Showing posts with label কবিতাচিন্তা. Show all posts
Showing posts with label কবিতাচিন্তা. Show all posts

Monday, August 3, 2020

কবিতা বিষয়ক নোট

ইতিউতি ভাবনার উপজাত অনুভূতিরাজি যখন চিত্তমণ্ডলে লাগাতার ভাঙচুর চালাতে থাকে, তখন মনোপুলিশ লাগিয়ে গুম করে না দিয়ে সেসব অনুভূতিকে কথায়, রঙে বা সুরে মুক্তি দিলে নিদারুণ অস্বস্তি থেকে নিস্তার পাওয়া যায়। কার্যত আমি রঙান্ধ ও অসুর, তাই কথার আশ্রয়েই তার যথাসাধ্য প্রকাশ ঘটাই। কখনো কখনো দেখি কিয়দংশ প্রকাশে অবলীলায় ভর করে আছে রঙের ছোপছাপ ও সুরের পাখসাট। তখন বিস্ময়াহত আমি ওই প্রকাশবস্তুকে আহ্লাদ করে কবিতা নামে ডাকতে উদ্যত হই, কানা ছেলের নামও যেমন হয় পদ্মলোচন!

কবিতা হিসেবে ওসব হয়ত যথেষ্ট নিম্নমানের। তৎসত্ত্বেও, ষষ্ঠেন্দ্রিয়ধারী ইহবাদী ব্যক্তিমানুষ হিসেবে আমার ওসব অনুভূতিরও একটা সহজ তাৎপর্য আছে, ওখানে মূর্ত সাধ-আহ্লাদেরও একটা স্বপ্নমূল্য আছে। সে কারণে নামায়নের দুঃসাহস-সম্বলিত বিশেষায়িত ওইসব প্রকাশকে আমি সজ্ঞানে ও অজ্ঞানে নিয়ত প্রশ্রয় দিয়ে চলি। পরিপার্শ্বের গণতন্ত্রহীনতা মনদেশের গণতন্ত্রচর্চায় কোনোই প্রভাব রাখতে পারে না।

তবে মাঝে মাঝে ভাবি, কবিতা লিখতে এসে এত যে তেল-পানি খরচ করেছি, না যদি লিখতাম তো কী হতো ওই অব্যয়িত তেল ও পানিতে? খরচ না হওয়া ওই তেল-পানি কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে একখানে মিশে গিয়ে হয়ত কোনো বিতিকিচ্ছিরি চেহারা পেত, যাদের আলাদা করবার সমুদয় প্রয়াস পর্যবসিত হতো সকরুণ নিষ্ফলতায়। অবশ্য, পানিতে তেল মেশানোর চাইতে লবণ মেশানো যে অধিকতর সুবিধাজনক, এই বোধ, হয়ত কবিতা লিখি বলেই জাগে!

একটা আকামা জিনিসের পেছনে ছুটে জীবনকে তামা তামা করে, কার্যত, যা কিছু অর্জিত হয়েছে, তার কোনো নগদ অর্থ বা বিনিময়মূল্য এই মরপৃথিবীতে নেই, যেখানে অর্থহীনতাকে এ সমাজ ভালো চোখে কখনো দেখে না। সমাজের সমুদয় বিবেচনা অর্থ ও বিনিময়মূল্যে নির্ধারিত হয়। এরপরও, এই নিরর্থকতা ও অর্থহীনতার পেছনে ছোটার সহজ তাৎপর্য হলো, কিছুমাত্র হলেও আমি সমাজবিরোধী। কবিমাত্রই বোধহয় তাই। সমাজ যখন যেখানে যেভাবে আছে তাকে বরমাল্য প্রদানকারীরা কখনো কবি নয় বা হলেও হাফকবি! এ আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি। বৈচিত্র্যের সৌন্দর্যের প্রতি পূর্ণ আস্থা সত্ত্বেও এ বাক্যে ইমান আনা যায়। আমার সে ইমান আছে।

সমাজের চোখ হলো কবি বা শিল্পী নয় এমন সব মানুষের চোখ, তারা যেভাবে যা দেখে, কবি কখনো সেভাবে দেখে না। কবির আলাদা করে দেখাটাই তার সমাজবিরোধিতা। এ বিরোধিতা সমাজকে বদলে দেয় না বটে, তবে বিদ্যমান সমাজ্জলে সকারণ কিছু ঢিল ছোড়ে, যার ঢেউ সমাজের কাছে অস্বস্তিকর ঠেকে। ওই বিরোধিতাটা এক ধরনের সফট বিপ্লব, ধীরস্থির, কিন্তু পয়জনাস।

কবিতায় সমাজবিরোধিতার ঘটনাটা শৈল্পিকভাবে ঘটানো যায় ইমাজিনেশনের সহায়তায়; এর আরো উৎকট পন্থা আছে, যা বলা এখানে বাহুল্য। ইমাজিনেশন হলো সংবেদন ও ধারণার মনছবি আঁকবার সামর্থ্য, যার সবটা কোনো বিশেষ মুহূর্তে শ্রবণ-দর্শন বা অন্য কোনো একক ইন্দ্রিয় দ্বারা ধারণযোগ্য নয়। এটি তৈরি হয় বুদ্ধি ও আবেগের সংমিশ্রণে, যার পূর্বশর্ত হলো পূর্ণ স্বাধীনতা। তো, কবিদের এই অবাধ স্বাধীনতা ভোগ কবিতায় কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে কি না সেটা একটা বড়ো প্রশ্ন। যাকে চরম স্বাধীনতা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে সে সেই স্বাধীনতাটা তাৎপর্যপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারছে কি না তা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বটে। স্বাধীনতার মানে যে যথেচ্ছাচার নয়, এ শিক্ষার এখতিয়ার কেবল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একার নয়; এটি কবিতাসহ শিল্পপাড়ারও আওতাধীন বিষয়।

দেখি যে, অধুনার কবিদের একাংশ চিত্রমাত্রকেই চিত্রকল্প ভাবছে। আরেকদল কল্পনাকে এতটাই অবাধে চরতে দিচ্ছে যে, কাঁটাতার ডিঙিয়ে তারা পায়ে হেঁটে সাগর পাড়ি দিয়ে ফেলছে। চিত্রকল্পের নামে হাতিগুচ্ছকে তুড়িতে উড়িয়ে দিচ্ছে আকাশে আকাশে, নদীকে পুড়িয়ে দিচ্ছে মাছের যৌনতাসহ; যেহেতু কাজটা যথার্থেই সংঘটিত হবার দরকার হচ্ছে না, শব্দ-বাক্যের কারসাজিতেই ঘটিয়ে দেওয়া যাচ্ছে সব। এই প্রবণতাকে অনেকটা ফ্রি পেয়ে মাথার বাঁ’পাশে বাড়তি আরেকটা মাথা জুড়ে নেওয়ার মতো ব্যাপার বলে মনে হয়।

পাগলামি অনেক সময় উৎকৃষ্ট মনছবি আঁকতে পারে, তবে সেসব ছবির সিংহভাগ যে অসংলগ্ন চিন্তায় ঠেস দেওয়া থাকে প্রায়শ তার কোনো জাতকুল থাকে না। এসব চিন্তা মানুষের পারসেপশনের আওতার মধ্যেই যেন আর থাকতে চাইছে না। হামেশাই ডিঙিয়ে যাচ্ছে বোধ্যতার সীমা-পরিসীমা। কিন্তু এরও সীমা আছে, থাকা উচিত। তা নইলে কথিত কবিতাকে উপলব্ধিতে নিতে অসমর্থ পাঠককে পশ্চাৎপদ ঠাওরে গালি দিয়েও আখেরে পার পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। যা-ই কল্পনা করি না কেন, মানব ধারণায় তাকে সম্ভব মনে হতে হয়। অন্তত দূরান্বয়ী হলেও একটা সম্পর্কসেতু কোথাও থাকতে হয় আবিষ্কার করে ওঠবার জন্য। তাহলেই কেবল সেখানে সৌন্দর্য ভর করবার ফুরসত পায়, অন্যথায় সৃষ্টি হয় সামঞ্জস্যহীন প্রগলভতা। মনে রাখতে হয় যে, প্রলাপোক্তিসর্বস্বতা কবিতার এক নম্বরের শত্রু।

আমার মনে হয়, উত্তুঙ্গ কল্পনা যাতে কোনোভাবেই প্রলাপে পর্যবসিত হয়ে না যায়, সেটা নিয়ন্ত্রণ করে উঠতে পারাই আমাদের একাংশ সাম্প্রতিক কবির জন্য এখন বড়ো রকমের চ্যালেঞ্জ।

Thursday, July 9, 2020

কবিতাযাত্রার ভাবাভাস

জেতা মৎস্য গিলে বকে মনুষ্য খায় বাঘ-ভালুকে
রহস্য বোঝে না লোকে কেবল বলে জয়।
দীন দ্বিজদাস, জনপদাবলি, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত
জীবন মানে কেবল নিয়মিত আহার গ্রহণ, তদসাপেক্ষে বর্জ্যত্যাগ ও নিয়মিত প্রজনন ক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া নয়। এরকম স্থূল জীবনকে মহিমা দিতে রুচিতে বাধে। সূক্ষ্মতার ভিতর দিয়েই জীবন মহিমামণ্ডিত হয়ে ওঠে। যে জীবনে খাওয়া-পরা-ভোগের অধিক মগ্নতা নেই, সে জীবন আমাদের কাম্য নয়। সূক্ষ্মতার দিকে তাক করা এই যে প্রত্যাশিত জীবন, এরও অবশ্য গোপন এক নির্ভরতা আছে খাওয়া ক্রিয়াটার ওপর।

একটা বয়সে, কৈশোরে, যখন প্রথম বুঝতে শিখেছিলাম যে, জীবজগৎ সচল থাকার মূলে রয়ে গেছে নিরবচ্ছিন্ন খাদ্যচক্রের ভিতর দিয়ে শক্তির স্থানান্তর প্রক্রিয়া, তখন হঠাৎই একটা পরিবর্তন টের পেয়েছিলাম দেহে-মনে। কেননা তখনই জানতে পেরেছিলাম যে সমস্ত সূক্ষ্মতাই স্থূলতানির্ভর। কিন্তু বরাবরই খানাপিনারূপ স্থূলতা শিল্পের জগৎ থেকে কম-বেশি নির্বাসিত থেকেছে। এই স্থূলতা নিয়ে একটিও সচেতন বাক্য রচনা করেন নি বা আঁচড় কাটেন নি অনেক লেখক-শিল্পী, যেমন রবীন্দ্রনাথ।

আমরা জানি, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও পানির মাধ্যমে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে গাছের সবুজ পাতার ক্লোরোফিল গ্লুকোজ নামক চিনি উৎপাদন করে, যে চিনিশক্তি গাছের খাদ্য। গাছের পাতা-ফুল-ফল খেয়ে সেখান থেকে শক্তি আহরণ করে ক্ষুদ্র পতঙ্গকুল। ওই পতঙ্গ যখন জলের ওপরে ভাসে তখন কোনো ক্ষুদ্র মাছ তাকে টুক করে গিলে নেয়। ক্ষুদ্র মাছকে পরে খায় অপেক্ষাকৃত বড়ো কোনো মাছ। ওই বড়ো মাছ হয়ত পরে খাদ্য হয় কোনো বিশাল আকৃতির জলজীব বা মাছের। কোনো মৎস্যশিকারির মধ্যস্থতায় বিশাল মাছটি ধৃত হয়ে চলে আসে মানুষের খাবার টেবিলে। এই মানুষই আবার কখনো-বা বাঘ-ভালুকের খাদ্য হয় কিংবা কোনো জলজীবের। স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও তার দেহ মাটিতে মিশে যায়। বেঁচে থাকতে মানুষটি যত শক্তি সঞ্চয় করেছিল সব শুষে নেয় মাটি। শিকড়ের মাধ্যমে ওই শক্তি আবার শুষে নেয় বিভিন্ন গাছপালা। বাঁচার প্রয়োজনে গাছপালার গ্লুকোজ উৎপাদন অব্যাহত থাকে।

এই চক্রটি পুরোপুরি উপলব্ধিতে আসার মাধ্যমে সহসাই আমার বোধবুদ্ধিটা একটা দার্শনিক পরিণতিতে চড়ে বসে যেন। প্রাকৃতিক সবকিছুর পরস্পরনির্ভরতা-বিষয়ক এক গূঢ় সত্যের বিশাল দরজা যেন উন্মুক্ত হয়ে যায় আমার সামনে। ভাবনাচিন্তা বিশেষ একটা ব্যাপ্তি পায়। তাহলে ব্যাপার এই, যে, জীবমাত্রই অন্য কারো খাদ্যে পরিণত হবার জন্য নিজেও খাদ্যসন্ধানে ব্যাপৃত থাকে অহর্নিশি!

