরাবেগ সম্পাদনা-শাসন দরকার হয়। ঝেড়ে ফেলতে হয় তাবৎ উৎকট অবস্থা, একান্ত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। দেখতে হয়, ওই টেক্সটে কোনো কিছুই যেন ময়লা দাঁত বের করে হাসতে না-থাকে। যেন ভদ্র জনসমাগমের ভিতর দিয়ে নিবস্ত্র হয়ে হাঁটতে শুরু করার মতো কোনো ঘটনার ওটা জন্ম দিয়ে না-বসে। এক্ষেত্রে অবশ্য একটা বিপদসংঘটনের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। বুদ্ধির সাথে অনুভূতির একটা তুমুল ঝগড়ার মোকাবেলা করতে হতে পারে সম্পাদনাকালে। এই ঝগড়ার মীমাংসাটা কে কীভাবে করবেন তা নির্ভর করে তাঁর কাব্যরুচি, মেজাজ, বিশ্বাস ইত্যাদির ওপর। সবচে’ ভালো সম্ভবত বুদ্ধি বা অনুভূতি কারো একার হাতেই পূর্ণ শাসনভার ছেড়ে না-দিয়ে দুয়ের একটা বিবাহসম্পর্কে আস্থা রাখা।

৬.

ইমাজিনেশন হলো সংবেদন ও ধারণার মনছবি আঁকবার সামর্থ্য, যা ওই বিশেষ মুহূর্তে শ্রবণ-দর্শন বা অন্য কোনো ইন্দ্রিয় দ্বারা ধারণযোগ্য নয়। এটি তৈরি হয় বুদ্ধি ও আবেগের সংমিশ্রণে। ছবিমাত্রকেই ছবিকল্প ভাববার একটা রেওয়াজ আছে আমাদের মধ্যে। একটিও দৃশ্য বা শ্র“তিকল্প নেই এমন কবিতাও ইমেজারিতে ঋদ্ধ বলে প্রশংসিত হতে দেখা যায় হামেশা। আমরা এত যে দিলখুশ হই সহজনের প্রতি, ঘেন্না লাগে। আর অন্যদিকে চলতেই থাকে ‘যারে দেখতে নারি’র চলনকে চিরকাল বাঁকা ঠাওরানো দাপুটে বাসনার বজ্জাতি।

মন কীভাবে এসব ছবি তৈরি করে? কল্পনা দিয়ে ভেবে শব্দ দিয়ে ধরাধরির মাধ্যমে। কল্পনার সীমাটা কী? সীমা প্রায় নেই। কারণ যা পূর্বাভিজ্ঞতায় নেই এমন কিছুই মনের চোখ দিয়ে দেখা দরকার হয় ইমেজারি নির্মাণের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে শতভাগ মুক্তি দরকার হয় কল্পনার। অথবা হতে পারে পূর্বে অংশত বা অন্য আঙ্গিকে অভিজ্ঞতায় ছিল। এক্ষেত্রে রকমফের থাকছে মাত্রায়।

তো, এই মাত্রার স্বাধীনতা ভোগ কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে কি না সেটা একটা বড়ো প্রশ্ন হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। যাঁকে চরম স্বাধীনতা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে তিনি সেই স্বাধীনতাটা তাৎপর্যপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারছেন কি না সেটা একটা সংগত বিবেচনা। অবাধ স্বাধীনতা ভোগের অধিকার লাভ করা মাত্র আমি যদি হাতিগুচ্ছকে তুড়িতে উড়িয়ে দেই আকাশে আকাশে, নদীকে পুড়িয়ে দেই মাছের যৌনতাসহ, যেহেতু কাজটা যথার্থেই সংঘটিত হওয়ার দরকার হচ্ছে না, শব্দ-বাক্যের কারসাজিতেই ঘটিয়ে দেয়া যাচ্ছে সব; দোষ কি আছে তাতে? আছে। এটা ফ্রি পেয়ে মাথার বাঁ’পাশে বাড়তি আরেকটা মাথা জুড়ে নেয়ার মতো ব্যাপার। পাঠকচিত্ত কতটা স্বস্তি পাবেন এহেন ভোগচর্চায়? এজন্য মাঝেমাঝে মনে হয়, সীমা বোধকরি এরও আছে কোথাও। যাই কল্পনা করি না কেন মানব ধারণায় তাকে সম্ভব মনে হতে হয়, অন্তত পরোক্ষে, তাহলেই কেবল সেখানে সৌন্দর্য ভর করবার ফুরসৎ পায়, অন্যথায় সৃষ্টি হয় অসামঞ্জস্যতা, যা কবিতার এক নম্বরের শত্রু।

