Showing posts with label বীক্ষণ. Show all posts
Showing posts with label বীক্ষণ. Show all posts

Saturday, July 4, 2020

অন্তরসম্পদে ঋদ্ধ হবার অন্যতম স্বর্ণদুয়ার

ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের নিয়মিত পাঠচক্র প্রকল্প বীক্ষণ তার ১৮০০তম অধিবেশনে উপনীত হতে যাচ্ছে, সংবাদ হিসেবে এটা প্রায় সবার জন্যই সচকিত হবার মতো। সংবাদটি আমার জন্য একইসঙ্গে গর্বেরও, যেহেতু ১৯৯২-এর অক্টোবর থেকে ১৯৯৩-এর মার্চ পর্যন্ত ৩৭ ও ৩৮ নম্বর প্রান্তিকে আহ্বায়ক হিসেবে বীক্ষণের হাল ধরে এর সুদীর্ঘ পরম্পরায় আমিও তুচ্ছ অবদান রাখতে পেরেছিলাম। পাশাপাশি সহ-আহ্বায়ক এবং সাধারণ অংশগ্রহণকারী হিসেবেও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম আগে-পরে আরো কিছুদিন। পেশাগত প্রয়োজনে দূরবর্তী শহরে অবস্থানের কারণে পরবর্তী প্রায় আড়াই দশকে বীক্ষণে আমার অংশগ্রহণের সুযোগ কমই ঘটেছে। তবে এটা বলা যায় যে, শারীরিক দূরত্ব সত্ত্বেও বীক্ষণের সঙ্গে কোনো মানসিক দূরত্ব আজ অবধি তৈরি হয় নি। হওয়া সম্ভবও নয়।

সকলেই জানেন এবং মানেন যে, লেখালেখি করবার কাজটি শতভাগ ব্যক্তিগত। কিন্তু তার জন্য সামাজিক হয়ে ওঠবার ব্যাপার আছে। অগ্রজ, সমসাময়িক, অনুজ নির্বিশেষে অন্য লেখকদের সঙ্গে মেলামেশা, পাঠাভিজ্ঞতা ও শিল্পধারণা বিনিময়, বিচিত্র তথ্য আদানপ্রদান, তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদি সে অবকাশ তৈরি করে দেয়, অন্তরসম্পদে ঋদ্ধ করে তোলে। অন্তরসম্পদে ঋদ্ধ হবার অসংখ্য মার্গের একটি হলো সামাজিক হওয়া। বলতে কী, এ ধনে যে যত ঋদ্ধ, তার ব্যক্তিগত লেখনযাপন তত সুফলদায়ক।

বীক্ষণ আমাদের জন্য ছিল অন্তরসম্পদে ঋদ্ধ হবার অন্যতম স্বর্ণদুয়ার। অন্য লেখকদের সাথে একজন সাহিত্যকর্মী কীভাবে মিশবেন, ওই মেলামেশা থেকে কিছু আহরণ করবেন নাকি কেবল নিজেকে প্রদর্শন করে বেড়াবেন সেটা প্রত্যেকের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। বীক্ষণ সে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য ১৯৮৩ সাল থেকে সবার সামনে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়ে চলেছে। যাত্রার শুরুতেই এরকম একটা প্রস্তুত ক্ষেত্রের সন্ধান লাভ যে কোনো সাহিত্যকর্মীর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