এই অতিশয় স্থূল ও চক্রক্রমিক খাদ্যগীতির পাশে সুকুমারবৃত্তি নামধেয় ব্যাপারস্যাপার, তথা শিল্পসাহিত্যসংগীতনৃত্যঅভিনয়— এসব কি ওই খাদ্যকল্পেরই অন্য রূপারূপ তবে? গুহাগাত্রে শিকারছবি এঁকে, বর্ণেশব্দে যাপনবিদ্যার তেলনুনছবি ধরে, কর্মের লাগোয়া সুরধুন তুলে, আহরণমুদ্রায় শরীর বিক্ষেপণ করে, যাপনচর্যার বিবিধার্থক রূপায়ণ ছলে মানুষ আসলে কীসের প্রমাণ রক্ষা ও প্রলম্বিত করে এসেছে যুগ যুগ ধরে? এসব কি এক অর্থে খাদ্য হয়ে ওঠা ও খাদ্য খুঁজে ফেরারই নন্দনতারিফ নয়?

বিজ্ঞানীরা ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশব্যবস্থায় জড়ে-জড়ে, জীবে-জীবে এবং জড়ে-জীবে বা জীবে-জড়ে অত্যাবশ্যক সম্পর্কের আনুপূর্বিক ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে, প্রাকৃতিক সকল কিছুই পরস্পরের সাপেক্ষে প্রয়োজনীয়। কিন্তু শিল্পসাহিত্যসংগীতনৃত্যঅভিনয় প্রাকৃতিক নয়, মনুষ্যসৃষ্ট। এসবে আশ্রিত যে কলার ধারণা তা জড়ও নয়, জীবও নয়। প্রতিবেশব্যবস্থায় এর স্থান তাহলে কোথায়? এতদিন ধরে এর কোনো জবাবই আমার আয়ত্তে ছিল না। সম্প্রতি এর একটি সম্পর্কসূত্র বা বিহিত আমি খুঁজে পেয়েছি বলে মনে হয়, যখন বুঝতে শিখেছি যে, মানুষ তার বিস্তৃত পরিপার্শ্বে ক্রমশই তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর হয়ে উঠতে থাকে। মানুষের চারপাশের আপাত সীমিত যে পরিসর, যাকে মনে হয় যে এইই শেষ, এর সবটা জানা হলেই জানা হয়ে যাবে গোটাটা, তা আসলে ঠিক নয়। বস্তুত দিন দিনই পরিসরটি প্রসারিত হতে থাকে। যত দ্রুত জানাশোনার প্রসার ঘটে, তার চেয়ে দ্রুত প্রসারিত হয় নতুন নতুন পরিসর। তাতে কেবলই বোধ হতে থাকে যে, আমাদের জানাবোঝা অতিশয় তুচ্ছতর। তো, ওই তুচ্ছ আলোর প্রক্ষেপণে একান্তে যা ধরা পড়ে, তাতে মনে হয়, এই যত কলাকাণ্ড এরও নির্দিষ্ট ভোক্তাশ্রেণি থাকে, যারা এগুলো খায়। গলাধঃকরণ করে না বটে তবে খায়, উপভোগ করে। অন্যদের মতো কলাকার নিজেও একজন কলাভোক্তা। তাদের এগুলো আসকালসন্ধ্যার ভোগে লাগে। সেই আবার খাদ্য খুঁজে ফেরা, খাওয়া। খাওয়ার ভিতর দিয়ে জীবনীশক্তি, শৈলীপ্রণোদনা, জীবনসত্য ও আবিষ্কারোচ্ছ্বাস লাভ, অবলম্বন খুঁজে পেয়ে ঝুলে পড়া।

উলটোভাবে বিচিত্ররূপ কলারাও কলাকারকে খায়। অর্থাৎ কলাকারের নিজস্ব অনেককিছুর নিঃশর্ত সমর্পণের মাধ্যমেই কলা সৃজিত হয়, কলাবিদ্যা অর্জিত হয়। কলা একে একে কলাকারের সময় খায়, ঘুম খায়, স্বস্তি খায়, তৃপ্তি খায়, সম্পর্ক ও সামাজিকতা খায়, শান্তি খায়; সবিশেষ দেহটা খায়, একেবারে খেয়ে ফেলে। যেমন কাব্যকলা খেয়েছে জীবনানন্দ দাশ, বিনয় মজুমদার, আবুল হাসান, সাবদার সিদ্দিকী, ফাল্গুনী রায়, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুনীল সাইফুল্লাহ, শামীম কবীর, আপন মাহমুদ প্রমুখকে। কলা ও কলাকারের মধ্যকার এই সম্পর্ক জড়-জীব বা জীব-জড়বোধক। অনেকটা উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যকার অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড চক্রের মতোই যেন। উদ্ভিদ অক্সিজেন দেবে প্রাণী নেবে, প্রাণী কার্বন-ডাই-অক্সাইড দেবে উদ্ভিদ নেবে। এই দেওয়া-নেওয়াই জীবনবায়ুর উদ্গাতা বোধকরি।

এটুকুই মাত্র আমার বিবেচনা, যে বিবেচনায় আমি বলতে চাই যে কলারও স্থান আছে খাদ্যচক্রে, অতএব ইকোসিস্টেমে। সকল কালের সকল কলার কাজেই অস্তিত্বশীল থাকতে হয়, নতুন নতুন কলাবস্তু ও কলাধারণা সৃজিত হতে হয়। তা না হলে তৈরি হয় ভারসাম্যহীনতার হাহাকার, যে ভারসাম্য কৈলিক ও সাংস্কৃতিক।

এহেন ভারসাম্য রক্ষার্থেই আমি কলাসৃজনে প্রবৃত্ত হই, লিখি— আরো ভেঙে বললে জবাবটি অন্যরকম শোনাবে। সমস্ত বিস্তারণই কেননা আব্রুহীন, সমস্ত স্বচ্ছতাই কেননা রহস্যহীন। আমার লেখালেখির উদ্দেশ্য বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছি আমি, নানা ছুঁতোয়। দেখেছি যে, জবাব বারবার বদলে গেছে। একই সওয়ালের জবাবে একেক বয়সে দেখেছি একেকরকম উত্তরদান প্রয়াস। এখন মনে হয়— আমার কিছু দৃশ্য, ঘটনা ও কার্যের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করবার থাকে, যারা কারণসমূহের সাথে মিলিত হবার ইচ্ছেয় বহুকাল ধরে অপেক্ষায় আছে। আমার কিছু আনন্দ-বেদনা-ক্রোধ থাকে, যা সহস্রজনের আনন্দ-বেদনা-ক্রোধের থেকে আলাদা অথবা আলাদা নয়, যেসব বিষয়ে অনেকেই কোনোদিন কিছু ভেবে ওঠেন নি। আমার সবসময়ই কিছু কথা বানিয়ে বলবার থাকে, যা সত্যমিথ্যানিরপেক্ষ, লিখবার পরে প্রায়শ যেগুলোকে সত্যের পড়শির মতো মনে হয়। আমার কিছু তুচ্ছ বিষয়ের প্রতি অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করবার থাকে, যেদিকে মনোযোগদান প্রতিবেশ ব্যবস্থার জন্যে জরুরি বোধকরি। এ ছাড়াও, যাপনযুদ্ধের বিভিন্ন পর্বে জড়-জড়, জীব-জীব এবং জড়-জীবের অনেক সম্পর্ক আমার কাছে নতুন করে প্রতিভাত হয়। ওই আবিষ্কার চিহ্নগুলো আমি ধরে রাখতে চাই, চিন্তার পরবর্তী পরম্পরার কথা ভেবে। আমার লেখনচেষ্টার নেপথ্যে সুপ্ত মূল কারণের বিভাজিত রূপ মূলত এই।

আমি না করলেও এই কাজগুলো অন্য কেউ তার মতো করে করবে। কিন্তু আমার মতো করে করা কেবল আমার পক্ষেই সম্ভব। দেখার ও লেখার প্রত্যেক লেখকেরই কমবেশি স্বতন্ত্র ভঙ্গি থাকে। থাকাটা জরুরিও। আমি দাবি করি যে, আমারও তা আছে। আর আছে বলেই ওই স্বাতন্ত্র্যটুকু বাংলা লেখন-বৈচিত্র্যের ভাণ্ডারে আমি যুক্ত করে যেতে চাই। তাতে বাংলাসাহিত্যের সমৃদ্ধি না এলেও বাংলা ভাষার সম্ভাবনাটি কিছু দৃষ্টান্ত লাভ করবে, নিঃসন্দেহে।

দুই.

এই মর্মে একটি রুশ প্রবাদ আছে যে, “সে কোনো মুক্ত মানুষই নয়, যে কখনো ‘কিছুই না’ করে না”। এই প্রবাদোক্ত ‘কিছুই না’ করা ব্যাপারটা অত সহজ নয়, যেহেতু জীবন মানুষকে সবসময় কোনো-না-কোনো ‘কিছু’র মধ্যেই থাকতে বাধ্য করতে চায়।

বাংলাদেশসহ অনেক দেশে অবশ্য অর্থকরী কাজ না-করাকেই ‘কিছুই না’ করা ভাবা হয়। গার্হস্থ্য ও প্রজনন কর্মভারে পীড়িত আমাদের নারীসমাজ ওই উদ্দেশ্যমূলক ভাবনার প্রত্যক্ষ শিকার। কিন্তু প্রবাদোক্ত ‘কিছুই না’ করা একেবারেই অন্য জিনিস। প্রস্তাবিত ‘কিছুই না’র সঙ্গে লিঙ্গশোষণমূলক ব্যাপারস্যাপারের কোনো সংস্রব নেই, সংস্রব আছে অন্তর্গত মুক্তি ও পূর্ণাবসরের। এই মুক্তি কেবল বাহ্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দায় থেকে নয়, বরং ভেতরগত চিন্তনভার থেকেও। ‘কিছুই না’ কাজেই দেহে-মনে পরম এক শূন্যময়তার আর্তিসমগ্রতায় সমর্পিত হওয়া।

চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়াকে আমার মাঝেসাঝে মূর্তিমান এক অভিশাপ বলে মনে হয়। জন্মাতাম যদি কাঠবিড়ালি কিংবা নিদেনপক্ষে ঝুঁটিশালিক হয়ে, একমনে খাদ্যাহরণ ও কামোদযাপনে পার হয়ে যেতে পারত একটা জীবন। কিন্তু মানুষ হয়ে রীতিমতো ফেঁসে গেছি। অভিশাপদগ্ধ এই মনুষ্যজন্ম আমাকে প্রায়ই ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রের ভবিষ্যযাপনচিন্তার গর্তের মুখে ঠেলে দেয়। ক্বচিৎ কখনো উৎফুল্ল হলেও প্রায়শই হতাশায় ডুবে যেতে হয়। এর মধ্যেও সৌন্দর্যলিপ্সা জাগে। রক্তমাংসের তাড়নায় ভুগি। তদুপরি কিছু মানুষের কাণ্ডকীর্তিদৃষ্টে জগৎসাধন ব্যাপারে বিবমিষা জাগে। কখনো-বা ক্রোধোন্মত্ত হয়ে উঠি। আগাগোড়াই নিষ্ফল যদিও।

এই প্রতিক্রিয়াগুলোর প্রতিটিই দেহ-মনকে সতত ব্যস্ত রাখে। আর নানারূপ অনুভূতির জন্ম হতে থাকে। তাতে বেজায় ভার বোধ হয়। যাপনস্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে ওই ভার মাথা থেকে নামিয়ে ফেলবার দরকার হয়। নইলে স্বস্তি মেলে না।
আমার কবিতা করা, ভেবে দেখেছি, কণ্টকাকীর্ণ বিচিত্র ওই অনুভূতিভার খালাস করে মস্তিষ্ককে খালি করবার প্রয়াস থেকেই জাত। শুরুতে ফেনা ফেনা গাদ ওঠে। গাদ সরে গেলে একসময় ঝিলকে ওঠে পরম শূন্যের কাছাকাছি অঞ্চলে চরে বেড়ানো নিখাদ মেঘপুঞ্জের মতো শ্বেতশুভ্র হাতি-ঘোড়া, পরাহ্ণমনের আলো ঠিকরে পড়লে যাতে লালাভার উচ্ছ্বাস জাগে। ওই মেঘানুভূতিমালার শব্দ-বাক্যকৃত অনুবাদই আমার কবিতা।

কবিতা না-করে অন্য কোনো নিরর্থকতায় সমর্পিত হয়েও এ বাবদে নির্ভার হওয়া যায় না তেমন নয়। হওয়া যায়। হইও। কিন্তু শূন্যময়তার সন্ধানে ‘কিছুই না’ করার দিকে যাত্রার মাধ্যম হিসেবে কবিতাকেই আমার সবচেয়ে মোক্ষম অবলম্বন বলে মনে হয়।

তিন.

