Sunday, November 15, 2009

আনাড়ীর কবিদর্শন

এক দু’পৃষ্ঠার একটি গদ্য লিখে একজন কবির প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে তোলা যেন সম্ভব কোনো কাজ, তাও যেই সেই কোনো কবি নন, স্বয়ং বিনয় মজুমদারকে : বাংলা কবিতাঙ্গনে কবিতার শহীদ বলে খ্যাত জীবন্ত কিংবদন্তী হয়ে যিনি অদ্যাবধি শিমুলপুর আলোকিত করে আছেন-- কবিতার পাঠককে আরো কিছু বিস্ময় উপহার দেবার জন্যে। কিন্তু তবু আমরা কলম ধরি। ধরি, হাতেকলমে এটি প্রমাণ করবার জন্যে যে গোটা কয়েক পৃষ্ঠায় একজন লেখকের কোনো চিন্তার, চরিত্রের, প্রকৃতির প্রান্তটিকে স্পর্শ করা যায় মাত্র। দশজন মিলে দশদিক থেকে প্রান্ত স্পর্শ করলে সম্পূর্ণ কবির অনেকখানিই নিকটে পৌঁছা হয়ে যায়, যেতে পারে। এরকম স্পর্শে স্পর্শে কবির স্বর্ণাবয়বটি ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। আর কবির স্পষ্ট হওয়া মোটেই কবির জন্যে নয়, দরকার পাঠকের এবং প্রকারান্তরে আগামী কবিতার জন্যেই। আমরা যখন একজন কবির বিষয়ে কিছু লিখতে উপগত হই, তখন অতসব ভেবে না-নিলেও সাধিত কর্মটি অগোচরে এ ফলাফলটুকুই সম্ভব করে তোলে মাত্র। তবু কাজটি করতেই হয়, ফুল নামধেয় কাঁটার উৎপাত অরণ্যানীতে এত বেড়ে গেছে যে, আদপে যারা ফুল তাদেরকে নানাদিক থেকে দেখে চিনে ফেলা প্রয়োজন-- তাতে ক’টিমাত্র দল, পাপড়ি দৃশ্য নাকি অদৃশ্য, বর্ণিল নাকি বর্ণহীনতাই তার সৌন্দর্য-স্মারক, গন্ধ আছে কি না, থাকলে তার জাতকুল শনাক্তযোগ্য কি না ইত্যাদি। নইলে কাঁটারাও ফুলের পোশাকে সজ্জিত হয়ে ফ্যাশন শোর মতো পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ভ্যাংচাতে থাকবে-- আর প্রকারান্তরে ভুল অভিলক্ষে অভিমুখীনতাকে চিহ্নিত করে বিভ্রান্ত দর্শক কাম উপভোগকর্তা, রক্তপাতের কারণকে রক্তমূল্যে সংগ্রহ করার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এজন্যে আমার আপনার ভাবিত হবার কী আছে, যেখানে উপভোগকর্তা নিজেই নিজের জন্যে বিপদ কিনে আনছে? এর জবাব এরকম যে, ভাবিত হবার মূল্যমানের কারণ আছে। কেননা নিষ্ঠ কবিতাকর্মীরা, যারা নিজেরা ফুলোপম গন্ধ বিলাবার জন্যে অনেক কামনাবিলাসিতাকে উপেক্ষার চাবুক কষে সদা প্রস্ফূটিত হয়ে চলেছেন অরণ্যানীছায়ে, প্রকৃত ফুলচিহ্নিতকরণের সূত্রাদি সন্ধানে ব্যর্থ হলে পরবর্তী গন্ধলোভীরাও এদের শনাক্ত করতে পারবে না। তাতে আগাগোড়া ঘাটতিরই সমূহতা বাঙ্ময় হয়ে উঠবে। যে পথে ধাবন কেবলই ঘাটতির নিশ্চয়তা বিধান করছে, সে পথ বাঁয়ে রেখে হাঁটাই কাজের কথা-- কেনই বা অযথা দাঁড়াবে একজন গিয়ে বিষবৃক্ষতলে? তাই--

বিনয় মজুমদারকে

অবশেষে রাত্রিও পেছনে হটে ঘুম যায় চূড়ায় আভাসে
স্ত্রীপুত্রসমেত-- একা শুধু ঢালে শুয়ে পাতাদের
পতন যন্ত্রণাগুলি ছুঁয়ে ছেনে দেখ আর ঘাসের সুগন্ধে
ধোও মুখ-- দূরে পড়ে আছে যারা স্বজন সুহৃদ
পাহাড়ের পদ-সন্নিকটে-- ‘পথ নেই খুঁজে বার কর’ বলে
দলেবলে মেতে আছে নিবিড় বিপ্লবে
তাদের সকাশে দ্রুত জটিল এক সবুজ বার্তাবাণী
পৌঁছে দাও বাতাসে ঝাঁকিয়ে মাথা বিশাল বৃক্ষের...
ফলে দূর বিন্দুসাথে যে পথ রচিত হয় ট্রান্সন্যাচারাল
সে পথ কুসুমরঙা তুমুল প্রবাহে ভাসে
গণের প্রবল চাপে আকাঙ্ক্ষা উত্তাপে
একার বাসনা বীণা পিষে ফেলে
জলের স্বভাবে গলে কলকল ধেয়ে আস নিচে

এবং

খ্যাতিলোভী কবিযশোপ্রার্থীদের

সুবিন্যস্ত আলোময় এহেন নক্ষত্ররাজি দিয়ে আকাশের
নিজের কী লাভ হলো কবে

বাতাসের স্বয়ম্বর নাতনিরা সবে অকৃপণ
আঁচলে পুঁটুলি করে অম্লজান বয়ে এনে
বিনিময়ে কোনোকিছু না চেয়েই
আযৌবন বিলিয়ে গেল বখাটে যুবাদের

ধড়মড় পাড় ভেঙে নদীরই বক্ষ বাড়ে
জলের তা কোনকালে কোন কাজে লাগে

আর শুধু ভাষা শিখে মোচড় আঁকতে শিখে
অনুভূতি গেলে ঢেলে ছাঁচে ফেলে কথা লিখে বিনিময় চাও
যাও তবে যাও
ক্ষণজীবী খ্যাতি পেলে সস্তায়-- আজলায় তুলে নিয়ে
চেটেপুটে খাও

পাশাপাশি এসব ভাবতে হয়, কারণ খ্যাতির কাঙ্ক্ষায় প্রতি মুহূর্তে আকুপাকু করে যেসব কবিযশোপ্রার্থী; সামাজিকতা রক্ষায় তারা বিনয়ের কবিতাকে যতই সেরা বলুক, মর্ম দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে না, পারা সম্ভব নয়। শিল্পের জন্যে ন্যূনতম স্যাক্রিফাইস যে এক জীবনে করতে পারে নি, মানুষ কেন নিকটে কুকুর গেলেও তার কিছুই উড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে না, প্রকৃত সারস তো দূর অস্ত। এই প্রকৃত সারস নিজের ভিতরে ধারণ করতে হলেই একজনকে নানারকম হাতছানি উপেক্ষা করে একাকী এসে দাঁড়াতে হয় সংঘের বিপরীতে। কারণ সংঘ সর্বদা স্বার্থের নিমিত্তে গঠিত হয়, সংঘ সর্বদা সংঘের দিকেই হাঁটাচলা করে, সংঘ নৈঃসঙ্গের পক্ষে কোনো যুক্তি বিস্তার করতে দেয় না। সে সম্ভাবনাটুকুই নস্যাৎ করে দেয় বরং। বিনয় মজুমদার যে অগ্নিমেধা নিয়ে নির্মোহ একাকিত্বকে কেবল কবিতার জন্যে বরণ করে নিয়েছেন, সে মেধা নিয়ে বিষয়ভাবনায় মত্ত হলে বিনয় কর্তৃক উপেক্ষিত সংঘের অনেকেই তার কর্তৃক আহরিতব্য সম্ভাব্য বিষয়ৌজ্জ্বল্যের কাছে মলিনতম হয়ে যেতেন। সংঘহীনতা সত্যের যতটা নিকটে পৌঁছবার সাহস যোগায়, আর কিছু ততটা নয়। যেকোনো হীনতা, তা যদি অন্য কোনো তুমূল ও যথার্থ প্রাপ্তিকে ধরে আনবার জন্য প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে, তবে কেন একজন বিনয় মজুমদার হৈচৈয়ের থেকে লক্ষ যোজন দূরে ‘বিনোদিনী কুঠি’র নিবিড় প্রকোষ্ঠে সেধিয়ে যাবেন না? সেটা যুগপৎ বিনয় এবং বাংলা কবিতার পাঠকের জন্যে ইতিবাচক হয়েছে। তিনি নিজে খ্যাতির কাঙ্ক্ষায় মরিয়া হয়ে যান নি বলে খ্যাতিই এখন তাকে শীতের ওম জোগাচ্ছে চারপাশ থেকে।

শুধু কবিতার জন্যে এই বেঁচে থাকা-- এইভাবে ভাবতে পারা গেলে আপনা-আপনি একটি ধ্যানযোগ ঘটে যায় কবিচিত্তে। এই ধ্যানযোগই কবির বক্তব্যকে পৌঁছে দেয় অভাবিত দার্শনিক উচ্চতায়। কবির আত্মোপলব্ধিই তখন সর্বকালীনতা ও সর্বজনীনতা প্রাপ্ত হয়ে যায়। অমর কবিতার অভীষ্ট বোধকরি সেটাই। এরকম ধ্যানযোগই ঘটেছে বিনয় মজুমদারের ফিরে এসো, চাকা এবং অঘ্রানের অনুভূতিমালার ছত্রান্তরে। এখানে তাঁর পর্যবেক্ষণসমূহ জীবনের এমনি সব বাঁক-কোণ ছেয়ে গেছে যে, ওসব টেক্সট উপলব্ধিযোগ্য সত্যের একেকটি নন্দনভাণ্ডারে রূপ পরিগ্রহ করেছে।

২.
বিনয় মজুমদার কর্তৃক আহরিত সত্যরাশি তুলনারহিত। এই অনুসন্ধেয় সত্যরাশি বলার ভঙ্গির অসাধারণত্বে হয়ে উঠেছে জ্ঞানালোক জারিত একেকটা কাব্য-ধর্মাধ্যায়-- যুগপৎ ব্যক্তির এবং বস্তুর। হতে পারত যে, আহৃত সত্যমালাকে গৌণ করে দিয়ে মেদে মেদে শরীর নির্মাণ করেছেন তিনি কবিতার-- অন্য অনেক কবিপ্রবীণের মতো। কিন্তু যখন হুবহু মুখস্থযোগ্য বাক্য রচনা করতে চাবেন একজন কেউ, তখন পঙক্তিসমূহ এমন হওয়া চাই, যা একজন পাঠক সহজেই তার জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে পারেন, ব্যক্তির প্রেমানুভূতি যার থৈ সহজেই স্পর্শ করতে পারে। এখানে বিনয় মজুমদার কর্তৃক নির্ধারিত কবিতার সংজ্ঞাটি সামনে আনা যেতে পারে। তাঁর মতে, কবিতা হচ্ছে চিরস্মরণীয় সেই বাক্যসমষ্টি, যা হুবহু মুখস্থ করা যায়; এবং এ-ও তিনি জানিয়ে রাখেন যে, এ সংজ্ঞাটি অমর কবিতার। সেক্ষেত্রে কবিতায় প্রাবাদিক পঙক্তি রচনাও দোষান্যায়ের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে সক্ষম হয়। এখানে বিনয় মজুমদারের ফিরে এসো, চাকার কতিপয় পঙক্তি উৎকলন করা যেতে পারে। অনুসন্ধিৎসু পাঠক চাইলে এসব আরেকবার পড়ে নিতে পারেন--

...সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে
চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা

সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কতো বেশি বিপদসংকুল
তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ

সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে

মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়

আলোকসম্পাতহেতু বিদ্যুৎ সঞ্চার হয়

সফল জ্যোৎস্না চিরকাল মানুষের প্রেরণাস্বরূপ

জীবনধারণ করা সমীরবিলাসী হওয়া নয়

ঘন অরণ্যের মধ্যে সূর্যের আলোর তীব্র অনটন বুঝে
তরুণ সেগুন গাছ ঋজু আর শাখাহীন, অতি দীর্ঘ হয়;

বৃক্ষ ও প্রাণীরা মিলে বায়ুমণ্ডলকে সুস্থ, স্বাস্থ্যকর রাখে

সকল ফুলের কাছে এতো মোহময় মনে যাবার পরেও
মানুষেরা কিন্তু মাংস রন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে

বর্ণাবলেপনগুলি কাছে গেলে অর্থহীন, অতি স্থুল বলে মনে হয়

                     উপবিষ্ট মশা উড়ে গেলে
তার এই উড়ে যাওয়া ঈষৎ সঙ্গীতময় হয়

বিনিদ্র রাত্রির পরে মাথায় জড়তা আসে, চোখ জ্বলে যায়।

সকল সমুদ্র আর উদ্ভিদজগৎ আর মরুভূমি দিয়ে
প্রবাহিত হওয়া ভিন্ন বাতাসের অন্য কোনো গতিবিধি নেই

প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগুলি ক্রমে জ্ঞান হয়ে ওঠে

শয়নভঙ্গির মতো আড়ষ্ট স্বকীয় বিকাশ
সকল মানুষ চায়--

বিদেশী চিত্রের মতো আগত, অপরিচিত হলে
কিংবা নক্ষত্রের মতো অতি পরিচিত হলে তবে
আলাপে আগ্রহ আসে;

...গাঙচিলগুলি জাহাজের সঙ্গে-সঙ্গে চলে,
অথবা ফড়িং সেও নৌকার উপরে ভেসে থাকে
ডানা না-নেড়েই এত স্বাভাবিক, সহজ, স্বাধীন

সর্বদা কোনো না কোনো স্থানে, ঝড় হতে থাকে

ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে
পুনরায় কেশোদ্গম হবে না;

সূর্যপরিক্রমারত জ্যোতিষ্কগুলির মধ্যে শুধু
ধূমকেতু প্রকৃতই অগ্নিময়ী;

                                              বাতাসের
নীলাভতা-হেতু দিনে আকাশকে নীল মনে হয়

কিছুটা সময় দিলে তবে দুধে সর ভেসে ওঠে

ক্বচিৎ কখনো কোনো ফোঁড়া নিষিদ্ধ হলেও
যে-কারণে তার কাছে অগোচরে হাত চলে যায়

সন্তপ্ত কুসুম ফুটে পুনরায় ক্ষোভে ঝ’রে যায়।

                             প্রাকৃতিক সকল কিছুই
টীকা ও টিপ্পনী মাত্র, পরিচিত গভীর গ্রন্থের

চিৎকার আহ্বান নয়, গান গেয়ে ঘুম ভাঙালেও
অনেকে বিরক্ত হয়;

মুগ্ধ মিলনের কালে সজোরে আঘাতে সম্ভাবিত
ব্যথা থেকে মাংসরাশি, নিতম্বই রক্ষা করে থাকে।

বিনয় মজুমদার কর্তৃক আবিষ্কৃত এইসব প্রাবাদিক সত্যগুচ্ছকে মোটাদাগে চারভাগে ভাগ করে দেখা যেতে পারে-- এর বাইরেও আরো অজস্র সূক্ষ্ম বিভাজন সম্ভব তো বটেই। আপাতত এই চারটি গবাক্ষপথে তাকালেও আলোর রঙ বৈচিত্র্যটা অনেকটাই উপলব্ধিতে আসে বলে মনে হয়।

১.    জৈবনিক
২.    প্রাকৃতিক
৩.    জ্যোতির্লৌকিক
৪.    বৈজ্ঞানিক

বলা বাহুল্য যে, তাঁর কর্তৃক আবিষ্কৃত এসব সত্যের চিরন্তনতা সর্বক্ষেত্রে প্রশ্নাতীত নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও পদ্ধতিগতভাবে লব্ধ জ্ঞান বলে বিজ্ঞান ক্রমপরিবর্তনের পথে সদাই ধাবিত। ফলে জনৈক পর্যবেক্ষকের কাছে আজ যা অসম্ভব বা মিথ্যা-- কাল তাই-ই সম্ভব ও সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যেতে পারে। বিনয় মজুমদার তাঁর গায়ত্রীকের একটি  কবিতায় জানিয়েছিলেন যে, ‘...আজো মানুষেরা প্রসবের আগে শিশু পুরুষ কি মেয়ে,/ মৃত কি জীবিত হবে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা রাখে না।’ এটি একটি বৈজ্ঞানিক মিথ্যা হিসেবে আজ পরিগণিত। কারণ বিজ্ঞান আজ এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। আবার অঘ্রানের অনুভূতিমালায় বিনয় মজুমদার কিছু জ্যোতির্লৌকিক তথ্য উপস্থাপন করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে বিনয় নিজের জবানীতেই তার অসারতার কথা বলেছেন। ওখানে সপ্তর্ষী নক্ষত্রমণ্ডলি অঘ্রান মাসে ওঠে বলা হয়েছে। আসলে ওঠে গ্রীষ্মকালে। এ গ্রন্থেই উল্লিখিত একটি প্রাকৃতিক সত্য-- ‘সকল বকুল ফুল শীতকালে ফোটে/ ফোটে শীতাতুর রাতে’-- অথচ বকুল ফুল কখনোই শীতকালে ফোটে না, ফোটে বসন্তকালে। আবার প্রচুর পরিমাণে জৈবনিক ও প্রাকৃতিক যেসব সত্য বিনয় মজুমদার তাঁর রসোত্তীর্ণ প্রবাদপ্রতিম বাক্যে ধারণ করেছেন, তার চিরন্তনতা প্রশ্নাতীত বলে মনে হয়। আসলে সেসবও প্রশ্নাতীত নয়। যেমন, ‘ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে/ পুনরায় কেশোদ্গম হবে না’। প্রকৃতপক্ষে ক্ষতস্থানে প্রচুর পরিমাণে কেশ না-গজালেও ক্ষতের প্রান্ত ঘেষে একটি দুটি দীর্ঘ লোম গজায়। অনেকের দেহই তার প্রমাণ বহন করছে। কিন্তু ‘ঘন অরণ্যের মাঝে সূর্যের আলোর তীব্র অনটন বুঝে/ তরুণ সেগুন গাছ ঋজু আর শাখাহীন অতি ধীর্ঘ হয়’-- আজিও চিরন্তন।

বলে রাখা ভালো যে, কেবল চিরন্তনতার অনুসন্ধানই কবিতার অভীষ্ট হবে এরকম কোনো কথা নেই। সময়ের ব্যাবধানে গায়ত্রীকে থেকে উল্লিখিত কবিতার বৈজ্ঞানিক সত্য আজ মিথ্যায় পর্যবসিত হয়েছে-- তাতে কবিতার তেমন যায় আসে নি কিছুই। কবিতার সৌন্দর্যের জায়গায় তা কোনো ব্যত্যয় ঘটিয়েছে, এমন নয়। কিন্তু যে কবিতার ধরনটিই এমন যে পাঠোত্তরে মনেই হয় তা আমাকে কিছু সত্যের অন্তত রজ্জুটা হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে-- সে কবিতার কবির এ ব্যাপারে সতর্ক থাকাই সমীচীন বলে আমার মনে হয়। নইলে পাঠককে অকারণে বিভ্রান্ত করা হয়ে যেতে পারে।

বিনয় মজুমদার জানাচ্ছেন, পাঠক যে কবিতা পড়ে, বারবার যে কবিতার কাছে ফিরে যায়, পড়ে পড়ে মুখস্থ করে ফেলে-- এর পেছনে ভূমিকা রাখে আনন্দ লাভাকাঙ্ক্ষা। কবিতায় রচিত বাক্য পাঠকের কাছে আনন্দপ্রদ হয় বলেই পাঠক বারেবারে কবিতামুখী হয়।

এরূপ বিরহ ভালো; কবিতার প্রথম পাঠের
পরবর্তী কাল যদি নিদ্রিতের মতো থাকা যায়
স্বপ্নাচ্ছন্ন, কাল্পনিক; দীর্ঘকাল পরে পুনরায়
পাঠের সময় যদি শাশ্বত ফুলের মতো স্মিত
রূপ, ঘ্রাণ ঝ’রে পড়ে তাহলে সার্থক সব ব্যথা

এই যে নিদ্রিতের মতো আচ্ছন্ন, বুঁদ হয়ে থাকা তা আনন্দের কারণেই। ‘কবিতা ও আনন্দ’ নামক প্রবন্ধে বিনয় মজুমদার কবিতা থেকে পাঠক কর্তৃক আনন্দ পাবার ১৪টি উপায় শনাক্ত করেছেন। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই চতুর্দশ উপায় বিনয় মজুমদারের নিজের কবিতাকেই ব্যাখ্যা করছে। এ বৈশিষ্ট্যগুলো বিনয়ের কবিতারই বৈশিষ্ট্য। আবার একইসঙ্গে এগুলো অমর কবিতারও বৈশিষ্ট্য।

বিনয় মজুমদারের মতে, অমর কবিতায় নিম্নোক্ত গুণগুলো থাকা দরকার-- মধুর ঘটনা, অন্যের জীবন কাহিনি জানবার উপকরণ, সত্য, জ্ঞানোপকরণ, দর্শন, জুগুপ্সা, ব্যঞ্জনা, ধাঁধার সমাধান, আবিষ্কার, প্রয়োজনীয়তা, সহজে মনে রাখার মতো বিন্যাস, সারাজীবন ধরে গবেষণার সুযোগ, নীতিকথা এবং রহস্য।

এর সবকটি কিংবা কোনো একটি কিংবা কোনো-কোনোটি একটি কবিতায় উপস্থিত থাকলে সে কবিতা পাঠকের জন্য আনন্দ বিধান করতে সক্ষম এবং সেটি অমর কবিতার দিকে অল্পবিস্তর অগ্রসরমাণ। কবিতায় এই অমরত্বের সন্ধান দেবার জন্যই বিনয় মজুমদার এর ছত্রে ছত্রে উল্লিখিত আনন্দোপকরণসমূহের সুষম বিন্যাস ঘটিয়েছেন। সুতরাং বিনয় মজুমদার ফিরে এসো, চাকা কিংবা অঘ্রানের অনুভূতিমালায় যা দিয়েছেন, পরবর্তী কয়েক পুরুষ ধরে আমরা তাতে আনন্দোপকরণ খুঁজে পাবার জন্যে বারেবারে অবগাহনের আয়োজন করব ও প্রকৃতই অবগাহনের খেলায় মেতে উঠব, প্রায়শই ডুব দিয়ে উঠিয়ে আনব নবতর আরো আরো প্রকৃত মাণিক্যের সন্ধান। আমরা তাঁর কবিতার কাছে ফিরে যাব রথ হয়ে, চাকা হয়ে-- যদি কেউই আমরা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক নই। সে কেবল একজনই ছিলেন, আছেন; কিন্তু বিনয়ের কবিতার কাছে তিনিও কোনো কোনো বিশেষ মুহূর্তে ফিরে ফিরে যান কি না, তা আমরা জানি না।