যেখানে মনছবির প্রশ্ন, সেখানে মনই গুরু। যার মন যেরকম ছবির জন্ম দিতে সক্ষম, তিনি তেমনি আঁকবেন। পাগলামি বা উন্মত্ততার ব্যাপারটাও এখানে উল্লেখ্য। পাগলামি অনেক উৎকৃষ্ট মনছবি আঁকতে পারে, আবার এ বৈশিষ্ট্য প্রলাপেও নিপতিত হতে পারে। যিনি পাগল বা উন্মাদ, তাঁর সামনে কোনো সীমারেখা বেঁধে দেয়া যায় না, সেটা সম্ভবও নয়। মনছবি আঁকবার ওই বিশিষ্ট সময়ে তাঁর মন-মস্তিষ্ক যে অবস্থায় বিরাজ করছে, সে অবস্থারই উৎপাদন সামনে আনবেন তিনি। ওটা কদ্দূর মানুষের পারসেপশনের আওতার মধ্যে থাকল না-থাকল, সেটা পরে বিবেচ্য। তবে হ্যাঁ, একটা মাত্রার সূক্ষ্ম উন্মাদনা ভালো মনছবি আঁকবার জন্য খুবই দরকারি বিবেচ্য হতে পারে। এ অবস্থা যুক্তিশৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে পারে, স্বাভাবিক অবস্থা যে সুযোগটা মোটেই দিতে চায় না।

ঢাকা, জুন ২০০৯

মৃত্যুর আগে : জীবন খুঁজিয়া ফেরে জীবনের তল

আরো অনেক পরে জীবনানন্দ দাশ ‘মানুষের মৃত্যু হলে’ কবিতায় যে বোধের প্রকাশ করেছিলেন ‘মানুষ মরে গেলে তবুও মানব থেকে যায়’, ধূসর পাণ্ডুলিপির ‘মৃত্যুর আগে’ শেষ হয়েছে মূলত সেই খবর দিয়ে। সবকিছু ফুরিয়ে যাবে কিন্তু রয়ে যাবে মানুষ... তার জন্যে আলোও রয়ে যাবে। রোদকে যদি জীবন বলে ধরে নিই আমাদের, তাদের জন্যে স্থির আলো আছে জীবনধারণের : যা কখনোই যাবে না নিভে।

‘মৃত্যুর আগে’ কাজেই নিশ্চিত মৃত্যুর ভীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখায়। মায়া বেড়ে যায় দেখা সব ছবির প্রতি। যেগুলো আবারও দেখার মতো, বারেবারে যে সৌন্দর্য ছুঁয়ে দেবার মতো। ধূসর পাণ্ডুলিপি পড়ে রবীন্দ্রনাথ বইটিতে মুদ্রিত ১৭টি কবিতা ব্যাপারে সাধারণ যে মন্তব্য করেছিলেন তার দু’টো ব্যাপ্তিসম্পন্ন শব্দ বা শব্দবন্ধ কারো নজর এড়িয়ে যায় না : ‘চিত্ররূপময়’তা ও ‘তাকিয়ে দেখার আনন্দ’ আবিষ্কার করেছিলেন তিনি এ বইতে।

দূর থেকে কবিতাটির দিকে যদি তাকানো যায় তবে মনে হবে বিশাল এক আটচল্লিশ কুঠুরীর আটতলা, প্রায় সমান খাপে যার শরীর বাঁধা। বাইশ থাম প্রতিটায় বলা যেত, কিন্তু নিচের দিকের তিন অষ্টাংশে শক্তি বাড়িয়ে নিতে প্রতিটিতে ছাব্বিশ থাম-- অথচ অদ্ভুত এই, এ স্থাপত্যে যাহা শেষে নির্মিত তাহাই মূল, যাকে বলে ফাউন্ডেশন-- ইটের তৈরি ভবনের থেকে এর পার্থক্যটা ঠিক এ জায়গায় নির্দিষ্ট।

দ্বিতীয় পাঠ

ইহা কবিতা, ইহা খাপে পুষে রাখে জীবনের গল্পসমুদয়...
ইহা কল্যাণী, আনন্দ-অদ্ভুত রঙে পুড়ে পুড়ে
সংশয়ায়িত স্তব্ধ-ঘুমে
গানেদের দেশে দেশে নির্জলে ওঠে বিকশিয়া

তাকিয়ে দেখার আনন্দ বলে একে
ভরা বাট যেন কোনো ঘোড়দৌড় মাঠ
টইটম্বুর রসে ভরা চিত্রে বিচিত্র
যাতে মাখা আছে রাশি রাশি কল্পব্যঞ্জন

এ-ও তো রূপময় বিদ্যুৎ
ঝিলিকে ঝিলিকে শুধু ঝিলকায়ে চলা
গোটা ঝিলপারে মহাধুম
জ্যোৎস্নায় সবুজের গোধুমের বনে...
ধূসর আজ ধূসরিম আরো ফিকে কুয়াশায়
কলকল গ্লানির জলধি

প্রাণ তবু গতিমান

স্থাপত্যিক নকশা করেও যদি কাজটি শুরু করা হয়ে থাকে (যদিও কবিতা কখনো এইভাবে শুরু হয় না) তবে তাতে থাম বা ইটের ব্যবহার হবার কথা ছিল (২২x৪৮)=১০৫৬টি। কিন্তু ব্যবহৃত হয়েছে সর্বমোট ১০৬৮টি। এরকম হয়েছে তিনটি কুঠুরিতে ৪টি করে ইট বেশি ব্যবহৃত হওয়ায়। এর কারণ আমরা চিহ্নিত করতে পারি কম করেও দুটো। ১. বাইশ ইটে কুঠুরি তিনটি নির্মাণে নির্মাতার অক্ষমতা। ২. কোনো সূক্ষ্ম অর্জনকে সম্ভব করতে নিজের পরিকল্পনাকে অবলীলায় ভেঙে ফেলা।