কবিতা বিষয়ে কিছু লেখা বা বলার চেয়ে একটি কবিতা লেখা বরং অনেক নিরাপদ। অবশ্য এরকম কোনো বাক্য এক্ষেত্রে বলা চলেই না যে এটি ওটির চেয়ে সহজ বা কঠিন, কিংবা ওটির চেয়ে এটি। যিনি যখন যেটা লিখেন, তখন তিনিই কেবল সেটার সারল্য-কাঠিন্য আন্দাজ করতে পারেন, অন্য কেউ নন। আমার কাছে দুটোই সহজ, যখন লিখি। লেখা হয়ে গেলে মনে হয় জব্বর জটিল এক সাঁকো পার হয়ে এলাম বুঝি! কী করে সাধন করলাম এই অসাধ্যকে? নিজেকে বেশ সফল মানুষ মনে হয় তখন। যখন সে লেখা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে যাবার প্রসঙ্গ আসে, অর্থাৎ পঠিত বা মুদ্রিত হবার কথা, তখন আবার অন্যরকম লাগে। মনে হয় এটা হয় নি কিছুই আর ওটা হাস্যকররকম বাজে হয়েছে, ইত্যাদি। দাঁড়াল কী তাহলে? এই কি নয় যে কবিতা বিষয়ে আমি যা ভাবি, কবিতাকর্মী হিসেবে প্রায়শই আমি তা করে উঠতে পারি না, কিংবা, আমার নিজস্ব কবিতাধারণাও ফ্রিকোয়েন্টলি বদলে বদলে যায়! অতএব এটা বলা যায় যে, আমার কবিতা সবসময় আমার পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করে না। সে হিসেবে কবিতা থেকে আমার শত হস্ত দূরে থাকাই স্বাস্থ্যসম্মত! কিন্তু তবু লিখতে বসে যাই অধরা অদৃশ্যকে ধরতে, যা ধরা গেলে বলা যাবে যে এটি বা এগুলো আমার প্রকৃষ্ট প্রতিনিধি। কিন্তু হায়! প্রান্তরজুড়ে যথেচ্ছ দাপাদাপি করেও অধরা শেষপর্যন্ত অধরাই থেকে যায়।

একজন স্বাধীনচেতা মানুষ হিসেবে সর্বত্রই আমি স্বাধীনতার চর্চা করতে ভালোবাসি। লেখালেখিতেও। যখনই স্বাধীনেচ্ছা বিঘ্নিত হবার উপক্রম হয়েছে, তখনই আমার গতিমুখ বদলে নিয়েছি। এখনো তাই করি। সৃজনের প্রয়োজনে কারোর এঁকে দেওয়া নকশামতো কিংবা অগ্রজের পদচ্ছাপ দেখে পা ফেলানো আমার পছন্দ নয়। ওই হাঁটায় অনুকারিতা যতটা আছে, আবিষ্কারানন্দ ততটা নেই। এজন্য কেউই আমাকে শিষ্য ভেবে স্বস্তি পান নি, আমিও পাই নি গুরু ভেবে। নিজের মতো করে দিকবিদিক হাঁটি, মানুষ, লভ্য প্রাণীকুল ও উদ্ভিদের সঙ্গে মেলামেশা করি, দেখি ও শিখি। এই বিরল যাত্রাভিজ্ঞতার ফাঁক-ফোকরগুলো, ইমাজিনেশনের নরম পুডিং লাগিয়ে ভরে তুলে তার সাথে সহনীয় মাত্রায় মনের রং মিশিয়ে নিজের ভাষায় যতটা কুলোয় লিখে ফেলতে চেষ্টা করি। এদের কোনো-কোনোটিকে জন্মক্ষণ থেকেই সম্পন্ন হয়ে উঠতে দেখা যায়, কোনোটিকে খুব নিঃস্ব দেখায়। ঝরঝরে হয়ে উঠতে যতদিন লাগে, ততদিন এদের আগলে থাকি। চুল-নোখ কেটে দেই, জামাকাপড় ও কাজল-সুর্মা পরাই, হাগু-মুতু সাফ করি, গোসল দেই। শেষোক্তদের প্রতি মায়াটা একটু বেশিই জন্মে, এজন্য সঙ্গও বেশি পায় তারা, অটিস্টিক শিশুর মতো।

সকল মানুষেরই বিচিত্র যাপনাভিজ্ঞতা আছে, কল্পন-সক্ষমতা আছে। আছে অনুভূতি প্রকাশের ভাষা ও মনে ছড়ানো বিচিত্র রং। অথচ সবাই কবিতা লিখেন না। কেন লিখেন না? কারণ তারা হয়ত কবিতা জিনিসটা পছন্দই করেন না বা লিখে আনন্দ পান না বা লিখতে পারেন না বা এটাকে নিতান্ত পণ্ডশ্রম মনে করেন, ইত্যাদি। স্পষ্ট যে, আমি কবিতা লিখি ঠিক এসবের উলটো কারণে। কবিতা জিনিসটা আমার খুব পছন্দ, এটি লিখে বিস্তর আনন্দ পাই এবং লিখতে পারিও। কবিতা লেখাকে কখনোই আমার কাছে পণ্ডশ্রম মনে হয় না। এই-ই সার। এর বাইরে ‘কবিতা না-লিখলে আমি বাঁচব না’, ‘আমি তো লিখি না, কবিতাই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়’ বা ‘আমার কবিতা দূর আকাশ থেকে নাজেল হয়’, ‘লিখি সমাজ বদলের জন্য’; কবিতা লেখা নিয়ে ইত্যাদি কথাবার্তার সর্বৈব ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয় আমার। এই লৌকিক কাজটিকে যারা অতিলৌকিক বা অলৌকিক মহিমা দিতে চান, তাদের প্রতি একটা বড়োসড়ো সন্দেহ জিইয়ে রেখেই অধরাপ্রান্তরে আমার শিকারাভিযান আমি অব্যাহত রেখে চলেছি।

চার. 

কবিতা একইসঙ্গে কবিতাকর্মী ও পাঠকের দিক থেকে একাকিত্ব উদযাপনের অন্যতম ভাষিক শিল্পমাধ্যম। প্রকৃতপক্ষে মানুষ যেহেতু একা, কাজেই কবিতা অবিকল্প মানব সমাজে।

আবার মানুষ যেহেতু সমাজে বাস করে, কাজেই সে জীব হিসেবে সামাজিক, একজন সামাজিক জীবের প্রয়োজন মোটানোর যোগ্যতায় যে কোনো নিম্নকণ্ঠ ও অন্তর্গত বয়ানঋদ্ধ কবিতাও শেষ বিচারে সামাজিক। এর মানে হলো কবিতামাত্রই সামাজিক কবিতা।

এরূপ বৃহদার্থে কবিতার সামাজিক হওয়া আর সরাসরি সমাজ পরিবর্তনের মানসে লিখিত কবিতার সামাজিক পরিচিতি অবশ্যই আলাদা ব্যাপার; কবিতা দুটোই, কিন্তু সব কবিতা সবার জন্য নয়।

কবিতাকে আমরা দেখেছি নানারকম দায়িত্ব পালন করতে— আত্মসত্তার অনুসন্ধান থেকে শুরু করে জাতীয়তার চেতনা নির্মাণ ও তার মেরামত, সংকট মুহূর্তে সংগ্রামের প্রেরণা ও সাহস সঞ্চারণ, বিপ্লবের ভাষিক প্রণোদনা জোগানো, শত্রুমিত্রজ্ঞান ঝালাইকরণ, লৌকিক পুরাণকে প্রবহমাণ রাখা, অপ্রাপ্তি-বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাণীরূপ প্রণোদনা বিলানো, ভাষাচিন্তার নমুনাগ্রন্থন, বিশৃঙ্খল যাপনের ডায়েরি সংরক্ষণ, মানসপ্রান্তরে সবজিচাষ, পাগলামির ডকুমেন্টেশন, নশ্বরদেহের অধীন অন্তঃকরণের স্বপ্নাদ্য রূপরেখার মমিকরণ, নানামাত্রিক প্রেমের জয়গান ও প্রেমোৎপাদন, প্রকৃতির রূপের নকলনবিশিকরণ, ইত্যাকার কাজবাজ সামলে আমাদের কবিতা ধারণ করেছে বিচিত্র অবয়ব ও বহুবাচনিক মর্মবেদনা।

এসব দায়িত্ব আমাদের নতুন কবিতার জন্য অবশ্যপালনীয় নয়, আমরা হয়ত এর কোনো-কোনোটা করি বা করি না, কোনো-কোনোটা করব বা করব না; কিন্তু স্বীকার করি ও করব যে এর সবকটাই কবিতার কাজ।

অন্য কোনো কোনো শিল্পমাধ্যম এসব দায়িত্বের কোনো-কোনোটা এর চেয়ে ভালোভাবে পালন করতে পারে ও করে, কিন্তু উৎপাদনরীতি ও ব্যবহারে তা আলাদা। কবিতার কায়দা অনেকখানি গেরিলা ধরনের। সমাজচোখকে ফাঁকি দিয়ে এমনসব জায়গায় কবিতা প্রবেশ করে, যেখানে অন্য মাধ্যম যায় না বা যেতে পারে না। কবিতাই আমাদের চিনিয়েছে শিশিরের ঘ্রাণ ও জলের অভিমান, পর্বতের ঋতুস্রাব ও ঘুমের যৌবন, যোনির কূটনীতি ও লিঙ্গনামাজ। এ জানা ভীষণ জানা, এ জ্ঞানকাণ্ডে ভ্রমণ বিষয়সাফল্য দেয় না ঠিক, কিন্তু দেয় সূক্ষ্মতার জগৎমন্দিরে ঢুকে যাপনকে বুঝে নেবার একচ্ছত্র ধ্যানগরিমা।

নিষ্ঠকবির যে শব্দসাধন, যে নৈশঃব্দ্যবাদন, তার উৎপাদন যত তুচ্ছই হোক, কবির কাছে তা অশেষ মূল্যবান; একজীবনে ওই মূল্যমান পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে কখনো উপলব্ধ না-হলেও।

পাঁচ.

আওয়াজবহুল শব্দ দিয়ে নৈঃশব্দ্যকে ধরবার যে কৌশল, যার কোনো বস্তুগত রূপ নেই, তার দিকে ডিঙি বেয়ে যেতে যেতে পথের যেসব বেদনের সাথে দেখা হয়, সেসবের নিরাবয়ব অস্তিত্বের সাথে নিজের বেদনকাশি মিলিয়ে-মিশিয়ে নিলে একটা শান্তি শান্তি অনুভূতি হয়, ওকে পুরোপুরি পাবার জন্যই নিশিবল্কলে একটা নির্ঘুম জীবন ভাব-আঠায় সেঁটে দিয়ে অবিরাম হাল বেয়ে যাওয়া

আশ্চর্য এক প্রাসাদসুখ চূড়ান্তমঞ্জিল ওই ভিখারিপল্লিতে, যারা জানল না অনুভূতিময় ওই যাপনকাহিনি, তাদের দিক থেকে আসা অবজ্ঞার ঢিল গিলে অদৃশ্যকে দৃশ্যের সাথে বাঁধাবাঁধির স্বতোচ্ছল প্রয়াসেই এত সব আয়োজন, যন্ত্রণা-আফিম সেবে ঝিম মেরে থাকা

কী হয় এই বাঁধাবাঁধি দিয়ে, সে প্রশ্নে চোখ কচলালে শত-সহস্র বছর ধরে জীবিত অজস্রাজস্র কথার বাগানে ফোটা ফুলটুল দৃশ্যমানতা পায়, যারা অবিরাম চালিয়ে যাচ্ছে নন্দনশাসন, বিরল সব আবিষ্কার, অবিকল্প সব উপলব্ধি, মিথ্যা দিয়ে লেপাপোছা জীবন ও সমাজসত্য ওই তাকে জড়ো হয়ে দিকে দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে অফুরন্ত বিভা

অত্যাশ্চর্য মনছবি-নির্মিত অনায়াসলব্ধ ওই আনন্দবিতানের সুগন্ধে মগ্ন হয়ে লোভ-মোহ ত্যাগ করে লতাঝাড়ের মতো প্রত্যন্তে বেড়ে ওঠার মোহন মধুরতা আমি টের পেয়ে গেছি, কথার না হবে যদি, কার তবে এসব মহিমা, যেই দিকে ফিরে ফিরে যায় পৃথিবীর বাছাই মানুষ

ছয়.

