বিবিধ দূষণ, আচরণের ক্রূরতা-বক্রতা, নিকটজনের তীর্যক বাক্যবাণ, পারস্পরিক অবিশ্বস্ততা, সন্দেহ, প্রভৃতি যখন দারুণভাবে ক্লান্ত-শ্রান্ত করে তুলছে, যখন শ্বাসকষ্ট গেড়ে বসছে ফুসফুসে-মনে, বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই যখন খুঁজছি গ্রামকে হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে-দেয়া-যায় ধরনের ছোট শহরের আবডাল, তখন অন্তর্গত প্ররোচনাবশত আরো একবার মাহবুব কবিরের কবিতার শুশ্রূষা নিতে গিয়ে শৈশব-কৈশোরকে স্পর্শ করতে পারার আনন্দে যেন নতুনভাবে বেঁচে উঠছিলাম আমি। জানি, ওটি দুধের স্বাদ নিছক ঘোলে মেটানো। তথাপি কবিতার এ মনোসামাজিক গুরুত্বকে নিজের মতো করে উপলব্ধিতে আনতে পেরে ভিতরোৎসারিত অন্যরকম এক আহ্লাদবোধে তাড়িত হচ্ছিলাম। সেটি বছর দশেক আগের কথা, যখন আমি এই ঘোরে সমর্পিত হই। তৎকালে ঘোরটিকে আবিষ্কারের একটা ইচ্ছেও জাগে মনে। এরকম সদিচ্ছা থেকে কৈ ও মেঘের কবিতাসমৃদ্ধ আমার ভাণ্ড পূর্ণ করে তুলি কবিবন্ধু অলকা নন্দিতার সংগ্রহ থেকে ধূলির বল্কল ধার করে এনে। তখনকার ভালোমন্দ লাগাগুলোর দুয়েকটা সূত্রকথার ভার কী-বোর্ডে আঘাতও করেছিল। কিন্তু মাত্র ওই পর্যন্তই। আর এগোনো যায় নি। সাহিত্যদর্শনজাত একটি বৈপরীত্য আমাকে হঠাৎই শাসাতে লাগে। ফলে ঘোরটি ভিন্নদিকে মোড় নিয়ে নেয়। ব্যস্ত হয়ে পড়ি অন্য হাজারো কাজে।
ব্যাপার এমন হয় যে, মাহবুব কবিরকে আমরা কম দেখতে থাকি, এমনকি ওর কবিতাকেও। কবিতার জন্যে ওত পেতে থাকা ওর স্বভাবেও খানিক পরিবর্তন আসে। একা হলেই জীবন ওকে বেশ ধমকাতে শুরু করে। এই ধমকের ভয়েই ও সংসারী হবার দিকে তাকায়। আর সম্ভাব্য প্রয়োজনে ওকে গলা বাড়িয়ে দিতে হয় পরাধীনতার যূপকাষ্ঠে। সাপ যেমন মাথার মণিকে নিরাপদ স্থানে রেখে খাদ্যাহরণে যায়, তেমনি মাহবুবও কবিতার ঘোরকে ব্যাগে অথবা অন্য কোথাও রেখে পত্রিকা অফিসে যাতায়াত শুরু করে। স্বর্ণালী পর্বটি ওর সমাপ্ত হয়ে যায়।
২.
২০০৫-এ আমাকে হাওর বিষয়ে একটি ধারণাপত্র তৈরি করবার দায়িত্ব নিতে হয়। এ-বিষয়ক সংশ্লিষ্ট, আধাসংশ্লিষ্ট, ঊনসংশ্লিষ্ট সব সেকেন্ডারি ইনফরমেশনের এক বিশাল ভাণ্ডের নিচে আমি প্রায় চাপা পড়ে যাই। প্রায় তিন মাস সময় নিয়ে ওই স্তূপ থেকে বেরোতে বেরোতে দেখতে পাই যে আমার পরিকল্পিত ধারণাপত্রটি একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থে রূপ পরিগ্রহ করেছে। যেটি ওই বছরই ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইইডি) একটি গ্রন্থমর্যাদায় হাওর : জলে ভাসা জনপদ নামে প্রকাশ করে। তো, ওটি লিখবার সময় বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতিতে হাওর কীভাবে উপস্থিত তা খুঁজে দেখবারও একটা চেষ্টা চালাই। এজন্য প্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট গ্রন্থগুলোর সঙ্গে আমি আমূল ময়মনসিংহ গীতিকাও চষে ফেলি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে হাওরের ছেলে মাহবুব কবিরের কবিতার দিকে তাকাবার কথা তখন আমার একেবারেই মনে পড়ে নি। ওর ‘হিজল-জন্ম’ কবিতায় হাওরকে যে নিবিড়ভাবে আবিষ্কার করা আছে, সেটি তখন স্মরণ করতে না-পারার আমার যে অক্ষমতা, তা গ্রন্থটির প্রকাশপরবর্তীকালে আমার জন্য দারুণভাবে পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে। অনেক সজ্জন পাঠক বাংলাভাষায় হাওর বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ও সফল গ্রন্থ হিসেবে ওই পাঁচ ফর্মা পরিসরের প্রকাশনাটিকে গুরুত্ব দিলেও ‘হিজল-জন্ম’-এর পুনর্পাঠে আমি তুলনা করে দেখেছি যে, মাহবুব কবিরের ওই ৯৫ শব্দের কবিতাটি আমার ২৫ হাজার শব্দের গ্রন্থটির চেয়েও সফল। হায় সক্ষমতা!
৩.
যন্ত্রকঠিন নিষ্ঠুরতার অকুস্থল এ চোখধাঁধানো আপাতউজ্জ্বল নগর বারবারই মনে করিয়ে দেয় যে, এ স্থান অন্তত আমার জন্য নয়, যার মনোমূল ছড়িয়ে রয়েছে গ্রামদেশে। প্রতিদিনই তাই ভালোবাসার পাল্লাটা হেলে যাচ্ছে পিছে ফেলে আসা গ্রামসীমানার দিকে। সুখজাগানিয়া স্মৃতিবোধ মুচড়ে উঠছে তার মাঠ-মধ্যিখানে থাকা পক্ষীকূজনিত একলাএকা গাছকে নিয়ে, ঘাসকার্পেটে মোড়িত মাছরাঙারঙিন পুকুরপাড়কে নিয়ে, শাপলাসুন্দর বিলহাওরের অনিন্দ্যসুন্দর ইশারাকে নিয়ে, খলবল লাফিয়ে ওঠা ছোট-বড়ো মোলা-ডানকিনে মাছকে নিয়ে, ধুলোওড়া দিনের খেজুরগাছের সীমানা আঁকা উলুঝুলু কাঁচারাস্তাকে নিয়ে, কুয়াশাজর্জর রাত্রি-লেপে-দেয়া অন্ধকারে অস্তিত্বময় লণ্ঠনের আলোয় দেখা পালাগানের নায়িকাকে নিয়ে। এই সবকিছু এবং এর বোনবেরাদর সহযোগে গড়ে ওঠা গ্রামসংস্কৃতির যে বিস্তৃত পাঠশালা, তার অনেক টুলবেঞ্চিপাঁচিলধারাপাতই খুঁজে পাওয়া যায় মাহবুব কবিরের কবিতায়। এ মন্তব্যের বিশ্বস্ত সাক্ষ্য বহন করে ওর ফৃ প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ কৈ ও মেঘের কবিতা। গ্রন্থটি বাংলা কবিতার বিচিত্রলক্ষ্যী বহুস্বরব্যঞ্জিতঘোরকালসীমানায় একটি ঘাড়-কাত-করা হিজলগাছের মতো হাওরদেশের আলোহাওয়াজল গায়ে মেখে ধ্যানস্থ নিতান্ত সহজ-সরল এক নালায়েক মেধাবী তরুণের চকিত উত্থানের বিন্দুবিসর্গ অঙ্গে ধারণ করে মহীয়ান হয়ে আছে।
৪.
একজন পাঠক কবিতার কাছে যান কীসের অন্বেষণে? মাহবুব কবিরের কবিতায় যা সহজলভ্য সেসবের অন্বেষণেই কি? এর উত্তরে বলা যায়, হ্যাঁ সেসবও, তবে অবশ্যই সেসবই নয়। আরো অনেক কিছুই কবিতার কাছে প্রত্যাশার থাকতে পারে, থাকেও। আমরা যখন অন্যভাষায় রচিত কবিতা পড়ি, পড়তে যাই, তখন তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকে একরকম, আর যখন বাংলাভাষায় রচিত কবিতা পড়ি তখন আরেকরকম। কোনো কবিতা যে-ভাষায় রচিত সে-ভাষাসংস্কৃতির একটি আন্তর্স্বর সে কবিতায় থাকাই সংগত। মাহবুব বাংলায় লিখে থাকে, ওর কাছে আমাদের প্রত্যাশা কাজেই বঙ্গভূমির-বঙ্গবাসীর আনন্দবেদনাউন্মাদনার ভাষিক অভিঘাত। আমাদের সে প্রত্যাশা মাহবুব পূরণ করে অনেকাংশে। যে ধন ওর কবিতামালার আনাচেকানাচে গচ্ছিত সে ধন বাংলা কবিতার চিরকেলে মৌলসম্পদ। বহমান বাঙালি সংস্কৃতির এ রূপগুণরেখাবলির ছাপ আমরা বাংলা কবিতার কাছে অবশ্যই প্রত্যাশা করি।
কিন্তু কোনো কবিতার সর্বস্ব যদি হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার বিশ্বস্ত ফটোগ্রাফ, তখন কি সে কবিতার প্রতি আমরা একটু সন্দেহের চোখে তাকাই না? মুখটাকে আলগোছে একটু এদিক-সেদিক বাঁকাই না? সে-জাতের কবিতার প্রতি আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারি না, যা বস্তুত প্রদর্শন করে ক্যামেরার শৈলীচারিতা। পারি না, কারণ কবিতার কাছে আমরা যাই ক্যামেরার পারদর্শিতা দেখতে নয়। দেখতে যাই ফটোগ্রাফকে ছাড়িয়ে সৃজিত এমন এক পুঞ্জীভূত রূপ, যা কল্পনারঙিন অন্তরাকাশের শাদাকালো মেঘাবরণীমোড়িত, যা চিন্তনের ওইপারে চরের মতো জেগে ওঠা আবেগের ধ্রুপদী বদ্বীপ; যেই অভীপ্সারাশি পাঠককে দেয় নেচে ওঠবার মন্ত্রণা, সাঁতারস্বস্তিপ্রদ মৃদুকম্প জলের অনুকম্পা, নস্টালজিক ঝিনুক কুড়োবার তাৎকালিক ফুরসত। এসব লক্ষণসম্পৃক্ত প্রশ্নের সদুত্তরও যদি মাহবুবের কবিতা করুণা করতে সক্ষম হয়, তবে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারব যে, ঈদৃশ মাহবুব কবিরীয় স্বরন্যাস বাংলা কবিতায় খুব প্রয়োজনীয় কিছু করতে উপগত। আশার কথা কৈ ও মেঘের কবিতার পাতা উলটে আমরা সে দাবির সপক্ষে দাঁড়াতে-পারে-ধরনের তথ্যউপাত্তকে সগৌরবে সমুপস্থিত দেখতে পাই।
৫.
আমরা যারা কবি মাহবুব কবিরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি-জানি, ওর কবিতা পড়ে মনে হয় মাহবুব কবিরের পক্ষে এরকম কবিতা লেখাই সম্ভব। মগ্নতার যে পর্যায়ে থাকলে একজন মানুষের কোনো শত্রু উৎপাদিত হয় না (যদি অবশ্য হাঁটাচলার পথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হবার ব্যাপারটাকে শত্রু উৎপাদনের কারণ ভাবা না-হয়), একান্তে প্রেম নিবেদন করবার মতো সুযোগও বর্তমান থাকে না কোনো কবিমুগ্ধ তরুণীর, ধ্যান ভেঙে যাবে ভেবে হাত ধরে সাঁকো পার করে দেবার তাড়না বোধ করে না কোনো সঙ্গীপথিক; মাহবুব কবির বলতে গেলে ততখানিই নিমগ্ন। এই মগ্নতা যদি কারো নিজের মধ্যে কেবল নিজেকে নিয়ে হয়, তবে তার সৃষ্টিতে কখনো বেজে উঠতে পারে না পৃথিবী নামক গ্রহে বিরাজিত আপামর জীবনের নিগূঢ় যাপনধ্বনি, যা একদিন মহাকালিক ব্যঞ্জনা লাভে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। যেহেতু মাহবুবের কবিতায় নড়েচড়ে ওঠে বৃহৎঅর্থে বিচিত্ররূপী জীবনেরই খলবলতা, কাজেই গজকাঠি ফেলতে হয় ভিন্ন বিবেচনায়, যে, এ মগ্নতা প্রকৃতঅর্থে নিজের মধ্যে হলেও নিজেকে নিয়ে মন্ময় নয়, বরং বিস্তৃত প্রাণিকুলের সমূহতা নিয়ে তন্ময়।
আমরা জানি, কোনো কোলাহলেই প্রায় ওকে পাওয়া যায় না মধ্যমণিরূপে। স্বার্থদ্বন্দ্বে নিমজ্জিত সাহিত্য-রাজনীতির যে দুর্গন্ধ-কলুষতা প্রতপ্ত সাহিত্যপাড়ার ধুম্রোদ্গারী বিবর্ণ আকাশে দমবন্ধকর ল্যাংমারাখোঁচাখুচিনিন্দার অক্সাইড ছড়িয়ে যাচ্ছে শতকে-শতকে ও দশকে-দশকে, তার থেকে যোজন-যোজন দূরের সরু আলপথ দিয়ে ও পথ হাঁটে। মিডিয়াবাজির মতো নিন্দার্হ বায়ুযানভ্রমণে ও বরাবর অনুৎসাহী এবং অতৎপর। এহেন একজন ভাবুক কবিকে খুঁজেখেটে ওর কবিতার কাছাকাছি থেকে ভালোবেসে যাওয়া ছাড়া উৎকৃষ্ট কর্মটি আর হয় না বলেই মনে করি। যদিও আমরা কেবল ততক্ষণই এটি করে যেতে পারব, যতক্ষণ আমাদের কাছে ওর কবিতাকে প্রয়োজনীয় মনে হবে কোনোরূপ বাহ্য প্ররোচনাহীনভাবে এবং যতদিন স্বস্ব যোগ্যতায় ওর গ্রন্থসমূহ আমাদের সংগ্রহে অচর্চার ধূলিমলিনতামুক্ত থাকতে পারবে।
৬.
১৯৯৬ সালে ওর প্রথম গ্রন্থ কৈ ও মেঘের কবিতা প্রকাশিত হলে পরে যে মুগ্ধবিস্ময় ঝরে পড়েছিল পাঠকের চোখ-মুখ-চিত্ত থেকে, ১৯৯৭-এ প্রকাশিত ওর দ্বিতীয় গ্রন্থ ধূলির বল্কল তার কোনো ক্ষতিবৃদ্ধিই ঘটাতে পারে নি বস্তুত। কারণ তিনটি কবিতা বাদে আনুপূর্বিক কৈ ও মেঘের কবিতাকলাপই ধূলির বল্কল-এ ধৃত হয়ে নিজস্ব রূপ-চেহারাসমেত আসন গ্রহণ করেছে সামনের সারিতে। পেছনের সারিতে বসা নগরের অনেকটাই নষ্টচতুরতাজ্ঞানমিশ্রিত কবিতাসমূহ যেন জরাগ্রস্ত বৈকল্য নিয়ে পিটপিট করে তাকিয়ে জানান দিচ্ছে যে, আছি বলেই এটা আমাদের একরকম থাকা, না-থেকেও-থাকা বা থাকার মতো থাকাটা আমাদের চরিত্রধাতে নেই। এ কবিতারাজিতেও কৈ ও মেঘের কবিতার মাহবুব কবির বর্তমান, তবে ওর সঙ্গে আছে সেই চতুরতা, সেই নাগরিকতা, চিন্তার সেই সঙ্করতা, যা অনেক কিছুর ব্যানারে হাতে ধরিয়ে দেয় শেষপর্যন্ত ফাঁকির হাওয়াই মিঠাই।
এখানে মাহবুব কবির বউকে মা ডাকার পক্ষে অ্যাডভোকেসি করেছে। বুঝি না, জনসাধারণ্যে কবিতা করে এটা বলা দরকার কেন? কবিতায় বিষয়টা নতুন সন্দেহ নেই। কিন্তু বউকে মা কিংবা স্বামীকে বাবা বললে সমাজপ্রতিষ্ঠান আরোপিত বিবাহসম্পর্কের নেতিশৃঙ্খল থেকে মানুষ নামের জীবেদের উত্তীর্ণ হবার পক্ষে কী এমন বিপ্লব সাধিত হবে তা আপাতত বোধগম্য নয়, যেটির উদ্বোধন মাহবুব ওর ‘মা বাবা’ নামক কবিতায় ঘটিয়েছে। যার কাজ কৌতুক করা, সে করলে তা সবার কাছেই স্বাভাবিক বোধ হয়, কিন্তু আমরা যতটা বুঝি, তাতে মাহবুব কবিরকে মোটেই কৌতুক করবার মতো হালকা স্বভাবের মানুষ মনে হয় না। ওর এ প্রতিপাদ্যে এজন্য আমরা খানিক চমকেই উঠি বস্তুত।
৭.