বীক্ষণ বিষয়ে প্রসংগত আমি কিছু কথা লিখে উঠেছিলাম ২০০৫-এ প্রকাশিত ইফফাত আরা সম্পাদিত ‘দ্বিতীয় চিন্তা’র ফরিদ আহমদ দুলাল সংখ্যায় পত্রস্থ আমার আঁতুড়ঘরের নকশামালা, খুঁজে-ফিরে দেখার সাধনবিলাস শীর্ষক নাতিদীর্ঘ রচনায়। আমার মনে হয়, একই কথা পুনর্বার লিখবার চেষ্টা না করে ওই রচনাংশটিই এখানে উৎকলন করা যায়, যেহেতু আমাদের বীক্ষণঘনিষ্ঠ সময়টা ওখানে স্ফটিকাকারে হাজির হয়েছিল।
বীক্ষণবার
আপনি জানেন, বীক্ষণময় শুক্রবারগুলো ছিল উৎসবের দিন আমাদের, সচল-অচল সব ধরনের লেখকের। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই প্রস্তুতি চলত, পরদিন কোন কোন লেখা পড়া যায় সে নিয়ে। রাত জেগে নতুন করে কিছু লিখবার চেষ্টা, না হলে পুরোনো খসড়াকে ভাঙা আবেগের তুলি দিয়ে নতুন করে ঘষেমেজে সারিয়ে তোলা।
বীক্ষণ ছিল ময়মনসিংহের নবীন-প্রবীণ লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের এক মিলনমেলা, আজও। অনিবার্য কারণে একদিন না আসা গেলে সাংঘাতিক খারাপ লাগত। মনে হতো আমাকে বাদ দিয়ে সাহিত্যের খেয়া হয়ত পৌঁছে যাচ্ছে সিদ্ধির ঠিক ওপারে। মনে এতদবিবেচনা একবার ঠাঁই পাবার পর থেকে ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ (মসাস)-এর সর্বাপেক্ষা কার্যকর প্রকল্প বীক্ষণ-এ আমরা ছিলাম খুব নিয়মিত। তখন বীক্ষণ বসত সি. কে. ঘোষ রোডে অবস্থিত অনুগ্রহে পাওয়া প্রেসক্লাবের একটি কক্ষে। এখানে এসে সাহিত্যের জন্যে বিনাশ্রম, সিকিশ্রম, আধাশ্রম, পৌণেশ্রম, পূর্ণশ্রম— সব ধরনের সাহিত্যসংস্রবপুষ্ট লোকজনেরই চেহারা দেখেছি সামনাসামনি। ময়মনসিংহে লভ্য তাবৎ ঘরানার লেখকেরই আনাগোনা ছিল একে ঘিরে, হয়ত এখনো আছে। পূর্বনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, কবিতা-গল্প-ছড়া পাঠ শেষে বীক্ষণের আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হলেও তরুণতর আমাদের অনানুষ্ঠানিক যাত্রা কখনো কখনো পরদিন সকাল পর্যন্তও গড়াত, মনে পড়ে। বিষয় ও ভূগোলে সেসব অনানুষ্ঠানিক যাত্রা কোথা থেকে কোথায় গিয়ে থামবে আমরা কেউই পূর্ব থেকে জানতাম না কিছু।

প্রেসক্লাব ছেড়ে মুসলিম ইনস্টিটিউট হয়ে বীক্ষণ ব্রহ্মপুত্র তীরের কাজী নজরুল ইসলাম সড়কে রবীন্দ্রস্মৃতিধন্য মহারাজের বাগানবাড়ির তপোবনপ্রায় পুণ্যচ্ছায়ারাশি ঘেঁষা মসাস-এর নিজস্ব ডেরায় স্থানান্তরিত হলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই আমাদের দেহমনগাছে নতুন নতুন ডালপাতা ছড়াল। মসাস-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বীক্ষণের একজন গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবক আপনার বিশেষ নজর থাকত আমাদের প্রতি। সংগঠনের আগামী সময়ের সৈনিক হিসেবে আমাদের তৈরি করবার একটা চেষ্টা আপনার মধ্যে ক্রিয়াশীল দেখেছি বরাবর। আপনার পরামর্শ ও নির্দেশ আমরা মেনে চলতেই চেষ্টা করতাম। এক দু’বার করে আমরা অনেকে আহ্বায়ক হিসেবে বীক্ষণের হালও ধরেছি। কিন্তু নবিশ সংগঠক হিসেবে আমাদের অনেকেরই ব্যর্থতা ছিল, ছিল সংগঠক হবার ব্যাপারে অনাগ্রহও। কারো কারো চাওয়াও ছিল না যে বীক্ষণ ভায়া হয়ে একদিন মসাস-এর বড়ো সংগঠক হব, বরং আমাদের স্বপ্ন ছিল ভালো কিছু লিখবার। কেউ কেউ সংগঠক হয়েও অঢেল লিখতে পারেন, আপনি যেমন। আমাদের কারো কারো মনে হতো, এ কাজটা সবার নয়, আমাদের জন্ম হয়েছে শুধু লিখবারই জন্যে। যে কারণে সংগঠনের নকশা অনুযায়ী পরিচালিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকেও ভিতর দিক থেকে আমরা অনেকেই ছিলাম সংগঠনবিরোধী। ফাঁক খুঁজতাম কী করে প্রতিষ্ঠানের মাপ দেয়া সীমার বাইরে পা রাখা যায়, স্বাধীনভাবে সমমনাদের সাথে বেহিসেবী সময় যাপন করা যায়।