ব্যক্তিকবির জীবন নিষ্কাশিত হয়ে নেমে আসা অনুভূতিচূর্ণ যদি নানা আভরণের সংস্রবে অথবা সংস্রব বর্জন করে এমন কোনো দশাপ্রাপ্ত হয়, যা কবির অভিজ্ঞতাবাহিত অর্জন ছুঁয়ে বদলে যাওয়া ভাষার সহায়তায় প্রসারিত অর্থের শক্তি নিয়ে মনোহারী সৌন্দর্য অর্জন করে, তবে তাকে আমরা কবিতা বলবার অবকাশ পাই। এই রূপ বা সৌন্দর্যের নতুন হওয়া আবশ্যক হয়, যা অন্য কারো অনুকারবৃত্তির দ্বারা অর্জিত নয়, যা এই প্রথম জন্ম নিল মহাশূন্যতার উদর চিড়ে-ফেড়ে। কবিতা সেই চূড়ান্ত অবস্থা, যা অনুভূতিচূর্ণের মিশেলে অনাস্বাদিতপূর্ব এক আস্বাদআঞ্জাম সংগঠিত করে রাখে, যার নিবিড় সংস্পর্শ পাঠকচিত্তে ঘটায় তীব্র সংক্রমণ, দ্রুত কিংবা ধীরে। এটা আবশ্যিক নয় যে এই সংক্রমণকে সর্বদা মধুরই হতে হয়, তা এমনকি বিষাদ-বেদনা-যন্ত্রণার কিংবা বিস্ময়-স্তব্ধতা-মূর্ছনারও হতে পারে। তবে সবই এর আনন্দপ্রদ।

সন্দেহ কী যে, কবিতা পাঠকমনকে শিক্ষিত করে, সঞ্চারিত করে। কিন্তু এ শিক্ষা কখনোই বেত্রাঘাতোৎপাদিত ও উৎসারিত নয়, বরং স্বতোৎসারিত। এ পরীক্ষা পাসের নিশ্চয়তা দেয় না, এমনকি দেয় না করে-কেটে খাবারও সুযোগ। এ শিক্ষা কেবলই সৌন্দর্য চেনায়, দেয় সৌন্দর্যের ঘোরে বাস করবার গলিঘুপচির সন্ধান। যিনি এ শিক্ষার আস্বাদ জানেন, তিনি বহুপথ হেঁটেও তার কাছে যান, চোখের দিকে চেয়ে চুপটি করে বসে থাকেন, কখনোবা ভাঁজ খুলে দেখেন, চকিতে ওঠেন শব্দ করেও। পাঠকমহান নির্দিষ্ট কবিতার কাছে গিয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন (লোকদেখানো ও উদ্দেশ্যমূলক প্রতিক্রিয়ার কথা আলাদা), তার সম্পূর্ণটা কবিতা বা কবি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তা নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থায় নির্দিষ্ট পাঠকের সাথে ওই কবিতার যে যোগাযোগটি স্থাপিত হয়েছে, তাকে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার সাথে কীভাবে মিলিয়ে নিতে পারলেন না-পারলেন তার সাপেক্ষে। এই যোগাযোগটিও আবার নির্ভর করে কোন নির্দিষ্ট ও বিশেষ শ্রেণির শিল্পরূপের প্রতি তাঁর আগ্রহ বা অনাগ্রহ আছে তার ওপর।

প্রশ্নটা তাহলে ঠেকছে গিয়ে সৌন্দর্যে, যা পাঠককে আক্রান্ত করে। সৌন্দর্য ভোক্তার চিত্তাভ্যন্তরভাগে সংঘটিত ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ফলজাত একটা উপলব্ধি। কোনো শিল্পবস্তু ইন্দ্রিয়-সুখকর হলে এবং বুদ্ধিবৃত্তির খোরাক জোগালে তা ভোক্তার মধ্যে এই উপলব্ধির জন্ম দিতে পারে। সৌন্দর্যের এ ধরনের উপলব্ধি মনোমুগ্ধকর। সৌন্দর্যের অনুভূতিটা জন্মায় এ কারণে যে, এর দ্বারা পাঠক নতুন এক ভাষাসত্যের সামনে দাঁড়ান, যা তাঁকে ভাবায় ও তৃপ্ত করে। এর ফলে ঘটে তাঁর চৈতন্যের বহুস্তরিক উন্মোচন। এ প্রক্রিয়ায় তা আর কেবল আনন্দ থাকে না, ধারণ করে ওঠে আনন্দ ও উপযোগিতার এক সমন্বিত রূপ। যেজন্য মানুষ শিল্পবস্তুর কাছে যায়, বারবার ফিরে ফিরে যায়।

সাত.

কবিতা প্রতিবেদন নয়; প্রতিবেদন তথ্যজ্ঞাপক আর কবিতা অনুভূতিজ্ঞাপক। মহান পাঠক কবির দেওয়া তথ্য নয়, অনুভূতি দ্বারা সঞ্চারিত হন। অর্থাৎ, কবিতায় পাঠক খোঁজেন অনুভূতিজ জাত্যর্থ, নিজে চাঙ্গা হয়ে ওঠবার জন্য। অনুভূতির ভার বহন করাই কাব্যভাষার কাজ, কাব্যভাষার এজন্য প্রতিবেদনের ভাষা থেকে দূরবর্তী হতে হয়। কবিতায় শব্দ নতুন ব্যঞ্জনায় জেগে ওঠে, পাঠমাত্র পাঠকের মনে এর জন্ম হয়। নবজাত এই ব্যঞ্জনার প্রণোদনায়ই অর্থফাটল ভরাট করে নেন পাঠক। ফাটল কেন থাকে? প্রতিবেদনের পরম্পরা অনুসৃত হয় না বলে। এ ভাষায় ব্যক্তি-বস্তু এক পাতে বসে অভেদ রচনা করে, অচিন্তিতভাবে রূপকায়িত হয়ে লাভ করে ধ্বনির আদর আর চিন্তিতভাবে উপমায়িত হয়ে বইয়ে দেয় শুশ্রূষার মতো বাণী। ব্যক্তিগত মূল্যায়নের সরাসরি অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়েই ভাষা সেখানে এরকম রূপ পায়। এটা হয় অনুভূতিরই তাড়ায়। পাঠকের মনে আবার এটি অনুভূতি জাগাবারও দায়িত্ব পালন করে। কখনো কখনো বস্তু ও ধারণায় এমনকি প্রাণসঞ্চারও ঘটে। পাথরও বাউল হয়, ভয় জোরে কেশে ওঠে।

সংবাদপত্রের পাতায় তো আমরা হামেশাই দেখি ব্যাঙের ছাতার মতো মাদ্রাসাকে গজিয়ে উঠতে, বাজারে আগুন লাগতে। এ-ও তো রূপকই। তাহলে রূপকপ্রশ্নে প্রতিবেদন আর কবিতায় পার্থক্য রইল কই? আছে পার্থক্য। যে রূপক মরে যায় নি, সংবাদপত্র সে রূপক ব্যবহার করতে পারে না। সংবাদপত্রের প্রধান দায় বক্তব্যকে সহজে বোধগম্য করা। সংবাদপত্রের ভাষায় তাই ফাটল শোভন নয়, অনুভূতিজ্ঞাপন তার কাজ নয়, তার কাজ তথ্যজ্ঞাপন। কবিতা যে রূপকের জন্ম দেয়, তার কাজ বোধগম্য হওয়া শুধু নয়, বোধকে প্রসারতা দেওয়া ও উসকানি সরবরাহ করা। কবিতার রূপক সার্থক হলে একসময় সেটা মরে যায়। সংবাদপত্রও তখন পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটি করে দেখতে পারে। কবিতার রূপক এ প্রক্রিয়ায়ই ক্লিশে হতে হতে মরে গিয়ে সংবাদপত্রের ভাষা হবার যোগ্যতা অর্জন করে। ঠিক এ কারণেই সংবাদপত্র যখন সাহিত্যের দায় সামলায়, তখনো মরা রূপককেই তা মহিমান্বিত করে বেশি।

ব্রাত্যজনের ভাষায় উপমা-রূপকের যথেচ্ছ ব্যবহার আছে। যেসব ভাষাকে আমরা অশ্লীল বলে অভিযুক্ত করি, সেসব ভাষায় শক্তিশালী সব রূপকের উপস্থিতি থাকে। যিনি অকথ্য গালি খান তিনি যে দ্রুত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বা পালটা গালি দেন, এটা প্রমাণ করে যে, ওই নির্দিষ্ট প্রয়োগটা খুব দ্রুত শ্রোতাকে স্পর্শ করেছে এবং তার মনে পালটা অনুভূতির উদ্রেক করেছে। এটা রূপকেরই শক্তি। সাধারণ মানুষের মুখের কথা তাই কবির জন্য ব্যাপক অনুধ্যানের বিষয় হয়ে ওঠে। কবির কেন হবে শুধু? সকল লেখকেরই, সকল ভাষাকর্মীরই হয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, তীব্র আক্রমণাত্মক রূপকাশ্রয়ী গালাগালির ঘটনাগুলো যখন ঘটে তখন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চারপাশে ভিড় করে ওঠে। কী বলে না-বলে তা তারা মন দিয়ে শোনে। কেন শোনে এসব? কারণ এ ভাষা দারুণভাবে বোধ্য, অর্থময়, নাটকীয় অভিব্যক্তিসম্পন্ন ও দ্রুত সঞ্চারণশীল। মানুষের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা মন্দাগুন এ ঘটনায় চাড়া দিয়ে ওঠে। তাই জন্যে সেটা হয় আনন্দময়, সম্ভবত।

অধুনা বিকশিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বাংলা ভাষায় নোটানোটি শুরু হয়েছে বেশিদিন নয়। তারও আগে শুরু হয়েছে বাংলা ব্লগ। এসব মাধ্যমে ছদ্মনিক নিয়ে আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের এমন এক চূড়ান্ত অবস্থা মাঝেমধ্যে দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠে যে, তা বস্তির গালিকর্মকেও ছাড়িয়ে যায়। দেখা যায় যে, যেসব পোস্টে এ ধরনের কাণ্ড ঘটে সেসবের পাঠক বেড়ে যায়। হিট সংখ্যা হয় অনেক বেশি। ব্লগে হিট গণনা করা গেলেও ফেসবুকে সেটা করা যায় না। তবে এখানেও যে বিস্তর মানুষের আগমন ঘটে তা কতকটা বোঝা যায় কমেন্টের বহর দেখে। ফেসবুকে এসব ছদ্মনিকের গালিবাজি প্রতিরোধের জন্য একাধিকবার আন্দোলন গড়ে তুলবার চেষ্টা করেও বিশেষ সাফল্য পাওয়া যায় নি। বাকস্বাধীনতা ও স্বরবৈচিত্র্যের পক্ষে ভোট দিয়ে অনেককেই এখানে প্রকাশ্যে বলতে শোনা গেছে যে, তাঁরা নিকদের কথাবার্তা এমনকি পছন্দই করেন। ফলাফল থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছা কখনোই যাবে না যে, নিকসমর্থকদের প্রত্যেকেরই গোপনে একাধটা নিক আছে। তাঁদের আকর্ষণের একটা কারণ নিকসমূহের রূপকবহুল ভাষাও। যাঁরা এসব প্রশ্নে চুপ করে থাকেন, ধারণা হয় তাঁদের মনেও হয়ত নিকদের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন সমর্থনই প্রকাশ পায়। তা নইলে কথিত নিকদের বন্ধুতালিকা থেকে মুছে দেবার ব্যাপারে তাঁরা অনাগ্রহ প্রদর্শন করবেন কেন? এঁদের সবাই তো আর আক্রান্তের শত্রু নন যে, শত্রুর পরাস্ত হওয়া দেখে তাঁরা আনন্দ নেবেন। আনন্দ আসলে তাঁরা নেনই, তবে সে আনন্দটি আসে ভাষা থেকে, রূপকের ব্যবহার থেকে। আমরা আমাদের পাঠক জীবনে এমন অনেক গদ্যরচনার আস্বাদ নিয়েছি, যাকে আমরা বলেছি কাব্যগুণসমৃদ্ধ। এই বিশেষণ প্রয়োগের প্রধান কারণ সে ভাষার পরতে পরতে বস্তুত জেগে উঠেছে সপ্রাণ বাদ্যি, রূপকের ঢাক।
   
আট.

ভালো কবিতার ব্যাখ্যা পরিবর্তনশীল। পাঠকভেদে এর অর্থ তো আলাদা-আলাদাভাবে খোলেই, এমনকি একজন পাঠকের কাছেও উপর্যুপরি পাঠে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ধরা দেয়। যে কবিতার এ সম্ভাবনা আছে সে কবিতা বহুজনকে ছুঁতে পারে। গুমরমুক্ত ও একটিমাত্র সরল অর্থে ধরা দেওয়া একরৈখিক কবিতা হীনপ্রায়। কবিতায় অর্থের এই অস্থিরতা রহস্যময়তা সৃষ্টি করে করা সম্ভব। সময়ের জীবনছন্দ ধরে শব্দকে বাঁধাধরা পরিভাষার আওতা থেকে বের করে এনে দ্ব্যর্থক বা অনেকার্থক মানে জাগিয়ে তুলতে পারলে এ সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে সূচিত হতে পারে। এর জন্য উল্লম্ফন কার্যকর নয়, নন্দনগহ্বর তক বড়োজোর পাঠক নিতে রাজি হন। বাক্যের ওপর নিরর্থকতা বা অনর্থকতার ভার চাপাতে চাইলে ফাঁকি সৃষ্টি হয়, রহস্য নয়। অদূর এমনকি সুদূর চেষ্টায় হলেও শব্দ-বাক্যের নাগাল মিলতে হয়, তা নইলে কবির সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। যাই হোক, এরকম কবিতার মানে কোনো একটি স্থির নির্দিষ্ট পাটাতনে দাঁড়ানো থাকে না, বলাই বাহুল্য।

সাধারণীকৃত বক্তব্যের ক্ষেত্রেও কবিতার মানে নানাদিকে খুলবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একইসঙ্গে গাছের-মাছের, জীবন্মাত্রের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে সাধারণীকরণ। প্রতীকের ব্যবহারও কবিতাকে অনেকার্থকতা দিতে পারে। প্রতীক বস্তুটি বাইরে একটা মানে ধরলেও ভিতরে আরেক বা অনেক। প্রাথমিক পাঠে এর বহির্বাটির খোঁজ পাওয়া যায়। অগ্রসর পাঠে আস্তে আস্তে নিহিতার্থের দরজা খোলে। এক ধরনের পাঠক বাইরের মানেটা নিয়ে তৃপ্ত থাকে। কিন্তু সবাইকে ওই মানে তৃপ্ত করতে পারে না। গুমর বুনে রাখা গেলে তা অগ্রসর পাঠকের খোরাক হতে পারে। ব্যাজস্তুতি-ব্যাজনিন্দাও এ শ্রেণির পাঠকের আগ্রহের আওতায় স্থান পেতে পারে।

নয়.