এই লেখাটুকু বেশ কয়েক বছর আগে মাহবুব কবিরের কবিতা নিয়ে লিখিত আমার একটি দীর্ঘ মুসাবিদার অংশ। সে সময়কার সমস্ত বিবেচনার সঙ্গে হাতে হাত রেখে এখন আর এগোনো যাচ্ছে না। সুতরাং লেখাটা কিছুটা ঝেড়েমুছে নিতে হলো। সেটা মাহবুবের কবিতা এতদিনে খানিকটা বদলে গেছে বলে যতটা, তার চেয়ে বেশি আমার বিবেচনাবোধের বদলে যাওয়ার কারণে। শেষপর্যন্ত যা থাকল, তা কবি মাহবুব কবিরের কবিতাবিষয়ক নোট হিসেবে রীতিমতো অসম্পূর্ণ। এই সেই কারণ, যেজন্য দমবন্ধকর ব্যস্ততার মধ্যেও আরো দু’কলম খুচরো আঁকিবুকির চেষ্টা।
আমরা অবগত যে, ইতোমধ্যে ধূলির বল্কল-এর গ্রন্থমর্যাদা কবি-কর্তৃক প্রত্যাহৃত হওয়া ছাড়াও কৈ ও মেঘের কবিতার পুনর্মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে। ২০০৯ ও ২০১২-এ বেরিয়েছে যথাক্রমে ওর আরো দুটো কাব্যগ্রন্থ ফুলচাষি মালি যাই বলো এবং বেসরকারি কবিতা। বই দুটি এতদিন পর্যন্ত মাহবুব কবিরের প্রায়-আন্ডারগ্রাউন্ড কবিপরিচিতকে টেনে হ্যাঁচড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে জনসমক্ষে। পাঠকের শতধাবিচ্ছিন্ন মনোযোগকে এরা বাধ্য করেছে তাদের দিকে ফোকাসটাকে ঘুরিয়ে দিতে। কিন্তু কী দিয়ে? অত্যাশ্চর্য সারল্য ও দায়বদ্ধতাবোধ দিয়ে, প্রায় নিরলংকার বলনকেতার অনাড়ম্বরতা দিয়ে, কথাকে কবিতা করে তুলবার অনায়াস ভঙ্গি দিয়ে। এসব বৈশিষ্ট্য মাহবুব কবিরের কবিতায় আগেও ছিল। ফুলচাষি মালি যাই বলোর প্রেক্ষাপটও প্রায় অবিকল কৈ ও মেঘের কবিতার অনুরূপ গ্রামীণআবহে মোড়িত। তবে বেসরকারি কবিতার পরিসরে নগর তার শুভপ্রবেশ নিশ্চিত করে নিয়েছে; তবে অবশ্যই চাকচিক্যপূর্ণ অবয়ব নিয়ে নয়, আনাচকানাচের মালিন্য নিয়ে। এই দুই গ্রন্থে ওর কথার ধার আরো বেড়েছে, বোধের আগাটা আরো সুচালো হয়েছে, মানুষ ও সমাজ-সভ্যতা নিয়ে ওর ভাবনাটা আরো স্পষ্টতর হয়েছে।
মাহবুব কবির কবিতায় কথা বরাবরই কম বলে। গল্প করার জন্য গল্প বলে না, কিন্তু প্রায় কবিতায় গল্পচূর্ণ ছড়ানো ছিটানো থাকে ওর বিশেষ কাব্যশৈলীর চাহিদা অনুসারে। ফলে ওর কবিতার ভরা জনপদে খালি চোখে তাকালেও বিপন্নপ্রায় চরিত্রের বিষণ্ন মুখ দেখা যায়। হুমকির শিকার গাছপালা, প্রাণী, প্রান্তিক জনতাকে ঘিরেই প্রধানত ওর ভাবনারা ডালপালা মেলে। যেসব মানুষ ওর কবিতার মূল মনোযোগের কেন্দ্রে তারা সামাজিক মর্যাদায় তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির বা তারও চেয়ে হীন ব্রাত্যজন। বাসনকোসনের ফুটো সারাইকারী, মেথর, দরিদ্র পাখিশিকারি, যৌনকর্মী, ভাগ্যগণনাকারী, কুসংস্কারান্ধ পিরভক্ত, ওঝা, পাঁঠা দেখানেঅলা, মড়া সৎকারকারী ও শ্মশানচণ্ডাল, চোর ও খোঁড়া চোর, পাতকাকুড়ানির ধর্ষিতা মেয়ে, অগ্নিদগ্ধ নির্যাতিত নারী, জুয়াড়ি, হিজড়া, মাদকাসক্ত যুবক, ছিনতাইকারী প্রভৃতি পরিচয়ের নারী-পুরুষের মুখ ওর কবিতার মুখের দিকে তাকিয়ে অতি ঘনিষ্ঠভাবে চেনা যায়। আছে এদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত উন্নত মর্যাদার মানুষও-- বিপন্ন আদিবাসী, উদ্বিগ্ন পিতা, মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত, নিষ্কর্মা কল্পনাচারী, চিত্রকরের নগ্নিকা মডেল প্রভৃতি। এমন নয় যে, অন্য কিছু বলতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে এই দুই পর্যায়ের মানুষের কথা ওর কবিতায় উল্লিখিত। বরং এরাই সংশ্লিষ্ট কবিতাগুলোর কেন্দ্রীয় বিন্দু, যে বিন্দুকে কেন্দ্র করে কবিতাময় অন্য কথার বৃত্ত অঙ্কিত হয়েছে। এ যেন অজান্তেই কবিতার বর্ণাবলেপনে নিম্নবর্গের মানুষের সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনা করে যাওয়া।
৮.
মাহবুব কবির কবিতা করে তুলবার জন্য কোনোরকম বল খাটায় না। শব্দ ও বাক্যের ব্যায়াম করে না। মাহবুব সাধারণ অভিজ্ঞতার বিশেষায়িত পর্যবেক্ষণসমূহ সহজ করে বলে যেতে থাকে মাত্র। ওর মূল কারিগরিটা মনে হয় বলাবলির নিরাভরণ রূপ এবং পরম্পরা বিন্যাসে। সাধারণত মাহবুব যা দেখে তাই বলে। কখনো কখনো এই দেখায় চর্মচক্ষু ছাপিয়ে মনশ্চক্ষুর ভূমিকা বড়ো হয়ে ওঠে; যেমন, ‘আকাশ থেকে আকাশে ছুটে পালাচ্ছে দলে দলে মেঘ/ যেন হরিণের পালের ওপর হামলে পড়েছে বাঘ’ (বৃষ্টি হবে) বা ‘স্বর্গ পুরুষতান্ত্রিক পল্লি’ (স্বর্গে যাবো না)। এরকম উদাহরণ সত্ত্বেও, তাকালে দেখা যায় ফুলচাষি মালি যাই বলোতে চর্মচক্ষুর উজ্জ্বল কীর্তিই পরিমাণে বেশি। তবে আমরা এরকম বলতে চাইছি না যে, এই দেখা একবার এক ঝলক তাকিয়ে পাতার কাঁপন দেখার মতো একমাত্রিক কোনো দেখা। বরং এসব দেখা দীর্ঘদিন ধরে পর্যায়ক্রমে দেখতে দেখতে দেখনক্রিয়াকে সম্পূর্ণ করে তোলা; যে দেখাকে তাৎপর্যময় করে তোলে পূর্বার্জিত তথ্য ও নিবিড় জ্ঞানযোগে একটি বিন্দুকে আরেকটি বিন্দুর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভুজ অঙ্কনসাপেক্ষে মিলিয়ে দেবার দক্ষতা। ‘আদিবাসী হদি পরিবাটির সবকিছু আজ ইসলাম’ (সন্ধ্যাকুড়া) বা ‘পৃথিবীতে মানুষ আসলে বেশিদূর এগোয় নি/ মানুষ তো আজো সাম্প্রদায়িক রয়ে গেল’ (সাম্প্রদায়িক) বা ‘আমাদের নদীটি খালের মধ্যে ঢুকে গেছে’ (উন্নয়ন) ধরনের পর্যবেক্ষণসমূহকে জীবন-পরিবেশলগ্ন একেকটা মাইলস্টোন বলে মনে হতে পারে। বেসরকারি কবিতায়ও এমন দৃষ্টান্ত অবিরল। ‘যুবতীর আত্মহত্যার প্রশ্নে যৌনতা ল্যাপ্টে থাকে’ (আত্মহত্যা) বা শরণার্থী শিবির আর মহানগর ঢাকার/ গন্ধ কিন্তু একই’ (গন্ধবিষয়ক) ধরনের পর্যবেক্ষণকে অগভীর সাব্যস্ত করে তাচ্ছিল্য করবার সাহস আমাদের কমই হবে।
আমরা মাহবুব কবিরের কবিতার সারল্যের প্রশংসা করি। করে যাব। পড়ে যাব সারে সারে ওরে। বলে যাব সারল্যের জয় হোক। কিন্তু মাঝে মাঝে নিন্দা করবার শক্তিও যদি আমরা অর্জন করে না উঠি, তাহলে তাকে মনে হবে আত্মপ্রতারণা। আমাদের কাছে মনে হয়, ওর ফুলচাষি মালি যাই বলোর ‘কে প্রথম’ বা বেসরকারি কবিতার ‘নবজাতকের প্রতি’র মতো কবিতার জন্মনিয়ন্ত্রণ কাম্য। অন্যদিকে ওর কৈ ও মেঘের কবিতার ‘পৃথিবী’, ‘হিজল-জন্ম’, ‘কৈ ও মেঘের কবিতা’, ‘হত্যামুখর দিন’ (ঈদুল আজহার দিনের জাতীয় কবিতা) ও ‘আমার মাংস’; ফুলচাষি মালি যাই বলোর ‘মদন সরকার’, ফুলচাষি মালি যাই বলো, ‘সাম্প্রদায়িক’, ‘উন্নয়ন’ ও ‘সস্তা মানুষজন’; বেসরকারি কবিতার ‘হিরালাল’, ‘বেসরকারি কবিতা’, ‘নক্ষত্র’, ‘অভয় পৃথিবী নেই’ ও ‘আমাদের গ্রাম’-এর মতো কবিতার সঙ্গে সহবাস করে অধিকাংশ কবিতা পাঠক পরিপূর্ণ তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারে।
অনিকেত শামীম সম্পাদিত 'লোক'-এর নভেম্বর ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত
Friday, January 10, 2014
স্বদেশাপ্লুত ভালোবাসার শব্দছবি
খোন্দকার আশরাফ হোসেনের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’-এ আর যাই থাক ঘৃণা নেই, আছে সবিশেষ স্বদেশাপ্লুত ভালোবাসা; কাঁচা-পাকা, হিসেবি-বেহিসেবি, মাত্রাময়-মাত্রাছাড়া। মানবীরূপী একজন কোনো সুন্দরী এখানে উপস্থিত আছে কি না, যার প্রতি নিবেদিত এসব পঙক্তিমালা, তা নিয়েও সংশয় জাগতে পারে। অবশ্য স্বদেশই যদি কথিত সুন্দরী হয়, তবে তা ভালোভাবেই আছে। আর সে কারণেই হবে হয়ত যে, গ্রন্থভুক্ত অনেক কবিতাকে বেজায় কেজো মনে হয়। নিরর্থকতার যে সীমায় অনেক পাঠক কবিতাকে একান্ত নিরলে একা পেতে চান, সেরকমটি এখানে কালেভদ্রে ঘটে। তাতে অমন কবিতানুরাগীরা এ গ্রন্থপাঠে নাখোশ হবার ভাব করলে আমরা তাদের প্রবোধ দেবার অজুহাত খুব কমই খুঁজে পাই। অবশ্য তাদের উদ্দেশে এ কথাটি বলবার সুযোগটুকু আমরা যৌক্তিকভাবেই নিতে পারি যে, ‘কেজোকথা সর্বদা হেলাফেলা করিবার নয়’। বরং দেখা যায় এর নদীতীর ধরে যথেচ্ছ হেঁটে, এর বিষণ্ন প্রাঙ্গণে নিবিড়ভাবে বসে, যে, মাথার ওপর দিয়ে কত কী পাখি উড়ে যায়, মিথের। অতীতের চেনা-অচেনা নানা পৌরাণিক ও লোকচরিত্র, লোকবাচন, নির্বিঘ্নে পাশের গোপাট বেয়ে ধেয়ে যায়, বাংলার পথে। এ সময়ের নানাকিছুর তারা অংশী হয়। কবিতার এটা এক গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বটে। এটা করে দেখাতে পারা ছেলেখেলা নয় কিংবা নিবিড়ভাবে কাছে থেকে একে দেখতে পারাও কোনোভাবে আকামের নয়।
এর বাইরে আমরা কথা বিশেষ খুঁজে পাই না এ বই নিয়ে বলবার। কিন্তু তবু কথা বলতে হবে। অন্তত হাজার শব্দ তো বটেই। কেউ কেউ কথা ভালোবাসে। কেউ কেউ কথার ওজন নয় পরিমাণ মাপে। কেউ কেউ অর্থ নয় আওয়াজেই কাঁপে।
আমরা অগত্যা গ্রন্থধৃত কতিপয় কবিতার জানালায় উঁকি দেবো বলে ভাবি। পারি তো দরজা ঠেলে ভেতরেও ঢুকে যাব, বসব কতক। গৃহবাসীর সাথে ভাববিনিময় করব। তাতে যদি কিছু কথা রোচে যায়, ওই দিয়ে হয়ত-বা মুখরক্ষা হবে। সবেধন একটাই মুখ, আমাদের, তা যদি হারাই এসে এইখানে খেলা খেলা কথা বলে, কেজোকথার গরমাগরম দিনে লজ্জার একশেষ হবে।
২.
গ্রন্থযাত্রার শুরু ‘বেহুলা বাংলাদেশ’-এ; মিথিক বাস্তবতায় স্বদেশপ্রেমের জোয়ার বইয়ে দিয়ে। সংগতভাবেই বেহুলা বাংলায় লখিন্দর আছে, আছে দুর্বাসা, দ্রৌপদী ও ইন্দ্র। দায়িত্ব পেয়েছেন এখানে অর্ফিয়ুসও। কিন্তু এসব তথ্যে আমাদের মন ভরে না, যতক্ষণ না আমরা ‘আলোর বর্ষণে গর্ভবতী’ হওয়া বা ‘পিপাসার অশ্ব’ ছোটানোর মতো মেটাফরের সামনে পড়ি। বুঝি যে তিনি কবিতাই করতে বসেছেন, দেশগাথা বর্ণনার ছলে। দু'কূল রক্ষার এই সচেষ্টতাই কবিকুলে তাঁকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। এ কবিতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে স্বরে ও সরগমে আমাদের গায়ে এসে জীবনবাবুর ‘অন্ধকার’-এর আঁচ লাগে। ‘নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না’র অ্যালিউশন হাজির করে আমাদের তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, একটা জগদ্দল পাথরের সামূহিক ক্ষয়ক্ষতির লেজের অন্ধকার বর্ণনা করাই তার এখানকার প্রধান অভীষ্ট।
এই বিষাদময় অন্ধকারই বোধকরি তার চৈতন্যকে শাসন করতে থাকে। তা নইলে কেন সুকান্তের মতো এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবার ‘সুশোভন প্রতিশ্রুতি’ না-দিয়ে তিনি তার উলটোটাই করবেন? বৈশ্বানর, কৃষ্ণ, অর্জুন, স্পার্টাকাসকে হাজির-নাজির রেখেও কেন প্রিয় পুত্রকে সাহসী অভিমন্যু করে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেবেন, যেখানে তার ট্র্যাজিক পরিণতির কথা আমরা জানি? কী এমন সংগত কারণ আছে এই বিষাদবয়ানের? এর জবাবও দেখা যায় তিনি নিজেই দিয়ে রেখেছেন ‘বর্ষা ১৩৯৫’ কবিতায়। বলছেন, ‘এখন উদ্ভটতার ব্যাকরণ হাতে দীর্ঘ আলখাল্লা-পরা অন্ধকার/ আলোর উঠানকে খুব শাসাচ্ছে’। কারণ ‘(ঘোড়সওয়ারেরা চলে গেলে প্রান্তরের ভাওয়া ব্যাঙ-ও/ হানড্রেড মিটার রেসে জিতে নেয় সোনার পদক)’। যেজন্য তাঁর মনে হয় ‘বাংলার বর্ষা বড় মরিচাপ্রবণ’। আশ্চর্য লাগছে তো! লাগবারই কথা। বাংলার কবিকুল মাতোয়ারা থাকেন যে বর্ষায়, তাতেও তিনি মরিচা দেখেন? এমন তাঁর মনে হয় কারণ তাঁর কাছে বর্ষাও দেশনিরপেক্ষ কোনো অস্তিত্ব নয়; কারণ ‘নিরন্নের ভাতের থালায় কানকোতে হেঁটে আসা/ সুরভিত কৈ মাছের রূপকথা’ আজ নির্বাসিত। বইয়ের ‘বৌমাছ’, ‘যাত্রা’, ‘ধানরমণী’সহ অনেকানেক কবিতায় বাঙালিয়ানার সুবাস মাখিয়ে রাখেন তিনি। এসব আয়োজনে আবারো দেখা হয়ে যায় বেহুলার সাথে, খুল্লনা ও লহনার সাথেও। ‘কালপূর্ণিয়া’য় বন্দনা করেন দেশমাতার। ওই ট্র্যাজেডির বয়ানে তাঁর আকাশের চাঁদ হয়ে যায় ‘মর্মমূলে গাঁথা/ সারাসিন চাকু’ ! বটেই তো। তা নইলে রক্তপাতের এমন ভয়াবহতা দেখত কী করে বাংলার মানুষ?