বীক্ষণের দ্বিতীয়ার্ধে অনুষ্ঠিত স্বরচিত রচনার পাঠপর্ব আমাদের দারুণভাবে আকর্ষণ করলেও প্রথমভাগের আলোচনা সবসময় ভালো লাগত না ওর প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র এবং বিষয় নির্বাচনজনিত বদ্ধতার কারণে। ওখানে এমনকি ঈদানুষ্ঠানের তাৎপর্য, দুর্গাদেবীর মাহাত্ত্ব্য— এসব বিষয়েও আলোচনা হতো। যতদূর খবর রাখি, আজও হয়। একইসঙ্গে মক্কা-মদিনা-গয়া-কাশী-কপিলাবাস্তু-লুম্বিনী-বেথেলহেম-নাজারেথের ছবি ওখানে আঁকা হতো যতটা প্রতিষ্ঠানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্যে ততটা সাহিত্যিক প্রয়োজনে নয়, আমরা বুঝতাম। এসব আমাদের কখনোই টানত না, আজও তরুণদের টানে না। তার মানে এ নয় যে আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করি না। আমরা ভিতর দিক থেকে বেড়ে ওঠবার জন্যে আরো প্রাসঙ্গিক, ব্যবহারিক ও গতিশীল আলোচনা করবার ও শুনবার জন্যে সদা মুখিয়ে থাকতাম। সেসব আলোচনার কোনো শৃঙ্খলাবদ্ধ রূপছবি থাকত না, কিন্তু প্রাণমূলে রস থাকত।
আনুষ্ঠানিকতায় আমরা যারা অনেকটাই অপ্রস্তুত ও নীরব, ব্রহ্মপুত্র ধোয়া সাহেব কোয়ার্টার পার্কে গিয়ে বসলে আমরা সেখানে সবাই সরব। আমাদের এই আকর্ষণ সবকিছুকে ছাপিয়ে যেত।