কবিতা সময়ের জীবনছন্দ টের পায়। জীবন যে মাপে এগোয়, সময় যেভাবে হাঁটে, কবিতাকেও সেভাবে হাঁটতে হয়। তা নইলে সময়ের কবিতা লিখিত হয় না। একজন কবি সমসময়ে যাপনধর্ম পালন করে পঞ্চাশ বা একশ’ বছর আগের কবিতা লিখুন, তা চান না পাঠক। এটা শুধু বিষয়ের বা শব্দার্থেরও মামলা নয়, মামলা ছন্দেরও। প্রতিদিন কবিতায় যুক্ত হচ্ছে নতুন বিষয়, শব্দে যুক্ত হচ্ছে নতুন মানে, ছন্দ কেন পুরোনোটাই থাকবে? নতুন মোড়কে পুরোনো জিনিস যেমন প্রার্থিত নয়, তেমনি নয় পুরোনো মোড়কে নতুন জিনিসও। কাজেই ভেঙেচুরে ওর বারোটা বাজিয়ে দিতে হয় যে কোনোভাবে।

ছন্দের ব্যাপারে একটা কথা প্রায়ই ওঠে, যে, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দকে ভালো করে জানলেন না বুঝলেন না তিনি ছন্দ ভাঙবার অধিকার পাবেন কোন বিবেচনায়? খুবই সংগত কথা। জেনে ভাঙাই ভালো। কিন্তু যিনি ওটা ভালো করে জানবার-বুঝবার তাড়নাই বোধ করলেন না ভিতর থেকে, ভাবলেন একটা শৃঙ্খল, তাঁকে ব্রাত্য চিহ্নিত করবার অধিকারও কেউ রাখেন না।

প্রয়োগের উদাহরণসহ ভালো করে প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দ শেখা সপ্তাহখানেকের মামলা মাত্র। নিজে প্রয়োগে স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠতে মোটমাট আরো তিন মাস। একজন লেখক তাঁর লেখক জীবনে কাড়ি-কাড়ি জটিল বইয়ের এদিক দিয়ে ঢুকে সম্পন্ন হয়ে যদি ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন, তাঁর কাছে এক সপ্তাহের ওই কথিত আয়োজনটা যে গুরুত্বপূর্ণই মনে হলো না, এর কারণ অনুসন্ধান করে দেখাও জরুরি বৈকি। কবিতা বস্তুত মুক্তি চায়। তা এমনকি বিখ্যাত কবিতাবলিঘনিষ্ঠ কাব্যিক ঐতিহ্য, তার আবহ, শব্দরুচি, বাক্যগঠনশৈলী, বিষয়ভাবনা থেকে শুরু করে তাত্ত্বিক ভার, আভরণের ঘটা, ছন্দ সবকিছু থেকেই। এই মুক্তির মন্ত্রে যিনি বুঝেশুনে দীক্ষা নেন, তাঁর কাছে খোঁয়াড়প্রতিম একটা আয়োজনকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতেই পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দের নিটোল ব্যবহারে শাসিত অনেক কবিতার দিকে ঘনিষ্ঠভাবে তাকালে দমবন্ধকর অনুভূতি হয়। মনে হয় ওখানকার শব্দেরা, বাক্যেরা যেন মাত্রাতিরিক্ত শাসন সয়ে রীতিমতো কাঁচুমাচু হয়ে আছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না। বনসাই বনসাই একটা চেহারা। এ অবস্থা থেকে যত দ্রুত বেরোনো যাবে ততই মঙ্গল।
একটা কথা বলা হয় যে, ছন্দ কবিতাকে স্মৃতিতে রক্ষিত হতে সাহায্য করে। সে তো করেই। কিন্তু এ বিবৃতি কি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক তিন প্রবীণ ছন্দের বেলায়ই প্রযোজ্য? যিনি এই ছন্দগুলোর খড়্গের নিচে গলা বাড়িয়ে রাখেন না, তিনিও কি কবিতা ছন্দেই লিখেন না এক ধরনের? কবিতা হতে হলে টেক্সটের মধ্যে ভাষার যে সামঞ্জস্য তৈরি হতে হয়, গতি অব্যাহত রাখতে হয়, পাঠস্বাচ্ছন্দ্য স্থাপিত হতে হয়, এ কি কোনো ছন্দ তৈরি করে না? জীবনছন্দ কি ছন্দ নয়?

তরুণ কবিদের মধ্যে অল্প কয়েকজন সদস্যসম্বলিত একটি গোষ্ঠী বাংলা প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দ তো বটেই, এমনকি সংস্কৃত ও বৈদিক ছন্দেও কবিতা লিখছেন এবং ছন্দে না-লিখলে কবিতা কবিতা হয়ে উঠবে না বলছেন। এর বিপরীতে অন্য আরেকদল ছন্দকে অপ্রয়োজনীয় বলে সম্পূর্ণ বর্জন করবার পক্ষে উচ্চকিত ভাষণ দিচ্ছেন এবং ছন্দে লিখলে কেবল ছড়ামাত্র হয়ে উঠতে পারে বলে দাবি করছেন। সাময়িক বিরতি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এঁরা প্রায়ই বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক ছাপিয়ে রীতিমতো বাকযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ব্যক্তিগত সম্পর্কে ইতি টানেন। আমার কাছে এই দুই দলের কার্যকলাপকেই আপত্তিকর মনে হয়, দুই দলের সদস্যদের মধ্যেই গোঁড়া মৌলবাদী বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি দেখতে পাই।

জানা কথা যে, শিল্প-সাহিত্যে কোনো সর্বজনীন মত নেই, থাকা সংগতও নয়। ফলে নিজ নিজ শিল্পরুচির অনুকূলে নিজের কাজটি করবার পাশাপাশি অন্যের শিল্পরুচির প্রতি শ্রদ্ধা থাকাটাও আবশ্যক। অনেকরকম লেখায় কবিতাঙ্গন বর্ণিল হয়ে উঠলে কার কেন কীভাবে সমস্যা তৈরি হয় তা বোঝা মুশকিল। ক্ষুদ্র একটি লেখকসমাজের ভাবনাবৈচিত্র্যকে যাঁরা মেনে নিতে পারেন না, তাঁরা বাংলার বহুত্ববাদী সমাজচরিত্রের হাজার বছরের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখায় কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবেন বলে তো মনে হয় না। এসব লেখক দিয়ে আমরা কী করব আখেরে?

সবিশেষ, আমাদের দরকার উৎকৃষ্ট কবিতা। কবিতাটি কোন প্রক্রিয়ায় হয়ে উঠল, শৃঙ্খলের ভিতরে থেকে নাকি বাইরে এসে, সেটার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। কিন্তু শৃঙ্খল ছিল বলে মুক্তির পক্ষে কিংবা মুক্ত ছিল বলে শৃঙ্খলের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তরবারি শানানো অবশ্যই বন্ধ হওয়া দরকার।
   
দশ.

একজন কবিতাকর্মী হিসেবে আমি মৌলিক কবিতাই লিখতে চাই। কিন্তু মৌলিক কবিতা বলতে আমি যা বুঝি, বাস্তবিক অর্থে ওটা একটা ঘোড়ার আণ্ডা! যেদিকেই তাকানো যায়, দেখি কেবল ক্রাফটসম্যানশিপের বাহাদুরি, অন্যের জানালা দিয়ে আকাশ দেখার কেরামতি। যেন এই-ই হতে হয়, যেন এই-ই একমাত্র পথ, অবিকল্প। কেউ ট্রুকপি বানায়, কেউ শব্দ ধরে ঝুলে পড়ে, কেউ ছন্দ ধরে লাফায়। ঝুলতে ঝুলতে, লাফাতে লাফাতে যেখানে গিয়ে পৌঁছায়, তা আসলে অন্য কারো যতনে গড়ে তোলা বাড়ির আঙিনা বা অন্য কারো হাসিল করা চাষভূমি; অকর্ষিত কোনো প্রান্তর নয়।

এই-ই চলছে দিকে দিকে। এই চলার চলনদার যারা, দলেবলে ভারী বলে এরা সদাপট বিচরণ করে। উচ্চকণ্ঠে কথা বলে। বাণীশাসন চালায়। ঘটনাক্রমে এই বাণীবিদরা উজ্জ্বল, চলনে-বলনে ও দেখায়। এদের চেকনাই কাজেই নবাগতকে দুর্দান্ত আকর্ষণ করে। নবাগত হারিয়ে যায় চেনা ও অচেনার মিশ্রণ দিয়ে বানানো আণ্ডার ভোজে। এরা তখন জানপ্রাণ দিয়ে নামে বাণীবিদদের শিখিয়ে-পড়িয়ে দেওয়া কথা প্রচারে।

এই আণ্ডাবাজরা সাহেবি সমাজের লোক, মাটি ও মানুষঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতাহীনতায় নিরক্ত, পাণ্ডুরোগে ভোগা পাঠক। এরা পাঠ করে উপভোগের জন্য নয়, ছাঁচের সন্ধানে। পছন্দসই ছাঁচ পেলে পুরোনো কথা ফেলে নতুন কথা ঠেসে দেয়। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে অচেনা বানাবার, আসলে হয় না। আগের বাড়ির পালানে যেখানে লিচু গাছ ছিল, সেখানে রেইনট্রি গাছ লাগায়; যেখানে ইঁদারা ছিল সেখানে নলকূপ বসায়। এ ছাড়া, নতুন পোশাকের ভিতরে আর সব একই থাকে। যে কারণে পড়তে গেলে নস্টালজিক লাগে, কেমন যেন একটা চেনা স্বাদ, আবার চেনাও নয় অবস্থা। এই চেনা-অচেনার মিশ্রণ ব্যাপারটা মাধুর্যের এক ঘোর তৈরি করে, ওই ঘোরই করে সম্মোহিত। অল্পপ্রাণ পাঠক তখন হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার ওপরে। ভাবে, এটাই হয়ত চিরন্তন মাধুর্যপুরীতে পৌঁছুবার অবিকল্প সিঁড়ি!

মৌলিক কবিতা তত্ত্বীয়ভাবে কবিতা নির্মাণের এহেন সংস্কৃতি থেকে দূরে সদভিজ্ঞতাজাত, নতুন। যে অভিজ্ঞতা কবি নিজে ছুঁয়েছেন, অর্জন করেছেন, তা-ই সে কবিতার ভিত। কবিতা কমবেশি বানানো জিনিস সন্দেহ নেই, কিন্তু এর গভীরে কাজ করা অভিজ্ঞতাটা ধার করা হলে মুশকিল। যখন প্রত্যক্ষ সদভিজ্ঞতা কবিতা রচনার পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করে, তখন সে কবিতার মৌলিক হয়ে ওঠবার সম্ভাবনা প্রভূত, যদি অন্তত চালাকি করে কোনো ছাঁচ এনে ওর ওপরে চাপিয়ে দেওয়া না হয়। এরকম কবিতা পাঠকের কাছে মূলতক অচেনা লাগে, চাই কি অপ্রিয়ও। পাঠকের যাপনের নস্টালজিয়াবোধ জাগিয়ে তুলবার মালমশলা তাতে থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু সজ্ঞানে সেখানে চাপানো থাকে না পুরোনো কবিতার রূপরসগন্ধ। এসব বৈশিষ্ট্য ধরে বলেই কবিতা মৌলিক হয়ে ওঠে বা ওঠবার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

আমাদের যাপনের সাথে যুক্ত জলমাটিহাওয়ার সিংহভাগই এখনো অকর্ষিত, অন্তত কবিতায়। আধুনিক কবিতা নামের বিদেশাগত শৈলী ও শ্বাসপ্রশ্বাসের দিকে কোমরবেঁধে তাকিয়ে না-থাকলে চোখমাত্র খুঁজে পেতে পারে সেই অকর্ষিত অঞ্চল। বর্তমানে জীবনানন্দ পাঠকমাত্রের কাছে প্রিয়তর (তাঁর কবিতা বিদেশি শিল্পচিন্তাপ্রসূত হলেও), তা বলে আমাদের জীবনানন্দ হবার দরকার নেই। জসীমউদদীন আমাদের আত্মীয় (তাঁর কবিতা বাংলার লোকবেদনাপ্রসূত বলেও), তা বলে আমাদের জসীমউদদীন হবারও দরকার নেই। আমরা হবো আমাদের মতো। আধুনিক শিল্পচিন্তা আমাদের শত্রু নিশ্চয়ই নয়, লোকবেদনাও ফেলনা বিষয় নয়। আমাদের দুটোই দরকার। কিন্তু মুখস্থ শিল্পচিন্তাকে থাপ্পড় কষানোরও দরকার আছে, লোকবেদনা বলতে কেবল গ্রামীণ শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জীবনযন্ত্রণা ভাবাকে ভোলার প্রয়োজন আছে। গ্রাম-শহর সর্বাংশের মানুষই মানুষ, সবাই কবিতা। এইসব কবিতাকে জানতে বুঝতে চাই সউদ্ভাবিত শিল্পচিন্তা, যেটা অন্য কারো নয়, কেবল নিজের। সেটা কেমন হবে, যতক্ষণ করে ওঠা না হবে ততক্ষণ কেউ জানবে না। আগে জেনে শিখে ছাঁচ তৈরি করে করা দরকারি নয় এটা। করতে করতে হবে। কীভাবে হলো তা নথিভুক্ত হবে পরে। এই পথে যেতে যেতে কখনো এমন কোনো প্রান্তরে গিয়ে পৌঁছা যেতে পারে যেখানে আগে কেউ পৌঁছে নি কবিতা কারণে।