প্রথমোক্ত সম্ভাবনাটিকে আমরা শুরুতেই বাতিল করে দেব। যার শক্তিমত্তার সামনে আমরা প্রতি-মুহূর্তে থমকে দাঁড়াই; বিস্ময়াঘাতে হই ক্ষতবিক্ষত; তাকে অক্ষম বলে খাটো করাটা ঔদ্ধত্যের শামিল।

স্বাভাবিকতাকে ছাড়িয়ে যাওয়া তিনটি অবস্থাকে এবার একটু কাছ থেকে নিরিখ যাক--
১. যত নীল আকাশেরা রয়ে গেছে খুঁজে ফেরে আরো নীল আকাশের তল
২. পৃথিবীর কঙ্কাবতী ভেসে গিয়ে সেইখানে পায় ম্লান ধূপের শরীর
৩. ধূসর মৃত্যুর মুখ ;-- একদিন পৃথিবীতে স্বপ্ন ছিলো-- সোনা ছিলো যাহা
তৃতীয় পাঠ

জীবনানন্দের পাঠকমাত্র বুঝবেন যে, এই তিনটি কুঠুরিই ২২ ইটের ব্যবহারে নির্মাণ করা যেত ; এবং তা জীবনানন্দীয় ঢঙ বজায় রেখেই। আর এটা করার যৌক্তিকতাটাও সহজানুমেয়।

আটচল্লিশজনের কাতারে তিনজন বেয়াড়াকে কে আর সুচোখে দেখে। তাহলে? এই স্খলনের ব্যাপারটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় বা করা উচিত? তবে কি সত্যিই আটতলা এই ভবনের নিচের দিককার তিনতলার বিশেষভাবে নির্মিত কুঠুরিত্রয় আলাদা কোনো ব্যঞ্জনা ধারণ করে রেখেছে?

উপরদিককার পাঁচতলায় এত সরলভাবে ইট বিছানো হয়েছে যে, সাধারণ একজন আবাসিকের পক্ষেও তার গতি প্রকৃতি বোঝা সম্ভব। কিন্তু নিম্নদিকের তিনতলা, যে তিনটিতে তিনটি বিশেষ কুঠুরি সন্নিবেশিত, সেখানকার ইটের শয্যা অতটা সবুজ সহজ নয়; যেকোনো চোখের-দেখার হাত সেই মায়াবীর প্রয়োজনকে উপেক্ষা করতে জানবে না। উত্তর খুঁজবে, কিন্তু পাবে না। তখন তাকে নিরুত্তরেই খুঁজে নিতে হবে শান্তি।

মৃত্যুর ঠিক আগে মুমূর্ষু, মৃতপ্রায়, মরমর একটা অবস্থা থাকলেও বস্তুতপক্ষে জীবনই থাকে। জীবনানন্দের ‘মৃত্যুর আগে’র ও আ-পাদ (উড়ে গেছে কাক) মস্তক (আমরা হেঁটেছি যারা) চিত্রময় জীবন। এবং তা স্তব্ধ নয়, স্থির নয়-- অস্থির এবং গতিশীল। চঞ্চল। যেন জীবন খুঁজিয়া ফেরে জীবনের তল। এমনকি বাস্তবত যার প্রাণ নেই-- তার ভেতরেও এখানে প্রাণানুভূতি বাঙ্ময় হয়ে আছে।
১. ... যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ...
...মাঠ, চাঁদ কারোরই তো আমরা প্রাণ জানি না কিন্তু এ বাক্য প্রাণ দিয়েছে দুয়েরেই।
২. খড়ের চালের’ পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার ;--
কার? তা আমরা জানতে চাই না। আমরা বরং দিব্যানুমান করি যে ইহা খড়ের চালেরই ডানা।
৩. হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলি করিয়াছে খেলা
--কে ভাবতে পারে যে এখানে আলোও জীবন্ত নয়?
৪. চালের ধূসর গন্ধে তরঙ্গেরা রূপ হয়ে ঝরেছে দুবেলা--
--কী বিস্ময়কর প্রাণই না ঝলকাচ্ছে এখানে জলতরঙ্গে; এবং তার সাথে সাথে চালে, যার গন্ধ (তাও আবার ধূসর, গন্ধেরও বর্ণ বিভাজন জীবনান্দকে ছাড়া কে কবে করেছে এমন?) জলকে তরঙ্গায়িত করে দিনে দু’বেলা।
৫. মিনারের মতো মেঘ সোনালী চিলেরে তার জানালায় ডাকে--
--মেঘ যেখানে বিশেষ্য, ক্রিয়া সেখানে ডাক; অথচ এ বজ্রপাতরূপী হুঙ্কার নয়, ভালোবাসার ইশারা-- যা কেবল প্রাণেই শোভন।
৬. নরম জলের গন্ধ দিয়ে নদী বারবার তীরটিরে মাখে
অথবা
নির্জন মাঠের ভীড় মুখ দেখে নদীর ভিতরে ;
--যেখানে কোনো জনই নেই, সেখানে কেমন দেখাও হচ্ছে মাখাও হচ্ছে। যেন কোনো টিনেজারের প্রসাধনপর্ব। অদ্ভুত সব প্রাণময়তা, অপ্রাণে।