আপনাকে মনেপ্রাণে সদাতরুণ বলেই জানি, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের চেয়েও বেশি। তরুণ মসাস কর্মকর্তা গ্রন্থপ্রিয় আহমদ সাইফ, সুনন্দন ইয়াজদানী কোরায়শী, স্বরশিল্পী আমজাদ দোলনও। কিন্তু সর্বোপরি আপনারা ছিলেন মুরব্বি, সাংগঠনিক জন। মাঝে মধ্যে বীক্ষণ শেষে আপনারাও বসতেন পার্কে, কিছুক্ষণ। নদীর জল ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসে চুল ওড়াতে ওড়াতে ওখানে চা-সিঙারা, বাদাম-চানাচুর ইত্যাদি হতো। কিন্তু মত্তআড্ডা যাকে বলে সেটা জমত না বস্তুত। আমাদের কাছে আপনারা ছিলেন স্থানীয় অভিভাবক। আমাদের পুরোমাত্রায় খুলে যাওয়া সম্ভব হতো কাজেই আপনারা পিঠটান দেবার পর। তখন ভালো করে ভেবে দেখি নি, কিন্তু এতদিনে ওসব জমায়েতকে রোদে মেঘে কোলাকুলি বলে মনে হয়, মুহূর্ত-স্ফূরিত। 
নব্বইয়ের দশকের শুরুর কয়েক বছরে বীক্ষণে তরুণ ও তরুণতরদের এক অপ্রতিহত জোয়ার ছিল। লেখালেখিতেও বেশি সরব ছিলেন ওই তরুণরাই, সবসময়ই যা হয়। শাহীদা হোসেন রীনা, আশিক আকবর, আহমেদ শফিক, আশিক সালাম, আহমদ শাহাবুদ্দিন, চয়ন বিকাশ ভদ্র, তাসাদ্দুক ফাহিম, অমল রজক, তোফায়েল তফাজ্জল, সালাহউদ্দিন পাঠান, আবদুল মতিন, সরকার আজিজ, পলাশ চৌধুরী, তাসলিমা রহমান, আশরাফ রোকন, দিলীপ সেন, মোস্তাক বিবাগী, মোহাম্মদ ইয়াকুব, নাজমা মমতাজ, রীনা পণ্ডিত, হাদিউল ইসলাম, মাসুম মোকাররম, শামীম পারভেজ, মশিউর রহমান খান, শতাব্দী কাদের, রওশন ঝুনু, মিনহাজ উদ্দিন শপথ, সমুদ্র সেলিম, মামুন মাহবুব, জুয়েল কবীর, ওসমান গণি, মনো জসীম, ধনেশ পণ্ডিত, তন্দ্রা সরকার, রাজিয়া সুলতানা, মার্জিয়া সুলতানা নীলিমা, হিশাম আল মহান্নাভ, ফাতেমা নার্গিস বীণা, রোকসানা বিলকিস, অনিন্দ্য জসীম, স্বাধীন চৌধুরী, মামুন মোয়াজ্জেম, আলী ইউসুফ, শাবিহ মাহমুদ, শাহিন লতিফ, গনী আদম, সফেদ ফরাজী, বিল্লাল মেহদী, অতনু তিয়াস, চন্দন সাহা রায়, সিদ্ধার্থ টিপুসহ আরো অজস্রজন আমরা।

পার্ক বা সংগ্রহশালার বিকল্প-বীক্ষণ শুরু হতো এ তালিকার একটা গুরুঅংশকে নিয়ে। ওখানে আমরা থাকতাম পুরোমাত্রায় ব্যবহারিক, কবিতাকেই ভালো করে চিনবার-জানবার চেষ্টায় মত্ত। নানাজনের মুদ্রিত-অমুদ্রিত কবিতা থেকে পাঠ, তার ভালোমন্দের নিবিড় পর্যালোচনা, বিভিন্ন গ্রন্থ পাঠের অভিব্যক্তি শেয়ার, ইত্যাদিতে মত্ত থাকতাম আমরা। কবিতা বিষয়ে নানারকম কর্মশালাও হতো ওখানে। পাঁচ-দশজন মিলে বারোয়ারি কবিতাও লিখেছি আমরা। প্রতিজন এক দু’লাইন করে লিখে একটি কবিতার পূর্ণ রূপ দেবার সেসব চেষ্টা যুগপৎ আনন্দদায়ক এবং শিক্ষণীয় ছিল। ক্রমশ কমতে কমতে জমায়েত দু’তিনজনে এসে ঠেকলে আমরা অন্য মঞ্জিলমুখী হতাম। তারও পরে হতাম একা। হায় একা হওয়া আমাদের, বিরল ভাবনা।