কবিতায় তাঁর এ ধরনের ট্রিটমেন্ট দেখে মনে পড়ে যায় তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশানুরক্তি তাঁর অন্যতম চেতনানির্মাতা। এ বই প্রকাশের সময়কার ২১ বছরের পরিণত বয়সি বাংলার গায়ের নানা ক্ষতস্থানের দিকে চোখ পড়ামাত্র তাঁর প্রাসঙ্গিক প্রতিক্রিয়া ব্যঞ্জিত হয়ে ওঠাকে আমাদের কাছে কাজেই কোনো আরোপন মনে হয় না। তাঁর কবিচৈতন্যের গঠনপ্রক্রিয়ারও এ এক মৌল উপাদান। কবির সমুদয় সৃজনোল্লাস এই পথ বেয়েই তার গন্তব্যে পৌঁছেছে। ফলত এখানে দেখা হয়ে যায় বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, আইল-বাতর, রূপকথা-লোকাচারের সাথে।
ঈর্ষণীয় সবুজ বিষয়ে তাঁর কিছু বলবার থাকে, বাংলার; বলেনও। কেননা ‘চোখের দৃষ্টির জন্য সবুজের মতো ভালো/ চিকিৎসা নেই’। ‘আমার স্বদেশে সুখ্যাতি আছে সবুজের’ স্বরে আমরা শুনি পূর্বকবির ধ্বনি, তিনিও যেন বাংলার কিংবদন্তীর কথাই বলছেন নিজস্ব ভাষায়। মনে হয়, আবারও সেই দেশগাথা, আবারও কেজোপ্রেম। কিন্তু না, কেজোকে তিনি কেজো করেই রাখেন না, উতরাতে জানেন। সততই মেটাফর খুঁজে ফেরেন তিনি। অদ্ভুত সব চিত্রকল্পের প্রেমে পড়ে যান। একই ছবি এঁকে বসেন একাধিক কবিতায়। একইসঙ্গে ‘তারাদের হলকায়ে জেকের’ দেখেন-শুনেন ‘তাসের খেলা’ ও ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’তে। আবার ওই ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’তে যেমন দেখেন ‘শূন্য/ রাজপথে ফিগার স্কেটিং করে বাদামের খোসা’, তেমনি ‘কবিতা কোলাজ’-এর ‘অদ্ভুত’জুড়ে দেখতে পান ‘প্রান্তরের এপার থেকে ওপারে/ ফিগার-স্কেটিং করছে মেঘ’। কোথায় বাদামের খোসা, আর কোথায় মেঘ। দুইয়েরই এক আচরণ। বারণ নেই। দেখবার চোখটাই এখানে আসল, দেখানোরও। এই ছবি চিরন্তন। আর চিরছবির এই বলনকেতা তাঁর এমনই নিজস্ব যে, বারবার বলে তার নিশান উড়িয়ে রাখা প্রয়োজন মনে করেন। হয়ত না। আসলে বোধহয় মালিকানাবোধ থেকে নয়, বরং ওসব মনোমুগ্ধকর ছবির কাছে যে ধরা খেয়ে থাকে তাঁর আমূল কবিচিত্ত, তারই এ স্বতঃপ্রকাশ।
৩.
পেশাগতভাবে ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ঘর করেছেন তিনি। কিন্তু এ সম্পর্ক পেশার গণ্ডিতেই আবদ্ধ রাখেন নি, মাখিয়ে নিয়েছেন আমূল অস্তিত্বের সঙ্গে। এর মাধ্যমে বিশ্বকবিতার যে আঁতের খবর তিনি জেনে ফেলেছিলেন ও জানছিলেন, তা নিয়মিত জানিয়ে গেছেন বাংলা কবিতার পাঠকদেরও। এই পরিসরে তাঁর হাতে যে সোনালি শস্যগুলো রূপ বদলে নিয়েছে বাংলাভাষায়, তা ঋদ্ধ করেছে বাংলা কাব্য ও প্রবন্ধ সাহিত্যকে। এ সংবাদ এখানে প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে, প্রত্যক্ষ ওই আয়োজনের গভীরে সহজাতভাবে আরেকটি আয়োজনও সেরে নিয়েছিলেন তিনি, তা হলো, নিজের কবিতাবোধকে দিতে পেরেছিলেন একটি সমীহজাগানিয়া উচ্চতা। ওই উজ্জ্বলতা অনুপস্থিত নয় ‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’-এও। কবিতা তো বটেই, এ বইয়ের কিছু কবিতার নামকরণও অনেক বিখ্যাত বিশ্বকবিতার কথা মনে রেখে করা; যেমন, টি. এস. এলিয়টের ‘দি লাভ সঙ অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রুক’-এর স্মরণে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’, কোলরিজের ‘দি রাইম অব দা অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার’ স্মরণে তাঁর ‘বুড়ো নাবিকের প্রেমগীতি’। কবিতায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনের যে বিবেচনা হাজির করেছিলেন টি. এস. এলিয়ট তাঁর ‘ঐতিহ্য ও ব্যক্তিপ্রতিভা’ নামক সুবিখ্যাত প্রবন্ধে, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সেই মেলবন্ধন রচনা করেছেন। নিজের কবিতাদেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার অনুরণনও ছড়িয়ে পড়েছে যথাসাধ্য, যে খবর ইতোমধ্যে এ লেখায়ও মূর্ত হয়েছে।
৪.
আলোচ্য বই থেকে কবিতার পর কবিতা হাজির না-করে কম কথায় আলাপ সারবার পরিকল্পনার এ পর্যায়ে এসে মনে হয়, বলবার কথার পুঁজি আমাদের, এবার বুঝি সত্যিই ফুরালো। কৌতূহলী পাঠকের আকাঙ্ক্ষা এ দিয়েই নিবৃত্ত হবে কি না, এরকম ভাবনা যদিও জাগে মনে। তখন মনে হয়, গৌণ হোক তবু আরো কিছু তথ্য হয়ত এখানে উঠিয়ে রাখা যায় বইটি সম্পর্কে; যেমন, দেশবিষাদমণ্ডিত কবিতাভাণ্ডারে সমৃদ্ধ এ কবিতে প্রেমিকসুলভ আত্মবিশ্বাস এবং অহঙ্কারও দ্রষ্টব্য বটে। আর সেটা ‘(লাউডুগি যেমন মিশে থাকে জলঘাসের হৃদয়ে)’, ঠিক তেমন করে। যেহেতু ‘ভালোবাসিয়াছি ভালোবাসিয়াছি ভালোবাসে নাই ভালো’ বা ‘এ শরীর আজ বহু বসন্তের প্রেমের আগুনে পোড়া’, তাই জ্বরাক্রান্তের প্রেমের উত্তাপ নিয়ে শীতলতায় যাবার বাসনা থাকা এ পরিসরে নিতান্ত সংগত। কিন্তু তবু কারো উদ্ভট করুণা না-নেবার দৃঢ়তা তিনি মুহূর্তের জন্যও হারান না। ফলে আমরা একইসঙ্গে দেখি এ বইয়ে কবির ‘হৃদপিণ্ডের শব্দ থেকে গড়িয়ে পড়ছে ভালোবাসার জবাফুল’। কিংবা বলা যায়, এ বইয়ে প্রধানত খোলা অক্ষরবৃত্তেই সেরেছেন তিনি তাঁর কথালাপ। মাঝে মাঝে স্বরবৃত্তের ঘোড়ায় চড়েও পরিকল্পিত ভ্রমণে বের হয়ে গেছেন তিনি ‘ঘৃণার ঘুঙুর’, অংশত ‘চিকিৎসা’ ও ‘কবিতা কোলাজ’-এর ‘পদাবলী’পথে। স্বরবৃত্তে জগতোদ্ধার যাত্রায় তাঁর পথে পথে পালকি দোলা, বনে বনে ময়ালভীতি। এসবে আমরা নেচে উঠি, ফের থামি আত্মতুষ্ট হয়ে। পাশাপাশি এ বইয়ে মাত্রাবৃত্তের সফল প্রয়োগও তাঁর হাতে হয়েছে ‘বুড়ো নাবিকের প্রেমগীতি’র ছলে। বলা যায় এ কথাও যে, মুগ্ধ হতে হয় তাঁর প্রয়োগকৃত সৌন্দর্যময় কিছু শব্দবন্ধের দিকে চেয়ে; যেমন, ‘জলকরঙ্কবাহি’, ‘কণ্টকঝোপাবৃত’; কিংবা এই ভয়ঙ্কর ছবিতে যে, ‘সুর্মা-পরানো আয়ত চোখের কুহকিনী এক নারী/ শিশ্নমুণ্ডে পরিয়ে দিয়েছে অষ্টধাতুর বালা’। এখানে এটা উল্লেখের ইচ্ছে পোষণও হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ‘ধূমশলাকার শ্যামপীরিতি ছাড়তে হবে’র মতো পঙক্তি লিখে তিনি এ পীরিতাঘাতে কাতর সহস্রজনের গোপন আকাঙ্ক্ষাটিও মূর্ত করে রেখেছেন। যদিও তাঁকে কখনোই ধূমশলাকায় বুঁদ হয়ে থাকতে দেখি নি দু’চোখে।
‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’-এ ব্যাপকভাবে পাঠকপ্রিয় হবার মতো মোহটান নেই, প্রকাশিত হবার পরের ২১ বছরজুড়ে তা স্বতঃপ্রমাণিত। তবে একজন গুরুত্বপূর্ণ কবির নাতিদীর্ঘ যাত্রাপথের এ মধ্যঘাট তাঁর সমুদয় কাব্যবৈশিষ্ট্যের লক্ষণ ধারণ করে বিশিষ্ট হয়ে আছে; যার দিকে ফিরে ফিরে তাকানোয় আমাদের কোনো দায়মুক্তি নেই।
মুহম্মদ মুহসিন সম্পাদিত 'ধানসিড়ি'র অক্টোবর ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত
এর বাইরে আমরা কথা বিশেষ খুঁজে পাই না এ বই নিয়ে বলবার। কিন্তু তবু কথা বলতে হবে। অন্তত হাজার শব্দ তো বটেই। কেউ কেউ কথা ভালোবাসে। কেউ কেউ কথার ওজন নয় পরিমাণ মাপে। কেউ কেউ অর্থ নয় আওয়াজেই কাঁপে।
আমরা অগত্যা গ্রন্থধৃত কতিপয় কবিতার জানালায় উঁকি দেবো বলে ভাবি। পারি তো দরজা ঠেলে ভেতরেও ঢুকে যাব, বসব কতক। গৃহবাসীর সাথে ভাববিনিময় করব। তাতে যদি কিছু কথা রোচে যায়, ওই দিয়ে হয়ত-বা মুখরক্ষা হবে। সবেধন একটাই মুখ, আমাদের, তা যদি হারাই এসে এইখানে খেলা খেলা কথা বলে, কেজোকথার গরমাগরম দিনে লজ্জার একশেষ হবে।
২.
গ্রন্থযাত্রার শুরু ‘বেহুলা বাংলাদেশ’-এ; মিথিক বাস্তবতায় স্বদেশপ্রেমের জোয়ার বইয়ে দিয়ে। সংগতভাবেই বেহুলা বাংলায় লখিন্দর আছে, আছে দুর্বাসা, দ্রৌপদী ও ইন্দ্র। দায়িত্ব পেয়েছেন এখানে অর্ফিয়ুসও। কিন্তু এসব তথ্যে আমাদের মন ভরে না, যতক্ষণ না আমরা ‘আলোর বর্ষণে গর্ভবতী’ হওয়া বা ‘পিপাসার অশ্ব’ ছোটানোর মতো মেটাফরের সামনে পড়ি। বুঝি যে তিনি কবিতাই করতে বসেছেন, দেশগাথা বর্ণনার ছলে। দু'কূল রক্ষার এই সচেষ্টতাই কবিকুলে তাঁকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। এ কবিতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে স্বরে ও সরগমে আমাদের গায়ে এসে জীবনবাবুর ‘অন্ধকার’-এর আঁচ লাগে। ‘নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না’র অ্যালিউশন হাজির করে আমাদের তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, একটা জগদ্দল পাথরের সামূহিক ক্ষয়ক্ষতির লেজের অন্ধকার বর্ণনা করাই তার এখানকার প্রধান অভীষ্ট।
এই বিষাদময় অন্ধকারই বোধকরি তার চৈতন্যকে শাসন করতে থাকে। তা নইলে কেন সুকান্তের মতো এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবার ‘সুশোভন প্রতিশ্রুতি’ না-দিয়ে তিনি তার উলটোটাই করবেন? বৈশ্বানর, কৃষ্ণ, অর্জুন, স্পার্টাকাসকে হাজির-নাজির রেখেও কেন প্রিয় পুত্রকে সাহসী অভিমন্যু করে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেবেন, যেখানে তার ট্র্যাজিক পরিণতির কথা আমরা জানি? কী এমন সংগত কারণ আছে এই বিষাদবয়ানের? এর জবাবও দেখা যায় তিনি নিজেই দিয়ে রেখেছেন ‘বর্ষা ১৩৯৫’ কবিতায়। বলছেন, ‘এখন উদ্ভটতার ব্যাকরণ হাতে দীর্ঘ আলখাল্লা-পরা অন্ধকার/ আলোর উঠানকে খুব শাসাচ্ছে’। কারণ ‘(ঘোড়সওয়ারেরা চলে গেলে প্রান্তরের ভাওয়া ব্যাঙ-ও/ হানড্রেড মিটার রেসে জিতে নেয় সোনার পদক)’। যেজন্য তাঁর মনে হয় ‘বাংলার বর্ষা বড় মরিচাপ্রবণ’। আশ্চর্য লাগছে তো! লাগবারই কথা। বাংলার কবিকুল মাতোয়ারা থাকেন যে বর্ষায়, তাতেও তিনি মরিচা দেখেন? এমন তাঁর মনে হয় কারণ তাঁর কাছে বর্ষাও দেশনিরপেক্ষ কোনো অস্তিত্ব নয়; কারণ ‘নিরন্নের ভাতের থালায় কানকোতে হেঁটে আসা/ সুরভিত কৈ মাছের রূপকথা’ আজ নির্বাসিত। বইয়ের ‘বৌমাছ’, ‘যাত্রা’, ‘ধানরমণী’সহ অনেকানেক কবিতায় বাঙালিয়ানার সুবাস মাখিয়ে রাখেন তিনি। এসব আয়োজনে আবারো দেখা হয়ে যায় বেহুলার সাথে, খুল্লনা ও লহনার সাথেও। ‘কালপূর্ণিয়া’য় বন্দনা করেন দেশমাতার। ওই ট্র্যাজেডির বয়ানে তাঁর আকাশের চাঁদ হয়ে যায় ‘মর্মমূলে গাঁথা/ সারাসিন চাকু’ ! বটেই তো। তা নইলে রক্তপাতের এমন ভয়াবহতা দেখত কী করে বাংলার মানুষ?
কবিতায় তাঁর এ ধরনের ট্রিটমেন্ট দেখে মনে পড়ে যায় তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশানুরক্তি তাঁর অন্যতম চেতনানির্মাতা। এ বই প্রকাশের সময়কার ২১ বছরের পরিণত বয়সি বাংলার গায়ের নানা ক্ষতস্থানের দিকে চোখ পড়ামাত্র তাঁর প্রাসঙ্গিক প্রতিক্রিয়া ব্যঞ্জিত হয়ে ওঠাকে আমাদের কাছে কাজেই কোনো আরোপন মনে হয় না। তাঁর কবিচৈতন্যের গঠনপ্রক্রিয়ারও এ এক মৌল উপাদান। কবির সমুদয় সৃজনোল্লাস এই পথ বেয়েই তার গন্তব্যে পৌঁছেছে। ফলত এখানে দেখা হয়ে যায় বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, আইল-বাতর, রূপকথা-লোকাচারের সাথে।
ঈর্ষণীয় সবুজ বিষয়ে তাঁর কিছু বলবার থাকে, বাংলার; বলেনও। কেননা ‘চোখের দৃষ্টির জন্য সবুজের মতো ভালো/ চিকিৎসা নেই’। ‘আমার স্বদেশে সুখ্যাতি আছে সবুজের’ স্বরে আমরা শুনি পূর্বকবির ধ্বনি, তিনিও যেন বাংলার কিংবদন্তীর কথাই বলছেন নিজস্ব ভাষায়। মনে হয়, আবারও সেই দেশগাথা, আবারও কেজোপ্রেম। কিন্তু না, কেজোকে তিনি কেজো করেই রাখেন না, উতরাতে জানেন। সততই মেটাফর খুঁজে ফেরেন তিনি। অদ্ভুত সব চিত্রকল্পের প্রেমে পড়ে যান। একই ছবি এঁকে বসেন একাধিক কবিতায়। একইসঙ্গে ‘তারাদের হলকায়ে জেকের’ দেখেন-শুনেন ‘তাসের খেলা’ ও ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’তে। আবার ওই ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’তে যেমন দেখেন ‘শূন্য/ রাজপথে ফিগার স্কেটিং করে বাদামের খোসা’, তেমনি ‘কবিতা কোলাজ’-এর ‘অদ্ভুত’জুড়ে দেখতে পান ‘প্রান্তরের এপার থেকে ওপারে/ ফিগার-স্কেটিং করছে মেঘ’। কোথায় বাদামের খোসা, আর কোথায় মেঘ। দুইয়েরই এক আচরণ। বারণ নেই। দেখবার চোখটাই এখানে আসল, দেখানোরও। এই ছবি চিরন্তন। আর চিরছবির এই বলনকেতা তাঁর এমনই নিজস্ব যে, বারবার বলে তার নিশান উড়িয়ে রাখা প্রয়োজন মনে করেন। হয়ত না। আসলে বোধহয় মালিকানাবোধ থেকে নয়, বরং ওসব মনোমুগ্ধকর ছবির কাছে যে ধরা খেয়ে থাকে তাঁর আমূল কবিচিত্ত, তারই এ স্বতঃপ্রকাশ।
৩.