চতুর্থ পাঠ

এটি যদি একটি নির্মাণ, ভবন বা বাড়ি যাই বলি, তবে তার নিচের তিন অষ্টাংশের আঠারোটি কক্ষ দখলে রেখেছে বাড়িওয়ালা, যেখানে গোটা ভবনের সব মেইন সুইচ-- তা সে পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ যা কিছুরই হোক। উপরের পাঁচতলার ত্রিশটি কক্ষে নীরিহ ভদ্রলোক ভাড়াটিয়ারা থাকে। সবার উপরে চিলেকোঠা মতো একটা জায়গা, যা ভবনটির অতি নির্মাণ, অন্য দশটি বাড়ির ভিড়ে আলাদা হবার চিহ্ন; যাকে কখনো আলাদা একটি তলা হিসেবে গণ্যই করা যায় না-- ঠিক সেখানেই চুপিসারে বাস করে মৃত্যু, ম্রিয়মাণ অতি। যার চোখ ও মুখের আকৃতি দেখেই বোঝা যায়-- এ তল্লাটে সে বেশ সুবিধে করতে পারছে না। এখানের ভাড়াটিয়ারা যতটা জীবনবাদী তাতে মৃত্যুর চিলেকোঠাবাস বন্ধই হয়ে যেত-- যদি না বাড়িওয়ালার ছেলেপুলেদের সাথে তার অল্পবিস্তর বন্ধুত্ব থাকত।

পেকে ওঠা বিষফোঁড়ায় কণ্টকাঘাত : কিছু পুঁজ, কিছু দুর্গন্ধ

বিনয়ভূষণ আর নয়

মানুষ হিসেবে যিনি বেশ বিনয়ী ও সজ্জন-- এই সমাজব্যবস্থায় হঠাৎ করেই তিনি নিজেকে বড়ো ধরনের সমস্যাগ্রস্ত বলে আবিষ্কার করে বসতে পারেন। তখন যারা তাকে এতদিন বিনয়ী বলে প্রশংসা করেছিলেন, তাদেরকেই সমস্ত সর্বনাশের মূল বলে মনে হতে পারে। এসব ইতিউতি প্রশংসার প্রভাবে মানুষের ক্ষেত্রে বিনয় একটি বিরল গুণ মনে করে বেচারা বিনয়ীরা অস্ত্রহীন ঢুকে পড়েন শ্বাপদসংকুল জনারণ্যে। পরে তিনি বুঝতে পারেন, বাহ্য বেশভূষায় একটু আলাদাত্ব থাকলেও ‘জন’ ও ‘শ্বাপদ’ অনেক সময়ই প্রায় অবিকল গুণপনা রাখে; কথা বলে, হাগে-মুতে একই কায়দায়। বানরদেরও যে ময়ুরপুচ্ছ থাকতে পারে, ভালো মানুষ হয়ে সেটা সবসময় বুঝতে পারা যায় না বস্তুত।

এ প্রজাতির বানরেরা, সুযোগ পেলেই জনের ছদ্মাবরণে নিকটে এসে দশাসই পোদ মেরে ফার্লংখানি দূরে দাঁড়িয়ে যেভাবে দাঁত কেলায়, তাতে পোদাঞ্চল প্রতিরোধে সবিশেষ ব্যবস্থা সম্পন্ন করে অস্ত্রভাণ্ডারকে সহজোন্মোচনযোগ্য উপায়ে ঢেকে সদাপ্রস্তুত হয়ে থাকা ছাড়া বেচারা বিনয়ীদের এখন আর কোনো গত্যন্তর নেই-প্রায়। প্রয়োজন হলেই যাতে জিপার টেনে পোদাভীপ্সায় কাতরদের চোখমুখ লক্ষ্য করে জোরসে মুতে নষ্টজলের বান নামিয়ে দেয়া যায়, সেরকম রেডিমেড ব্যবস্থা সম্পন্ন করে রাখাটাই এখন জরুরি। নইলে এ ভবসংসার বেচারাদের কাছে অসহনীয়রকম তিক্ত অভিজ্ঞতায় দীর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ছোটোকাগজ বিক্রির পয়সা ঠকান যেসব পুস্তক ব্যবসায়ী প্রকৃতপক্ষে তারা সাহিত্যের শত্রু। মনে রাখা জরুরি যে, সাহিত্যকে ভালোবেসে তারা এ ব্যবসায় আসেন নি, তারা এমনকি জুত বুঝলে চামড়ার ব্যবসাও করবেন। লেখকদের মধ্যেও এরকম গোবেচারা আছেন, থাকেন। পুরানো খোলস ঝেড়ে তাদের এখন নতুন করে জেগে ওঠবার কাল আসন্ন। এ না-হলে লেখালেখি করতে এসে নিজে তো বটেই বাপদাদা চৌদ্দগোষ্ঠীসহ ভুল করেছে-- এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে খাতা-কলমের সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে এফডিসিতে গিয়ে এক্সট্রা হবার জন্য চেষ্টা করাটাই তাদের শেষোদ্ধারের একমাত্র পথ হয়ে যেতে পারে। যে লেখালেখির জন্য সমতল ও সহজহাঁট্য বহু রাস্তা রেখে বেচারা দীর্ঘদিন বন্ধুর পথে পদচারণা করেছে, যার জন্য নিজের ও নিকটজনের কাড়ি কাড়ি বঞ্চনাকে মাথা পেতে নিতে হয়েছে, তাকে পরিত্যাগ করে কেনই বা একজন হাতে পেরেক ঠুকতে যাবে? পর্বতচূড়ায় উঠে আকাশ না-ছুঁয়ে একজন নামবে কেন-- ও স্থান তো কারো বাপের একার নয়! কেউ কেউ অবশ্য সব স্থানকেই নিজের বা তার বাপের বলে মনে করে। পা ফাঁক করে বেদখল দিয়ে রাখে অন্যের হাঁটবার সমস্ত পথ, কিংবা গোপনে পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখে।