রচনাকাল : ২০০১

Saturday, November 14, 2009

কবিতার গান হয়ে ওঠা

খ. সুরের জগৎ কথার থেকে পৃথক।
গ. তবু এমন কথা আছে যাকে সাজালে সুরের রাজ্যে সহজে যাওয়া যায়।

কথা ও সুর : ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

আধুনিক বাংলা গান বিষয়ে আমি এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ লিখতে উদ্যত হই নি, কিংবা স্রেফ সাইম রানার গান বিষয়েও কোনো প্রবন্ধ লিখবার কোশেশ এটা নয়। এই লেখার অভিমুখ নিতান্তই অগভীর, কেবল আজকের গীতবৈঠকে গীত হবার জন্য তাঁর দশটি নির্বাচিত কবিতাকে ঘিরেই এর আবর্তন। ফলে এর প্রতি কোনো ধরনের অত্যাশা পোষণ হতাশার কারণ হতে পারে।

এই নিবন্ধকারের জানা আছে যে, সাইম রানা একজন কবি। আমি নিজেও কবিতার প্রতিবেশী বলে বিষয়টা অনেকটা কাছে থেকেই জানা। কিন্তু রানা যে একজন সংগীত সাধকও, সেটা আমি জানি না অথবা খুবই দূর থেকে জানি। কারণ কখনোই তাঁর কণ্ঠে সুরে বাঁধা কোনো কথা শুনবার সৌভাগ্য আমার হয় নি। আজই মাত্র আমার সামনে তেমন একটা সুযোগ অবারিত হতে যাচ্ছে। আমার কৌতূহলটা তাই সেখানেই বেশি। লিরিকগুলো আগে দেখা-পড়া থাকায় হয়ত এই এপিসোডটা আমার কাছে বেশ উপভোগ্য হবে, কেননা প্রায়-ন্যাংটো, উলোঝুলো ও ভাব-বক্তব্যের ভারবাহী কথার শরীরে সুর চাপালে সৌন্দর্য কীভাবে পূর্ণতা পায় বা লুপ্ত হয়, কীভাবে ডানে-বামে মোড় নেয় তা মিলিয়ে নিয়ে নিজের জানাবোঝাটায় কিছু হয়ত যোগ করার সুযোগ তৈরি হবে।

আজকের গীতবৈঠকের সংকলনে মুদ্রিত সাইম রানার কবিতাগুলো আমি বারকয় পড়েছি। এগুলোকে কবিতাই বলছি, কারণ সুর লাগবার আগ পর্যন্ত এগুলো তাই-ই, গান নয়। প্রথমবারের পড়াটা ছিল, যাকে বলে চোখ বুলানো, কোথাও ধাঁধিয়ে যাবার মতো কিছু ঠেকে যায় কি না তার অন্বেষণ। ঠেকে নি। কেমন সব চেনা চেনা শব্দ-বাক্য, চেনা ছবি, চেনা ফ্রেইজ। সপ্তাহখানেক সংকলনটা অবহেলায় পড়ে থাকে। ছুঁই না, ছোঁবার টান অনুভব করি না বলে। শুক্রবার যখন বেশ ঘনিয়ে আসতে থাকে, তখন ভেতর থেকে ক্রমশ নাগরিক হয়ে ওঠা আমার মনটা তাড়া দেয়, সেটা এই বলে যে, তুমি এই মর্মে আয়োজকদের কথা দিয়েছ, কবিতাগুলো সম্পর্কে একটা মিতভাষ্য অন্তত উপস্থাপন করবে। আমি আতঙ্কিত বোধ করি। তবে সেটা সহজেই কাটিয়ে ওঠা যায়। এক রাতে অন্য সব কাজকে লজিক্যালি গৌণ ঠাওরিয়ে সংকলনটা নিয়ে ফের বসা হয়। একটা একটা করে কবিতা পড়ি আর চোখ বন্ধ করে মাথার ভিতর কবিতাটাকে খেলাতে চাই। খেলে তো খেলে না। তারপর আবার পড়ি, কখনো বা আবার। দেখি যে ভিতরে এক ধরনের প্রতিক্রিয়ার জন্ম হচ্ছে। এক দুই শব্দে লেখাটার পাশেই ওই প্রতিক্রিয়াগুলো লিখে ফেলি। দশটি লেখাই যখন পড়া শেষ হয়, তখন ভিতরে একটা সমন্বিত চাপ তৈরি হয়, যা দশটি লেখার ভিত্তিতে সামগ্রিক একটা প্রতিক্রিয়াও উগরে দিতে চায়। একটা নোটখাতায় তাও টুকে ফেলি।

এরও তিন ঘণ্টা পরে বসি কম্পিউটারে। পটভূমি রচনার পর থমকে যাই, কীভাবে এগোবো সেটা ভেবে। সহসা সিদ্ধান্ত নেই যেভাবে চিন্তা এগিয়েছে সেভাবেই না হয় হোক লেখাটা। অর্থাৎ, পাঠোত্তরে প্রতিটা কবিতার পাশে প্রথম জন্ম নেয়া যে প্রতিক্রিয়াটি লেখা হয়েছিল তাই-ই একে একে বিন্যস্ত করি। লিখি--
  1. লড়াই-সংগ্রাম ছাপিয়ে ওঠা ক্লিশে এক আশা
  2. এবারও ভোর হয়, কোকিলেরা গেয়ে ওঠে পুরাতন ব্যথা ভুলে
  3. যা কিছুকেই তিনি মহান বলে ভাবেন, মহিমান্বিত করতে চান, তা-সবকেই তিনি বিশালতার উপমায় উপমায়িত করেন
  4. শিশুসুলভ সরল আবেগ উসকে ওঠে, দীর্ঘ জীবনের আকুতি প্রকাশ পায় শিশির প্রতীকে
  5. দুঃখমোচনের সাংগীতিক প্রেসক্রিপশন, যেখানে আবারো উঁকি দেয় আশা নামের ফুলঝুরি
  6. নদী-নৌকায় মাখামাখি ভাঙাগড়ার জীবনচিত্রে মূর্ত বাংলার রূপ
  7. ‘তুমি আসবে বলে’, ‘তুমি হাসবে বলে’-- এই জাতীয় ফ্রেইজ লিখতে অসতর্কতাজনিত একটা সাহস লাগে
  8. (...)। (সেসব কবিতাই গানের জন্য উৎকৃষ্ট, যাকে গদ্যে রূপ দেয়া যায় না।)
  9. অতিকে স্পর্শ করা খোলা কল্পনার উৎকর্ষ
  10. চিরছবির সংকলন। নীরবে কেয়াগাছের পাতা নড়ছে, ঋতু বদলাচ্ছে, এসব ঘটনার বয়স কখনোই বাড়ে না। কিন্তু মানুষের বয়স বাড়ে, আর বয়স বাড়া মানে ক্রমশ ফুরিয়ে যাওয়া-- মৃত্যুতে।   
এবার নোটখাতার দিকে তাকাই। সেখানে লেখা আছে, সাইম রানার এসব কবিতায় নতুন বোধ বা ছবির আবিষ্কার কই? কেবল পৃথিবীর নিয়ম রেখাকে ঘোড়ার ক্ষুরের মতো করে দেখা, কিংবা চোখের ভিতর পায়রার জল খেয়ে আশা মেটানো, কিংবা আয়ুর গ্লাসে মৃত্যু রাখা, কিংবা মেঘের বিছানায় হরিদ্রা কন্যার বেশে প্রভাতের ঘুমিয়ে থাকা, কিংবা জলের তারের কাঁপনে মেঘলা কুমারীর কেশে তান বাজানো-- এমন কয়েকটি জায়গা ছাড়া বাকি সব চিরচর্চিত বিষয়, বলনকেতায়ও যেসব প্রায় অনতুন। অর্থাৎ যেসব ছবি বা ছবিকল্প এখানে আঁকা হয়েছে, সেসব খুবই চেনা, তা সে গ্রামীণ বা নগর যে বাস্তবতা থেকেই নেয়া হোক বা যে বাস্তব ভিত্তিতে দাঁড়িয়েই কল্পনা করা হোক। লক্ষণীয় যে, গ্রামীণ ছবির উপস্থিতি বেশি হলেও সাইম রানার ভাব মূর্ত করবার ভঙ্গিটা অতিশয় নাগরিক বলে পুরো গ্রামীণ প্রেক্ষাপট ছুঁয়ে থেকেও তাঁর কবিতা লোককবিতা হয়ে ওঠে না বা বলতে পারি লোকগানের আত্মীয় হয়ে ওঠে না।

সাকুল্যে আমার পর্যবেক্ষণ এটুকুই। কিন্তু গীত হবার জন্য লিখিত কোনো কবিতাগুচ্ছ, অর্থাৎ লিরিক বা গীতিকবিতা সম্পর্কে এই-ই কি কখনো শেষ কথা হতে পারে, না হওয়া উচিত? যেখানে বলা হয় যে ‘সুরের জগৎ কথার থেকে পৃথক’, সেখানে এসব কথা তো শেষপর্যন্ত গীতঘনিষ্ঠ, সংগীতবান্ধব কোনো সম্ভাবনার কথা শোনায় না। এই টেক্সট কি সেসব সম্ভাবনা রহিত? অবশ্যই নয়। বরং সেদিক থেকে দেখলে এ ধরনের টেক্সটই প্রার্থিত। কীভাবে? আমাদের সংগীতচিন্তায় সামনের সারিতে বিবেচ্য বিশিষ্টজন ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘কথা ও সুর’ প্রবন্ধে জানাচ্ছেন, ‘শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতায় দুর্বোধ্য কথার বদলে পুরাতন ও পরিচিত কথারই প্রয়োগ দেখা যায়।’ কেন এমন হয় বা হতে হয়? কারণ কবিতা বুঝতেই যদি বেগ পেতে হয়, তবে সেটা উৎকৃষ্ট গীতিকবিতা হবার যোগ্যতা হারায়। এক্ষেত্রে তাঁর চূড়ান্ত কথা হলো, ‘যে শব্দ যত পরিমাণে অর্থ কিংবা বস্তুকে অতিক্রম করবার শক্তি ধারণ করে সেই শব্দ তত পরিমাণে গীতে সহায়ক, এবং সেইপ্রকার শব্দবাহী, শব্দবিন্যস্ত কবিতাই ততটা পরিমাণে সুর রচনার উপযুক্ত বাহন।’ কবিতাগুলো আমাদের পড়া আছে বলে আমরা কিছুটা জানি আবার সুরের সহযোগ পেয়ে কবিতার কথাগুলো কীভাবে এক্ষেত্রে উতরেছে তা আমরা এখনো জানি না বলে আপাতত এরকম একটি সিদ্ধান্তে দাঁড়ানোই সংগত যে, রানা হয়ত এই কবিতাগুলোর কথা এমনভাবেই সাজিয়েছেন, যার ভিতর দিয়ে সুরের রাজ্যে সহজে যাওয়া যায়।

সাইম রানা তাঁর সংগীতকর্মে সব্যসাচী। নিজেই তিনি গীতিকার-সুরকার এবং গায়ক। ফলে তাঁর সুরারোপের কৌশলকে, তাঁর গায়কীকে আলোচ্য গীতিকবিতাসমূহের পাশে রেখে কথা না বলে কেবল লিরিক নিয়ে শব্দে শব্দে আমরা যত কথাই সাজাই না কেন, তা সর্বার্থে অসম্পূর্ণতাকেই মূর্ত করে তুলবে। সুতরাং একটি অবশ্য-অসম্পূর্ণতাকে বেশিক্ষণ জাপটে ধরে না থেকে বরং কান পাতা যাক সেই কোনো জাদুতে, যা ব্যবহারিক জীবনের ভাবগুলির তুলনায় স্বভাবগতভাবেই অস্পষ্ট অথচ জীবনকে ছাপিয়ে থাকার ধর্মে যা আচ্ছন্ন।