পেশাগতভাবে ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ঘর করেছেন তিনি। কিন্তু এ সম্পর্ক পেশার গণ্ডিতেই আবদ্ধ রাখেন নি, মাখিয়ে নিয়েছেন আমূল অস্তিত্বের সঙ্গে। এর মাধ্যমে বিশ্বকবিতার যে আঁতের খবর তিনি জেনে ফেলেছিলেন ও জানছিলেন, তা নিয়মিত জানিয়ে গেছেন বাংলা কবিতার পাঠকদেরও। এই পরিসরে তাঁর হাতে যে সোনালি শস্যগুলো রূপ বদলে নিয়েছে বাংলাভাষায়, তা ঋদ্ধ করেছে বাংলা কাব্য ও প্রবন্ধ সাহিত্যকে। এ সংবাদ এখানে প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে, প্রত্যক্ষ ওই আয়োজনের গভীরে সহজাতভাবে আরেকটি আয়োজনও সেরে নিয়েছিলেন তিনি, তা হলো, নিজের কবিতাবোধকে দিতে পেরেছিলেন একটি সমীহজাগানিয়া উচ্চতা। ওই উজ্জ্বলতা অনুপস্থিত নয় ‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’-এও। কবিতা তো বটেই, এ বইয়ের কিছু কবিতার নামকরণও অনেক বিখ্যাত বিশ্বকবিতার কথা মনে রেখে করা; যেমন, টি. এস. এলিয়টের ‘দি লাভ সঙ অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রুক’-এর স্মরণে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’, কোলরিজের ‘দি রাইম অব দা অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার’ স্মরণে তাঁর ‘বুড়ো নাবিকের প্রেমগীতি’। কবিতায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনের যে বিবেচনা হাজির করেছিলেন টি. এস. এলিয়ট তাঁর ‘ঐতিহ্য ও ব্যক্তিপ্রতিভা’ নামক সুবিখ্যাত প্রবন্ধে, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সেই মেলবন্ধন রচনা করেছেন। নিজের কবিতাদেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার অনুরণনও ছড়িয়ে পড়েছে যথাসাধ্য, যে খবর ইতোমধ্যে এ লেখায়ও মূর্ত হয়েছে।
৪.
আলোচ্য বই থেকে কবিতার পর কবিতা হাজির না-করে কম কথায় আলাপ সারবার পরিকল্পনার এ পর্যায়ে এসে মনে হয়, বলবার কথার পুঁজি আমাদের, এবার বুঝি সত্যিই ফুরালো। কৌতূহলী পাঠকের আকাঙ্ক্ষা এ দিয়েই নিবৃত্ত হবে কি না, এরকম ভাবনা যদিও জাগে মনে। তখন মনে হয়, গৌণ হোক তবু আরো কিছু তথ্য হয়ত এখানে উঠিয়ে রাখা যায় বইটি সম্পর্কে; যেমন, দেশবিষাদমণ্ডিত কবিতাভাণ্ডারে সমৃদ্ধ এ কবিতে প্রেমিকসুলভ আত্মবিশ্বাস এবং অহঙ্কারও দ্রষ্টব্য বটে। আর সেটা ‘(লাউডুগি যেমন মিশে থাকে জলঘাসের হৃদয়ে)’, ঠিক তেমন করে। যেহেতু ‘ভালোবাসিয়াছি ভালোবাসিয়াছি ভালোবাসে নাই ভালো’ বা ‘এ শরীর আজ বহু বসন্তের প্রেমের আগুনে পোড়া’, তাই জ্বরাক্রান্তের প্রেমের উত্তাপ নিয়ে শীতলতায় যাবার বাসনা থাকা এ পরিসরে নিতান্ত সংগত। কিন্তু তবু কারো উদ্ভট করুণা না-নেবার দৃঢ়তা তিনি মুহূর্তের জন্যও হারান না। ফলে আমরা একইসঙ্গে দেখি এ বইয়ে কবির ‘হৃদপিণ্ডের শব্দ থেকে গড়িয়ে পড়ছে ভালোবাসার জবাফুল’। কিংবা বলা যায়, এ বইয়ে প্রধানত খোলা অক্ষরবৃত্তেই সেরেছেন তিনি তাঁর কথালাপ। মাঝে মাঝে স্বরবৃত্তের ঘোড়ায় চড়েও পরিকল্পিত ভ্রমণে বের হয়ে গেছেন তিনি ‘ঘৃণার ঘুঙুর’, অংশত ‘চিকিৎসা’ ও ‘কবিতা কোলাজ’-এর ‘পদাবলী’পথে। স্বরবৃত্তে জগতোদ্ধার যাত্রায় তাঁর পথে পথে পালকি দোলা, বনে বনে ময়ালভীতি। এসবে আমরা নেচে উঠি, ফের থামি আত্মতুষ্ট হয়ে। পাশাপাশি এ বইয়ে মাত্রাবৃত্তের সফল প্রয়োগও তাঁর হাতে হয়েছে ‘বুড়ো নাবিকের প্রেমগীতি’র ছলে। বলা যায় এ কথাও যে, মুগ্ধ হতে হয় তাঁর প্রয়োগকৃত সৌন্দর্যময় কিছু শব্দবন্ধের দিকে চেয়ে; যেমন, ‘জলকরঙ্কবাহি’, ‘কণ্টকঝোপাবৃত’; কিংবা এই ভয়ঙ্কর ছবিতে যে, ‘সুর্মা-পরানো আয়ত চোখের কুহকিনী এক নারী/ শিশ্নমুণ্ডে পরিয়ে দিয়েছে অষ্টধাতুর বালা’। এখানে এটা উল্লেখের ইচ্ছে পোষণও হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ‘ধূমশলাকার শ্যামপীরিতি ছাড়তে হবে’র মতো পঙক্তি লিখে তিনি এ পীরিতাঘাতে কাতর সহস্রজনের গোপন আকাঙ্ক্ষাটিও মূর্ত করে রেখেছেন। যদিও তাঁকে কখনোই ধূমশলাকায় বুঁদ হয়ে থাকতে দেখি নি দু’চোখে।
‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’-এ ব্যাপকভাবে পাঠকপ্রিয় হবার মতো মোহটান নেই, প্রকাশিত হবার পরের ২১ বছরজুড়ে তা স্বতঃপ্রমাণিত। তবে একজন গুরুত্বপূর্ণ কবির নাতিদীর্ঘ যাত্রাপথের এ মধ্যঘাট তাঁর সমুদয় কাব্যবৈশিষ্ট্যের লক্ষণ ধারণ করে বিশিষ্ট হয়ে আছে; যার দিকে ফিরে ফিরে তাকানোয় আমাদের কোনো দায়মুক্তি নেই।
মুহম্মদ মুহসিন সম্পাদিত 'ধানসিড়ি'র অক্টোবর ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত
Sunday, January 1, 2012
প্রভাব বিষয়ে প্রমিত আলাপ
প্লেটো মনে করতেন কাব্য সত্য থেকে তিন ধাপ দূরে অবস্থান করে। সত্য হলো কতগুলো ভাব বা আইডিয়া, আর বস্তুজগৎ তার অনুকরণ বা প্রতিফলন। কাব্যের আদর্শ যেহেতু বস্তুগজগৎ, কাজেই কাব্য অনুকরণের অনুকরণ। প্লেটোর এ মতের প্রতি তাঁর সুযোগ্য শিষ্য অ্যারিস্টটলের ভিন্নমত ছিল। তবে তা এ অর্থে নয় যে, কাব্য অনুকরণ নয়; বরং এ অর্থে যে, কাব্য সত্য থেকে তিন ধাপ দূরের বিষয় নয়। অর্থাৎ এই দুই গ্রিকচিন্তকের মতেই কবিতাকরা বস্তুজগতের অনুকারিতা। এ কথার পুরোটা হয়ত আমরা মানব না এতদিন পরে। কারণ কবিতার আদর্শ কেবল বস্তুজগৎ, এ মতটিই আমাদের সমর্থন পায় না। সে কারণে কথাটি নিসর্গ ও অন্যবিধ দৃশ্যবস্তুর দোষগুণ বর্ণনাকারী কবিতাগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা খাটলেও, মনোভাববর্ণনমূলক কবিতার ক্ষেত্রে অচল। এটা সত্য যে, মানুষ ও মানুষের মনও প্রাকৃতিক বস্তু, কিন্তু মনোভাব প্রাকৃতিক নয়। কাজেই তা নিয়ে লিখিত কবিতা কী করে বস্তুজগতের অনুকারিতা হবে? যদি কিছুর অনুকারিতা একে বলা হয়ই, তবে তা হয়ত ভাবনার অনুকারিতা, যে ভাবনার কোনো বাস্তবিক রূপই নেই। কাজেই নিজস্ব আবেগে চালিত হয়ে নিজ ভাবনার ছকানুযায়ী আমরা যখন কবিতা করি, তখন আমরা কারো অনুকারিতা করি না বস্তুত। কিন্তু মুশকিল হলো, ভাবনার অনুকারিতা করে সেই ভাবনাটা আমরা যখন ভাষায় প্রকাশ করি, তখন তা অবয়ব পায় নানা বস্তুসূচক শব্দের সহায়তায়ই। অর্থাৎ একবার অস্বীকার করেও ঘুরেফিরে আমাদের একভাবে প্লেটো-অ্যারিস্টটলের মতের আশ্রয়েই গিয়ে দাঁড়াতে হয়। সে যাই হোক, এ ধরনের অনুকারিতায় গ্লানি নেই, কারণ এটাই এক্ষেত্রে দাগায়িত সর্বশেষ সীমা। কেননা সকল অর্থপূর্ণ বক্তব্যই শেষপর্যন্ত দৃশ্য-অদৃশ্য বস্তুর গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। আমাদের উদ্বেগ কাজেই প্রকৃতির অনুকারিতা নিয়ে নয়, বরং মানুষ ও তার কর্মের অনুকারিতা নিয়ে।
ইতোমধ্যে আমরা নিজের ভাবনা নিয়ে গর্বিতভাব ব্যক্ত করেছি। কিন্তু নিজস্ব ভাবনা বলে আমরা যাকে গ্লোরিফাই করতে চাচ্ছি, সেটা কতদূর নিজের তা-ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বটে। ইউরোপের প্রথম সমালোচকরূপে খ্যাত জার্মান নাট্যকার লেসিংয়ের একটা বক্তব্য ছিল এরকম যে, ‘মাসুল না দিয়ে কেউ পাম গাছের তলায় হাঁটতে পারে না’। গ্যাটে তাঁর ইলেকটিভ এফিনিটিজ গ্রন্থে উদ্ধৃতিটি একই অর্থে ব্যবহার করেছিলেন। এর মানে হলো আমরা প্রতিনিয়ত যা দেখি-শুনি-পড়ি-করি তার কিছু না-কিছু প্রভাব আমাদের ওপর পড়েই, যা আমরা এড়াতে পারি না। এসব প্রভাবের বলেই আমরা চিন্তাভাবনা করি ও আমাদের মধ্যে অনুভূতির জন্ম হয়। ওই অনুভূতিই যদি আমরা লিখি তাহলেও কি বলা যাবে যে, আমরা অনুকারিতা করছি? বলা যাবে, কিন্তু আমরা বলি না ও বলব না। কিন্তু যদি আমরা অন্য কারো ভাবনা, ধারণা, বক্তব্যকে লুটেপুটে নিই, তাহলে সেটা অনুকারিতাই। এক্ষেত্রে আমরা হয়ত নিজেদের ভাবনার অনুকারিতাসূচক ধরনটাকে গ্রহণ করলেও পরের ভাবনার অনুকারিতাসূচক ধরনকে নিয়ে নীতিগতভাবে আপত্তি করব। কখনো কখনো আমরা আইডিয়া চুরির অভিযোগ কোথাও কোথাও নিম্নস্বরে উঠতে শুনেছিও, কিন্তু এ অভিযোগও কোথাও কখনো বড়ো হয়ে উঠেছে বলে শোনা যায় নি। কাজেই শিল্পনির্মাণ প্রশ্নে এটিকেও অগর্হিত আচরণ হিসেবেই গণ্য করা হয়।
ধরা যাক, কবি তাঁর বিভিন্ন পেশার পাঁচজন বন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা করেন; তাঁদের মধ্যে আছেন অধ্যাপক, সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, চিত্রকর ও ব্যবসায়ী। প্রত্যেকেই তাঁর তাঁর জগৎ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আড্ডায় নানা কথা বলেন, প্রতিক্রিয়া জানান। এসব কথা থেকে এমনসব ক্লু বেরিয়ে আসে বা আসতে পারে, যা জন্ম দিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কবিতার বীজ। হয়ত ওই আড্ডায় মিলিত না-হলে, উপর্যুক্ত আড্ডাসঙ্গীরা নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলাপ না-করলে, একজন বিশেষ একটি বাক্য উচ্চারণ না-করলে ওই বীজটি খুঁজে পাওয়া যেত না এবং কখনোই লিখিত হতো না বিশেষ একটি কবিতা। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় লিখিত কবিতাটিকে আমরা কেউই বলব না অনুকৃত। কারণ কবিতাবীজ আহরণের এ পন্থাটিও দোষের নয়।
অনেকের কাছে শুনেছি, কোনো কোনো কবি-লেখককে তাঁরা বিশেষভাবে রিসোর্সফুল বলে ভাবেন। তাঁদের কবিতা-গল্প-উপন্যাস ও অন্য লেখাপত্র পড়লে বিশেষ বিশেষ কবিতার সম্ভাবনা জাগ্রত হয়। সব অগ্রজ কবি-লেখক পরবর্তী লেখকদের ইন্ধন সরবরাহ করতে পারেন না। কারণ প্রভাবসঞ্চার করবার গুণ সবার থাকে না। সে কারণে বিশেষ বিশেষ কবি-লেখকের জীবন ও কর্ম সাধারণ পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে গৃহীত না-হলেও সতীর্থ লেখকদের কাছে নিত্যচর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। কবিতাবীজ সংগ্রহের এই পন্থাটিও স্বীকৃত ও বহুজনজ্ঞাত। এ ব্যাপারে ফরাসি লেখক ও কূটনীতিক আঁদ্রে মোরোয়ার বিশেষ ওকালতি আছে। তিনি উপদেশ দিয়েছেন, ‘যে সকল বড়ো লেখক মনে ভাবাবেগ সৃষ্টি করেন নবীন লেখক শুধু তাঁদেরই বেছে নেবে এবং তাঁদের গ্রন্থরাজিই সে পুঙ্খানুপুঙ্খ বারবার পাঠ করবে।’ কাজেই এটাকে এমনকি প্রভাব বলে নিন্দা করবারও রেওয়াজ নেই। কিন্তু কাউকে পড়তে গিয়ে তাঁর বিশেষায়িত শব্দরাজি, তাঁর শব্দ ব্যবহারের ধরন, কবিতাকে কবিতা করে তুলবার প্রক্রিয়া, ইত্যাদি সবই যদি আমরা আমাদের কবিতায় কাজে লাগাই বা লাগাবার চেষ্টা করি, তবে আমরা নির্ঘাৎ একটা ঝুঁকির দিকে পা বাড়িয়ে দেবো। এ অবস্থাটাকে নিন্দনীয় ভাববার সুযোগ আছে। সমাজচক্ষু বলবে, আমরা ওখান থেকে চুরি করেছি; ভয়ানক ক্ষতিকরভাবে প্রভাবিত হয়েছি; ইত্যাদি। তাছাড়া আমাদের নিজেদের দিক থেকেও সেটা হবে নিজের পায়ে কুড়াল মারবার মতো ব্যাপার। কারণ এই প্রবণতা আমাদের নিজস্ব স্বর তৈরির অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে, আমাদের কবিতার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিকূলতা তৈরি করবে।
বছর কয় আগে প্রথম আলো সাময়িকীতে শাহীন মমতাজের একটা কবিতার বইয়ের আলোচনায় তাঁর কবিতার ভূয়সী প্রশংসা শেষে আলোচক সাজ্জাদ শরিফকে বলতে শুনেছিলাম, শাহীনের এখন উচিত উৎপল কুমার বসুর হাতটা ছেড়ে দিয়ে নিজের মতো করে হাঁটা বা এ জাতীয় একটা কথা। এখানে সাজ্জাদ শরিফ সম্ভবত এটাই পরিষ্কার করতে চেয়েছেন যে, এ ধরনের প্রভাবে প্রভাবিত হওয়া যাবে কবির বেড়ে ওঠবার লগ্নে, কিন্তু এক সময় তার থেকে বেরিয়ে নিজের স্বর তৈরি করবার দিকে মনোযোগ দেয়া জরুরি, নইলে রহিত হয়ে যাবে তাঁর স্বতন্ত্র লেখক হিসেবে বেড়ে ওঠা। এ প্রশ্নে আঁদ্রে মোরোয়ার স্বরও প্রায় একইরকম; তিনি বলেন, ‘অন্যের রচনা-শৈলীর সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হবার পর নবীন লেখক নিজস্ব রচনা-শৈলী গড়ে তুলবেন’।
প্রভাবের পক্ষে বিশ্বখ্যাত ফরাসি-লেখক অঁদ্রে জিদেরও ব্যাপক ওকালতি আছে। তিনি ‘সাহিত্যে প্রভাব’ নামে একবার একটা দীর্ঘ বক্তৃতাই দিয়েছিলেন, যাতে তিনি সব ধরনের প্রভাবেরই পক্ষ নিয়েছিলেন। প্রভাব যে লেখকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই প্রতিপাদন করেছিলেন তিনি তাঁর বক্তৃতায়। তখন প্রশ্ন জাগে, তাহলে আমরা মেধাস্বত্ব বা ন্যায়ের প্রশ্নে সীমাটা টানব কোথায়? একটা সীমা নিশ্চয়ই কোথাও-না-কোথাও থেকে যাওয়া সংগত, তা নইলে চিরকালই আমাদের অঁদ্রে জিদ বা আঁদ্রে মোরোয়াই লিখে যেতে হবে, নতুন কিছু কেউ লিখবেন না।