সাহেব কহেন...

বাংলাদেশে যৌনকর্মীর অধিকার নিয়ে আন্দোলন আছে, আছে ভিখিরির-- নেই কেবল লেখকের। সেজন্য যারা সাহিত্যের খেদমত করে খান-দান, তারা বনে গেছেন দেবতাস্য দেবতা। তাদের যখন যা ইচ্ছে, তারা তা-ই করেন। করেন, করতে পারেন বলেই। ট্রেড ইউনিয়ন না-থাকলে কারখানাভ্যন্তরে শ্রমিকগণ যেভাবে মালিক-কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ব্যবহৃত হতে বাধ্য হন, লেখদের শক্তসমর্থ মেরুদণ্ড কিংবা ঐক্য কিংবা আন্দোলন কোনোটাই না-থাকায় তারাও দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক ও তথাকথিত ছোটোকাগজের সম্পাদক কর্তৃক যখন-তখন যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহৃত হন। কোনো কোনো লেখকের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয় যে এভাবে ব্যবহৃত হতে পারায় তারা বরং পুলকই অনুভব করেন। যেন ব্যবহৃত হবার জন্যেই তাদের জন্ম ও যাত্রা। যেন চোখেমুখে মোসাহেবি একটা ভাব ঝুলিয়ে দেহরক্ষীর মতো সর্বক্ষণ সাহিত্য সম্পাদকের লেজে ঝুলে থাকাটাই লেখক জীবনের চরম ও পরম সার্থকতা।

এবার একটু খুলে দেখি চলুন

অনেক আগে (৩০ মে ১৯৯৭) লেখা চেয়ে দ্রোণাচার্য সম্পাদকের পাঠানো এক চিঠির জবাবে একটি কবিতার খসড়া করেছিলাম, শেষপর্যন্ত সেটি ডাকে দেয়া হয় নি। পরবর্তী সময়েও কোনো কাগজে ওটি ছাপার কথা ভাবি নি। লেখাটি লিখতে পেরেই মনের ঝাল অনেকখানি মিটে গিয়েছিল। সুতরাং চুপ মেরে গিয়েছিলাম। ঘন ঘন যখন একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে এবং যখন এ বিষয় নিয়ে একটি লেখা লিখব বলেই মনস্থির করেছি, তখন মনে হচ্ছে চলতি প্রেক্ষিতের সাথে সম্পর্কসূত্র বিবেচনা করে ওই লেখাটিকে এখানে অস্ত্র হিসেবে ছুড়ে দেয়াও যেতে পারে।
একটি ঠোঁটকাটা কবিতা কিংবা শিমুল আজাদের কাছে খোলা চিঠি

শিমুল আজাদ আপনাকে জবাবি লিখছি
শিমুল আজাদ আপনাকে কুশল জানাচ্ছি
শিমুল আজাদ দ্রোনাচার্যে লেখা পাঠাচ্ছি

শিমুল
আজাদ
লেখালেখিতে আপনার চরিত্র কী
দ্রোনাচার্যের উদ্দেশ্য কী
রক্তাক্ত প্রজন্মের মেনিফেস্টোটা কী
এসব আমাদের
(আমার
অন্যদের
দ্রোনাচার্যের লেখকদের...)
জানা থাকা দরকার
জানাবেন

দ্রোণাচার্য আমার ভালো লাগে না
--উহা লাল কালিতে ছাপা হয়
--উহা বিজ্ঞাপনের ব্যবসা করে
--উহা বাজারিদের লেখা ছাপে
(আশিক-মোস্তাক-শুভঙ্কর এরা কী ভাবেন)

শিমুল
আজাদ
আপনি গ্রাফিত্তিতে যান আবার টিভিতেও
আপনি লিটল ম্যাগে যান আবার দৈনিকেও
আপনি টুপি পরেন আবার পৈতাও