৭ মার্চ ২০০৮
গীতবৈঠক, সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র

শাদাপৃষ্ঠা ভরাটকরণ প্রকল্পের অধীনে দেয়া কবিতাময় ছিন্ন-সন্তরণ

ক্ষণজন্মা ও স্পর্শকাতর ভাববস্তুর উৎকৃষ্ট অনুবাদ হচ্ছে কবিতা। যখন তখন এ ভাবের উদয় যেমন হয় না, যখন তখন চাইলেই এর অনুবাদও করা যায় না।

হয় না, কারণ, নির্দিষ্ট কবিব্যক্তিটির জৈবনিক নানা স্থূলক্রিয়ায় সময় ক্ষেপণ করতে হয়; কবি তাই অনুভূতির সূক্ষ্মতা সর্বদা বহনসক্ষম হন না। ভোঁতা অনুভূতিযোগে স্পর্শকাতরতা আঁচ করা কীভাবে সম্ভব! এ সময়কালে কবি অনুপস্থিত থাকেন ভাবদেশের স্বতোক্রিয়া নিরীক্ষণের কাজে। আর যায় না, কারণ, কবিতার ভাষা, যাতে সম্পন্ন করতে হয় অনুবাদক্রিয়া; তা সর্বক্ষণ দখলে থাকে না কোনো কবির। যেকোনো ভাষায় ভাবের যেকোনো প্রকাশই যেহেতু কবিতা নয়-- কাজেই কবিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হয় অনুবাদযোগ্য ভাষা। যিনি কবি, সূক্ষ্ম ভাবোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট কবিতাভাষাও এসে ধরা দেয় তাকে। এজন্যে আলাদা কোনো প্রয়াস অদরকারি। একটি কবিতা লিখবার পূর্বশর্ত তাই ক্ষণোদয়া ভাবের মৌলিক বিন্দুটিকে সূক্ষ্ম অনুভূতির জারকরসে সিক্ত করে, ততধিক সূক্ষ্ম যত্নে ভাষার আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারা এবং আনুষঙ্গিক ব্যঞ্জন সহযোগে শব্দসুতোয় তা গেঁথে ফেলবার জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠা।

কল্পনা কবিতার শ্বাসযন্ত্র বা ফুসফুস। এর দীনতা হাঁপানি রোগীর মতো অসুস্থ কবিতার জন্ম দেয়। কল্পনার চারুদেহে ভর করেই কবিতা হিসেবে দাঁড়িয়ে ওঠে বলবার কথাবস্তু; যার শিকড় প্রোথিত অকল্পনায়, বাস্তবে। এই অকল্পিত বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার মিশেলটা যত সমসত্ত্ব হয় কবিতার অর্জনমান হয় ততটা উৎকৃষ্টতর। মিশ্রণটি অসমসত্ত্ব হলেও ভালো কবিতা হওয়া সম্ভব, যদি থাকে কবিব্যক্তির উচ্চাঙ্গের পরিমিতি-জ্ঞান।

কল্পনা করবার ক্ষমতা আসে অভিজ্ঞতা থেকে। আর অভিজ্ঞতা আসে দেখা-শোনা-পড়া ইত্যাদির ভিতর দিয়ে। অভিজ্ঞতা হলো এক ধরনের ছাপ, যা মস্তিষ্কে কমবেশি স্থায়ী হয়। তার আলোকেই গড়ে ওঠে নানা কল্পিত ধারণা। কোনো কল্পনাই সুতরাং অভিজ্ঞতার বাইরের কোনো শূন্য জায়গা থেকে বেড়ে ওঠবার ফুরসৎ পায় না। মানুষ ঈশ্বর কল্পনা করেছে তার অভিজ্ঞতা থেকেই। মানবীয় সেই গুণসমূহই ঈশ্বর ধারণার ওপর আরোপ করা হয়েছে, যা উৎকৃষ্ট; যার কোনো কোনোটি মানুষের মধ্যে বর্তমান থাকলে আমরা সেই মানুষকে মহৎ, অসীম ও অলৌকিক গুণসম্পন্ন বলে জ্ঞান করি।

কল্পনা ক্ষমতা যার যত বেশি, তিনি ততবড়ো শিল্পী; আর উৎকৃষ্ট ও বিচিত্র কল্পনা করতে পারেন তিনিই, যিনি বিচিত্র অভিজ্ঞতার অধিকারী। কিন্তু আরো কথা থাকে-- এই যে অভিজ্ঞতা, যা কবির কল্পনা করবার পরিধিকে বাড়িয়ে দেয়, তা কবিতায় প্রযুক্ত হতে পারে কেবল তখন, যখন তা পরিশুদ্ধ হয়ে আসে অনুভূতিদেশ থেকে। এর অন্যথা হলে হয়ত পদ্য সৃজন সম্ভব, কিন্তু কবিতা অবশ্যই নয়।

ছন্দ কবিতার জন্য জরুরি; কিন্তু ধ্বনিময়তা সৃষ্টি হওয়া তার চেয়েও জরুরি। প্রচলিত কোনো ছন্দের ধারে-কাছে না-গিয়েও উৎকৃষ্ট কবিতা সৃজন সম্ভব। আবার ছন্দের সফল প্রয়োগেও একটি কবিতার সৃজন সম্ভব নাও হতে পারে। নেপথ্যে ভূমিকা রাখে এই ধ্বনির কারিশমা, ধ্বনি-আবহ সৃষ্টি হওয়া না-হওয়া। যুগপৎ ছন্দসাফল্য এবং ধ্বনিগত সাম্য সৃষ্টি হলে তা সবচে’ উত্তম। এ রকমটা অত ঘন ঘন হয় না। হওয়া সম্ভবও নয়। কদাচিৎ এমনটি ঘটে, যে কারণে ভালো কবিতা কদাচিৎ লিখিত হয়। যিনি ভালো কবি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন, তাঁর হাতেও সব সময় ভালো কবিতা এজন্যেই লিখিত হয় না। অন্যদিকে কোনোই স্বীকৃতি নেই, এমন কবির হাতেও সৃষ্টি হতে পারে একটি মহৎ কবিতা।

অনেকদিন থেকে যিনি কবিতা লিখেন, তিনি কবিতার বহিরাবয়বের এমন একটি ছাঁচ রপ্ত করে ফেলেন যে, চাইলেই তিনি কিছু শব্দকে ওই নির্দিষ্ট ছাঁচের মধ্যে ফেলে একটা অর্থবোধকতা সৃষ্টি করতে পারেন। খেটেখুটে তাকে অলঙ্কৃত করে তুলতে পারেন। হাতুড়ি-বাটালি-কাঠ পেলে যেকোনো কাঠমিস্ত্রি মানসিক যেকোনো অবস্থায় যেমন একটি চেয়ার বা টেবিল বানিয়ে ফেলতে পারেন, এ-ও অনেকটা তেমনি। কখনো কখনো প্রায় কবিমাত্রই এরকম কবিতামতো রচনা লিখে ফেলেন বটে-- কিন্তু সবসময় কবি বুঝতে পারেন না যে সেটি নির্জীব চেয়ার-টেবিল হয়েছে, না কবিতা। সেটা সম্ভব হলে চারপাশে কবিতামতো ব্যর্থ রচনার সংখ্যাধিক্য অবশ্যই চোখে পড়তো না। এটি বুঝতে পারার জন্য যে ধ্যান যোগ হতে হয়, তার অভাব না-ঘটলে চেয়ার-টেবিল নয় কবিতাই সৃজন সম্ভব। যিনি কবি তিনি কখনো কখনো কথিত এই ধ্যানময়তা থেকে চ্যুত হয়ে যান বটে, আবার ধ্যানমগ্নও তিনি হতে পারেন। তবে অকবি ধ্যানস্থের ভান করলেও ধ্যান তাতে ধ্যানস্থ হবার সুযোগ পায় না।

শেষপর্যন্ত একটি কবিতায় কী লিখিত হবে, কবি নিজেও তা জানেন না। একটি শব্দ, একটি বাক্য লিখিত হয়ে যাবার পর সেই শব্দ এবং বাক্যই চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে নিয়ে আসে আরেকটি শব্দ এবং বাক্যকে। এভাবে চলতে চলতে একসময় কবিতাটি সম্পূর্ণতা পায়। তখন শব্দ আরেকটি শব্দকে, বাক্য আরেকটি বাক্যকে ওই কবিতাটিতে আর প্রবিষ্ট হবার সুযোগ দেয় না, প্রয়োজন থাকে না বলে শেষ শব্দটি সম্পূর্ণ প্রবেশ পথ জুড়ে বসে থাকে। খতম হয় কবিতা কবিতা খেলা। এই যে একটি সম্পূর্ণ কবিতার সৃজিত হয়ে যাওয়া, পরিপূর্ণ ধ্যান যোগ হলে কখনো কখনো কবি ঠাহরও করতে পারেন না, কখন কীভাবে তাঁর দ্বারা অসাধ্যটি সাধিত হয়ে গেল। কবিতার এই সৃজিত হবার প্রক্রিয়ায় কবির অবচেতন মন এমনভাবে কাজ করতে থাকে যে, মস্তিষ্কের নির্দেশ পাবার পূর্বেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিখিত হয়ে যায় একেকটি শব্দ বা বাক্য। কখনো বা সম্পূর্ণ কবিতাটিই। অলৌকিকতা বলে কিছু নেই, কিন্তু মনে হয় এটি সংঘটিত হলো কোনো অলৌকিক প্রক্রিয়ায়ই। কবিতার জন্ম মুহূর্তটি এমন বলেই তাতে বাসা বাঁধতে পারে এত এত রহস্যের ঘনঘোর।

যিনি স্বভাষা বা বিভাষা শুদ্ধরূপে পড়তে-লিখতে-বলতে পারেন, তিনিই পাঠক নন। অন্তত কবিতার পাঠক তো ননই। কবিতার পাঠকের চালিত হতে হয় নির্দিষ্ট কবিতাটির সৃজন-প্রক্রিয়ার অধীনে আচ্ছন্নের মতো। যে গুণপনা থাকতে হয় কবির, তা কবিতার পাঠকেরও। যিনি এতসব গুণের অধিকারী, তিনি কবিতা না-লিখলেও কবি। হয়ত তিনি লিখেন না, কিন্তু লিখতে পারতেন। এরকম লোকের সংখ্যা প্রকৃতই কম, যিনি কবি নন অথচ কবিতার পাঠক। শেষপর্যন্ত কবিতার পাঠক কবিরাই। কবিই বাঁচিয়ে রাখেন কবিকে। আসলে একজন কবিতাকর্মীর সারাজীবন কবিতা লেখা, কবিতার পাঠক হয়ে ওঠবারই এক দীর্ঘমেয়াদি কষ্টকর পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারা মানেই কবি হয়ে ওঠা। যিনি কবি হয়ে উঠলেন কিন্তু পাঠক হয়ে উঠলেন না-- তার কোর্স অসম্পূর্ণ। কোর্স সমাপনীর কোনো সনদ তার কখনোই জুটবে না। তিনি সারাজীবন অধমই রয়ে যাবেন। একজন সম্পূর্ণ পাঠক, একজন অসম্পূর্ণ কবির চেয়ে উত্তম।