অঁদ্রে জিদ বলেন, ‘প্রভাবকে ভয় করে যাঁরা দূরে বসে থাকেন তাঁরা আত্মার দৈন্যকেই তুলে ধরেন। তাঁদের মাঝে নতুন কিছু খোঁজা বৃথা।’ এবং তিনি জানান, ‘মহামান্য ব্যক্তিদের আমরা প্রভাবের ভয়ে শঙ্কিত হতে দেখি না বরং প্রভাব সংগ্রহের অদম্য আগ্রহ তাঁদের কাছে অনেকটা বাঁচার আগ্রহের মতোই।’ শুনলে শিহরণ জাগে! উদাহরণ হিসেবে যে মহজ্জনের নাম তিনি সামনে আনেন তা শুনে ভিমড়ি খাবার জোগাড় হয়। এঁদের মধ্যে আছেন মিকেলেঞ্জেলো, মঁতেন, রাসিন, গ্যাটে, গোগোলের মতো শিল্পী-সাহিত্যিক। তখন মনে হয়, আমাদের হয়ত এরকম করে ভাবাই সংগত যে, মহৎদের কথা আলাদা! মহজ্জন প্রভাবকে মহৎ উপায়ে কাজে লাগাতে জানেন, মৌমাছির মতো নানা ফুল থেকে একটু একটু করে মধু আহরণ করে মধুভারে টইটম্বুর মৌচাক বানিয়ে তোলেন। আমরা অতটা পরিশ্রম করতে পারি না বা করতে রাজি হই না, বরং শর্টকাট রাস্তা খুঁজি। এই শর্টকাটওয়ালাদের কথাও তিনি বলেছেন বটে তাঁর বক্তৃতায়। জানিয়েছেন, ‘প্রভাব ভালো-মন্দ দু’রকমেরই হতে পারে।...প্রভাবের ভালোমন্দ নির্ধারিত হয় যিনি প্রভাবিত হন তাঁর ভালো-মন্দের আপেক্ষিকতায়।’ আমরাও কাজেই এই আপেক্ষিকতায় দাঁড়িয়েই আমাদের আলাপ বিস্তৃত করবার প্রয়াস করব। কারণ আমরা সাধারণ। আমরা সমুদ্রজল ছুঁতে জানি, কিন্তু গা না-ভিজিয়ে সে জলে অন্তর সিক্ত করে নেয়া আমরা শিখি নি।
কবিতার একটা ডিভাইস বা অলংকার আছে পরোক্ষ উদ্ধৃতি বা উল্লিখন নামে। পৃথিবীর অনেক খ্যাত-বিখ্যাত কবিই এ অলংকার ব্যবহার করেছেন, যেজন্য তাঁরা নিন্দিত হন নি। ইংরেজি ভাষার বিখ্যাত কবি এলিয়টের কবিতায় দেশ-বিদেশের বিস্তর ক্লাসিকসার ব্যবহৃত হয়েছিল। বাংলা কবিতার তিরিশের দশক থেকে যে আধুনিকতার সূচনা তাতে এলিয়টসহ প্রধান প্রধান ইউরোপীয় কবির সুস্পষ্ট প্রভাব কাজ করেছে। শুধু বাংলা কবিতা নয়, জানা যায়, অন্যত্রও এলিয়টের প্রভাব অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। মার্কিন কবি স্ট্যানলি ক্যুনিটজ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রায় তিন দশক এমন কোনো তরুণ কবি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ছিল যার পেছনে তাঁর (এলিয়টের) কণ্ঠস্বর শোনা যেত না। বিশের ও তিরিশের দশকে খ্যাতি অথবা শ্রোতা জোটাতে হলে এলিয়টকে অনুসরণ করতেই হতো।’ এরকম অবস্থায় দেশি বা বিদেশি উৎসের দ্বারা প্রভাবিত হওয়াকে দোষারূপ করবার কোনো সুযোগ থাকে না। বিদেশি শিল্পউৎস থেকে প্রভাব সঞ্চয় করাকে যে দোষারূপ করা যাবে না, তা এমনকি রবীন্দ্রনাথও তাঁর সহিত্যবিচার নামক প্রবন্ধে জানিয়েছেন, ‘সাহিত্যবিচারকালে বিদেশী প্রভাবের বা বিদেশী প্রকৃতির খোঁটা দিয়ে বর্ণসংকরতা বা ব্রাত্যতার তর্ক যেন না তোলা হয়।’ তবে এটা উল্লেখযোগ্য যে, একই প্রবন্ধে তিনি প্রভাবের ভালোমন্দ তথা দোষগুণের সীমাটাও আমাদের জন্য স্পষ্ট করে রেখেছেন। বলেছেন, ‘অনুকরণই চুরি, স্বীকরণ চুরি নয়। মানুষের সমস্ত বড়ো বড়ো সভ্যতা এই স্বীকরণশক্তির প্রভাবেই পূর্ণ মাহাত্ম্যলাভ করেছে।’ অর্থাৎ আমাদের স্বীকরণের অনুমতি আছে, অনুকরণের নেই। স্বীকরণের বিস্তর নমুনা আছে তাঁর নিজের রচনাকর্মেও। ইউরোপ-আমেরিকার সোনার খনি তো বটেই, সংস্কৃত ও প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের রত্নরাজি থেকে শুরু করে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য (সুফি-বাউল-বৈষ্ণব) দর্শন ও কবিতার ভাঁড়ার পর্যন্ত ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণস্থল।
আমাদের উদ্বেগ এখানে যে, এটুকু স্বীকৃতিকে নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে আমরা অনেকেই পরোক্ষ উদ্ধৃতি বা উল্লিখন নামক ডিভাইসটির যথেচ্ছ অপব্যবহার করে একে চুরির লাইসেন্স হিসেবে কাজে লাগাতে প্রয়াসী হয়েছি। এজন্য কখনো কখনো মনে হয়, ডিভাইসটি কেবল তাঁদের জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত, যাঁরা দায়বদ্ধ কবি হিসেবে ইতোমধ্যে স্বীকৃত হয়েছেন। নতুনদের হাতে এই অস্ত্র বিপদ ডেকে আনতে পারে। এঁদের মধ্যে যাঁরা অসৎ, যাঁরা সস্তা খ্যাতি চান, তাঁরা এ সুযোগটিকে একটি ভয়ংকরতার দিকে নিয়ে যেতে উদগ্রীব হন, হতে পারেন। এই স্বীকৃতির সুযোগে অনেকে বিপুল পাঠ দিয়ে সমস্ত ক্লাসিক কবিতার মনের কথাগুলো টুকে নিয়ে নিজের কাব্যজগৎ ভরিয়ে তুলতে পারেন ও তোলেন। তাঁদের কবিতা কবিতায় অভ্যস্ত পাঠকের ভালো লাগে। কারণ পাঠকের স্মৃতিতে উতরে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসিক কবিতার যে স্বরটা আলতোভাবে লেগে থাকে, সেটাই ধ্বনিত হয়ে ওঠে ওই ওই কবিতাপাঠে। এঁরা যতটা কবি, তারচে’ বেশি কারিগর বা ক্রাফটসম্যান। ক্রাফটসম্যানশিপের কাজটি এঁরা মনোযোগ দিয়ে করেন এঁদের কবিতায়। নানা জায়গা থেকে কাঠখড় আহরণ করে সুনিপুণ দ্রষ্টব্যবস্তু তৈরি করে লোকজনের সামনে হাজির করেন নিজ নিজ সৃষ্টবস্তু হিসেবে। ডিসকভারিই তখন হাজির হয় ইনভেনশন হিসেবে। দীর্ঘ ঐতিহ্যের সমর্থনে এটিও কবিতার ক্ষেত্রে নিন্দিত হয় না বিশেষ। কিন্তু অধিকাংশ কবি কি এই-ই করে যাবেন জীবনভর? এঁরা কি ইনভেন্ট করে দেখাবেন না কিছু? আমরা জানি, সেটা করার কিছু ঝুঁকি আছে। কবিতাপাঠকদের কাছে তা সম্পূর্ণত অচেনা লাগবে, দ্রুত জনপ্রিয় হবে না। বাহবা পাবার যে রুচি কবির তৈরি হয়েছে, তাঁর সে রুচি আহত হবে। কিন্তু তা হলেও পুরানোকে ভেঙে খাওয়ার চাইতে নতুন কিছু তৈরি করাই আমাদের কবিতার জন্য বেশি জরুরি মনে হয়, আজ; যখন সিংহভাগ কবিই কৈয়ের তেলে কৈ মাছ ভাজার প্রবণতায় আবিষ্ট হয়ে আছেন।
কবিদের মধ্যে একটা দল আছে, যাঁরা পাঠককে ফাঁকি দিতে গিয়ে নিজেদেরই ফাঁকি দিয়ে ফেলেন। এঁদের কৌশল একটু ভিন্ন। এঁরা কম জনপ্রিয়, কম পঠিত কবির কবিতাকে সম্পূর্ণত বা অংশত মেরে দিয়ে বালিতে মাথা গুঁজে থাকেন। ধরা পড়ে গেলে পরোক্ষ উল্লেখ বা উপলব্ধির ঐক্যের দোহাই দেন। দিয়ে পার পান অথবা পান না। কিন্তু প্লাজিয়ারিজম বা তস্করবৃত্তি কেন অলংকারের বরাতে মাফ হয়ে যাবে? কখনো কখনো দেখা যায়, এঁরা দ্রুত একটা খ্যাতি-পরিচিতি পান, আবার হঠাৎ চুরিতথ্য আবিষ্কৃত হয়ে গেলে নিন্দিত-ভর্ৎসিতও হন, পাঠক হারান। জানা কথা যে, এঁরা প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কবিতার কাজ করতে আসেন না। তাঁদের সাময়িক বিশেষ মিশন থাকে। মিশনে সফল হবার জন্য এঁরা ওই পন্থা নেন। এঁরা বস্তুত কিছু সৃজন করতে আসেন না, সৃজিত বাগানে লুণ্ঠনযজ্ঞ পরিচালনা করে নিজ নিজ সাম্রাজ্যের পরিধি বাড়াতে চান মাত্র।
জুলফিকার নিউটন নামের একজন কবিযশোপ্রার্থী ১৯৮৪ সালে হারানো অর্কিড নামে একটি কবিতার বই-ই প্রকাশ করে ফেলেন, যে বইয়ের সম্পূর্ণ প্রায়-একটি কবিতাও তাঁর নিজের লেখা ছিল না; ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্র, অরুণ মিত্র, দিনেশ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখ কবিদের লেখা। পরের বছর এই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণও বেরিয়েছিল। ধরা পড়ার পর তিনি আর কবিতা না-লিখে অন্যত্র গর্ত খুঁড়তে শুরু করেন। ইতোমধ্যে তথ্য-প্রমাণযোগে স্পষ্ট হয়েছে যে, তিনি নিজের অনুবাদ বলে একের পর এক যেসব বই বাজারে ছেড়েছেন ও ছাড়ছেন, ওগুলোর প্রতিটিও আগে করা অন্য কারো অনুবাদ নতুন করে কম্পোজ করে বই বানিয়ে ফেলানো মাত্র। ওসবে প্রায় কিছুই নতুন নেই, কেবল প্রশংসা করে কবীর চৌধুরীর লেখা একটা করে ভূমিকা/ফ্ল্যাপ ছাড়া (কবীর চৌধুরী প্রয়াত হওয়ায় ভবিষ্যতে এই লোক কিছুটা ভূমিকা-সংকটে পড়বেন বলে মনে হয়!)। এমনকি তিনি ভারতীয় বিখ্যাত লেখকদের প্রবন্ধগ্রন্থও একটু এদিক-ওদিক করে নিজের বই হিসেবে ছেপে দিয়েছেন।
ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব থেকে গত দশকে প্রকাশিত একটা প্রকাশনায় গাউসুর রহমানের একটা কবিতা ছাপা হয়, যেটি তরুণ কবিতাকর্মী শাহিন লতিফের বিশেষ ভালো লাগায় পড়তে পড়তে সে ওটা মুখস্থই করে ফেলে। কয়েক মাস পরে ঢাকার পল্টন থেকে একগাদা পুরানো দেশ পত্রিকা কিনে ময়মনসিংহে ফেরার পথে গাড়িতে বসেই লতিফ পত্রিকাগুলোর পাতা উলটাচ্ছিল। হঠাৎ বিকাশ গায়েনের একটা কবিতায় তার চোখ আটকে যায়, যেটা ও আগে কোথাও পড়েছে বলে মনে হয়। কীভাবে সম্ভব? ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ে যে, গাউসুর রহমানের নামে যে কবিতাটা লতিফ প্রেসক্লাব-প্রকাশনায় পড়েছিল, সেটির সাথে এর একটা মিল থাকলেও থাকতে পারে। বাসায় গিয়ে দুটো কবিতা মিলিয়ে লতিফ তার সন্দেহ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। এরপর শহরে খবরটা রাষ্ট্র হয়ে গেলে গাউসুর রহমান জানান, তিনি কবিতাটা দেশ-এ ছাপতে পাঠিয়েছিলেন। ওখান থেকেই এটা চুরি হয়েছে। কিন্তু তিনি যাই বলুন, ওখানকার সবাই নানা কারণে বুঝে নিয়েছিল যে, গাউসুর রহমানই বিকাশ গায়েনের কবিতাটায় হাত চালিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এখানে কে কারটা মেরেছেন, আমরা তা বিশেষভাবে তলিয়ে দেখতে যাই নি। কাজেই সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিতও নই। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত যে, যে-ই মারুন, কাজটা ছিল নিন্দনীয়।
সম্প্রতি তরুণ কবি শিমুল সালাহদ্দিনের নামে ফেসবুকে কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে যে, তাঁর ‘তোকে অনু, তোকে’ নামক দীর্ঘকবিতাটিতে প্রতিভাস থেকে প্রকাশিত কবি সুমন গুণের অন্যমনস্ক ও রূপবান নামক বইয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। অভিযোগকারী শিমুলের কবিতার পাশে সুমন গুণের কবিতার উল্লেখ করার পর কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিষয়, শব্দ ও বাক্যে দূরান্বয়ী সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। কালেকটিভ আনকনশাসনেসের কথা তুলে শিমুল তাঁর ওপর অর্পিত সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং জানান তিনি কখনো সুমন গুণের কবিতা পড়েন নি পর্যন্ত। উপলব্ধির ঐক্য দুটো ভিন্ন ভূগোলে অবস্থিত দুজন শিল্পীর শিল্পকর্মে কোনোভাবে লক্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে না, এরকম বলবার কোনো সুযোগ নেই। এমনটি হামেশাই ঘটে; কিন্তু এক্ষেত্রে কোনটা ঘটেছে, আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না।
উল্লিখিত তিনটা ঘটনাই পরস্পর থেকে আলাদা। তিনটিকেই আমরা অপরাধ হিসেবে নিলেও স্বীকার্য যে, একটি আরেকটির সমগোত্রীয় নয়। শিমুলেরটিকে যেখানে অপরাধ হিসেবে না-নিলেও চলে, সেখানে নিউটনেরটা অমার্জনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এবার অন্যরকম একটি ঘটনার কথা বলা যাক : আমাদের এক কবিবন্ধু বিস্তর পাঠ করত। পাঠে পাঠে যে চিত্র-সৌন্দর্যময় বিরল শব্দের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হতো, তাকে সে পিক আপ করত ও সেই শব্দকে কসাইয়ের দোকানে খাসির উরু ঝুলিয়ে রাখার মতো করে নাকের ডগায় কিছুদিন ঝুলিয়ে রেখে ভাবতে থাকত। ঝুলতে ঝুলতে ওই শব্দদোলনটি একসময় একটি স্বাধীন কবিতার দিকে যাওয়া-আসা শুরু করত। আমরা মানি, কোনো ভাষার কোনো শব্দই কোনো লেখকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এমনকি নিজে শব্দ তৈরি করে নিলেও তা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয় না। তৈরি করা শব্দটি যখন অন্যেরা ব্যবহার করে, তখনই বোঝা যায় যে ওই বিশেষ শব্দটি ভাষায় কার্যকর জায়গা পেল। অন্যথায় মৃত সন্তান প্রসবের মতো ব্যাপার হয়ে ওই জন্ম বেদনাই বাড়ায়। কাজেই আমাদের বন্ধুর এই কবিতাভিযানকে দোষ দেবার কোনো সুযোগ নেই। খুবই নিরাপদভাবে প্রভাবিত হবার একটা শৈলী এটা। কিন্তু বন্ধুটি যখন পূর্বে পাঠ করতে গিয়ে তাড়িত হয়েছিল, এমন কোনো কবিতাপঙক্তি একসময় নিজের পঙক্তি হিসেবেই লিখে বসতে থাকল, একই অর্থে একই লক্ষ্যে কেবল শব্দবিন্যাস ১০-১৫ শতাংশ আলাদা করে, তখন আমাদের কাছে তাঁকে বিশেষভাবে অনিরাপদ মনে হয়েছিল। তখন তাঁকে একথা বলা প্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল যে, সাবধান হও বন্ধু, সাবধান হও।