যেদিকে বৃষ্টি সেদিকে ছাতা আপনি
যেদিকে স্বার্থ সেদিকে ঝোল আপনি
যেদিকে প্রসাদ সেদিকে পুরোহিত আপনি
আপনার কাগজে আমি পুষ্পিত হতে চাই না

আপনি বিবরের লেখা নিয়ে দ্রোনাচার্যে ছাপেন
লেখকগণ তা জানেন না
আপনি দ্রোণাচার্যকে প্রজন্মের মুখপত্র বানান
লেখকগণ তা জানেন না
আপনি লেখকগণকে ব্যবহার করেন
তারা তা জানেন না

আমি নিয়মিত লিখে থাকি
তবু দ্রোণাচার্যের জন্য আমার কোনো লেখা নেই
আমার প্রচুর অপ্রকাশিত লেখা আছে
তবু দ্রোণাচার্যের জন্য আমার কোনো লেখা নেই
অপ্রকাশের ভার আমি সইতে পারি না
তবু দ্রোণাচার্যের জন্য আমার কোনো লেখা নেই

আমাকে মাফ করবেন আর এ কবিতাটা দ্রোণাচার্যে ছাপবেন
আমাকে মাফ করবেন আর এ কবিতাটা দ্রোণাচার্যে ছাপবেন

লক্ষ করুন

লেখাটির যেখানে যেখানে শিমুল আজাদ নামটি আছে সেখানে সেখানে শহিদুল ইসলাম কিংবা শামীম রেজা কিংবা জামিল আকতার বীনু কিংবা অন্য কোনো নাম এবং যেখানে যেখানে দ্রোণাচার্য আছে সেখানে সেখানে দৈনিক যুগান্তরের শুক্রবারের সাময়িকী কিংবা দৈনিক আজকের কাগজের সুবর্ণরেখা কিংবা কথকতা কিংবা অন্য কোনো পত্রিকার নাম পড়লে প্রতিক্ষেত্রেই এটি প্রাসঙ্গিক হতে পারে। এই লেখাটির প্রাসঙ্গিকতাকে আমরা উসকে দিতে চাই দিকে দিকে, আমাদের এবং অন্যদের জন্য।

নিজের দিকে ঝোল টানা

মানুষের জীবনটা হলো ক্রমশুদ্ধাভিযান। যারা গোড়া মতাদর্শ নিয়ে বিশুদ্ধ ছোটোকাগজের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে লেখালেখি শুরু করেছেন এবং সময়-সুযোগে ফাল দিয়ে বড়োকাগজের ডালে ডালে বাদুড় হয়ে ঝুলে পড়েছেন, তাদের থেকে কারো কারো গমনপথটা ঠিক বিপরীত দিকে প্রসারিত। এরা যেখান থেকে চ্যুত হয়েছেন, অন্য একজন সেখানে আসীন হবার চেষ্টাটাই চালিয়ে যেতে পারেন দেহেমনে। একের পরিত্যক্তটা অন্যের কাম্য হতেও পারে। এখানে কোনো অপমান লুকিয়ে আছে মনে করার কারণ নেই। এটা মনে হয় শুদ্ধাশুদ্ধি ধারণায় পার্থক্যের কারণে। আমাদের এবং আমাদের যৎপরোনাস্তি লেখালেখির জন্য স্বল্পায়োজনের এ দীর্ঘ যাত্রাপথটিই যথোপযুক্ত ও সঠিক। আপাতক্ষুদ্র এ টেকসই পথপরিসরে ব্যাপক স্বাধীনৌজ্জ্বল্য জ্বলজ্বলায়মান। নির্মোহতায় ব্যাপ্ত যে শুদ্ধিসম্ভাবনা, মোহগ্রস্ততায় হতে পারে তার বিপুল বিনাশ।

যারা দমবন্ধকর বিশাল প্রান্তর থেকে শ্বাসস্বস্তিপ্রদ ছোট্ট আঙিনায় এসে দাঁড়ান বা দাঁড়াতে চান, যারা ঝকমারির বিপরীতে ভালোবেসে সৃষ্টি করে নেন স্বয়ম্ভূ আড়াল-- উভয় মতাদর্শীয়রাই তাদেরকে জানতে-বুঝতে বরাবর ভুল করেন। তারা প্রায়শই অন্যদের স্বজন হিসেবে পরিগণিত হন না কিংবা অন্যরা তাদের, যদিও একই ধরনের চাষবাসে নিমগ্ন বলে আনেকের সাথেই মোলাকাত হয় পথেপ্রান্তরে। সমসময়ের লেখক হয়েও অন্যদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হয় যে কারণে টক-ঝাল-মিষ্টি, ‘পথে হলো দেখা’ জাতীয়।