সেজন্য ছন্দ এবং অছন্দেরও নতুন ধরন দরকার। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত : চিরকাল এই তিনটি ছন্দই মাড়াতে হবে তার কোনো মানে নেই। জগতের সবকিছু বদলে যাচ্ছে, ছন্দও বদলানো চাই। ছন্দ বানাতে হবে, মানে ছন্দের নতুন চাল। তা যদি না হয়, তবে কথা বলার আনকোরা নতুন তাল-লয়।

বিষয়টা যতটা লেখকের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার, ততটা অন্যের বলে দেবার ব্যাপার নয়। লেখক নিজেই জানবেন তিনি আসলে কী লিখছেন। কপি করা খাপে কথা ঠেসে দিচ্ছেন নাকি নিজের অবিকল্প অভিজ্ঞতাকে নিজের মতো করে গেঁথে তুলছেন। মৌলিক কবিতা তিনি কখনো লিখেন না, যিনি মনে করেন মৌলিক কবিতা লেখা অসম্ভব। মৌলিক কবিতা তিনি কখনো লিখেন না, যিনি প্রতিনিয়ত হাততালির বাসনায় কাতর হয়ে থাকেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন কবি শতভাগ মৌলিক কবিতা লিখতে পারেন কি না। আমি যে বিভিন্ন সময়ে দেশি-বিদেশি কবি-লেখকদের শত-সহস্র লেখা পড়ছি, দেশি-বিদেশি সিনেমা উপভোগ করছি, চিত্রকর্মে বুঁদ হয়ে থাকছি, নাচ-গান দেখছি-শুনছি, এগুলোর কোনো ভালোমন্দ অভিক্ষেপ কি আমার মধ্যে পড়ে না? যদি পড়ে তবে তার কি কোনো প্রভাব নেই আমার কবিতায়? নিশ্চয়ই আছে। না-থেকে পারেই না, যদি জার্মান নাট্যকার লেসিংয়ের এই বক্তব্যটি সত্য হয় যে, ‘মাসুল না-দিয়ে কেউ পাম গাছের তলায় হাঁটতে পারে না’। গ্যাটে তাঁর ‘ইলেকটিভ এফিনিটিজ’ গ্রন্থে উদ্ধৃতিটি একই অর্থে ব্যবহার করেছিলেন জেনে বাক্যটির নিহিত গুরুত্ব আরো গুরুত্ব লাভ করে। এর মানে হলো, কিছু প্রভাব আছে যেগুলোকে বলা যায় স্বতঃপ্রভাব। এগুলো এড়ানো অসম্ভব।

কবিতার জন্ম হয় নিজস্ব আনন্দ-বেদনার থেকে। এটা যতক্ষণ নিজস্ব ততক্ষণ তা সৎ। ভুল বুঝবার অবকাশ দূর করতে বলা দরকার যে অন্যের আনন্দ-বেদনাও নিজের হতে পারে, দেশের আনন্দ-বেদনাও নিজের হতে পারে, যদি তা কবিকে ভেতর থেকে স্পর্শ করে। যতক্ষণ স্পর্শ করে না, ততক্ষণ অন্যের আনন্দ-বেদনা নিজের আনন্দ-বেদনা হয় না। এরকম অবস্থায় ওই বিষয়ে লেখা কবিতা খুব জলো ও খেলো, ওপরভাসা ও হাস্যকর হয়। দেশের কবিতা, বিশেষ করে অধিকাংশ দেশের গান প্রায়ই হয় ওপরভাসা, মিথ্যা-আবেগে ঠাসা। ওগুলো নীতিকথা হিসেবে, শিক্ষার্থীপাঠ হিসেবে ভালো জিনিস, কিন্তু কবিতা হিসেবে সাধারণত প্রায়ই হয় নিকৃষ্ট। দেশের কবিতা কখনোই সদাবেগ দ্বারা লিখিত হয় না বা লেখা হতে পারে না, তা নয়। ষাটের দশকে, মুক্তিযুদ্ধকালে সেরকম সময় ছিল আমাদের। এখন যেরকম সময় বিরাজ করে ফিলিস্তিনে।

নিজস্ব আনন্দ-বেদনার সৌকর্যময় ভাষিক প্রকাশকেই আমরা কবিতা বলি। এ হয় আত্মাজারিত সদোচ্চারণ। এর প্রকাশবাসনা মানুষের সহজাত। অন্তর্গত একটা তাড়না মানুষকে খোঁচায় প্রকাশসক্ষম হতে। প্রকাশবাসনা থাকলেও প্রকাশসক্ষমতা সবার থাকে না। যার থাকে তিনি কবি হবার দিকে হাঁটেন, যার থাকে না তিনি শুয়ে-বসে থাকেন!
এ আলাপের ভিত আরো মজবুত হতে পারত, যদি কথিত মৌলিক ও অমৌলিক কবিতার উদাহরণ হাজির করে কথা বলা যেত। সেটা করা যেত না তা না, কিন্তু করা হয় নি। করা হয় নি কারণ পাঠকের জন্য সেটাও অন্যজনের স্থাপিত বাতিঘরের দিকে তাকিয়ে জগজ্জীবনকে উপলব্ধি করা হতো। এ আলাপের অভীষ্ট কোনো বিতর্কের মাঠে রণসজ্জায় হাজির হওয়া নয়, বরং ভিতরপ্রদেশে এক সদাকাঙ্ক্ষার জাগরণ, যা খুঁজে দেখবে সম্ভাবনাময় চাষযোগ্য আত্মগত অকর্ষিত ভূমি, যার যে কোনো অবস্থায় মৌলিক হবার সম্ভাবনা শতভাগ। ক্রাফটসম্যানশিপের বর্তমান রমরমা সময়ে যা হয়ে উঠতে পারে মৌলিক কবিতার এক ক্রমাগ্রসরমান বিপ্লবী মিছিল।

মনজুর কাদের সম্পাদিত 'কঙ্কাল'-এ প্রকাশিত, ২০১৯

Sunday, August 16, 2009

বালখিল্যকথন

কবিতা হলো কবির জীবনের একটা পরিস্রাবিত দ্রবণ, পরিপার্শ্বের তাপে গলা, যে-দ্রবণে মিশে এসে সমুদয় ভালোমন্দ অর্জনের ভাঁপ, ক্লেদ-গ্লাণিসহ। এসবের ভিতর দিয়ে যাওয়া, ডান-বাম দেখে, পাশ দিয়ে কে যায় না-যায় তার তল্লাশ জারি রেখে। যেসব জিনিসকে মানুষ উপেক্ষা করে আসে, যেসবকে রেখে আসে পরে কাজে দেবে ভেবে, সেসবের দূরাভাও থাকে। প্রান্ত ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পানির মতো প্রয়োজনীয়তা সকল, সেসবকে যথাসম্মান দিয়েও বর্জ্যপ্রায় পরিত্যাজ্য বস্তু ও বস্তুভাবনার চরাচর চুঁইয়ে নেমে আসা অবিরল জলের দিকেও মাঝেসাঝে তাকাতে হয় ফিরে। কাকে নিতে হবে কাকে রাখতে হবে এসব ঠিক করে দেয় মেজাজ, যেটা সমাজঘটনা দিয়ে মোড়া। যে সুবিধা, যে অসুবিধা বিরাজ করে ভূয়ে, যখন যাপন করেন কবি, কবিতায় তার নিঃশ্বাসধ্বনিটাই বাজে। মানুষ দেখে দেখে শেখা মহাকালবোধ, এইখানে চুপিসারে এসে মেশে।

ভয়ের রক্তচক্ষুকে যুক্তির আঙুল দেখিয়ে থামিয়ে রাখা, অথচ ভেসে থাকা গোপন এক ভীতিভাবে। সভ্যতার নিঠুরাবেশে যতসব হুংকার দিকপাশে বাজে, নাতিদূরে ঘোরঘাটে খেলে ওঠে যতসব সন্তরণ লীলা, এসবেরও আঁচ রাখতে হয়, কোথায় কোথায় ভীতি সেই কথা সামনে না-এনে। ঘোর সেই পাললিক পরিসর নেচে ওঠে ধ্যানমগ্নতায়। পাঠককে গ্রস্ত করে ঘোর, আনে সম্মোহন। শুকনো পাতার সাথে উড়ে উড়ে ঝরে পড়ে পালকের আগে। মেঘসম্ভব গাম্ভীর্য ভেঙে বৃষ্টিধারা বয়।

বেদখল হয়ে যাওয়া ভূমির বেদনা রোদের আঁচে তাতিয়ে নিয়েও বড়োসড়ো অভিযোগ কাঁধে নেয়া, তার ভার। ঘরের ভয় ও পথের ভয় আলাদা-আলাদা, ওইসব হাতের চউলে নিয়ে দেখা। সামনে তাকিয়ে দেখা কারা কারা পথে নেমে গেছে, লাল-নীল। নানাদিকে হাত উঠিয়ে থাকা। পথ বন্ধ হয়ে থাকে পুরো, বড়ো নির্যাতন সয়ে তবু ওর দিকে যেতে হয়। আমোদে-আহ্লাদে যাওয়া দরকার যেইদিকে, সেদিকের প্রেমকুঁড়ি গাছ, তার ডালপাতা মূলটুল স্থান করে নেয় যথারীতি। সব করে নিতে হয় নিজেই প্রস্তুত। যারা অপেক্ষা করে থাকে যত্নের, কত তারা ধরে মিছে সত্য, তুলে আনতে হয় ওরে ধরে, তারপর শুরু হয় বাগানবিলাস। অধিগত নয় যেটা, তাকে ঘিরে অপচয় বাড়ে, তবে এরও নিগূঢ় আঁচড় থাকে মিলেমিশে, যদিও দরকারি এর থেকে দূরে বাস করা, নিজের মতো করে, ঘাড়টাকে যথারীতি ত্যাড়া করে রূপার কপাটে দিয়ে খিল।

হয়ত শোনা গেল ধনচে শিশুর কোলাহল, একপাশে থেকে যেতে পারে কোনো প্রেমময় কথার ঝিলিকও। তাকানো দরকার নেই জেনেও তাকানোর মরশুমে চোখে চোখে গেঁথে নেয়া জিওল ভাবনা। খটখট-ঘটঘট হয়তবা দূরে ঠেলে রেখে যায় সবিশেষ কামভাব, অবদমনের কোনো দমনচেষ্টায় বুঝি থরে থরে সাজানো থাকে এইসব কর্মের ডালা। যে ধ্যানে পৌঁছা যায় না, সে ধ্যানের ভিতর দিয়ে আসা মনে মনে। সেরকম ধ্যানের মায়ায় বুঝি লাল চেলি ভুলে গিয়ে অকুল-আশার গলে মালা দেয়া। অজ্ঞতা ছায়ার মতো লেড়েল্যাপ্টে থাকে, বোধকরি থাকতেও হয়। এই সবকিছু মিলেমিশে বিচিত্র রূপগুণ নিয়ে যেটা আসে, সেটাই কেবল হয় মহাকালমুখী, কোনো-না-কোনোভাবে।

২.

এই-ই সব, যেন এই-ই সব। যদি হয়ও তা, এ ধারার তরল বর্ণনার চেয়ে তা করে ওঠা কঠিন। আর শুধু করে ওঠাই বা বলি কেন? বলাটাই বা সহজ হবে কী প্রকারে, যে বলা প্রকৃত বলা? যদিও প্রকৃতটা বলা এক্ষেত্রে নিতান্তই অসম্ভব, কারণ কবিতা শিল্প। শিল্পের কীভাবে এমন সংজ্ঞা হতে পারে যা সর্বজনীন? স্বপ্রণীত সংজ্ঞাযোগে ধারকাছ দিয়ে হয়ত যাওয়া যায় তার, কিন্তু শতভাগ ঠিক ঠিক জায়গাটা শনাক্ত করা যায় না এর। আমরা তবু চিনতে চাই একে স্ব স্ব অভিজ্ঞতা ও জানাবোঝা দিয়ে। বুঝতে চাই যে, কোনপথে হাঁটলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় ও হাঁটার ভঙ্গিটা ঠিক কী হলে রচিত কবিতায় ভর করে এসে সুন্দর।

স্থান-কাল-পাত্রভেদে সর্ববাদীসম্মত সংজ্ঞাহীন সুন্দরের মান ও মানে বদলে যায়। সুতরাং একজন কেউ যখন সুন্দরকে চিনাতে যান, কবিতার সুন্দর, তখন তা প্রধানত হয় ওই কথকেরই মতো। আর যাঁরা যাঁরা নির্দিষ্ট কথকের মতো করে ভাবেন, বা দেখেন কথকের ভাবনার মধ্যে তাঁর/তাঁদের ভাবনার কোনো খোরাক আছে সামনে এগোবার, বা ধরা যাক এমন কেউ যিনি ঠিক উলটো করে ভাবেন বা ভাবতে চান কথকের চেয়ে; কথককে ছাড়া আর কেবল তাঁর তাঁর কাছে এসব বলাবলির কোনো মানে থাকলে থেকেও যেতে পারে।

৩.