আমরা অঁদ্রে জিদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আঁদ্রে মোরোয়ার বিপরীত প্রান্তে দাঁড়ানো অবস্থায় জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ারকে এ ব্যাপারে আমাদের মতোই উদ্বিগ্ন দেখতে পাই। ‘গ্রন্থরচনা ও রচনা-রীতি’ নামক প্রবন্ধে তিনি লেখকের শ্রেণিভেদ করতে গিয়ে এক ধরনের লেখকের কথা বলেন, ‘যাঁহারা লিখিবার পূর্বে নিজেরা কোনো চিন্তা করে নাই; হয়, কবে কি দেখিয়াছে বা শুনিয়াছে তাহাই ব্যাখ্যান করে, নয়, সরাসরি অপর লেখকের লেখা হইতে তাহাদের চিন্তা সংগ্রহ করে।...ইঁহারা, নিজেদের চিন্তার খোরাক বা প্রেরণার জন্য অপরের চিন্তার উপরে নির্ভর করেন। এইজন্য ইঁহারা কখনও পরের প্রভাব এড়াইতে পারেন না, ইঁহাদের রচনা সম্পূর্ণ মৌলিক হইতে পারে না।’
এইরূপ অমৌলিক রচনার প্রাদুর্ভাব থেকে আমরা মুক্তি চাই। দিকে দিকে তেমন রচনার প্রাচুর্য তৈরি হোক, যা পাঠকদের অভ্যস্ততায় নেই। প্রথমে নাক সিঁটকালেও পড়তে পড়তে পাঠকগণ একসময় ওই নতুনে অবগাহন করবেনই করবেন, দুদিন আগে কিংবা পরে, যদি রচনায় কোনো সারবস্তু থেকে থাকে। সাহিত্যের সুস্বাস্থ্যের জন্য এটাই বিশেষভাবে মঙ্গলজনক। অর্থাৎ অন্যের গোলাঘরে হামলা না-চালিয়ে নিজের অন্তর খুঁড়বার শক্তি, রুচি ও সাহসে বলীয়ান লেখক দরকার আমাদের। অবশ্য বলে রাখা ভালো যে, এ দিয়ে কিছুতেই আমরা পাঠাভ্যাস রহিত হতে বলছি না। পাঠ আরো বাড়লেই বরং মৌলিকত্বের সম্ভাবনা বাড়বে। দরকার নিজের কাছে সৎ কলমচি, যার কাছে স্বীকরণমাত্র গ্রহণীয়, অনুকরণ কিংবা চুরি নয়। স্বীকরণ শক্তির তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহারে সক্ষম ব্যক্তিদের আমরা দোষারোপ করব না, তবে স্বপ্রতিভার ঔজ্জ্বল্যে নতুন আকাশ-মাটি গড়ে তুলবেন যেসব লেখক তাদের বেশি করে সম্মানিত করব। সেরকম লেখকের আধিক্য আমাদের মনে আশা জাগাক, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য লাভ করুক শ্লাঘনীয় মহিমা।
দাঁড়াবার জায়গা
- কাব্যতত্ত্ব : এরিস্টটল, শিশিরকুমার দাশ অনূদিত, প্যাপিরাস ১৯৭৭, কলকাতা
- সাহিত্যে প্রভাব, অঁদ্রে জিদ, তিনটি ফরাসি প্রবন্ধ, মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ সম্পাদিত ও অনূদিত, পড়–য়া ২০০৭, ঢাকা
- লেখকের শিল্প-কৌশল, আঁদ্রে মোরোয়া, লেখার শিল্প লেখকের সংকল্প, মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম ও হামীম কামরুল হক সংকলিত ও সম্পাদিত, সংবেদ ২০১১, ঢাকা
- গ্রন্থরচনা ও রচনা-রীতি, আর্থার শোপেনহাওয়ার, লেখার শিল্প লেখকের সংকল্প, মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম ও হামীম কামরুল হক সংকলিত ও সম্পাদিত, সংবেদ ২০১১, ঢাকা
- সাহিত্যবিচার, সাহিত্যের পথে, রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড), ঐতিহ্য ২০০৪, ঢাকা
- সাহিত্যে কুম্ভীলকবৃত্তি, দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে, রেজাউল করিম সুমন, আর্টস বিডিনিউজ২৪ডটকম ২০০৮, ঢাকা
- ইঙ্গ-মার্কিন কবিতায় আধুনিকবাদ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, একবিংশ, ২৫ বছর পূর্তি সংখ্যা, ফেব্র“য়ারি ২০১০, ঢাকা
- কবিতাপ্রেমীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হোন, কৃশ অ্যাডামসের নোট, ফেসবুক ২০১০
Wednesday, November 30, 2011
স্নান, ঈশ্বর ও অনীশ্বরে
ঈশ্বরের কোনো ধর্ম নেই : মহাত্মা গান্ধী
পড়ছিলাম ঈশ্বরবিষয়ক বিপ্রতীপচিন্তা, কুমার চক্রবর্তীর প্রবন্ধ মায় দর্শনগ্রন্থ। নানা বিষয়ে আমাদের দেশে সরল চিন্তারই যেখানে প্রকট দৈন্য, সেখানে বিপ্রতীপচিন্তার সাক্ষাৎ কালেভদ্রেই মিলবার কথা। যদিও ঈশ্বর বিষয়ে আদি ও অকৃত্রিম মডেলের রেডিমেড চিন্তার কমতি নেই। এসবের আর নবায়ন হয় নি, নবায়ন বৈধ নয় বলে। একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা। সময়কে, সময়ের অর্জনকে ওই বিশেষ চিন্তার সাপেক্ষে সমন্বয় করে দেখবার সুযোগ ও সাহসের অভাবে একটা গৎই কেবল প্যাঁচানো হয়ে চলেছে কালে কালে। এহেন গৎপরিসরে এ বিষয়ক বিপ্রতীপচিন্তা বিশেষভাবে আগ্রহজাগানিয়া।
যাকে এ গ্রন্থে ঈশ্বরবিষয়ক বিপ্রতীপচিন্তা বলা হচ্ছে, তারও বেশ বয়স হয়েছে, এ কারণে ঝুঁকি থাকে এখানেও বয়সী গাধাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাবার। এ গ্রন্থ পরিসরে তা-ই করা হয়েছে, নাকি খুঁজে দেখা হয়েছে নতুন চিন্তার কোনো জানালা-দরজা, সেটাও বিবেচ্য বটে। গ্রন্থের কর্মপ্রবাহ সরল ঈশ্বরবিশ্বাসের বিপরীতে বয়ে চলা চিন্তাপ্রেক্ষিতকে ঝাড়েবংশে পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং এসবের সাপেক্ষে নিজস্ব চিন্তার বয়ান হাজির করবার প্রয়াসে পরিকল্পিত, যে কারণে একই যাত্রায় দুই ভিন্ন স্বাদের রেখা উন্মোচিত। এই স্বাদ কেমন স্বাদ, তা-ও ক্রমপ্রকাশ্য।
পরিবার ও সমাজজীবনে সতত উপস্থিত একজন মানুষের নিয়মিতই নানা ধারার কাজ-আকাজ চাই কি কাম-আকামেও যুক্ত হতে হয়! এ নিবন্ধকারেরও তার থেকে মুক্তি নেই। এসবের মধ্যেই মাঝে মাঝে বইটির ভেতরে ঢুকি আবার বেরিয়ে যাই, বেরোতে হয় বলে। ১৬০ পৃষ্ঠার নিরস (ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরসম্পর্কিত কোনো বিষয়ই কোনোকালে সরস ছিল না) জিনিসের মধ্যে জগজ্জীবন ভুলে ডুবে থাকা তো যায় না! যাওয়া সংগতও নয়। কিন্তু মুশকিল হলো আমি বেরোলেও মাথা থেকে ঈশ্বরমশাই বোরোন না। এহেন নাছোড় এক অতিথিভার মাথায় নিয়ে ঘুরেফিরে যখন আমি ভীষণভাবে ক্লান্ত, তখন এক গোধূলি-আঞ্জামে চন্দ্রিমার ভাঁজে ভাঁজে হাঁটতে গিয়ে বদখত এক বমনোদ্রেকাকুল অনুভূতির সাথে দেখা হয়ে যায়। কোনোভাবেই যখন একে রহিত করা গেল না, তখন উদ্যানের স্বল্পালোয় (এ আলো-স্বল্পতার কারণ সামাজিক নয়, রাজনৈতিক) করা গেল বমনায়োজন। দেখতে দেখতে গলগলিয়ে নেমে গেল অনেকানেক ভার। লিখিত হলো,
ঈশ্বর ব্যাপারটা মোটমাট একটা ডালিমফুলের মতো, দূর থেকে মনোহর লাগে, কাছে গিয়ে নাকে নিলে গন্ধ নেই, কাজেও লাগে না কোনো, হাতে নিয়ে টিপে দিলে কাঁদে না কাটে না, টিকে যায় ঝড়ে ও ঝঞ্ঝায়, একান্ত চাইলে বিনাশও করে ফেলা যায়, তবু ডালিমফুল ও তার ছায়ার মহিমাগান লিখেলিখে জগতের সমস্ত কাগজ ভরে ফেলছে কিছু কবি, লিখছে যশোপ্রার্থীরাও, জগৎভরা ওইসব ট্র্যাশে ভেসে জলবায়ু বদলের কথা ভেবে নাস্তানাবুদ লাগেওকে, ওই মনোহর ডালিমফুলকে নষ্ট করতে যদি চাই, ভারা ভারা সময় নষ্ট হয়, উচ্চমূল্য পরিশোধ করেও শেষে বিনিয়োগ মনে হয় অকারণ, যার কোনো ভূমিকাই থাকে না কারো জীবনধারণে, অথচ সময় এখানে বিকোনো যায় বিপুলার্থ দামে, সময় এখানে এক আশ্চর্য সূর্যকুসুম, যার তাপ শক্তিনাচন দেয় পৃথিবীতে, চাকাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনে, কাগজে কাগজে জাগে কলম চুইয়ে নামা কালির মিছিলযেকোনো অনর্থকে জড়িয়ে মূহ্যমান হয়ে গেলে অর্থের ঢেউ এসে দুয়ারে দাঁড়ায়, যেজন মনের নদী সাঁতরে পার হতে গিয়ে পত্রপাঠ ডুবে মরে, তার সব হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন স্বর্গের হুরেদের হাতপাখা হবে, তার তার বেদনার অশ্রুপ্রবাহ হবে স্বর্গের ঝিরিঝিরি নদী, এইসব বলাবলি ঈশ্বরের বাণীবিতরণের মতো মাংসল কল্পনা বলে মনে হয়ক্ষয় যত বড়ো হয় একটি পৃষ্ঠায় তত কম শব্দ ধরে, এ হিসেব শব্দ নিয়ে ব্যস্ত থাকা কাজিদের দিনকার কাজ, এসব জ্ঞানেই তারা চাষ করে খেয়ে যায় জগতের মাঠ, ব্রহ্মানাম বা তসবি জপে এইটুকু করে খাওয়া চলে না, এত বড়ো দুনিয়ার সবস্থানে থেকে তিনি না-থাকার ভূত হয়ে ধোঁকা দিয়ে যান, থাকা না-থাকায় ওই ঝুলে দেখি নামটাই দৃশ্য কেবল, এর বেশি স্পর্শ অতিরেক, এর বেশি থাকাটারে মন দিয়ে চোখ দিয়ে বুঝি নাস্বর্গীয় সেবক হয়ে আয়োজন করে যদি দেন তিনি সিগারেট খাওয়া, তবে এই আলাপের রং যায় আনদিকে ঘুরে, কথা বলে জেনে নেয়া যায় তার কোনখানে যাতায়াত বেশি, কোন টোলে পড়াশোনা, কতদূর জগৎ চিনেছে আর বড়ো হয়ে করে খেতে চায় কার দাস হয়ে, কোন হাতিয়ারে তার শুরু হবে নিতি সংগ্রাম
আমার কিছুই নাই এটা যদি তার লাগি হয়ে থাকে, আমার সকলি আছে তার লাগি এটাও তাহলে হোক, যদি সেটা করা রেখে আচানক বাণী দিয়ে ঠেলে দেয় ফাঁকিপুর স্টেশনের দিকে, তার নামে কেন তবে বায়ু গুণে যাবো, কাজ রেখে কাম রেখে আকামের বাঁশি শুনে লোকজন হুঁশ হারায় আনাচে কানাচেম্যালাদিন জল দিল নদী, সাগরদুহিতা ভেবে তারে যদি শুরু করি ধূপধূনা দেয়া, তবুও শুকাবে জল, সাগর শুকায়ে যায় এইকথা কবিতায় আছে, এ কারণে মাঝে মাঝে কবিতাকে মনে হয় ঢের বেশি বলের ধারক, যখন যেভাবে চায় সেইখানে সেটাই বানিয়ে নেয় কবি, ঈশ্বর কখনোই এইমতো পারে না দেখাতে করে হাতে ও কলমে, ঐশীপুস্তকগুলো তবু পারেঈশ্বরের হাত আছে পা আছে মাথা আছে এরকম কল্পনা করেছে কিছু লোক, যার যত জানাবোঝা দেখাশোনা সেরকম করে ভাবে সকলেই, তবে এরকম কথা কেউ ভাবে নাই তার হাতে কলম আছে কি না, তার হয়ে লেখালেখি করে দিতে লোক রাখা আছে, নিজে তিনি করেছেন এইকথা কোনোদিন প্রমাণ করতে চেয়ে কোনো লোক করে নি সময় ব্যয়, এইখানে এসে যদি ঝেড়ে কাশি : লিখতে পারেন না তিনি, ঝুরঝুরে আস্থা দিয়ে ডালপুরি না-বানিয়ে ধরে এনে দেখাবে কিছু লিখে এজলাসে, মনে হয় কোনোদিনই ইরকম হবি নাইঈশ্বর-নামাঙ্কিত তালমিছরি আমি ছোটোকালে খেয়েছি প্রচুর, পরে আর কোনোদিনই করে নি ইচ্ছে ফিরে খেয়ে দেখি, ইচ্ছাবিরুদ্ধ এই মদে ডুবে কী কারণে মাতাল বিভোর হয়ে পথে ঘুরে ট্র্যাশ দিয়ে গিগাবাইট গিগাবাইট স্থান খেয়ে যাব, নিজের তৈরি করা এক কিলোবাইট যদি বিনাকাজে খুন করে রক্ত মাখিয়ে আমি লেজে ও গোবরে করে ক্লিশের পিছনে গিয়ে দাবড়ে বেড়াই, এই দাবড়ানো তবে অটো-আনট্যাগ হবে ডিজিটাল যুগেভার্চুয়ালি তারে ছোঁয়া যায়, ধরা যায়, খাওয়া যায়, জানালার ওইপাশে চাই কি ক্রিয়াদের খেলা দেখা যায়, তারে পিডিএফ করা যায়, পাওয়ারপয়েন্ট, রংচঙে প্রেজেন্টেশন প্রোজেকশনে গেলে মনে হয়, এই বুঝি পাশে বসে শুনিতেছে তিরতির বাকধ্বনি, কলের পুতুল যেন কিচিমিচি ছাড়া আর বড়োবেশি রেইচেই করে নামধ্যখানে ভেঙে যাওয়া মানুষের পাশে যদি না-দাঁড়ায়, ডাল ভেঙে প্রতি ভোরে মেসওয়াকে মেসওয়াকে ঈশ্বরগাছে, আমার কি দন্তরঙ্গি হবে, গোসাঁই বাতাসে হাঁটে, গোসাঁই আগুনে যায়, গোসাঁই বাগানে ফুটে, তরীদের লালপাল ধারে নিয়ে বাতাস মহানে যারা গোসাঁইয়ের পালিয়ে যাওয়াটাকে দেখে নাই, চোখলাল ক্ষুধার্ত মানুষের ধমকের কাছে তারা পুরোটা অলীকঈশ্বরকে জরুরি ভেবে যদি প্রেমিকার চেয়ে, ঠেলে দেই মগ্নতা ওইদিকে, তবে দেখি বেশিদূর যায় না এগোনো, প্রেমিকা যা দিতে পারে, পারে সেটা ঈশ্বরও, নগদানগদি, যেকোনো মুড অব পেমেন্টে, এরকম কথা আমি শুনি নাই, তার সব বাকি মাল, বাকি ব্যবসায়ী, জগতে কথা আছে প্রচলিত ‘বাকি মানে ফাঁকি’, সমুদয় ‘বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী’ সম্প্রদায়ে এই কথা রটে গেছে, এরকম কথা তুমি আতশিকাচের চোখে তাকালেও দেখে যেতে পার, এইমতো প্রেক্ষাপটের চোখে চোখ রেখে তুমি যদি বিষমতা ভাবো, দেখবে কেমন তিনি নিজের প্রভাব দিয়ে তার দিকে জরিপাগ্রহটাকে বেঁধে রাখে, বিপরীতে লাল চোখ গড়ে যায় অলঙ্ঘ প্রাচীর এক নিরুৎসাহ ইটেনয় একে নয় আর দশ একে দশ গুনে দিন গেলে পরিপাশে গ্লানির পাহাড় জমে, ভয়ের যোনির ঘ্রাণ ভেসে এসে ঘুমের গভীর থেকে ডাক দেয়, পকেটে টিয়া পুষে দূরে দূরে থেকে যাওয়া অন্যায্য বাহানা করা, জগতে এমন ভয় থেকে গেছে, যার ভয়ে ঈশ্বরভয়গুলো পালিয়ে গিয়েছে ফেলে সুনন্দ বাড়ি, ওই খাঁটি তীরে তবু ভয়নদী সাঁতরানো ঈশ্বরাশায়
এ পর্যায়ে কষে ধমকিয়ে নিজেকে সামাল দেই। মনে হয়, একটু বুঝি বেশি হয়ে গেল! বেশি যদি হয় তাকে বেশি ভেবে কম খেলে হতে পারে। আমার যা কাজ সেটা পরিবেশনায়, এ পর্যায় মনোযোগ দাবি করে মান রাখা খাদ্যাখাদ্যের আর কিছু থালাবাটি ধোয়া ও মোছায়। কম আলোতে সেখানেই স্থির থাকি নিজ মতি নিয়ে।
২.