উল্লিখিতদের অনেকেই আজ আর লেখালেখির সঙ্গে নেই, অনেকেই ক্রমশ নিভে গেছেন অথবা নিভতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু যুগপূর্বকালে এদের সবার ভিতরেই কমবেশি সৃজন-আগুন ছিল। ওই অন্তর্গত অগ্নির সম্মিলিত উত্তাপ আমরা সকলেই অনুভব করতাম সমভাবে, সংবিধানবিহীন আমাদের সংঘপ্রয়াসে। 
এটা ঠিক যে, ২৫ বছরে অনেকখানি বদলে গেছে ওই জগৎ। আমাদের অনেক অগ্রজ ও সতীর্থ আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, যাঁদের সংস্পর্শ আমাদের প্রাণিত করেছিল। বীক্ষণসংশ্লিষ্টদের থেকে ইতোমধ্যেই প্রয়াত হয়েছেন আহমদ সাঈফ, প্রদীপ কুমার বিশ্বাস, আজাহার সরকার, মোহাম্মদ আবদুল হান্নান, আবদুল মতিন, তাসলিমা রহমান ও শামীম পারভেজ। ১৮০০তম অধিবেশনের এই উৎসবায়োজনে হৃদয়তন্ত্রীতে আজ তাঁদের কথাই বেদনবীণা হয়ে বাজছে বেশি করে।

সেপ্টেম্বর ২০১৮

Friday, July 3, 2020

শামীম পারভেজ, বর্ষাস্বপ্নে কাটলো যাহার চৈত্রপোড়াদিন

সেলফোনে প্রথম যখন ভয়াবহ অসুস্থ শামীম পারভেজকে ঢাকার মহাখালীস্থ মেট্রোপলিটন মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করবার খবর পাই, তখন জুনজনিত ব্যস্ততায় ডুবতে ডুবতে শ্রমসাধ্য একটি অ্যাসাইনমেন্ট শেষে তীরে দাঁড়িয়ে কাকতালীয়ভাবে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ক্লিক করে অদূর অতীতে জাপানে সংঘটিত প্রলয়ংকরী সুনামির একটি বিরল ভিডিও ক্লিপ দেখছিলাম। একটা সচল জনপদের সপ্রাণ-নিষ্প্রাণ সমস্ত কিছুকে ক্ষুধার্ত ও রাগী সমুদ্রের মুহূর্তে গ্রাস করে নেবার ভয়াবহতা এবং মানুষের অসহায়তার এমন অবিশ্বাস্য ও করুণ চিত্র আর হয় না। ঘটনার ভয়াবহতায় কেবলই কাঁটা দিয়ে উঠছিল আমার মাঝবয়েসি গা। এমন অবস্থায় ফোনবাহিত হয়ে এল আরেক সুনামির সংবাদ। ক্লিপটিতে চোখ রেখে ঘটনার বিবরণ শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল প্রাণান্ত দৌড়েও যে লোকটি রাগী জলের থাবা থেকে শেষ পর্যন্ত আত্মরক্ষা করতে পারল না ওই লোকটিই হয়ত শামীম, আর অপেক্ষাকৃত শক্ত ভিতের উপরে নির্মিত তেতলা বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে যে লোকটি মনে করছে যে এ যাত্রায় বড়ো বাঁচা বেঁচে গেছি অথচ খানিক পরে বাড়ি ধ্বসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে নিজেও জলের পাকে নিখোঁজ হয়ে যাবে সে লোকটি বোধহয় আমি!

ফোন রাখতে না রাখতে আরেকজনের কল পাই, সেও বয়ে আনে ওই একই সংবাদ। বিকেল নাগাদ আরো একজন। কিন্তু না, আটঘণ্টা শ্রম বেচা শেষেও সংসারজনিত ব্যস্ততা বাধ সেধে দাঁড়ালে ওইদিনই আমার মহাখালী যাওয়া সম্ভব হয় নি; দীর্ঘ অদেখার কারণে টানে যদিও ঘাটতি ছিল না কোথাও।