‘ভাষাই বড়ো ব্যর্থতা ব্যর্থ লেখকের’— এ কথায় মনেপ্রাণে আস্থা না-রাখবার কোনো কারণ ঘটে নি এখনো। লক্ষ করলে দেখা যায় যে, কোনো কোনো লেখক অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা অনেক অর্থপূর্ণভাবে বলেছেন, কিন্তু ভাষাগত বিশেষত্ব ও বাগসংহতি না-থাকায় তা পাঠককে ছুঁতে পারে না। কবিতায় ভাষার ব্যবহার হতে হয় অব্যর্থ ও যথাযথ। যোগাযোগসহজতা তার একমাত্র বিবেচনা নয়। বিবেচনায় থাকে উচ্চারণসহজতা, প্রত্যাশিত গাম্ভীর্য সৃষ্টির লক্ষ্য ও অর্থ প্রসারণ চেষ্টাও। অবিবেচকের মতো অবান্তর শব্দনিক্ষেপ কবিতাকে সিদ্ধির কূলে পৌঁছতে দেয় না, বরং চরে আটকিয়ে দেয়। পুরো কবিতার শব্দবিন্যাস সামঞ্জস্য ও সংগতিপূর্ণ হওয়া লাগে। তবেই কেবল তা সংগীতের দিকে এগিয়ে যায়।

ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। ভাষার এই পরিবর্তনের গতিটা কোনদিকে সেটা আন্দাজ করা গেলে সবচে’ সুবিধা। যেহেতু একজন কবিতাকর্মী আজকের জন্যই কবিতা লিখেন না, বরং লিখেন আগামীর জন্য, কাজেই আগামীতে ভাষার যে সম্ভাব্য রূপটি দাঁড়াতে যাচ্ছে তা যদি কেউ ঠিকঠাক ধরে উঠতে পারেন, তাহলে তিনিই আগামী সময়ে বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। একজন কবির কবিতা যতদিন প্রাসঙ্গিক ততদিনই তিনি পঠিত হন, এবং ততদিনই তিনি জীবিত। ততদিনই তাঁর লেখার নব নব দরোজা উন্মোচনের সম্ভাবনা থেকে যায়। আর্কাইভড হওয়া একজন লেখকের কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়, প্রত্যাশাও নয়।

লেখককে প্রাসঙ্গিক রাখে কেবল ভাষা নয়, তাঁর বক্তব্যও। নিহিত বক্তব্যকেও সমকালোত্তরণের স্পর্ধা রাখতে হয়। যা আজ লেখা হলো তা আজ তো সমকালীনই, কিন্তু কাল যদি তা পশ্চাৎপদ বিবেচিত হয়, তবে তা ভাষায় প্রাসঙ্গিক হলেও সার্বিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। আজকের বার্তাকে যদি তাবৎ ক্ষমতাযোগে মহাকালের করে তোলা যায়, তবে সেটা প্রসঙ্গ হয় আগামীদিনের। এজন্য ভাবনাচিন্তায় আধুনিক হতে হয়, বিজ্ঞাননিষ্ঠ হতে হয়, নতুনকে গ্রহণ করবার মানসিকতাসম্পন্ন হতে হয়, কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে হয়। এ হলে ছোঁয়া যায় চিরসমকাল। অর্থাৎ কবির মহাকালকে লক্ষ্যে রেখে শব্দচয়ন, শব্দসজ্জা ও বাক্য নির্মাণ করতে হয়। এটা যে যত ভালো করতে পারেন, তিনি তত বেশিদিন বেঁচে থাকেন। এ বাঁচা শারীরিকভাবে নয়, পাঠকের মধ্যে নান্দনিকভাবে বাঁচা।

পাঠকদের একটা অংশের সঙ্গে কবির যে দূরত্ব তৈরি হয়, তার একটা কারণ মহাকালকে অভীষ্ট ভাবা। এটা সংগতও। এ অবস্থা কারো ক্ষেত্রে খুবই প্রকট আকার ধারণ করে, কারো ক্ষেত্রে অপ্রকট। কিন্তু এ কখনো নয় যে, পাঠকঅপ্রিয় কবিমাত্রই মহাকালের সওদাপাতিতে ব্যস্ত। পাঠকঅপ্রিয়দের একটা বড়ো অংশই অল্পপ্রাণ কবি অথবা অকবি। পাঠকপ্রিয়দের মধ্যে এ সংখ্যা আরো বেশি।

৪.

একটা বহুশ্রুত প্রবাদ আছে আমাদের সংস্কৃতিতে, ‘ঝিকে মেরে বউকে শেখানো’ বা ‘বউকে মেরে ঝিকে..’,। এই প্রবাদোপরিতলে যে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট, কবিতায় প্রতীক ওই কাজটিই করে। যে বস্তুকে বা যাকে বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে তার কথা না-বলে বর্ণিত বস্তু বা ভাব বা ঘটনার বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঠিকঠাক ঘটে এমন কিছু দ্বারা মূলকে প্রতিস্থাপিত করাই প্রতীকায়ন। আড়াল সৃষ্টির জন্য এবং সৌন্দর্য নির্মাণের জন্য এটির দরকার হয়। শিল্পে প্রতীকের ব্যবহার খুব প্রচলিত ঘটনা। সঠিক প্রতীক ব্যবহার করতে পারা বিষয় ও বিষয়সংশ্লিষ্ট জগৎ সম্পর্কে অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে। প্রতীককে হতে হয় সুপ্রযোজ্য। একটি প্রতীকের অযথার্থ ব্যবহার একটি কবিতাকে মাঠে মেরে ফেলতে পারে। সব পাঠক সব প্রতীককে ঠিকঠাক ধরতে পারবেন সেরকম ভেবে ওঠা অসংগত। কিন্তু নিবিড় পাঠে তা অধিকাংশ অভিজ্ঞ পাঠকের কাছে গ্রাহ্য হয়ে ওঠা উচিত। ব্যবহার যথার্থ হলে তা না-হবারও কারণ খুব থাকে না। অবশ্য কবি যে অর্থে প্রতীকটি ব্যবহার করেছেন ঠিক সেটাই না-বুঝে পাঠক অন্য কিছুকে বুঝলে মহাভারত ক্ষণিকের জন্যও অশুদ্ধ হয় না, যেহেতু পাঠকই কবিতার ‘মানে’কে জন্ম দেন তাঁর তাঁর মতো করে। কবিতার অর্থ পাঠকভেদে বদলে যেতে পারে, এটাই কবিতার শক্তি। এমনকি বলা চলে স্থিত মানের রচনা কোনো কবিতাই নয়। সেটাই কবিতা, যে টেক্সটের মানে পাঠে পাঠে বদলায়। এটা দূর করবার চেষ্টা কবিতার কবিতাত্ব নিয়ে খানিক সংশয়কে বরং উদ্বেলিত করা।

কবির সময়ে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অনেক কারণ থাকে, যা তাঁকে আড়াল সৃষ্টি করতে বাধ্য করে। এ তাঁর নিজ অস্তিত্ব রক্ষার্থে তো বটেই, শিল্পের কৌমার্য রক্ষার্থেও দরকার। কবির আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নানা ঘটনার দ্রষ্টা হয়ে উঠতে হয়। আর এসবের ভিত্তিতে সামাজিক মানুষ হিসেবে তিনি নানা প্রেরণাও লাভ করেন, আবেগাপ্লুুত হন। কিন্তু খুব সরাসরি তিনি তা বলতে পারেন না। বললে তাঁর উপরে নানা খড়্গ নেমে আসার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া শিল্প হিসেবে কবিতার সব কথা সবভাবে গ্রহণ করবার সক্ষমতা নেই, এটা মনে রাখতে হয়। এত অনর্থক ভার বইতে পারে না কবিতা। যে কারণে কবিকে বক্তব্য আড়াল করতে নানা প্রতীকের আশ্রয় নিতে হয়।

ভাষা সংকেতও আদতে প্রতীক। ভাষার প্রতিটি শব্দ এক বা একাধিক বস্তুর প্রতীক। কলিম খান অবশ্য বলেন, বাংলাভাষার শব্দভাণ্ডারের সবচে’ বড়ো সম্ভার সংস্কৃত ভাষা ছিল ক্রিয়াভিত্তিক। তৎসম শব্দসমূহের মাধ্যমে এ গুণ বাংলা ভাষায় স্বতঃস্থানান্তরিত। ক্রিয়াভিত্তিক ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এর মূল অর্থ হয় ধাতুর। নির্দিষ্ট ধাতু থেকে উদ্ভূত সমস্ত শব্দের অর্থই নিয়ন্ত্রণ করে ধাতুর অর্থ। শব্দব্যাখ্যান কর্মের যে ছবি সামনে আনে, সেই কর্মের বৈশিষ্ট্যই নির্ধারণ করে শব্দটির গঠন কী হবে। এ মতে শব্দের অর্থ বাইরে থেকে আরোপিত নয়, ভিতর থেকে উৎসারিত। পরে মুনাফালক্ষ্যী বিনিময়কে শব্দার্থজাত ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে অধিক লাভজনক করবার জন্য শব্দকে সুনির্দিষ্ট মানেবাহী করে তুলতে কিছু শব্দের অর্থকে সুনির্দিষ্ট করে ফেলা হয়। যে কারণে কোনো-কোনো শব্দের ধাতুমূলগত অর্থ অজস্র হলেও শোনামাত্র কেবল এক-দুটি প্রাণী, বস্তু বা বিষয়কে বোঝায়। এটা স্বাভাবিকভাবে অজস্র অর্থ হওয়াকে আস্বাভাবিকভাবে সীমিত পরিসরে বেঁধে ফেলানো। এর মানে প্রসারিত অর্থকে সংকুচিত করে ফেলা, যেভাবে আমাদের বাংলা ভাষাও, অন্যসব ভাষার মতো প্রতীকী ভাষা হয়ে উঠেছে। সব ভাষাই সময়ের সাথে বদলে যায়, ভিতরে ও বাইরে। সংকুচিত হয় প্রসারিতও হয়। এর অনেকগুলো কারণ থাকে, কলিম খান মুনাফালক্ষ্যী বহির্দেশিয় বেণিয়াদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কারণটিকে নেতিবাচকভাবে দেখেছেন। সংকোচনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।

অমুনাফালক্ষ্যী শিল্পসৃজনের প্রয়োজনেও যে শব্দের অর্থ কালে কালে বদলে যায়, এটাকে তিনি সংকোচনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন নি। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ নামক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে অভিধানকে ভিত্তি করে কলিম খানের ক্রিয়াভিত্তিক ভাষাতত্ত্ব দাঁড়িয়েছে, সেটি সংকলনকাল পর্যন্ত বিভিন্ন মুদ্রিত দলিলে যে সমস্ত অর্থে যেভাবে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তার একটা যথাসম্ভব ভালো ডকুমেন্টেশন, সেখানে সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের উদাহরণসহ প্রাপ্ত অর্থসমূহ নথিভুক্ত হয়েছে। ভাষাসংশ্লিষ্ট সকল সেক্টরেই শব্দের মানে বদলায়, নতুন মানে সংস্থাপিত হয়; এবং শুধু লিখিতভাবে নয় এটা হয় মৌখিকভাবেও। সচল ভাষামাত্রেরই ক্ষেত্রে এরকমটা ঘটে। ভাষা যত বিচিত্র কাজে ব্যবহৃত হয়, তত বিচিত্র হয় এর জগৎ, সমৃদ্ধি। সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম সবচে’ বড়ো সেক্টর, যেখানে এই কাজটা হয় সবচে’ বেশি। এখানে প্রতিনিয়ত শব্দের মানে নড়েচড়ে যায়, প্রসারিত হয়। প্রসারণার্থে শব্দের এই প্রয়োগেরও সাহিত্যে প্রতীকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার কথা, যে ধরনের প্রতীকের ব্যবহার রচনাকে কবিতা করে তোলে। একজন কবিতাকর্মী একইসঙ্গে ভাষাকর্মী। তাঁর একটা কাজ এ-ও যে তিনি ভাষাকে সম্প্রসারিত করেন। ভাষার সম্প্রসারণ ব্যবহারিকভাবে ঘটাতে গিয়ে তিনি একটি কবিতা করলেন এরকম নয়, বরং কবিতা করতে-করতে একইসঙ্গে ভাষাকে সম্প্রসারিত করছেন। কবিতাটি যখন শিল্প হয়ে ওঠে, তখন এই ভাষাকৃতিটা উপজাত।

শব্দে নতুন প্রাণসঞ্চারের এই কাজটি কবিতাকর্মীর একটি মুখ্য কাজ। শব্দ যদি নতুনভাবে খেলে ওঠে, অর্থটা যদি একটু মুচড়ে যায়, তাহলে পাঠক নড়েচড়ে বসে। ক্লিশে মানেযুক্ত করে ক্লিশে শব্দের ব্যবহার মৃত রূপকের ব্যবহার, যা আবার প্রতীকও। কবিতায় পাঠক মৃত রূপকের রাশি-রাশি লাশ দেখতে পছন্দ করেন না।

মিথ হিসেবে খ্যাত লৌকিক পুরাণ বা পৌরাণিক লোকশ্র“তিকেও প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। পৌরাণিক একেকটি চরিত্র বা ঘটনা অতীতের একটা চরিত্র বা ঘটনার গল্পকে ছোট শব্দশরীরের মধ্যে ধরে রাখে। গোটা কবিতায় একটি শব্দ হয়ে ব্যবহৃত হলেও ওর অনেক দীর্ঘ অদৃশ্য ফুটনোট থাকে। শব্দটি ওই ফুটনোটের প্রতীক। একজন কবি অবিকল অর্থেই শব্দটি কবিতায় ব্যবহার করলে ধরতে হবে তিনি মৃত রূপক বা ক্লিশে প্রতীক ব্যবহার করলেন। মিথের এরকম ব্যবহার গতিশীল নয়, নয় প্রগতিশীলও। হাজির করতে হয় এর নতুন বয়ান। পুরোপুরি অথবা অংশত, যেটা প্রাসঙ্গিক। ধরা যাক দেবী দুর্গাকে দশ হাতে কাজ করা গার্হস্থ্যকর্মী সক্রিয় নারীর রূপে দেখা হলো। এ প্রয়োগটিকে পাঠক আরো দূর পর্যন্ত কল্পনা করে নিতে পারবেন, যে, এতকিছুর পরও একজন গার্হস্থ্যকর্মী নারী ‘কর্মী’ স্বীকৃতিটা পর্যন্ত অর্জন করতে পারে না এবং এর জন্য কোনো অর্থমূল্য দাবি করতে পারে না। কাজগুলো অনর্থক না-হয়েও না-অর্থক হওয়ার কারণে এই যে পুরুষতান্ত্রিক বঞ্চনা, এটা তখন হয়ে যেতে পারে ওই নির্দিষ্ট প্রয়োগের একটা তাৎপর্যপূর্ণ আলোকপাত। মিথের এই মুক্তিটা কবিতায় প্রার্থিত।

৫.