অভিজ্ঞতা, আতংক এবং সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ

একজন নিষ্কলূষ কিশোরীকে পতিতা বানাবার জন্য আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ঘৃণ্যপ্রয়াস যেরকম বিরামহীন, মুক্তবাণিজ্যের যুগে সবাইকে বাজারি লেখক বানাবার জন্যও কতিপয় সম্পাদকের সেরকম চেষ্টার কমতি নেই, লক্ষ করি। পূর্বাদর্শচ্যুতদেরও গোপনে এতে ইন্ধন ও সহযোগিতা থাকে। কে না জানে এসব অন্যায়। নারীর অধিকার যেমন মানবাধিকার, লেখকাধিকারও তেমনি। অথচ অনেক লেখকই সে অধিকার লঙ্ঘনের শিকার। এখন এসব অধিকারলঙ্ঘনৈতিহ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোটা জরুরি হয়ে পড়েছে। সেটা এজন্যে যে, নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করবার মানসিকতাসম্পন্ন সম্পাদকের চ্যালারা এরপর এমনকি নিজেরাই একখানা যাচ্ছেতাই লেখা লিখে অন্য কারো নামে ছাপিয়ে রাখবে বাজারমাৎ কোনো কাগজে। পাঠকগণ একদিন হয়ত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করবেন যে গল্পকার সেলিম মোরশেদ কিংবা কাজল শাহনেওয়াজ কিংবা তপন বড়ুয়া কিংবা কামরুল হুদা পথিক কিংবা সরকার আশরাফ কিংবা রোকন রহমান কিংবা রবিউল করিম কিংবা শেখ লুৎফরের নামে কোনো গল্প অথবা ফারুক সিদ্দিকী কিংবা শোয়েব শাহরিয়ার কিংবা আহমাদ মিনহাজের নামে কোনো প্রবন্ধ হাজারটা ভুল বাক্যে সমাচ্ছন্ন হয়ে আজকের কাগজের অপরিচ্ছন্ন সাহিত্য সাময়িকীতে ফুটে রয়েছে। অথবা হয়ত দেখা যাবে যে শান্তনু চৌধুরী কিংবা স্বদেশ বন্ধু সরকার কিংবা শোয়েব শাদাব কিংবা বিষ্ণু বিশ্বাস কিংবা শরিফ শাহরিয়ার কিংবা আহমেদ নকীব কিংবা শাহেদ শাফায়েত কিংবা ঈশান জয়দ্রথ কিংবা আশিক আকবর কিংবা মজনু শাহ কিংবা মোস্তাক আহমাদ দীন কিংবা জ্যাকি ইসলাম কিংবা মাসুদ আশরাফ কিংবা সুহৃদ শহীদুল্লাহর নামে কোনো কবিতামতো লেখা আনন্দ নগর, একদিন প্রতিদিন, ইসলাম ও জীবন এবং অজস্র বিজ্ঞাপনে ল্যাপ্টানো যুগান্তর সাময়িকীতে মুদ্রণপ্রমাদসহ শোভা পাচ্ছে। এমনকি এ-ও অবিশ্বাস্য নয় যে এরা প্রয়াত কবি সাবদার সিদ্দিকী কিংবা শামীম কবীরের ভাবমূর্তিকেও বাজারকাষ্ঠে বলি দিয়ে বসতে পারেন। এ আতংক এখন রাত পোহাতে একবার, দিন ফুরাতে আরেকবার জাগে। কারণ উল্লিখিতগণ শ্রেণীতে সংখ্যালঘু। বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিতে সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে বসেছে বলেই এ ভীতিটা এখন বেশি করে পাত্তা পাচ্ছে।

লেখকের অনুমোদন ব্যতিরেকে তার কোনো রচনা ছেপে দেবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদটা এখন আমরা লিখেই জানাচ্ছি, পরে প্রয়োজনে চিৎকার করে জানাব। এ ইস্যুতে সমর্থন থাকলে অন্যেরাও আমাদের এ চ্যাঁচনযজ্ঞে শামিল হবেন, না থাকলে হবেন না। সেক্ষেত্রে আমাদের বিকল্প নীতিপন্থা ‘একলা চলো রে’।

আরো একটি গণবেদনা

কাগজের নাম উত্তরপুরুষ। সম্পাদক হামিদ রায়হান। জানুয়ারি ২০০২-এ প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছে। প্রত্যেকেই মানবেন যে শুধু কবিতা বিষয়ক গদ্য কাগজের বিশেষ প্রয়োজন আছে, যেরকম কাগজের সংখ্যা আমাদের দেশে শূন্যের কোঠায় পরিগণিত। কবিতা বিষয়ক গদ্যের কাগজ করবার কথা নিজে অনেক ভেবেছি, করতে পারি নি। শেষপর্যন্ত অন্যের হাতে যদিও বা হলো-- আশান্বিত হবার কোনো কারণ ঘটে নি। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, এ কাগজটি কোনো জাতেই পড়ে না।

এটি বাদ দিয়ে কাগজটিতে কোনো শিক্ষণীয় ছিল না যে, কোনো আলোচনায় লেখকের বিনানুমতিতে তার কোনো রচনা অংশত বা সম্পূর্ণত উদ্ধৃত করার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা জরুরি। যারা বইয়ে এরকম ঘোষণা যুক্ত করে দেন তারা ভালোই করেন। আমার নিজের অভিজ্ঞতাটি এক্ষেত্রে খুব তিক্ত।