জানা গেল, শামীমের স্ত্রী ক্লিনিকে ওর সঙ্গে আছে। ফোন নম্বরও পাওয়া গেল তাঁর। দেখতে যেতে হলে তাঁর কাছ থেকে ডিটেল জেনে নেয়া দরকার হবে। ভাবলাম, যদিও আজ যেতে পারব না তবু একটা ফোন করে ওর সংবাদটা অন্তত নেয়া যাক। কিন্তু নানারকম ভাবনা হলো। ফোন করে কী শুনতে কী শুনব কে জানে। সইতে পারব তো! তা ছাড়া, ভদ্রমহিলার সঙ্গে আগে কখনো আমার দেখা-কথাও হয় নি। এসব মিলিয়ে প্রয়োজনীয় মনোবল সঞ্চয় করে উঠতে পারলাম না। পারতে পারতে এক দিন দুই রাত গত। পরদিন ফোন করে যা বুঝতে পারলাম তাতে মনে হলো ভদ্রমহিলা শামীমকে সুনামির রাগী জলের তোড়ে হারিয়ে যেতে দিতে শারীরিক-মানসিকভাবে একেবারেই প্রস্তুত নন। ওকে টিকিয়ে রাখতে আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি অন্যান্যের সহায়তায়, যদিও আশঙ্কা পুরোপুরি ছাড়ছে না তাঁকে। কারণ চিকিৎসকরা তেমন আশ্বাসবাণী শোনাতে পারছেন না। যাই হোক, তারও পরদিন সন্ধ্যায় মহাখালী যেতে পারলাম, কিন্তু মানসিকভাবে বলীয়ান মিসেস শামীমকে ওখানে পাওয়া গেল না যে তাঁকে একটা ধন্যবাদ দেবো। অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে আছেন তাঁর ছোটভাই, শামীমের শ্যালক।

সকল ভালো হাসপাতালের মতো ওখানেও প্যাসেন্ট ভিজিট করবার নির্দিষ্ট সময় আছে, আমি যার অনেক আগেই ক্লিনিকে পৌঁছেছি। ফলত অপেক্ষা করতে হলো। শামীমের শ্যালক রিসেপশনে সঙ্গ দিলেন আমায়। এটা-ওটা কথা হচ্ছিল ওর সম্পর্কে। কথার সারাংশ শামীমের নিজের শরীরের প্রতি নানা অনিয়ম-অত্যাচারের বর্ণনায় ভরা। শেষ দিকে চাকুরি-বাকুরি ছেড়ে কিছুটা থিতু হয়েছিল সে, অনিয়মটাও খানিকটা কমিয়ে এনেছিল। কিন্তু ততদিনে ভেতরে স্থায়ী কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেছে। চোরা অসুস্থতা রীতিমতো গেড়ে বসেছে।

প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করে সন্ধ্যা সাতটায় মাস্ক ও ইউনিফর্ম পরে এইচডিইউ তথা হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে গিয়ে দেখলাম চার হাত-পা ছড়িয়ে শামীম ঘুমিয়ে আছে। বেশ কিছুদিন শেভ করা নেই। ক্লান্ত বিমর্ষ অভিব্যক্তি। নাকে ও নিম্নাঙ্গে বিবিধ নল। দূর থেকেও শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। জাগিয়ে কথা বলা নিরাপদ নয়। ছবি তোলাও নিষিদ্ধ। বেড ঘেঁষে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে স্মৃতিতে থাকা ওর প্রাণোচ্ছল মুখটাকে ওই মুখের সাথে মিলিয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না আমার।

জিজ্ঞাসার জবাবে নিচুস্বরে নার্স জানালেন, হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠেই উনি সিগারেট খেতে চাচ্ছেন। এই বিবরণে আমার নিজের মুখও যেন ভেসে উঠল, যার কাছে সিগারেটই প্রধান স্বজন! সিগারেট শামীমকে খাচ্ছে, খাবে আমাকেও, মনে হলো। হায়, প্রাণসংহারক সিগারেট!