সব শিশুই নাস্তিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করে থাকে। জন্মগতভাবে ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই থাকে না-- দার্শনিক ডি’হোলবাখের এই মতকে প্রথমত বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এ গ্রন্থে সংগৃহীত ও পত্রস্থ নানামুখী আলাপোদ্ধৃতি থেকে বুঝতে পারা যায় যে, এ বাক্যকে বিশ্বাস করা ঝুঁকিমুক্ত নয়। জন্মের সময় শিশুর মধ্যে বিশ্বাস যেমন থাকে না, তেমনি থাকে না অবিশ্বাসও। কাজেই এর কোনো একটিকে বড়ো করে দেখাবার কোনো সুযোগ নেই। কথা বলা যায় বরং এখানে যে, ধারণাগতভাবে ডান-বাম দুদিকেই শূন্য খাঁ-খাঁ মনোক্যানভাসধারী শিশুদের ব্যক্তিক, পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে বিশ্বাস তথা আস্তিকতার ধারণা দেয়া হয়। ধারণাকে বিশ্বাসে রূপ দিতে ও চর্চায় আনতে ভয়ঙ্করতা কপচিয়ে নরকজুজু ও অশ্লীলতা মাখিয়ে স্বর্গপ্রলোভন দেখানো হয়। এইভাবে একমুখী ক্রিয়ার প্রকোপে আস্তিকতা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ভিত্তি গেড়ে বসে। ওই গাছের নিচে মিথ্যা বল নিয়ে খেলতে খেলতে শিশুরা বড়ো হয়ে ওঠে। এ বিবেচনায় বরং বলা যায় শিশুরা শৈশবে সাধারণত আস্তিকই থাকে। যারা ঈশ্বরের সঙ্গে মিশে বাকাবিল্লা হয়ে যান, সংশয়বাদী হয়ে বিভ্রান্তি জপ করেন, অবিশ্বাসী বা নাস্তিক হয়ে দ্যুতি ছড়ান, তারা তা হন স্বেচ্ছায়, পরে, সচেতনভাবে। তার মানে দাঁড়ায় এই যে, বিশ্বাসী হওয়া সহজাত সামাজিক প্রবণতা, আর অবিশ্বাসী হওয়া মস্তিষ্কের দোষ বলে অর্জনসাপেক্ষ; এবং কিছুটা অসামাজিকও। মজাটা এখানে যে, এতদসত্ত্বেও, ঠিক জন্মমুহূর্তে যে শিশুরা ঈশ্বরহীনও থাকে, এ তথ্য মিথ্যা হয়ে যায় না। তা নইলে শিশুর কাঁধে ঈশ্বরের ভার চাপাতে সমাজসংসারে যে সচেতন কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তার ভূমিকাকে খাটো করে দেখা হয়।
তো, মানুষ কেন অবিশ্বাস বা নাস্তিক্য অর্জন করে বা করার প্রয়োজন বোধ করে? উত্তরটা ইঙ্গিত করবে হয়ত জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজে না-পাওয়াকে। আবার সেটা হয় কতকটা এ সমাজ তাকে প্রয়োজন বোধ করায় বলেও। কীভাবে? এ ব্যাপারে বাস্তব গল্প হাজির করা যায়, কবি শেলী এক চিঠিতে তাঁর একটি উপলব্ধির কথা বলেছিলেন : পরমেশ্বরের মহান প্রকাশ হিসেবে খ্রিষ্টধর্মের যাথার্থ্য সম্পর্কে বালকমনেই আমার সন্দেহের উদ্রেক হয়। খ্রিষ্টীয়বাদ আবির্ভূত হয়েছে গ্রিক ও রোমের প্রতিভাবানদের জ্ঞান ও গুণাবলির নির্যাস থেকে, অথচ সক্রেটিস ও সিসেরো ধ্বংস হবে আর আধুনিক ইংল্যান্ডের হীন-পশ্চাৎগামীরা পরজীবন লাভ করবে, কীভাবে? তারিক আলী তাঁর ক্লাস অব ফান্ডামেন্টালিজম গ্রন্থে বলেন : যখন পরিবারের সদস্যরা ঈশ্বরের ভয়ে ভীত হয়ে তাঁকে বলতেন যে, এ কাজ করলে বা না-করলে ঈশ্বর তাঁকে শাস্তি দেবেন এবং বাস্তবে দেখা যায় যে শাস্তি আসে না, তখন তাঁর মনে ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে সন্দেহের জন্ম হতে থাকে। এই দুটো ক্ষেত্রেই জিজ্ঞাসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অধিকন্তু, দ্বিতীয় ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবার ও সমাজ মিথ্যাচার করে তাঁকে ওই পথে ঠেলে দিয়েছে। এসব ঘটনা এ গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে নানারকম বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দৃষ্টান্ত হাজির করতে গিয়ে।
আমরা জানি, গ্রন্থটিও জানাচ্ছে যে, ঈশ্বরে অবিশ্বাস মানেই নাস্তিকতা নয়। সংশয়বাদ ও অজ্ঞেয়বাদ থেকে নাস্তিকতার একটা দূরত্ব আছে, তা যত ক্ষীণ বা দীর্ঘতরই হোক, যে দূরত্ব চিহ্নিত হয় ধারণাগত অবস্থান দ্বারা। ধরা হয় সংশয়বাদ নাস্তিক্যবাদের পূর্বাবস্থা তথা ঝুলন্ত অবস্থা, আর অজ্ঞেয়বাদ যৌক্তিক প্রমাণ ছাড়া যেকোনো কিছুকে বিশ্বাসে অনাগ্রহী। একই তীর্থের এরা যেন ভিন্ন ভিন্ন ঘাট। এই দুই ঘাটেই মানুষের ওঠানামা আছে, দূর থেকে তাকিয়ে থাকা আছে, ঘাটদ্বয়ের নামে প্রমাদ গোনা আছে। এইসব মিলিয়ে জগৎসাধন, যেখানে ধারণাগতভাবে কোনো না-কোনো আঙ্গিকে আছে তার নাছোড় উপস্থিতি, হ্যাঁ-এ কিংবা না-এ। জগৎমানসকে ভাবিয়ে মারার এ যেন এক অনাবশ্যক ফাঁদ, যত্রতত্র পাতা!
আস্তিকতার গতিপ্রকৃতি বর্ণনা এ গ্রন্থের বিষয় নয়, তবে বিশ্বাসীরা অবিশ্বাসীকে কীভাবে দেখেন ও মূল্যায়ন করেন অংশত তার ছবিও এখানে লভ্য। এতে লাভ হয়েছে। কারণ এ ছবি নিরীশ্বরতা বা নাস্তিকতাকে দেখবার সমাজভঙ্গিকে সংজ্ঞায়িত করে। লন্ডন ম্যাগাজিনের একটি জনপ্রিয় রচনায় একজন আস্তিক জগতে সত্যিকারার্থে কোনো নাস্তিক আছে কি না সে সংশয় থেকে লিখেন : অনুধ্যানী নাস্তিক, আমি মনে করি অসম্ভব; নাস্তিক হিসেবে যারা নিজেদের চিন্তা করে তাদের অধিকাংশই তাদের অলসতার জন্যেই এরকম ভেবে বসে, কারণ তারা এ ব্যাপারে সময় ও যুক্তি দেয় না নিজেদের। তারা যে এরকম তার কারণ তাদের ভাবের চাপল্য, চিন্তার ফলাফল নয় এই নাস্তিকতা। কিংবা এখানে টমাস ব্রাউটনের কথাও বলা যায়, যিনি বলেছেন : সন্দেহ করার জায়গা আছে যে, আসলেই এমন চিন্তাশীল মানুষ আছেন কি না যারা ঈশ্বরে অবিশ্বাস বিষয়ে সত্যিকার অর্থেই নিজেদের যৌক্তিক করেছেন। এ সবই নানারূপ যুক্তি ও পালটা যুক্তির অনুশীলন। কোনো স্বতঃসিদ্ধ বা অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত নয়, বস্তুত। তবে এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে নাস্তিকদের নিজেদের আরো শাণিত করে তুলবার প্রয়োজনীয়তাটা অন্তত এহেন তর্কপ্রেক্ষিতে সামনে চলে আসে। নইলে বিশ্বাসের শিকড় উপড়ানোর তাদের সাধনপথ কানাগলিতে পথ হারিয়ে বসবে।
এসব বাদানুবাদ আজকের নয়। হাজার হাজার বছর আগের। এর পরেও এরকম লক্ষ লক্ষ বাদানুবাদ হয়েছে, যদিও সেসবের উপস্থিতি এখানে নেই। থাকা সম্ভবও নয়। যাই হোক, এ পরিসরে যা বলতে চাচ্ছি তা হলো, আস্তিকতার সাথে নাস্তিকতার বা নাস্তিকতার সাথে আস্তিকতার সঙ্গমে কোনোদিনই কোনো অর্গাজম হয় নি! নিরানন্দময় ঝগড়া বিবাদ হয়েছে। মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়েছে। মারামারি কাটাকাটি হয়েছে। তত্রাচ, মীমাংসা হয় নি। ঈশ্বর নিয়ে চিন্তা করে কথা বলে বিতর্কে মেতে যুদ্ধবিগ্রহে ডুবে মানবসমাজ হাজার হাজার বছরে এত শক্তিক্ষয় করেছে যে, এই শক্তি একটি অভিন্ন লক্ষ্যে প্রয়োগ করা হলে, কে জানে, মানুষ এতদিনে অনার্জিত অনেক কিছুর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের করায়ত্তে নিয়ে নিতে পারত!
এ দুয়ে মীমাংসা নেই, কোনোদিন হবেও না। কোনো পক্ষই চূড়ান্তভাবে তাদের মতকে প্রমাণ করতে পারে না, ঈশ্বর এমন এক ধাঁধা। দুইই লড়াই করে নিজেদের বিশ্বাসের (অবিশ্বাসও এক ধরনের বিশ্বাস) বলে, কিছুতেই নিজ অবস্থান থেকে সরে আসা যাবে না এরকম দৃঢ়তায়। এর কোনো মধ্যবিন্দু নেই। বড়োজোর আছে কেবল ‘তুমিও থাকো আমিও থাকি’ জাতীয় একটা পারস্পরিক বোঝাপড়া। আত্মিক মিলন নয় এটা, এক ধরনের সামাজিক সহাবস্থান-সহায়ক চুক্তি। খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মুক্তসম্ভাবনা-সম্বলিত মানবজাতির সর্বোচ্চ সভ্য এলাকা, বলেছেন গিবন, তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব দ্য রোমান এম্পায়ার-এ। তখন এখানে নাকি দেখা গিয়েছিল সহনশীলতার সর্বজনীন উদ্দীপ্ততা। কারণ নানা মত ও বিশ্বাসের অপূর্ব এক সহাবস্থান দেখা গিয়েছিল সেসময়। ধর্মাধর্মযুক্ত বা বিযুক্ত হয়ে যেকোনোভাবেই হোক এরকম একটা সমাজ এক জীবনে অস্তিত্বশীল দেখবার বড়ো সাধ হয়!
ঈশ্বরের থাকা না-থাকা বিষয়ক দার্শনিক বিতর্কের কোনো সুরাহা না-হোক, চর্চার সংস্কৃতি এ বিষয়ে আমাদের নানা পথ দেখিয়ে চলেছে। সখ্য অসম্ভব জানিয়ে একেক পথ চলে গেছে একেক দিকে। এরকম একটা পথের প্রান্তে দাঁড়িয়ে উপলব্ধ হয় যে, শিল্প ও যান্ত্রিকতানির্ভর আধুনিক মানুষের একটা বড়ো অংশের জীবন থেকে ধর্ম ব্যাপারটা অনিবার্যক্রমে উধাও হয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা এখন আর ঈশ্বরের থাকা না-থাকায়ও থেমে নেই, বরং ধর্মের থাকা না-থাকা পর্যন্ত ভিড়ে গেছে তরী। অধিকন্তু, ধর্মের থাকা না-থাকাতেও বস্তুত কিছু আসছে যাচ্ছে না এসব মানুষের, ইহজাগতিক যাপন পরিসরে তারা এর কোনো অনিবার্যতাই খুঁজে পাচ্ছে না কোনোভাবে। এ প্রেক্ষাপটে যৌক্তিকভাবে মনে হয় যে,
ক্রমহ্রাসমান ঈশ্বর ধারণা দিনে দিনে এক ফোঁটা স্বর্গীয় জলের রূপে টলমলাচ্ছে রৌদ্রালোকিত দিনের উদ্বাহু কচুপাতায়পড়ে গেলে শুষে খাবে মাটি, থেকে গেলে শুকাবে উত্তাপে তার ভিটামাটিসহ, তৃতীয় কোনো উদয়পথ খোলা নেই সমূহ নেতিসম্ভাবনা থেকে তার সুরক্ষা পাবারএকবিংশই ঈশ্বরের চূড়ান্ত বিলয় শতক
৩.
আলোচ্য গ্রন্থে প্রথম পর্বের প্রবন্ধগুলোয় (ঈশ্বরবিষয়ক বিপ্রতীপচিন্তা, ঈশ্বরবিষয়ক বিপ্রতীপচিন্তা : সক্রাতিসপূর্ব সময়, ঈশ্বরবিষয়ক বিপ্রতীপচিন্তা : সক্রাতিস-এর সময়, ঈশ্বরবিষয়ক বিপ্রতীপচিন্তা : হেলেনীয় যুগ, ঈশ্বরবিষয়ক বিপ্রতীপচিন্তা : রোমক-কাল) ঈশ্বরাবিশ্বাসসংক্রান্ত বিভিন্ন মতবাদ সম্পর্কে ধারণা দেয়ার পাশাপাশি পৃথিবীতে প্রচলিত প্রধান ধর্মসমূহ এবং প্রধান প্রধান ধর্ম ও দর্শনতাত্ত্বিকগণ এতদবিষয়ে কবে কোথায় কী মত দিয়েছেন তার একটি সার সংকলনের চেষ্টা করা হয়েছে। লক্ষণীয়, এতদপ্রক্রিয়ায় লেখকের ব্যবহার্য চশমাটি ছিল পাশ্চাত্য থেকে ধার করা, একইভাবে তাঁর দেখার ভঙ্গিটিও ছিল পাশ্চাত্যানুরক্ত। যে কারণে পৃথিবীর নাস্তিক্যবাদী চিন্তাসমূহের পরিচয় দিতে গিয়ে প্রাচ্যচিন্তার জন্য একটি বিশেষায়িত প্রবন্ধ রচনার প্রয়োজনও মনে করেন নি তিনি। কেবল সূচনা প্রবন্ধটিতে পাশ্চাত্যাচ্ছন্নতার ফাঁকে হাই তোলা বা আড়মোড়া ভাঙার জন্য পজ দেবার মতো করে দুবার মাত্র প্রাচ্যচিন্তায় হেলান দিয়েছেন। বলা যায়, এ-ও করেছেন খুব শ্রদ্ধা নিয়ে নয়। যেমন চার্বাক দর্শন সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলা হচ্ছে : চার্বাক দর্শনও বস্তুতান্ত্রিক ঈশ্বরবিরোধী দর্শন, এপিকিউরাসীয় দর্শনের সাথে এর মিল রয়েছে যা পার্থিব সুখবাদী নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। অথচ শ্রদ্ধা ও সচেতনতার সাথে এই অংশ লিখলে তাঁকে বাক্যটা ঘুরিয়ে বলতে হতো যে, এপিকিউরাসীয় দর্শনে চার্বাক দর্শনের প্রভাব শনাক্ত করা যায়। কারণ ধারণা করা হয় চার্বাক মতের প্রবক্তা বৃহস্পতির জীবৎকাল খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ শতাব্দী, বিপরীতে গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাস জীবিত ছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪১ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০ পর্যন্ত।
সূচনাপ্রবন্ধে বৌদ্ধধর্মকে তিনি এর অবস্থানগত জায়গা থেকে মূল্যায়ন করেন এইভাবে, যে, প্রাচীন ভারতে নাস্তিকতার কয়েকটি মাত্রিকতা পরিলক্ষিত হয় : বেদ-এ অবিশ্বাস পরলোকে অবিশ্বাস ও ঈশ্বরে অবিশ্বাস। এর মধ্যে অনেকে ছিলেন বেদ ও ঈশ্বরে অবিশ্বাসী কিন্তু পরলোকে বিশ্বাসী আর এই ধারারই উৎকর্ষ ও বিকাশ পরিলক্ষিত হয় বৌদ্ধ ও জৈন মতবাদে যেখানে ঈশ্বরহীন এক ধর্মের অনুপম উত্থান পরিদৃষ্ট হয় যা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য। পৃথিবী প্রথমবার বিস্ময়ে দেখল এক ধর্ম যা ঈশ্বরহীন বা ঈশ্বর-বিমুখ। এই মূল্যায়ন ঠিক এর পরই উলটে যায়। চার্বাক-মূল্যায়নের মতো একইরকম দায়সারাভাবে তিনি জানান দেন : ভারতবর্ষে এই নাস্তিকতার ধারা ব্যাপক হয় নি, বৌদ্ধরাও পরবর্তীকালে ঈশ্বরমুখী হয়ে গেছে। অথচ কথাটা সত্য নয়। গৌতম বুদ্ধের প্রয়াণের পর বৌদ্ধবাদের কোনো কোনো স্কুল ভক্তিবাদী হয়ে উঠলেও বেশিরভাগ স্কুল এখনো আদি নিরীশ্বরতারই চর্চা করে। এই ভক্তিও কোনো ঈশ্বর বা দেবতার প্রতি নিবেদিত নয়, বরং মানুষেরই প্রতি। কাজেই ‘ঈশ্বরমুখী’ কথাটা এখানে সত্যকে ছাড়িয়ে যেতে ইন্ধন দেয়। তাছাড়া মূল্যায়নটা ওইখানে এসে থেমে গেলে ভারতবর্ষে বৌদ্ধবাদের বিকাশ রহিত হওয়ার পেছনের রাজনৈতিক কারণগুলোকে আড়াল করা হয় এবং এটাও আড়াল হয়ে থাকে যে, প্রাচ্যের অনেক দেশে ব্যাপকভাবে এবং পাশ্চাত্যের কোনো কোনো দেশে নানারূপে এখনো বৌদ্ধ দর্শনের চর্চা জারি আছে। গ্রন্থকার পরে নিরীশ্বরতাপ্রশ্নে বৌদ্ধ মতবাদের সাথে হিন্দুত্ববাদের তুলনা করে বলছেন : একটি বিষয় তাত্ত্বিকভাবে হলেও যুক্তিতে টিকে গেছে যে, হিন্দুত্বে নাস্তিক্য দূষণীয় নয় বরং গীতার জ্ঞানমার্গের দর্শনে আশ্রিত। পৃথিবীর জীবন্ত কোনো ধর্মেই এ সুযোগ নেই শুধু হিন্দুধর্ম ছাড়া, একমাত্র একজন হিন্দু বললেও বলতে পারেন যে তিনি নাস্তিক। হিন্দুত্বে নাস্তিক্য দূষণীয় কি না সে আলাপ এখানে থাক। কিন্তু পৃথিবীর জীবন্ত কোনো ধর্মেই এ সুযোগ নেই শুধু হিন্দুধর্ম ছাড়া, একমাত্র একজন হিন্দু বললেও বলতে পারেন যে তিনি নাস্তিক-- এই কথাটা কীভাবে সঠিক, যেখানে তিনি কিছুক্ষণ আগেই বৌদ্ধধর্মকে নাস্তিক্যপ্রশ্নে পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য বলে শনাক্ত করলেন? তবে কি তিনি বলতে চান যে, বৌদ্ধবাদ ভারতে প্রায়-প্রত্নবস্তু হয়ে গেছে বলে এবং ১৯৫১ সালের হিসেবে ৫২০ মিলিয়ন অনুসারীর বিবেচনায় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ধর্ম আজ তার অবস্থানচ্যুত হয়েছে বলে সারা পৃথিবীতেই এটা অচর্চিত? তা তো নয়। সরাসরি অনুসারীদৃষ্টে এখনো এর অবস্থান জীবিত ধর্মগুলোর মধ্যে চতুর্থ স্থানে। তাছাড়া বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক মিশ্রণ ঢুকে গেছে তাওবাদ, কনফুসিয়বাদ, শিন্টো, পূর্ব ও পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী ধর্ম, শামানিজম ও সর্বপ্রাণবাদে। এতদাঞ্চল ও ইউরোপের কিয়দংশে জেনবাদও তো বৌদ্ধধর্মের একটা স্কুল হিসেবেই চর্চিত হয়। লেখকের উল্লিখিত মন্তব্যটা আরেকটা প্রশ্নেও যে ঠিক নয়, রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতো বিশিষ্ট বৌদ্ধ নাস্তিককে সামনে আনলেই সেটা প্রমাণিত হয়, যিনি বুদ্ধের প্রতীত্যসমুৎপাদ দর্শনের ভেলায় চড়েই মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে উপনীত হতে পেরেছিলেন।
সত্য থাকেন যুক্তি নামের রোদে, তার থেকে বিচ্ছুরিত আলোমালা, দিকনির্ণায়কহীন মুক্ত কাঠে গড়া চিন্তারূপ নৌকার গলুই, প্রতিবারই নিয়ে যায় আনকোরা পথে
৪.
গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বে মোট চারটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে : মরমি সত্তার গান, ভাবনার অন্তর, শূন্যতার চিত্রকল্প ও ভাবনাবিন্দু। নামগুলো সাক্ষ্য দেয় এগুলো এমন কিছু দেবার জন্য প্রস্তুত, প্রথমপর্বে যার সাক্ষাৎ মেলে নি। আগের পর্বের প্রবন্ধগুলো যেখানে তথ্যভার বইছে বেশি, এ পর্ব হয়ত বইবে অন্তরাগুন। সে আগুন কমবেশি আছে এখানে। কিন্তু এ প্রসঙ্গিত আলাপেও লেখকচৈতন্য বিশিষ্টজন ও মতের চিন্তার জালে এমনভাবে বন্দি যে, ওসবের ফাঁকে নিজস্ব চিন্তা পাখা মেলবার পরিসর ও অবকাশ কমই পেয়েছে, মনে হয়। এটা আরো একটা কারণে হয়ে থাকতে পারে, তা হলো প্রবণতা, অন্য কারো কাঁধে ভর না-দিয়ে দাঁড়াবার অনাগ্রহ; যদিও এটা এখানে স্বতঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে স্বাধীনভাবে দাঁড়াবার সক্ষমতা এ লেখক ধারণ করেন। ফলত, বলাই যায় যে, পাঠক প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয় নি।
গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বে মোট চারটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে : মরমি সত্তার গান, ভাবনার অন্তর, শূন্যতার চিত্রকল্প ও ভাবনাবিন্দু। নামগুলো সাক্ষ্য দেয় এগুলো এমন কিছু দেবার জন্য প্রস্তুত, প্রথমপর্বে যার সাক্ষাৎ মেলে নি। আগের পর্বের প্রবন্ধগুলো যেখানে তথ্যভার বইছে বেশি, এ পর্ব হয়ত বইবে অন্তরাগুন। সে আগুন কমবেশি আছে এখানে। কিন্তু এ প্রসঙ্গিত আলাপেও লেখকচৈতন্য বিশিষ্টজন ও মতের চিন্তার জালে এমনভাবে বন্দি যে, ওসবের ফাঁকে নিজস্ব চিন্তা পাখা মেলবার পরিসর ও অবকাশ কমই পেয়েছে, মনে হয়। এটা আরো একটা কারণে হয়ে থাকতে পারে, তা হলো প্রবণতা, অন্য কারো কাঁধে ভর না-দিয়ে দাঁড়াবার অনাগ্রহ; যদিও এটা এখানে স্বতঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে স্বাধীনভাবে দাঁড়াবার সক্ষমতা এ লেখক ধারণ করেন। ফলত, বলাই যায় যে, পাঠক প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয় নি।
মরমি সত্তার গান মরমিবাদকে চিড়েফেঁড়ে দেখবার চেষ্টা। আনুষ্ঠানিক ধর্মাচারপরিপন্থী, ঈশ্বরের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব বিষয়ে গোঁড়ামিহীন, আধ্যাত্মিক এই বিশেষ গোষ্ঠীর বিস্তার ভালোভাবে উঠে এসেছে এ প্রবন্ধে। প্রশ্ন উঠতে পারে মরমিরা তো নিরীশ্বর নয়, এ গ্রন্থে মরমিবাদ কেন? উত্তর হলো মরমিবাদ এক ধরনের আস্তিকতা হলেও এটি ঈশ্বরবিষয়ক সরল চিন্তার বিপরীতে এক ধরনের বিপ্রতীপচিন্তাই। মরমিদের একটা অংশ ঈশ্বরমুখী হলেও আরেকটা অংশ ধর্মনিরপেক্ষ। এ কারণে নিরীশ্বরবাদী মতের সাথেও এর আত্মীয়তা আছে। এ মতে স্রষ্টাকে স্বাধীন হাতে টিপেগড়ে নেবার সুযোগ রয়েছে, যেটা প্রথাগত ধর্মসমূহে সম্পূর্ণত অসম্ভব। নাস্তিকরা মরমি দার্শনিকদের সঙ্গে এবং মরমমিরাও নাস্তিকদের সঙ্গে একই চাতালের নিচে নির্বিঘ্নে ওঠাবসা করতে পারেন। তাদের মধ্যে যে যোগ সেটা বান্ধবতার, শত্র“তার নয়। কারণ মরমি মতে, দূর বাতিঘর ধরে কোনো পথচলা নেই, সাধারণত অন্তরমুখী হয় এর ঘোর অভিযাত্রা।
মরমি চিন্তার পাশাপাশি এ প্রবন্ধে মরমি কবিতাকেও চিনতে ও চিনাতে চাওয়া হয়েছে। ভক্তিমূলক গান ও কবিতা থেকে মরমি কবিতার পার্থক্যটাও স্পষ্ট হয়েছে এখানে। বলা হয়েছে : ধর্মীয় কবিতায় কূটাভাস নেই, নেই প্রতীকায়ন; কিন্তু মরমি কবিতায় কূটাভাস আছে, প্রতীকায়ন আছে, রূপকার্থ আছে। এই কূটাভাস হলো প্রকাশের অসম্ভাব্যতা, আর যদিও তা অসম্ভব তবুও তাকে ধরার আর্তি। এই প্যারাডক্সই মরমি কবিতার পাওয়ার স্টেশন।
এ প্রবন্ধের ভাষা যত্নে গড়া, অতএব সৌন্দর্যময়; এবং এ কারণেই অনেকাংশে দুরারোহ্য, দুর্ভেদ্য। দমস্বল্পতার কারণে অনেক পাঠকের উপলব্ধি-সক্ষমতার বাইরে থেকে যাবে এর কিয়দংশ বোধব্যাপ্তি। যেমন : এই আলোর অন্বেষণ, এই অসীমের অনুধ্যান, এই শাশ্বতের স্বতঃস্ফূর্ত সমীকরণ সমস্ত ব্যক্তিতা ও প্রতিস্বকে আত্মসাৎ করে অবশেষে স্বজ্ঞাদীর্ণ এক দিব্যাবস্থায়, এক সত্যোর্ধ্ব সত্যে এসে হাজির হয়েছে; মানুষ অজানা ও অসীমের সন্তান হিসেবে এই বিরাটকেই অধিশ্রিত করবে-- এই তার সুনির্দিষ্ট নিয়তি।
এই অধ্যাত্ম অভিনিবেশ, এই সমূহ সুরভি, দ্বীপে দ্বীপে জ্বালিয়ে চলেছে বহু অন্তরদীপ--
অন্তরতীর্থে করেন তিনি বসবাস, এই সুফিগৌরব লাল ঘাসফড়িংয়ের মনে দোলা দিয়ে গেল, শরিয়তি কঞ্চির ওপরে বসতে গিয়ে ওর যে সমস্যা হলো তার কথা জানতেন কবিবর মনসুর হাল্লাজ, মরুবক্ষ বিদীর্ণ করে ‘আনাল হক’ নামে যার তরী ভেসেছিলযুগের মুকুট খুলে দেখানোই যায় যে, যুক্তিঅস্ত্রসহ মুতাজিলাদের জন্ম সম্ভব হয়েছিল এক অনুদার ও বদ্ধ জীবনপথেএ যুগের মুসাফির ঘোরের প্রকোপে জ্বলে রহস্যকবিতারূপে পথে পথে ডিম পেড়ে যান
৫.
শেষাংশের ‘ভাবনার অন্তর’ প্রবন্ধটি অনেকটা মুক্ত। পুনর্জন্ম, জ্ঞান ইত্যাদি প্রসঙ্গ এখানে আলোচিত হয়েছে। তবে নিজে বলার চেয়ে এতদবিষয়ে অন্যে কী বলেছেন সে দিকেই যেন লেখকের বেশি ঝোঁক। ‘শূন্যতার চিত্রকল্প’ স্রষ্টার অভ্যুদয় বিষয়ে যতœবান। প্রসঙ্গক্রমে এখানে এসেছে ইহুদিবাদ, তাওবাদ, কনফুসিয়বাদ, শিন্টো, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টধর্মের এতদবিষয়ক দৃষ্টিকোণ। ‘ভাবনাবিন্দু’র যেন কোনো বেড়া নেই। আলোকপ্রাপ্তি, পৃথিবী ও প্রাণের উৎপত্তি, ভাষার উৎপত্তি, বিবর্তন, মৃত্যু ও মৃত্যুউত্তর সৎকার রীতি, মৃত্যুসংক্রান্ত বিশ্বাস, পরলোকবিশ্বাস, ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদের শাস্ত্রাবলি ও সে সংক্রান্ত মিথ, গ্রীকদর্শন এবং গ্রীক, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার কবিতা ইত্যাদির ভেতরে আলোক প্রক্ষেপিত হয়েছে এখানে। প্রকৃতার্থে ‘ভাবনাবিন্দু’ প্রবন্ধে ভাবনার কোনো কেন্দ্রবিন্দু নেই, যেন বহুরৈখিক কবিতা। আর প্রবন্ধ হিসেবে এখানেই এর খামতি। যে কারণে এর বিরুদ্ধে অসংলগ্নতাদোষে দুষ্টতার অভিযোগ তোলা যায়। মনে হয়, বিভিন্ন সময়ে ধর্মদর্শন, ধর্ম ও তার নানা কৃত্য, বিজ্ঞান, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে অধ্যয়নকালে পরে কাজে লাগবে ধারণায় যেসব নোট গ্রহণ করা হয়েছিল, সে সমুদয় মালমশলা সৎকারের জন্য এই প্রবন্ধটিকে একটা বড়ো বিন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর পাঠ এ কারণে সবিশেষ ক্লান্তিউদ্রেককর।
শেষাংশের ‘ভাবনার অন্তর’ প্রবন্ধটি অনেকটা মুক্ত। পুনর্জন্ম, জ্ঞান ইত্যাদি প্রসঙ্গ এখানে আলোচিত হয়েছে। তবে নিজে বলার চেয়ে এতদবিষয়ে অন্যে কী বলেছেন সে দিকেই যেন লেখকের বেশি ঝোঁক। ‘শূন্যতার চিত্রকল্প’ স্রষ্টার অভ্যুদয় বিষয়ে যতœবান। প্রসঙ্গক্রমে এখানে এসেছে ইহুদিবাদ, তাওবাদ, কনফুসিয়বাদ, শিন্টো, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টধর্মের এতদবিষয়ক দৃষ্টিকোণ। ‘ভাবনাবিন্দু’র যেন কোনো বেড়া নেই। আলোকপ্রাপ্তি, পৃথিবী ও প্রাণের উৎপত্তি, ভাষার উৎপত্তি, বিবর্তন, মৃত্যু ও মৃত্যুউত্তর সৎকার রীতি, মৃত্যুসংক্রান্ত বিশ্বাস, পরলোকবিশ্বাস, ইহুদিবাদ ও খ্রিষ্টবাদের শাস্ত্রাবলি ও সে সংক্রান্ত মিথ, গ্রীকদর্শন এবং গ্রীক, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার কবিতা ইত্যাদির ভেতরে আলোক প্রক্ষেপিত হয়েছে এখানে। প্রকৃতার্থে ‘ভাবনাবিন্দু’ প্রবন্ধে ভাবনার কোনো কেন্দ্রবিন্দু নেই, যেন বহুরৈখিক কবিতা। আর প্রবন্ধ হিসেবে এখানেই এর খামতি। যে কারণে এর বিরুদ্ধে অসংলগ্নতাদোষে দুষ্টতার অভিযোগ তোলা যায়। মনে হয়, বিভিন্ন সময়ে ধর্মদর্শন, ধর্ম ও তার নানা কৃত্য, বিজ্ঞান, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে অধ্যয়নকালে পরে কাজে লাগবে ধারণায় যেসব নোট গ্রহণ করা হয়েছিল, সে সমুদয় মালমশলা সৎকারের জন্য এই প্রবন্ধটিকে একটা বড়ো বিন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর পাঠ এ কারণে সবিশেষ ক্লান্তিউদ্রেককর।
বেন সিরার পুস্তকের নির্দেশ : তোমাদের নিকট যা কঠিন মনে হবে তার অন্বেষণ ¾করো না, যা তোমাদের বলা হয়েছে তাই করো। গোপন বিষয়ে তোমাদের কোনো কাজ নেই এই ইহুদি মতটিতে ব্যক্ত অবস্থানেই স্ব স্ব প্রান্তে দাঁড়ায় প্রতিটা ঐশীধর্ম ও তার অনুসারীরা। এখানে প্রশ্ন করা নিষেধ, জাগা প্রশ্ন সবার অগোচরে এখানে কফ-থুথুর মতো গিলে ফেলতে হয়। সজ্ঞান চৈতন্যধারী মানুষেরা এই কফ-থুথু গিলে গিলে জীবন পার করে দেবেন নাকি ইমানুয়েল কান্ট কথিত আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তি হয়ে উঠবেন, যারা কোনো ঐশীগ্রন্থের উন্মাদনাকে পরিত্যাগ করে নিজস্ব আহরণ ও অভিজ্ঞতার দ্বারা নিজেরাই হয়ে ওঠেন স্ব-অভিভাবক, তা মানুষ নিজেই ঠিক করে নেবেন। সচেতন মানুষকে সেই সিদ্ধান্ত নেবার জন্য এ গ্রন্থ সমদুয় তথ্য জোগান দিতে পারে না বটে, তবে দুইপ্রান্তের টানাহ্যাঁচড়ার দিব্যদর্শন ঘটাতে সাহায্য করে, যা হয়ত নিবিষ্ট পাঠককে দাঁড়াবার জমি খুঁজতে বেরোবার জন্য চিন্তাসূত্র উপহার দিতে সক্ষম। আগামী পৃথিবীর রূপচেহারার ওপর এসব চিন্তার তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বিকোবো আশায় আজ উঠেছি বাজারে, ক্রেতা নেই ফাঁকা পথ, মাঝরাত কড়া নাড়ে দাঁড়ায়ে দুয়ারে
রাগরক্ত গায়ে নিতে শরীর পেতেছি, বাঁচাতে তোমার দেয়া ক্ষীণ প্রাণ, ক্রেতা দাও ক্রেতা দাও, নইলে নিজেই বলো আছি
নভেম্বর ২০১১
Subscribe to:
Posts (Atom)
ভাষাবস্তু অবয়বে ধরে রাখে ভাষাচিন্তারেখা
ধর্মতত্ত্ব, বিবর্তনতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে অত্যল্প জানাশোনা আমাকে এরকম একটা গড় ধারণা দেয় যে, মানবপ্রজাতি আদিতে এক গোষ্ঠীভুক্ত ছিল। বি...
-
ধারণা করা হয়, নারীজাতি একসময় স্বাধীন ছিল। নারী-পুরুষ উভয়ে তখন জীবিকার জন্য মিলিতভাবে খাদ্যদ্রব্যের সন্ধান করত এবং যথেচ্ছ ভোগ করত। ভোগে-ত্যাগ...
-
বাইকুজ্বর ও তার আরোগ্যার্থ প্রেসক্রিপশন হাইকু , বাংলায় যাকে বলা যায় ক্রীড়মান পদ্য, জাপানের এক বিশেষায়িত কাব্যআঙ্গিক। আকৃতির দিক থেকে জানাশ...
-
কবিতার জঙ্গলে মাংস বিক্রি করতে এসেছেন যে মাসুদার, তাকে চিনে রাখা ভালো। জরুরিও। টেড হিউজকে কাঁদিয়ে সিলভিয়া প্লাথকে নিয়ে একঘরে থাকেন এই আইডিয়া...