রচনাকাল : ২০০০

Sunday, August 16, 2009

বালখিল্যকথন

কবিতা হলো কবির জীবনের একটা পরিস্রাবিত দ্রবণ, পরিপার্শ্বের তাপে গলা, যে-দ্রবণে মিশে এসে সমুদয় ভালোমন্দ অর্জনের ভাঁপ, ক্লেদ-গ্লাণিসহ। এসবের ভিতর দিয়ে যাওয়া, ডান-বাম দেখে, পাশ দিয়ে কে যায় না-যায় তার তল্লাশ জারি রেখে। যেসব জিনিসকে মানুষ উপেক্ষা করে আসে, যেসবকে রেখে আসে পরে কাজে দেবে ভেবে, সেসবের দূরাভাও থাকে। প্রান্ত ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পানির মতো প্রয়োজনীয়তা সকল, সেসবকে যথাসম্মান দিয়েও বর্জ্যপ্রায় পরিত্যাজ্য বস্তু ও বস্তুভাবনার চরাচর চুঁইয়ে নেমে আসা অবিরল জলের দিকেও মাঝেসাঝে তাকাতে হয় ফিরে। কাকে নিতে হবে কাকে রাখতে হবে এসব ঠিক করে দেয় মেজাজ, যেটা সমাজঘটনা দিয়ে মোড়া। যে সুবিধা, যে অসুবিধা বিরাজ করে ভূয়ে, যখন যাপন করেন কবি, কবিতায় তার নিঃশ্বাসধ্বনিটাই বাজে। মানুষ দেখে দেখে শেখা মহাকালবোধ, এইখানে চুপিসারে এসে মেশে।

ভয়ের রক্তচক্ষুকে যুক্তির আঙুল দেখিয়ে থামিয়ে রাখা, অথচ ভেসে থাকা গোপন এক ভীতিভাবে। সভ্যতার নিঠুরাবেশে যতসব হুংকার দিকপাশে বাজে, নাতিদূরে ঘোরঘাটে খেলে ওঠে যতসব সন্তরণ লীলা, এসবেরও আঁচ রাখতে হয়, কোথায় কোথায় ভীতি সেই কথা সামনে না-এনে। ঘোর সেই পাললিক পরিসর নেচে ওঠে ধ্যানমগ্নতায়। পাঠককে গ্রস্ত করে ঘোর, আনে সম্মোহন। শুকনো পাতার সাথে উড়ে উড়ে ঝরে পড়ে পালকের আগে। মেঘসম্ভব গাম্ভীর্য ভেঙে বৃষ্টিধারা বয়।

বেদখল হয়ে যাওয়া ভূমির বেদনা রোদের আঁচে তাতিয়ে নিয়েও বড়োসড়ো অভিযোগ কাঁধে নেয়া, তার ভার। ঘরের ভয় ও পথের ভয় আলাদা-আলাদা, ওইসব হাতের চউলে নিয়ে দেখা। সামনে তাকিয়ে দেখা কারা কারা পথে নেমে গেছে, লাল-নীল। নানাদিকে হাত উঠিয়ে থাকা। পথ বন্ধ হয়ে থাকে পুরো, বড়ো নির্যাতন সয়ে তবু ওর দিকে যেতে হয়। আমোদে-আহ্লাদে যাওয়া দরকার যেইদিকে, সেদিকের প্রেমকুঁড়ি গাছ, তার ডালপাতা মূলটুল স্থান করে নেয় যথারীতি। সব করে নিতে হয় নিজেই প্রস্তুত। যারা অপেক্ষা করে থাকে যত্নের, কত তারা ধরে মিছে সত্য, তুলে আনতে হয় ওরে ধরে, তারপর শুরু হয় বাগানবিলাস। অধিগত নয় যেটা, তাকে ঘিরে অপচয় বাড়ে, তবে এরও নিগূঢ় আঁচড় থাকে মিলেমিশে, যদিও দরকারি এর থেকে দূরে বাস করা, নিজের মতো করে, ঘাড়টাকে যথারীতি ত্যাড়া করে রূপার কপাটে দিয়ে খিল।

হয়ত শোনা গেল ধনচে শিশুর কোলাহল, একপাশে থেকে যেতে পারে কোনো প্রেমময় কথার ঝিলিকও। তাকানো দরকার নেই জেনেও তাকানোর মরশুমে চোখে চোখে গেঁথে নেয়া জিওল ভাবনা। খটখট-ঘটঘট হয়তবা দূরে ঠেলে রেখে যায় সবিশেষ কামভাব, অবদমনের কোনো দমনচেষ্টায় বুঝি থরে থরে সাজানো থাকে এইসব কর্মের ডালা। যে ধ্যানে পৌঁছা যায় না, সে ধ্যানের ভিতর দিয়ে আসা মনে মনে। সেরকম ধ্যানের মায়ায় বুঝি লাল চেলি ভুলে গিয়ে অকুল-আশার গলে মালা দেয়া। অজ্ঞতা ছায়ার মতো লেড়েল্যাপ্টে থাকে, বোধকরি থাকতেও হয়। এই সবকিছু মিলেমিশে বিচিত্র রূপগুণ নিয়ে যেটা আসে, সেটাই কেবল হয় মহাকালমুখী, কোনো-না-কোনোভাবে।

২.

ব্যক্তিকবির জীবন নিষ্কাশিত হয়ে নেমে আসা অনুভূতিচূর্ণ যদি নানা আভরণের সংস্রবে অথবা সংস্রব বর্জন করে এমন কোনো দশাপ্রাপ্ত হয়, যা কবির অভিজ্ঞতাবাহিত অর্জন ছুঁয়ে বদলে যাওয়া ভাষার সহায়তায় প্রসারিত অর্থের শক্তি নিয়ে মনোহারী সৌন্দর্য অর্জন করে, তবে তাকে আমরা কবিতা বলবার অবকাশ পাই। এই রূপ বা সৌন্দর্যের নতুন হওয়া আবশ্যক হয়, যা অন্য কারো অনুকারবৃত্তির দ্বারা অর্জিত নয়, যা এই প্রথম জন্ম নিল মহাশূন্যতার উদর চিঁড়েফেড়ে। কবিতা সেই চূড়ান্ত অবস্থা, যা অনুভূতিচূর্ণের মিশেলে অনাস্বাদিতপূর্ব এক আস্বাদআঞ্জাম সংগঠিত করে রাখে, যার নিবিড় সংস্পর্শ পাঠকচিত্তে ঘটায় তীব্র সংক্রমণ, দ্রুত কিংবা ধীরে। এটা আবশ্যিক নয় যে এই সংক্রমণকে সর্বদা মধুরই হতে হয়, তা এমনকি বিষাদ-বেদনা-যন্ত্রণার কিংবা বিস্ময়-স্তব্ধতা-মূর্ছনারও হতে পারে। তবে সবই এর আনন্দপ্রদ।

সন্দেহ কী যে, কবিতা পাঠকমনকে শিক্ষিত করে, সঞ্চারিত করে। কিন্তু এ শিক্ষা কখনোই বেত্রাঘাতোৎপাদিত ও উৎসারিত নয়, বরং স্বতোৎসারিত। এ পরীক্ষা পাসের নিশ্চয়তা দেয় না, এমনকি দেয় না করে-কেটে খাবারও সুযোগ। এ শিক্ষা কেবলই সৌন্দর্য চেনায়, দেয় সৌন্দর্যের ঘোরে বাস করবার গলিঘুপচির সন্ধান। যিনি এ শিক্ষার আস্বাদ জানেন, তিনি বহুপথ হেঁটেও তার কাছে যান, চোখের দিকে চেয়ে চুপটি করে বসে থাকেন, কখনোবা ভাঁজ খুলে দেখেন, চকিতে শব্দ করেও ওঠেন। পাঠকমহান নির্দিষ্ট কবিতার কাছে গিয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন (লোকদেখানো ও উদ্দেশ্যমূলক প্রতিক্রিয়ার কথা আলাদা), তার সম্পূর্ণটা কবি বা কবিতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তা নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থায় নির্দিষ্ট পাঠকের সাথে ওই কবিতার যে যোগাযোগটি স্থাপিত হয়েছে, তাকে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার সাথে কীভাবে মিলিয়ে নিতে পারলেন না-পারলেন তার সাপেক্ষে। এই যোগাযোগটিও আবার নির্ভর করে কোন নির্দিষ্ট ও বিশেষ শ্রেণির শিল্পরূপের প্রতি তাঁর আগ্রহ বা অনাগ্রহ আছে তার ওপর।

প্রশ্নটা তাহলে ঠেকছে গিয়ে সৌন্দর্যে, যা পাঠককে আক্রান্ত করে। সৌন্দর্য ভোক্তার চিত্তাভ্যন্তরভাগে সংঘটিত ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ফলজাত একটা উপলব্ধি। কোনো শিল্পবস্তু ইন্দ্রিয়-সুখকর হলে এবং বুদ্ধিবৃত্তির খোরাক যোগালে তা ভোক্তার মধ্যে এই উপলব্ধির জন্ম দিতে পারে। সৌন্দর্যের এ ধরনের উপলব্ধি মনোমুগ্ধকর। সৌন্দর্যের অনুভূতিটা জন্মায় এ কারণে যে, এর দ্বারা পাঠক নতুন এক ভাষাসত্যের সামনে দাঁড়ান, যা তাঁকে ভাবায় ও তৃপ্ত করে। এর ফলে ঘটে তাঁর চৈতন্যের বহুস্তরিক উন্মোচন। এ প্রক্রিয়ায় তা আর কেবল আনন্দ থাকে না, ধারণ করে ওঠে আনন্দ ও উপযোগিতার এক সমন্বিত রূপ। যেজন্য মানুষ শিল্পবস্তুর কাছে যায়, বারবার ফিরে ফিরে যায়।

৩.

এই-ই সব, যেন এই-ই সব। যদি হয়ও তা, এ ধারার তরল বর্ণনার চেয়ে তা করে ওঠা কঠিন। আর শুধু করে ওঠাই বা বলি কেন? বলাটাই বা সহজ হবে কী প্রকারে, যে বলা প্রকৃত বলা? যদিও প্রকৃতটা বলা এক্ষেত্রে নিতান্তই অসম্ভব, কারণ কবিতা শিল্প। শিল্পের কীভাবে এমন সংজ্ঞা হতে পারে যা সর্বজনীন? স্বপ্রণীত সংজ্ঞাযোগে ধারকাছ দিয়ে হয়ত যাওয়া যায় তার, কিন্তু শতভাগ ঠিক ঠিক জায়গাটা শনাক্ত করা যায় না এর। আমরা তবু চিনতে চাই একে স্ব স্ব অভিজ্ঞতা ও জানাবোঝা দিয়ে। বুঝতে চাই যে, কোনপথে হাঁটলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় ও হাঁটার ভঙ্গিটা ঠিক কী হলে রচিত কবিতায় ভর করে এসে সুন্দর।

স্থান-কাল-পাত্রভেদে সর্ববাদীসম্মত সংজ্ঞাহীন সুন্দরের মান ও মানে বদলে যায়। সুতরাং একজন কেউ যখন সুন্দরকে চিনাতে যান, কবিতার সুন্দর, তখন তা প্রধানত হয় ওই কথকেরই মতো। আর যাঁরা যাঁরা নির্দিষ্ট কথকের মতো করে ভাবেন, বা দেখেন কথকের ভাবনার মধ্যে তাঁর/তাঁদের ভাবনার কোনো খোরাক আছে সামনে এগোবার, বা ধরা যাক এমন কেউ যিনি ঠিক উলটো করে ভাবেন বা ভাবতে চান কথকের চেয়ে; কথককে ছাড়া আর কেবল তাঁর তাঁর কাছে এসব বলাবলির কোনো মানে থাকলে থেকেও যেতে পারে।

৪.