উত্তরপুরুষ-এ মুদ্রিত একটি লেখায় আমার রূপকথা নামধেয় একটি কবিতা অংশত উদ্ধৃত হয়েছে (কবিতা-- প্রসঙ্গ কিংবা অনুষঙ্গ, সমকালীন কিংবা দূরকালীন : মাহবুব হাসান), যে কবিতাটি আমার সবেধন গ্রন্থ মমি উপত্যকাভুক্ত। কবিতাটির ওপর ওখানে কী মন্তব্য করা হয়েছে, সে ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। আমার বলার হলো এই যে, ওই উদ্ধৃতাংশের প্রশ্রয়ে ব্যাপক প্রমাদ সংঘটনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কবিতা রূপকথাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হয়েছে, যে অধিকার কোনো সম্পাদকের থাকতে নেই। উদ্ধৃতিতে কবিতার পঙক্তি ও স্পেসবিন্যাসেও সম্পাদক বেশ সৃজনশীলতার ছাপ রেখেছেন। প্রমাদ সংঘটনের মাধ্যমে ‘ঘুমমত্ত’কে ‘ঘুমন্ত’ বললে না হয় অর্থগত কোনো বিভ্রাট ঘটে না কিন্তু যদি ‘ঘাসস্থান’কে ‘বাসস্থান’, ‘শুলে’কে ‘শুনে’ এবং ‘রোদন’কে ‘রোপন’ (আসলে হবে রোপণ) লেখা হয়, তখন সে কবিতায় কিছুই থাকে না বস্তুত। বরং কবি শুদ্ধ বাক্য রচনা করতে পারেন কি না এ নিয়েই সংশয় তৈরি হয়। এসবের ভিতর দিয়ে বুঝে-না-বুঝে লেখকের বিশেষ ক্ষতি করা হয় বলেই আমাদের মনে হয়।

মুদ্রিত হবার পর প্রমাদের আধিক্য দেখে কাগজ সামনে নিয়ে কেঁদে ফেলবার ইচ্ছা আমার মতো আরো অনেক লেখকেরই জেগেছে-- আমি জানি। ছররা গুলির মাধ্যমে নির্বিচারে পাখিহত্যা করে শিকারির যেরকম আনন্দ, লেখকদের এভাবে যন্ত্রণা দিয়ে কোনো কোনো সম্পাদক সেরকম আহ্লাদই বোধ করেন মনে হয়। বিপরীতে লেখকগণ কষ্টে জর্জরিত হয়ে গোপনে কাঁইকুঁই করেন। গোপনে করেন এজন্যে যে সমাজে তাদের সাপোর্ট নেই-প্রায়, তারা অনেকের চোখেই না-জাত, কুত্তার বাচ্চা আর সম্পাদকরা তাদের মা-বাপ। এ অবস্থা ঘুচানো যেতে পারে কেবল লেখকদের মধ্যে কোনো চলমান আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করা গেলে। প্রয়োজনই যেকোনো আবিষ্কারের নেপথ্য সূচনাবিন্দু। প্রয়োজন যখন দেখা দিয়েছে, আজ-কাল-পরশু সেটা হবে আশা করি।

এ ধরনের ঘটনার শিকার আমরা হামেশাই হই। এখানে ভূতপূর্ব গুণধরের মতো ‘এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না, এবারই প্রথম তুমি’ বলবার কোনোই জো নেই। যে কারণে কোথাও কোনো প্রান্তরে পুষ্পিত হবার অফার এলেই আগে জেনে বুঝে দেখা দরকার-- প্রান্তরটা কেমন প্রশস্ত ও খোলামেলা, মাটিটা কেমন ধাঁচের, চাষীরা কেমন, কেন্দ্রীয় চাষী বপনপ্রণালি ঠিক বোঝে কি না ইত্যাদি। এ তো গেল স্বেচ্ছায় নিজের লেখা ছাপতে দেবার পূর্ব বিবেচনা কিন্তু কেউ কারো লেখা ভুলভাবে উদ্ধৃত করলে সেটা ঠেকানো কী করে? এখানে তো কাগজ সম্পর্কে প্রাক জরিপের কোনো অবকাশই থাকে না। সম্পাদকগণ কি এক্ষেত্রে লেখকদেরকে কোর্টাভিমুখে চালিত করতে চান নাকি? কপিরাইট আইন বলে কি এদেশে কিছুই নেই?

সিকদার আমিনুল হককে একটি উপদেশ

যে কাগজ ভাষার শুদ্ধ ও সঠিক প্রয়োগের ব্যাপারে নিজেরাই শ্রদ্ধাশীল নয় এবং অতি প্রায়শই যেখানে ভুল বাক্যের দেখা মেলে-- সেখানে অন্য কারো লেখা বাক্য ভুল প্রমাণ করতে যাওয়ার ফল হিতে বিপরীত হয়।

শিঁরদাড়ার প্রথম সংখ্যায় মুদ্রিত

ভাষাবস্তু অবয়বে ধরে রাখে ভাষাচিন্তারেখা

ধর্মতত্ত্ব, বিবর্তনতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে অত্যল্প জানাশোনা আমাকে এরকম একটা গড় ধারণা দেয় যে, মানবপ্রজাতি আদিতে এক গোষ্ঠীভুক্ত ছিল। বি...