২.
শামীমকে আমরা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ময়মনসিংহে পেয়েছিলাম, আমাদের বেড়ে ওঠার সময়কার সঙ্গী হিসেবে। বীক্ষণে ও বীক্ষণের বাইরের অন্যান্য সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক তৎপরতায় অনেক সময় একত্রে পার করেছি আমরা। শরীরের উপরে অত্যাচার তার তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল। অনিয়ম-অত্যাচার আমরা সমন্বিতভাবেও করেছি অনেক সময়। কিন্তু ওর সুঠাম শরীরে ওসব কোনো প্রভাব ফেলতে পারে তেমনটা মনে হয় নি তখন। পেশাগত প্রয়োজনে পরে আমাদের মধ্যে দীর্ঘ বিচ্ছেদের রাত্রি নেমে আসে। শামীম চলে যায় সিএইচটির কোনো জেলায়, রোকন উত্তরবঙ্গে, জুয়েল শেরপুরে, আশিক ও আমি ঢাকায়; মাসুম অবশ্য ময়মনসিংহেই থেকে যায়। এই বিচ্ছেদের কোনো নিরাময় ছিল না। বছর দশেক কাল মাঝেমধ্যে কোনো একটা লিরিকের চার/পাঁচ লাইন টেক্সট মেসেজ আকারে আমাকে পাঠাত শামীম। এগুলো হতো প্রায়শই রাত দুটোয় বা তারও পরে। সেটাই ছিল ওর লিরিক প্রস্তুতকাল। কখনো ওগুলো পড়ে ব্যাক করেছি, কখনো করতে পারি নি বা বিরক্ত হয়েছি। ব্যাক করলে কথা হতো গান লেখা নিয়ে। শামীম তখন চার হাতে গান লিখছে। কাউকে কাউকে দিয়ে ওসব লিরিক গায়নের উদ্যোগ নেবার কথাও জানাত সে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব পরিকল্পনার কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে তার কিছুই জানি না।

না, ওর কোনো কবিতা দীর্ঘ দীর্ঘ দিন কোথাও পড়া হয় নি আমার। শেষ সময় সে ময়মনসিংহেই স্থায়ী নিবাস গড়েছিল। ওখানকার সাহিত্যাঙ্গনে সেসময় ওর নৈমিত্তিক উপস্থিতি ছিল বলে শুনেছি, ছবি দেখেছি। কিন্তু এই পর্যায়েও ওর সঙ্গে মোলাকাতের সুযোগ তৈরি হয় নি আমার। এর মধ্যে দু’-চারবার বিভিন্ন কাজে ময়মনসিংহে গেলেও দুর্ভাগ্যক্রমে শামীমের সাথে দেখা হয় নি। ওর সম্পর্কে দীর্ঘ এই অদেখাই আমার সঞ্চয় হিসেবে রয়ে গেল মাত্র।

শামীমের মৃত্যুর পরে ইমেইলে ওর একটি কবিতার পাণ্ডুলিপি পাই শাহীন লতিফের মাধ্যম। নাম নেই। খুব সময় নিয়ে নিষ্ঠার সাথে পড়তে না পারলেও শ্রদ্ধার সাথে ওর ভেতর দিয়ে গেছি আমি। ওখানে পাতায় পাতায় শামীমের মুখ লুকানো। তবে কবিতাগুলোতে দীর্ঘ অচর্চার ছাপও স্পষ্ট, যার আরো সম্পাদনা দরকার। চোখ আটকে যাওয়া অনেক জায়গা আছে লেখাগুলোয়। ‘ছুটি চাহিয়া’ নামক একটি কবিতায় শামীম বলছে : ‘কফিন সময় কাছে ডাকে বড় বেশী ক্ষমাহীনতায়।/ শেফালী ফুলেরা নিয়েছে ছুটি সেই কোন ভোরে। ছুটি মঞ্জুর কর তবে অন্দরবাসিনী...।’ হ্যাঁ, ওর ছুটি শেষ পর্যন্ত মঞ্জুর হয়েছে। ছুটির এ সময়টা শামীম কীভাবে কাটাবে সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। কোনো মানে নেই এ কথা বলার, তবু বলা যাক যে, ওর ওখানকার চৈত্রপোড়াদিনগুলোও ‘বর্ষাস্বপ্ন’-এ ভরে উঠুক।

অক্টোবর ২০১৫

ভাষাবস্তু অবয়বে ধরে রাখে ভাষাচিন্তারেখা

ধর্মতত্ত্ব, বিবর্তনতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে অত্যল্প জানাশোনা আমাকে এরকম একটা গড় ধারণা দেয় যে, মানবপ্রজাতি আদিতে এক গোষ্ঠীভুক্ত ছিল। বি...