‘ভাষাই বড়ো ব্যর্থতা ব্যর্থ লেখকের’-- এ কথায় মনেপ্রাণে আস্থা না-রাখবার কোনো কারণ ঘটে নি এখনো। লক্ষ করলে দেখা যায় যে, কোনো কোনো লেখক অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা অনেক অর্থপূর্ণভাবে বলেছেন, কিন্তু ভাষাগত বিশেষত্ব ও বাগসংহতি না-থাকায় তা পাঠককে ছুঁতে পারে না। কবিতায় ভাষার ব্যবহার হতে হয় অব্যর্থ ও যথাযথ। যোগাযোগসহজতা তার একমাত্র বিবেচনা নয়। বিবেচনায় থাকে উচ্চারণসহজতা, প্রত্যাশিত গাম্ভীর্য সৃষ্টির লক্ষ্য ও অর্থ প্রসারণ চেষ্টাও। অবিবেচকের মতো অবান্তর শব্দনিক্ষেপ কবিতাকে সিদ্ধির কূলে পৌঁছতে দেয় না, বরং চরে আটকিয়ে দেয়। পুরো কবিতার শব্দবিন্যাস সামঞ্জস্য ও সংগতিপূর্ণ হওয়া লাগে। তবেই কেবল তা সংগীতের দিকে এগিয়ে যায়।

ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। ভাষার এই পরিবর্তনের গতিটা কোনদিকে সেটা আন্দাজ করা গেলে সবচে’ সুবিধা। যেহেতু একজন কবিতাকর্মী আজকের জন্যই কবিতা লিখেন না, বরং লিখেন আগামীর জন্য, কাজেই আগামীতে ভাষার যে সম্ভাব্য রূপটি দাঁড়াতে যাচ্ছে তা যদি কেউ ঠিকঠাক ধরে উঠতে পারেন, তাহলে তিনিই আগামী সময়ে বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। একজন কবির কবিতা যতদিন প্রাসঙ্গিক ততদিনই তিনি পঠিত হন, এবং ততদিনই তিনি জীবিত। ততদিনই তাঁর লেখার নব নব দরোজা উন্মোচনের সম্ভাবনা থেকে যায়। আর্কাইভড হওয়া একজন লেখকের কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়, প্রত্যাশাও নয়।

লেখককে প্রাসঙ্গিক রাখে কেবল ভাষা নয়, তাঁর বক্তব্যও। নিহিত বক্তব্যকেও সমকালোত্তরণের স্পর্ধা রাখতে হয়। যা আজ লেখা হলো তা আজ তো সমকালীনই, কিন্তু কাল যদি তা পশ্চাৎপদ বিবেচিত হয়, তবে তা ভাষায় প্রাসঙ্গিক হলেও সার্বিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। আজকের বার্তাকে যদি তাবৎ ক্ষমতাযোগে মহাকালের করে তোলা যায়, তবে সেটা প্রসঙ্গ হয় আগামীদিনের। এজন্য ভাবনাচিন্তায় আধুনিক হতে হয়, বিজ্ঞাননিষ্ঠ হতে হয়, নতুনকে গ্রহণ করবার মানসিকতাসম্পন্ন হতে হয়, কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে হয়। এ হলে ছোঁয়া যায় চিরসমকাল। অর্থাৎ কবির মহাকালকে লক্ষ্যে রেখে শব্দচয়ন, শব্দসজ্জা ও বাক্য নির্মাণ করতে হয়। এটা যে যত ভালো করতে পারেন, তিনি তত বেশিদিন বেঁচে থাকেন। এ বাঁচা শারীরিকভাবে নয়, পাঠকের মধ্যে নান্দনিকভাবে বাঁচা।

পাঠকদের একটা অংশের সঙ্গে কবির যে দূরত্ব তৈরি হয়, তার একটা কারণ মহাকালকে অভীষ্ট ভাবা। এটা সংগতও। এ অবস্থা কারো ক্ষেত্রে খুবই প্রকট আকার ধারণ করে, কারো ক্ষেত্রে অপ্রকট। কিন্তু এ কখনো নয় যে, পাঠকঅপ্রিয় কবিমাত্রই মহাকালের সওদাপাতিতে ব্যস্ত। পাঠকঅপ্রিয়দের একটা বড়ো অংশই অল্পপ্রাণ কবি অথবা অকবি। পাঠকপ্রিয়দের মধ্যে এ সংখ্যা আরো বেশি।

৫.

কবিতা প্রতিবেদন নয়, প্রতিবেদন তথ্যজ্ঞাপক, কবিতা অনুভূতিজ্ঞাপক। মহান পাঠক কবির দেয়া তথ্য নয়, অনুভূতি দ্বারা সঞ্চারিত হন। অর্থাৎ, কবিতায় পাঠক খোঁজেন অনুভূতিজ জাত্যর্থ, নিজে চাঙ্গা হয়ে ওঠবার জন্য। অনুভূতির ভার বহন করাই কাব্যভাষার কাজ, কাব্যভাষার এজন্য প্রতিবেদনের ভাষা থেকে দূরবর্তী হতে হয়। কবিতায় শব্দ নতুন ব্যঞ্জনায় জেগে ওঠে, পাঠমাত্র পাঠকের মনে এর জন্ম হয়। নবজাত এই ব্যঞ্জনার প্রণোদনায়ই অর্থফাটল ভরাট করে নেন পাঠক। ফাটল কেন থাকে? প্রতিবেদনের পরম্পরা অনুসৃত হয় না বলে। এ ভাষায় ব্যক্তি-বস্তু এক পাতে বসে অভেদ রচনা করে, অচিন্তিতভাবে রূপকায়িত হয়ে লাভ করে ধ্বনির আদর আর চিন্তিতভাবে উপমায়িত হয়ে বইয়ে দেয় শুশ্রূষার মতো বাণী। ব্যক্তিগত মূল্যায়নের সরাসরি অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়েই ভাষা সেখানে এরকম রূপ পায়। এটা হয় অনুভূতিরই তাড়ায়। পাঠকের মনে আবার এটি অনুভূতি জাগাবারও দায়িত্ব পালন করে। কখনো কখনো বস্তু ও ধারণায় এমনকি প্রাণসঞ্চারও ঘটে, পাথরও বাউল হয়, ভয় জোরে কেশে ওঠে।

সংবাদপত্রের পাতায় তো আমরা হামেশাই দেখি ব্যাঙের ছাতার মতো মাদ্রাসাকে গজিয়ে উঠতে, বাজারে আগুন লাগতে। এ-ও তো রূপকই। তাহলে রূপকপ্রশ্নে প্রতিবেদন আর কবিতায় পার্থক্য রইল কই? আছে পার্থক্য। যে রূপক মরে যায় নি, সংবাদপত্র সে রূপক ব্যবহার করতে পারে না। সংবাদপত্রের প্রধান দায় বক্তব্যকে সহজে বোধগম্য করা। সংবাদপত্রের ভাষায় তাই ফাটল শোভন নয়, অনুভূতিজ্ঞাপন তার কাজ নয়, তার কাজ তথ্যজ্ঞাপন। কবিতা যে রূপকের জন্ম দেয়, তার কাজ বোধগম্য হওয়া শুধু নয়, বোধকে উসকে দেওয়াও। কবিতার রূপক সার্থক হলে সময়ে সেটা মরে যায়। সংবাদপত্রও তখন পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটি করে দেখতে পারে। কবিতার রূপক এ প্রক্রিয়ায়ই ক্লিশে হতে হতে মরে গিয়ে সংবাদপত্রের ভাষা হবার যোগ্যতা অর্জন করে। ঠিক এ কারণেই সংবাদপত্র যখন সাহিত্যের দায় সামলায়, তখনও মরা রূপককেই তা মহিমান্বিত করে বেশি।

ব্রাত্যজনের ভাষায় উপমা-রূপকের যথেচ্ছ ব্যবহার আছে। যেসব ভাষাকে আমরা অশ্লীল বলে অভিযুক্ত করি, সেসব ভাষায় শক্তিশালী সব রূপকের উপস্থিতি থাকে। যিনি অকথ্য গালি খান তিনি যে দ্রুত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বা পালটা গালি দেন, এটা প্রমাণ করে যে, ওই নির্দিষ্ট প্রয়োগটা খুব দ্রুত শ্রোতাকে স্পর্শ করেছে এবং তার মনে পালটা অনুভূতির উদ্রেক করেছে। এটা রূপকেরই শক্তি। সাধারণ মানুষের মুখের কথা তাই কবির জন্য ব্যাপক অনুধ্যানের বিষয় হয়ে ওঠে। কবির কেন হবে শুধু? সকল লেখকেরই, সকল ভাষাকর্মীরই হয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, তীব্র আক্রমণাত্মক রূপকাশ্রয়ী গালাগালির ঘটনাগুলো যখন ঘটে তখন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চারপাশে ভিড় করে ওঠে। কী বলে না বলে তা তারা মনে দিয়ে শোনে। কেন শোনে এসব? কারণ এ ভাষা দারুণভাবে বোধ্য, অর্থময়, নাটকীয় অভিব্যক্তিসমৃদ্ধ ও দ্রুত সঞ্চরণশীল। মানুষের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা মন্দাগুন এ ঘটনায় চাড়া দিয়ে ওঠে। তাই জন্যে সেটা হয় আনন্দময়, সম্ভবত।

অধুনা বিকশিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বাংলা ভাষায় নোটানোটি শুরু হয়েছে বেশিদিন নয়। তারও আগে শুরু হয়েছে বাংলা ব্লগ। এসব মাধ্যমে ছদ্মনিক নিয়ে আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের এমন এক চূড়ান্ত অবস্থা মাঝেমধ্যে দ্রষ্টব্য হয়ে উঠছে যে, তা বস্তির গালিকর্মকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দেখা যায় যে, যেসব পোস্টে এ ধরনের কাণ্ড ঘটে সেসবের পাঠক বেড়ে যায়। হিট সংখ্যা হয় অনেক বেশি। ব্লগে হিট গণনা করা গেলেও ফেসবুকে সেটা করা যায় না। তবে এখানেও যে বিস্তর মানুষের আগমন ঘটে তা কতকটা বোঝা যায় কমেন্টের বহর দেখে। সম্প্রতি ফেসবুকে এসব ছদ্মনিকের গালিবাজি প্রতিরোধের জন্য একাধিকবার আন্দোলন গড়ে তুলবার চেষ্টা করেও বিশেষ সাফল্য পাওয়া যায় নি। বাকস্বাধীনতা ও স্বরবৈচিত্র্যের পক্ষে ভোট দিয়ে অনেককেই এখানে প্রকাশ্যে বলতে শোনা গেছে যে, তাঁরা নিকদের কথাবার্তা এমনকি পছন্দই করেন। ফলাফল থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছা কখনোই যাবে না যে, নিকসমর্থকদের প্রত্যেকেরই গোপনে একাধটা নিক আছে। তাঁদের আকর্ষণের একটা কারণ নিকসমূহের রূপকবহুল ভাষাও। যাঁরা এসব প্রশ্নে চুপ করে থাকেন, ধারণা হয় তাঁদের মনেও হয়ত নিকদের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন সমর্থনই প্রকাশ পায়। তা নইলে কথিত নিকদের বন্ধুতালিকা থেকে মুছে দেবার ব্যাপারে তাঁরা অনাগ্রহ প্রদর্শন করবেন কেন? এঁদের সবাই তো আর আক্রান্তের শত্রু নন যে, শত্রুর পরাস্ত হওয়া দেখে তাঁরা আনন্দ নেবেন। আনন্দ আসলে তাঁরা নেনই, তবে সে আনন্দটি আসে ভাষা থেকে, রূপকের ব্যবহার থেকে। আমরা আমাদের পাঠক জীবনে এমন অনেক গদ্যরচনার আস্বাদ নিয়েছি, যাকে আমরা বলেছি কাব্যগুণসমৃদ্ধ। এই বিশেষণ প্রয়োগের প্রধান কারণ সে ভাষার পরতে পরতে বস্তুতে জেগে উঠেছে সপ্রাণ বাদ্যি, রূপকের ঢাক।

৬.