আবেগ কবিতার জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ একটা অদৃশ্য ঘটনা যে একে ছাড়া শিল্পসৃষ্টি, বিশেষ করে কবিতা লেখা অসম্ভবপ্রায়। অবশ্য আবেগ ব্যতিরেকেও কবিতামতো দেখতে রচনা তৈরি করা সম্ভব, যেটা অতি অবশ্যই হয় যান্ত্রিক, অতএব কবিতা নয়। এ ধরনের রচনা তৈরিকে পেশাদার কাঠমিস্ত্রির একের পর এক টেবিল-চেয়ার বানানোর সাথে মিলিয়ে দেখা যায়। যতক্ষণ ব্যবহারোপযোগী কাঠ আছে, হাতুড়ি-বাটালি আছে, বাইস আছে, ততক্ষণ কাঠমিস্ত্রি অবিরাম বা সবিরাম চেয়ার-টেবিল বানিয়ে যেতে পারেন। একটি চেয়ার ও টেবিলের শিল্পকর্ম হয়ে ওঠবারও অবকাশ থাকে, কিন্তু পেশাদারি উন্মাদনায় ভেতরের টান ছাড়া নির্মিত চেয়ার-টেবিল তা হয় না। একইরকমভাবে একজন কবিতাকর্মীকে কাগজ-কলম-পরিসর দিলে যখন-তখনই তিনি ছন্দোবদ্ধ কবিতামতো লেখা তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সেটা পেশাদারি উপায়ে তৈরি চেয়ার-টেবিলের মতোই যান্ত্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্যমার্কা একটা ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। পেশাদার ঔপন্যাসিকদের হাতে যেরকম ফল ফলতে থাকে অবিরাম। তাঁরা হলেন বারোমাসী ফলগাছ। বছরে হরদিনই সেসব গাছে ফল থাকে।

সত্যিকার কবিতা রচিত হতে গেলে তার মধ্যে আবেগের পরিমিত প্রকাশ ঘটতে হয়। এই প্রকাশ ঘটায় আবার ইন্সপিরেশন বা প্রেরণা। দাঁড়ালো তাহলে এই যে, যে-প্রেরণার গুত্তো খেয়ে বিষাদ, ক্রোধ বা আনন্দ জাতীয় আবেগ উসকে উঠবে, তার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সৃজিত মানেযুক্ত রচনার কবিতাবস্তু হয়ে ওঠবার অবকাশ থাকে। অর্থাৎ আবেগ যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি অত্যাবশ্যক তার সুনিয়ন্ত্রণ। ধরা যাক, কোনো কারণে অত্যধিক ক্রোধ সঞ্চারিত হলো মনে। ঠিক তৎক্ষণাৎ একটি কবিতা রচনায় উপগত হলে এটির কবিতা হয়ে ওঠবার সম্ভাবনা লোপ পায়। ক্রোধটাকে সামগ্রিকতার ওপরে দাঁড়াবার জন্য সময় দিতে হয়, তাতে তা আর ব্যক্তিগত ক্রোধ থাকে না, হয়ে ওঠে সর্বজনীন, সাধারণ। এই সর্বজনীন ক্রোধ যদি কোনো একটি রচনা উৎপাদনের নেপথ্যে ভূমিকা রাখে, তবে তার মাধ্যমে সৃজিত রচনাটি কবিতা হলেও হতে পারে, এমনকি খুলে যেতে পারে তার সর্বজনীন হয়ে ওঠবার সম্ভাবনাও। চীনা একটি প্রবাদ আছে এরকম যে, রাগান্বিত অবস্থায় কখনো চিঠির জবাব দিতে নেই। কেন? ওই একই কারণে। নইলে যাকে জবাব লেখা হচ্ছে, তার প্রতি অবিচার হয়ে যাবার সম্ভাবনা শয়ে প্রায় শ’। রাগ প্রশমিত হয়ে যখন ব্যাপারটা সূক্ষ্ম ক্রোধানুভূতিতে রূপান্তিত হয়, তখন তার পক্ষে সম্ভব সামগ্রিক অবস্থার মূল্যায়ন করা ও মত স্থাপন করা। ওই প্রাবাদিক সত্যটা কাজেই এখানেও নিহিত।

কবিতায় তাৎক্ষণিকতার এই বিপদাপদ সম্পর্কে কবিমাত্রেরই সচেতন থাকা আবশ্যক জ্ঞান হয়। এর মানে কি এই যে সুতীব্র উন্মাদনার ভিতরে আনন্দ, বেদনা বা অন্য কোনো অনুভূতির কথা লেখাই যাবে না? না, তা নয়, একদমই নয়। লেখা যাবে। কারো কারো হাতে এভাবেও উৎকৃষ্ট রচনা বেরিয়ে আসা সম্ভব বৈকি, তবে এতে নিকৃষ্ট রচনা তৈরি হবার ঝুঁকিই বেশি থাকে বলে মনে হয়। সুতীব্র উন্মাদনাজাত রচনার খসড়াকে কবিতায় রূপ দেবার জন্য অনেক কাল ফেলে রাখাই সঙ্গত। এটা কতদিন, তার কোনো সুস্পষ্ট সীমা নেই। তবে এরকম বলা যায়, যতদিন ওই নির্দিষ্ট অনুভূতি, যা নেপথ্য কাণ্ডারি হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল, তা একটা সামগ্রিকতার ওপরে না-দাঁড়ায়, ততদিন। নির্দিষ্ট সময় পর ওই খসড়ার একটা নিরাবেগ সম্পাদনা-শাসন দরকার হয়। ঝেড়ে ফেলতে হয় তাবৎ উৎকট অবস্থা, একান্ত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। দেখতে হয়, ওই টেক্সটে কোনো কিছুই যেন ময়লা দাঁত বের করে হাসতে না-থাকে। যেন ভদ্র জনসমাগমের ভিতর দিয়ে নিবস্ত্র হয়ে হাঁটতে শুরু করার মতো কোনো ঘটনার ওটা জন্ম দিয়ে না-বসে। এক্ষেত্রে অবশ্য একটা বিপদসংঘটনের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। বুদ্ধির সাথে অনুভূতির একটা তুমুল ঝগড়ার মোকাবেলা করতে হতে পারে সম্পাদনাকালে। এই ঝগড়ার মীমাংসাটা কে কীভাবে করবেন তা নির্ভর করে তাঁর কাব্যরুচি, মেজাজ, বিশ্বাস ইত্যাদির ওপর। সবচে’ ভালো সম্ভবত বুদ্ধি বা অনুভূতি কারো একার হাতেই পূর্ণ শাসনভার ছেড়ে না-দিয়ে দুয়ের একটা বিবাহসম্পর্কে আস্থা রাখা।

৬.

ইমাজিনেশন হলো সংবেদন ও ধারণার মনছবি আঁকবার সামর্থ্য, যা ওই বিশেষ মুহূর্তে শ্রবণ-দর্শন বা অন্য কোনো ইন্দ্রিয় দ্বারা ধারণযোগ্য নয়। এটি তৈরি হয় বুদ্ধি ও আবেগের সংমিশ্রণে। ছবিমাত্রকেই ছবিকল্প ভাববার একটা রেওয়াজ আছে আমাদের মধ্যে। একটিও দৃশ্য বা শ্র“তিকল্প নেই এমন কবিতাও ইমেজারিতে ঋদ্ধ বলে প্রশংসিত হতে দেখা যায় হামেশা। আমরা এত যে দিলখুশ হই সহজনের প্রতি, ঘেন্না লাগে। আর অন্যদিকে চলতেই থাকে ‘যারে দেখতে নারি’র চলনকে চিরকাল বাঁকা ঠাওরানো দাপুটে বাসনার বজ্জাতি।

মন কীভাবে এসব ছবি তৈরি করে? কল্পনা দিয়ে ভেবে শব্দ দিয়ে ধরাধরির মাধ্যমে। কল্পনার সীমাটা কী? সীমা প্রায় নেই। কারণ যা পূর্বাভিজ্ঞতায় নেই এমন কিছুই মনের চোখ দিয়ে দেখা দরকার হয় ইমেজারি নির্মাণের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে শতভাগ মুক্তি দরকার হয় কল্পনার। অথবা হতে পারে পূর্বে অংশত বা অন্য আঙ্গিকে অভিজ্ঞতায় ছিল। এক্ষেত্রে রকমফের থাকছে মাত্রায়।

তো, এই মাত্রার স্বাধীনতা ভোগ কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে কি না সেটা একটা বড়ো প্রশ্ন হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। যাঁকে চরম স্বাধীনতা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে তিনি সেই স্বাধীনতাটা তাৎপর্যপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারছেন কি না সেটা একটা সংগত বিবেচনা। অবাধ স্বাধীনতা ভোগের অধিকার লাভ করা মাত্র আমি যদি হাতিগুচ্ছকে তুড়িতে উড়িয়ে দেই আকাশে আকাশে, নদীকে পুড়িয়ে দেই মাছের যৌনতাসহ, যেহেতু কাজটা যথার্থেই সংঘটিত হওয়ার দরকার হচ্ছে না, শব্দ-বাক্যের কারসাজিতেই ঘটিয়ে দেয়া যাচ্ছে সব; দোষ কি আছে তাতে? আছে। এটা ফ্রি পেয়ে মাথার বাঁ’পাশে বাড়তি আরেকটা মাথা জুড়ে নেয়ার মতো ব্যাপার। পাঠকচিত্ত কতটা স্বস্তি পাবেন এহেন ভোগচর্চায়? এজন্য মাঝেমাঝে মনে হয়, সীমা বোধকরি এরও আছে কোথাও। যাই কল্পনা করি না কেন মানব ধারণায় তাকে সম্ভব মনে হতে হয়, অন্তত পরোক্ষে, তাহলেই কেবল সেখানে সৌন্দর্য ভর করবার ফুরসৎ পায়, অন্যথায় সৃষ্টি হয় অসামঞ্জস্যতা, যা কবিতার এক নম্বরের শত্রু।

যেখানে মনছবির প্রশ্ন, সেখানে মনই গুরু। যার মন যেরকম ছবির জন্ম দিতে সক্ষম, তিনি তেমনি আঁকবেন। পাগলামি বা উন্মত্ততার ব্যাপারটাও এখানে উল্লেখ্য। পাগলামি অনেক উৎকৃষ্ট মনছবি আঁকতে পারে, আবার এ বৈশিষ্ট্য প্রলাপেও নিপতিত হতে পারে। যিনি পাগল বা উন্মাদ, তাঁর সামনে কোনো সীমারেখা বেঁধে দেয়া যায় না, সেটা সম্ভবও নয়। মনছবি আঁকবার ওই বিশিষ্ট সময়ে তাঁর মন-মস্তিষ্ক যে অবস্থায় বিরাজ করছে, সে অবস্থারই উৎপাদন সামনে আনবেন তিনি। ওটা কদ্দূর মানুষের পারসেপশনের আওতার মধ্যে থাকল না-থাকল, সেটা পরে বিবেচ্য। তবে হ্যাঁ, একটা মাত্রার সূক্ষ্ম উন্মাদনা ভালো মনছবি আঁকবার জন্য খুবই দরকারি বিবেচ্য হতে পারে। এ অবস্থা যুক্তিশৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে পারে, স্বাভাবিক অবস্থা যে সুযোগটা মোটেই দিতে চায় না।

ঢাকা, জুন ২০০৯

ভাষাবস্তু অবয়বে ধরে রাখে ভাষাচিন্তারেখা

ধর্মতত্ত্ব, বিবর্তনতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে অত্যল্প জানাশোনা আমাকে এরকম একটা গড় ধারণা দেয় যে, মানবপ্রজাতি আদিতে এক গোষ্ঠীভুক্ত ছিল। বি...