একটা বহুশ্রুত প্রবাদ আছে আমাদের সংস্কৃতিতে, ‘ঝিকে মেরে বউকে শেখানো’ বা ‘বউকে মেরে ঝিকে..’,। এই প্রবাদোপরিতলে যে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট, কবিতায় প্রতীক ওই কাজটিই করে। যে বস্তুকে বা যাকে বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে তার কথা না-বলে বর্ণিত বস্তু বা ভাব বা ঘটনার বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঠিকঠাক ঘটে এমন কিছু দ্বারা মূলকে প্রতিস্থাপিত করাই প্রতীকায়ন। আড়াল সৃষ্টির জন্য এবং সৌন্দর্য নির্মাণের জন্য এটির দরকার হয়। শিল্পে প্রতীকের ব্যবহার খুব প্রচলিত ঘটনা। সঠিক প্রতীক ব্যবহার করতে পারা বিষয় ও বিষয়সংশ্লিষ্ট জগৎ সম্পর্কে অভিজ্ঞতার পরিচয় বহন করে। প্রতীককে হতে হয় সুপ্রযোজ্য। একটি প্রতীকের অযথার্থ ব্যবহার একটি কবিতাকে মাঠে মেরে ফেলতে পারে। সব পাঠক সব প্রতীককে ঠিকঠাক ধরতে পারবেন সেরকম ভেবে ওঠা অসংগত। কিন্তু নিবিড় পাঠে তা অধিকাংশ অভিজ্ঞ পাঠকের কাছে গ্রাহ্য হয়ে ওঠা উচিত। ব্যবহার যথার্থ হলে তা না-হবারও কারণ খুব থাকে না। অবশ্য কবি যে অর্থে প্রতীকটি ব্যবহার করেছেন ঠিক সেটাই না-বুঝে পাঠক অন্য কিছুকে বুঝলে মহাভারত ক্ষণিকের জন্যও অশুদ্ধ হয় না, যেহেতু পাঠকই কবিতার ‘মানে’কে জন্ম দেন তাঁর তাঁর মতো করে। কবিতার অর্থ পাঠকভেদে বদলে যেতে পারে, এটাই কবিতার শক্তি। এমনকি বলা চলে স্থিত মানের রচনা কোনো কবিতাই নয়। সেটাই কবিতা, যে টেক্সটের মানে পাঠে পাঠে বদলায়। এটা দূর করবার চেষ্টা কবিতার কবিতাত্ব নিয়ে খানিক সংশয়কে বরং উদ্বেলিত করা।

কবির সময়ে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অনেক কারণ থাকে, যা তাঁকে আড়াল সৃষ্টি করতে বাধ্য করে। এ তাঁর নিজ অস্তিত্ব রক্ষার্থে তো বটেই, শিল্পের কৌমার্য রক্ষার্থেও দরকার। কবির আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নানা ঘটনার দ্রষ্টা হয়ে উঠতে হয়। আর এসবের ভিত্তিতে সামাজিক মানুষ হিসেবে তিনি নানা প্রেরণাও লাভ করেন, আবেগাপ্লুুত হন। কিন্তু খুব সরাসরি তিনি তা বলতে পারেন না। বললে তাঁর উপরে নানা খড়্গ নেমে আসার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া শিল্প হিসেবে কবিতার সব কথা সবভাবে গ্রহণ করবার সক্ষমতা নেই, এটা মনে রাখতে হয়। এত অনর্থক ভার বইতে পারে না কবিতা। যে কারণে কবিকে বক্তব্য আড়াল করতে নানা প্রতীকের আশ্রয় নিতে হয়।

ভাষা সংকেতও আদতে প্রতীক। ভাষার প্রতিটি শব্দ এক বা একাধিক বস্তুর প্রতীক। কলিম খান অবশ্য বলেন, বাংলাভাষার শব্দভাণ্ডারের সবচে’ বড়ো সম্ভার সংস্কৃত ভাষা ছিল ক্রিয়াভিত্তিক। তৎসম শব্দসমূহের মাধ্যমে এ গুণ বাংলা ভাষায় স্বতঃস্থানান্তরিত। ক্রিয়াভিত্তিক ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এর মূল অর্থ হয় ধাতুর। নির্দিষ্ট ধাতু থেকে উদ্ভূত সমস্ত শব্দের অর্থই নিয়ন্ত্রণ করে ধাতুর অর্থ। শব্দব্যাখ্যান কর্মের যে ছবি সামনে আনে, সেই কর্মের বৈশিষ্ট্যই নির্ধারণ করে শব্দটির গঠন কী হবে। এ মতে শব্দের অর্থ বাইরে থেকে আরোপিত নয়, ভিতর থেকে উৎসারিত। পরে মুনাফালক্ষ্যী বিনিময়কে শব্দার্থজাত ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে অধিক লাভজনক করবার জন্য শব্দকে সুনির্দিষ্ট মানেবাহী করে তুলতে কিছু শব্দের অর্থকে সুনির্দিষ্ট করে ফেলা হয়। যে কারণে কোনো-কোনো শব্দের ধাতুমূলগত অর্থ অজস্র হলেও শোনামাত্র কেবল এক-দুটি প্রাণী, বস্তু বা বিষয়কে বোঝায়। এটা স্বাভাবিকভাবে অজস্র অর্থ হওয়াকে আস্বাভাবিকভাবে সীমিত পরিসরে বেঁধে ফেলানো। এর মানে প্রসারিত অর্থকে সংকুচিত করে ফেলা, যেভাবে আমাদের বাংলা ভাষাও, অন্যসব ভাষার মতো প্রতীকী ভাষা হয়ে উঠেছে। সব ভাষাই সময়ের সাথে বদলে যায়, ভিতরে ও বাইরে। সংকুচিত হয় প্রসারিতও হয়। এর অনেকগুলো কারণ থাকে, কলিম খান মুনাফালক্ষ্যী বহির্দেশিয় বেণিয়াদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কারণটিকে নেতিবাচকভাবে দেখেছেন। সংকোচনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।

অমুনাফালক্ষ্যী শিল্পসৃজনের প্রয়োজনেও যে শব্দের অর্থ কালে কালে বদলে যায়, এটাকে তিনি সংকোচনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেন নি। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ নামক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে অভিধানকে ভিত্তি করে কলিম খানের ক্রিয়াভিত্তিক ভাষাতত্ত্ব দাঁড়িয়েছে, সেটি সংকলনকাল পর্যন্ত বিভিন্ন মুদ্রিত দলিলে যে সমস্ত অর্থে যেভাবে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তার একটা যথাসম্ভব ভালো ডকুমেন্টেশন, সেখানে সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের উদাহরণসহ প্রাপ্ত অর্থসমূহ নথিভুক্ত হয়েছে। ভাষাসংশ্লিষ্ট সকল সেক্টরেই শব্দের মানে বদলায়, নতুন মানে সংস্থাপিত হয়; এবং শুধু লিখিতভাবে নয় এটা হয় মৌখিকভাবেও। সচল ভাষামাত্রেরই ক্ষেত্রে এরকমটা ঘটে। ভাষা যত বিচিত্র কাজে ব্যবহৃত হয়, তত বিচিত্র হয় এর জগৎ, সমৃদ্ধি। সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম সবচে’ বড়ো সেক্টর, যেখানে এই কাজটা হয় সবচে’ বেশি। এখানে প্রতিনিয়ত শব্দের মানে নড়েচড়ে যায়, প্রসারিত হয়। প্রসারণার্থে শব্দের এই প্রয়োগেরও সাহিত্যে প্রতীকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার কথা, যে ধরনের প্রতীকের ব্যবহার রচনাকে কবিতা করে তোলে। একজন কবিতাকর্মী একইসঙ্গে ভাষাকর্মী। তাঁর একটা কাজ এ-ও যে তিনি ভাষাকে সম্প্রসারিত করেন। ভাষার সম্প্রসারণ ব্যবহারিকভাবে ঘটাতে গিয়ে তিনি একটি কবিতা করলেন এরকম নয়, বরং কবিতা করতে-করতে একইসঙ্গে ভাষাকে সম্প্রসারিত করছেন। কবিতাটি যখন শিল্প হয়ে ওঠে, তখন এই ভাষাকৃতিটা উপজাত।

শব্দে নতুন প্রাণসঞ্চারের এই কাজটি কবিতাকর্মীর একটি মুখ্য কাজ। শব্দ যদি নতুনভাবে খেলে ওঠে, অর্থটা যদি একটু মুচড়ে যায়, তাহলে পাঠক নড়েচড়ে বসে। ক্লিশে মানেযুক্ত করে ক্লিশে শব্দের ব্যবহার মৃত রূপকের ব্যবহার, যা আবার প্রতীকও। কবিতায় পাঠক মৃত রূপকের রাশি-রাশি লাশ দেখতে পছন্দ করেন না।

মিথ হিসেবে খ্যাত লৌকিক পুরাণ বা পৌরাণিক লোকশ্র“তিকেও প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। পৌরাণিক একেকটি চরিত্র বা ঘটনা অতীতের একটা চরিত্র বা ঘটনার গল্পকে ছোট শব্দশরীরের মধ্যে ধরে রাখে। গোটা কবিতায় একটি শব্দ হয়ে ব্যবহৃত হলেও ওর অনেক দীর্ঘ অদৃশ্য ফুটনোট থাকে। শব্দটি ওই ফুটনোটের প্রতীক। একজন কবি অবিকল অর্থেই শব্দটি কবিতায় ব্যবহার করলে ধরতে হবে তিনি মৃত রূপক বা ক্লিশে প্রতীক ব্যবহার করলেন। মিথের এরকম ব্যবহার গতিশীল নয়, নয় প্রগতিশীলও। হাজির করতে হয় এর নতুন বয়ান। পুরোপুরি অথবা অংশত, যেটা প্রাসঙ্গিক। ধরা যাক দেবী দুর্গাকে দশ হাতে কাজ করা গার্হস্থ্যকর্মী সক্রিয় নারীর রূপে দেখা হলো। এ প্রয়োগটিকে পাঠক আরো দূর পর্যন্ত কল্পনা করে নিতে পারবেন, যে, এতকিছুর পরও একজন গার্হস্থ্যকর্মী নারী ‘কর্মী’ স্বীকৃতিটা পর্যন্ত অর্জন করতে পারে না এবং এর জন্য কোনো অর্থমূল্য দাবি করতে পারে না। কাজগুলো অনর্থক না-হয়েও না-অর্থক হওয়ার কারণে এই যে পুরুষতান্ত্রিক বঞ্চনা, এটা তখন হয়ে যেতে পারে ওই নির্দিষ্ট প্রয়োগের একটা তাৎপর্যপূর্ণ আলোকপাত। মিথের এই মুক্তিটা কবিতায় প্রার্থিত।

৭.

ভালো কবিতার ব্যাখ্যা পরিবর্তনশীল। পাঠকভেদে এর অর্থ তো আলাদা-আলাদাভাবে খোলেই, এমনকি একজন পাঠকের কাছেও উপর্যুপরি পাঠে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ধরা দেয়। যে কবিতার এ সম্ভাবনা আছে সে কবিতা বহুজনকে ছুঁতে পারে। গুমরমুক্ত ও একটিমাত্র সরল অর্থে ধরা দেওয়া একরৈখিক কবিতা হীনপ্রায়। কবিতায় অর্থের এই অস্থিরতা রহস্যময়তা সৃষ্টি করে করা সম্ভব। সময়ের জীবনছন্দ ধরে শব্দকে বাঁধাধরা পরিভাষার আওতা থেকে বের করে এনে দ্ব্যর্থক বা অনেকার্থক মানে জাগিয়ে তুলতে পারলে এ সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে সূচিত হতে পারে। এর জন্য উল্লম্ফন কার্যকর নয়, নন্দনগহ্বর তক বড়োজোর পাঠক নিতে রাজি হন। বাক্যের ওপর নিরর্থকতা বা অনর্থকতার ভার চাপাতে চাইলে ফাঁকি সৃষ্টি হয়, রহস্য নয়। অদূর এমনকি সুদূর চেষ্টায় হলেও শব্দ-বাক্যের নাগাল মিলতে হয়, তা নইলে কবির সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। যাই হোক, এরকম কবিতার মানে কোনো একটি স্থির নির্দিষ্ট পাটাতনে দাঁড়ানো থাকে না, বলাই বাহুল্য।

সাধারণীকৃত বক্তব্যের ক্ষেত্রেও কবিতার মানে নানাদিকে খুলবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একইসঙ্গে গাছের-মাছের, জীবন্মাত্রের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে সাধারণীকরণ। প্রতীকের ব্যবহারও কবিতাকে অনেকার্থকতা দিতে পারে। প্রতীকবস্তুটি বাইরে একটা মানে ধরলেও ভিতরে আরেক বা অনেক। প্রাথমিক পাঠে এর বহির্বাটির খোঁজ পাওয়া যায়। অগ্রসর পাঠে আস্তে আস্তে নিহিতার্থের দরজা খোলে। এক ধরনের পাঠক বাইরের মানেটা নিয়ে তৃপ্ত থাকে। কিন্তু সবাইকে ওই মানে তৃপ্ত করতে পারে না। গুমর বয়ন করা গেলে অগ্রসর পাঠকের জন্য খোরাক হতে পারে। ব্যাজস্তুতি-ব্যাজনিন্দাও এ শ্রেণির পাঠকের আগ্রহের আওতায় স্থান পেতে পারে।

৮.

আবেগ কবিতার জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ একটা অদৃশ্য ঘটনা যে একে ছাড়া শিল্পসৃষ্টি, বিশেষ করে কবিতা লেখা অসম্ভবপ্রায়। অবশ্য আবেগ ব্যতিরেকেও কবিতামতো দেখতে রচনা তৈরি করা সম্ভব, যেটা অতি অবশ্যই হয় যান্ত্রিক, অতএব কবিতা নয়। এ ধরনের রচনা তৈরিকে পেশাদার কাঠমিস্ত্রির একের পর এক টেবিল-চেয়ার বানানোর সাথে মিলিয়ে দেখা যায়। যতক্ষণ ব্যবহারোপযোগী কাঠ আছে, হাতুড়ি-বাটালি আছে, বাইস আছে, ততক্ষণ কাঠমিস্ত্রি অবিরাম বা সবিরাম চেয়ার-টেবিল বানিয়ে যেতে পারেন। একটি চেয়ার ও টেবিলের শিল্পকর্ম হয়ে ওঠবারও অবকাশ থাকে, কিন্তু পেশাদারি উন্মাদনায় ভেতরের টান ছাড়া নির্মিত চেয়ার-টেবিল তা হয় না। একইরকমভাবে একজন কবিতাকর্মীকে কাগজ-কলম-পরিসর দিলে যখন-তখনই তিনি ছন্দোবদ্ধ কবিতামতো লেখা তৈরি করতে পারেন, কিন্তু সেটা পেশাদারি উপায়ে তৈরি চেয়ার-টেবিলের মতোই যান্ত্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্যমার্কা একটা ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। পেশাদার ঔপন্যাসিকদের হাতে যেরকম ফল ফলতে থাকে অবিরাম। তাঁরা হলেন বারোমাসী ফলগাছ। বছরে হরদিনই সেসব গাছে ফল থাকে।

সত্যিকার কবিতা রচিত হতে গেলে তার মধ্যে আবেগের পরিমিত প্রকাশ ঘটতে হয়। এই প্রকাশ ঘটায় আবার ইন্সপিরেশন বা প্রেরণা। দাঁড়ালো তাহলে এই যে, যে-প্রেরণার গুত্তো খেয়ে বিষাদ, ক্রোধ বা আনন্দ জাতীয় আবেগ উসকে উঠবে, তার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সৃজিত মানেযুক্ত রচনার কবিতাবস্তু হয়ে ওঠবার অবকাশ থাকে। অর্থাৎ আবেগ যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি অত্যাবশ্যক তার সুনিয়ন্ত্রণ। ধরা যাক, কোনো কারণে অত্যধিক ক্রোধ সঞ্চারিত হলো মনে। ঠিক তৎক্ষণাৎ একটি কবিতা রচনায় উপগত হলে এটির কবিতা হয়ে ওঠবার সম্ভাবনা লোপ পায়। ক্রোধটাকে সামগ্রিকতার ওপরে দাঁড়াবার জন্য সময় দিতে হয়, তাতে তা আর ব্যক্তিগত ক্রোধ থাকে না, হয়ে ওঠে সর্বজনীন, সাধারণ। এই সর্বজনীন ক্রোধ যদি কোনো একটি রচনা উৎপাদনের নেপথ্যে ভূমিকা রাখে, তবে তার মাধ্যমে সৃজিত রচনাটি কবিতা হলেও হতে পারে, এমনকি খুলে যেতে পারে তার সর্বজনীন হয়ে ওঠবার সম্ভাবনাও। চীনা একটি প্রবাদ আছে এরকম যে, রাগান্বিত অবস্থায় কখনো চিঠির জবাব দিতে নেই। কেন? ওই একই কারণে। নইলে যাকে জবাব লেখা হচ্ছে, তার প্রতি অবিচার হয়ে যাবার সম্ভাবনা শয়ে প্রায় শ’। রাগ প্রশমিত হয়ে যখন ব্যাপারটা সূক্ষ্ম ক্রোধানুভূতিতে রূপান্তিত হয়, তখন তার পক্ষে সম্ভব সামগ্রিক অবস্থার মূল্যায়ন করা ও মত স্থাপন করা। ওই প্রাবাদিক সত্যটা কাজেই এখানেও নিহিত।

কবিতায় তাৎক্ষণিকতার এই বিপদাপদ সম্পর্কে কবিমাত্রেরই সচেতন থাকা আবশ্যক জ্ঞান হয়। এর মানে কি এই যে সুতীব্র উন্মাদনার ভিতরে আনন্দ, বেদনা বা অন্য কোনো অনুভূতির কথা লেখাই যাবে না? না, তা নয়, একদমই নয়। লেখা যাবে। কারো কারো হাতে এভাবেও উৎকৃষ্ট রচনা বেরিয়ে আসা সম্ভব বৈকি, তবে এতে নিকৃষ্ট রচনা তৈরি হবার ঝুঁকিই বেশি থাকে বলে মনে হয়। সুতীব্র উন্মাদনাজাত রচনার খসড়াকে কবিতায় রূপ দেবার জন্য অনেক কাল ফেলে রাখাই সঙ্গত। এটা কতদিন, তার কোনো সুস্পষ্ট সীমা নেই। তবে এরকম বলা যায়, যতদিন ওই নির্দিষ্ট অনুভূতি, যা নেপথ্য কাণ্ডারি হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল, তা একটা সামগ্রিকতার ওপরে না-দাঁড়ায়, ততদিন। নির্দিষ্ট সময় পর ওই খসড়ার একটা নিরাবেগ সম্পাদনা-শাসন দরকার হয়। ঝেড়ে ফেলতে হয় তাবৎ উৎকট অবস্থা, একান্ত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। দেখতে হয়, ওই টেক্সটে কোনো কিছুই যেন ময়লা দাঁত বের করে হাসতে না-থাকে। যেন ভদ্র জনসমাগমের ভিতর দিয়ে নিবস্ত্র হয়ে হাঁটতে শুরু করার মতো কোনো ঘটনার ওটা জন্ম দিয়ে না-বসে। এক্ষেত্রে অবশ্য একটা বিপদসংঘটনের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। বুদ্ধির সাথে অনুভূতির একটা তুমুল ঝগড়ার মোকাবেলা করতে হতে পারে সম্পাদনাকালে। এই ঝগড়ার মীমাংসাটা কে কীভাবে করবেন তা নির্ভর করে তাঁর কাব্যরুচি, মেজাজ, বিশ্বাস ইত্যাদির ওপর। সবচে’ ভালো সম্ভবত বুদ্ধি বা অনুভূতি কারো একার হাতেই পূর্ণ শাসনভার ছেড়ে না-দিয়ে দুয়ের একটা বিবাহসম্পর্কে আস্থা রাখা।

৯.

ইমাজিনেশন হলো সংবেদন ও ধারণার মনছবি আঁকবার সামর্থ্য, যা ওই বিশেষ মুহূর্তে শ্রবণ-দর্শন বা অন্য কোনো ইন্দ্রিয় দ্বারা ধারণযোগ্য নয়। এটি তৈরি হয় বুদ্ধি ও আবেগের সংমিশ্রণে। ছবিমাত্রকেই ছবিকল্প ভাববার একটা রেওয়াজ আছে আমাদের মধ্যে। একটিও দৃশ্য বা শ্র“তিকল্প নেই এমন কবিতাও ইমেজারিতে ঋদ্ধ বলে প্রশংসিত হতে দেখা যায় হামেশা। আমরা এত যে দিলখুশ হই সহজনের প্রতি, ঘেন্না লাগে। আর অন্যদিকে চলতেই থাকে ‘যারে দেখতে নারি’র চলনকে চিরকাল বাঁকা ঠাওরানো দাপুটে বাসনার বজ্জাতি।

মন কীভাবে এসব ছবি তৈরি করে? কল্পনা দিয়ে ভেবে শব্দ দিয়ে ধরাধরির মাধ্যমে। কল্পনার সীমাটা কী? সীমা প্রায় নেই। কারণ যা পূর্বাভিজ্ঞতায় নেই এমন কিছুই মনের চোখ দিয়ে দেখা দরকার হয় ইমেজারি নির্মাণের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে শতভাগ মুক্তি দরকার হয় কল্পনার। অথবা হতে পারে পূর্বে অংশত বা অন্য আঙ্গিকে অভিজ্ঞতায় ছিল। এক্ষেত্রে রকমফের থাকছে মাত্রায়।

তো, এই মাত্রার স্বাধীনতা ভোগ কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে কি না সেটা একটা বড়ো প্রশ্ন হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। যাঁকে চরম স্বাধীনতা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে তিনি সেই স্বাধীনতাটা তাৎপর্যপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারছেন কি না সেটা একটা সংগত বিবেচনা। অবাধ স্বাধীনতা ভোগের অধিকার লাভ করা মাত্র আমি যদি হাতিগুচ্ছকে তুড়িতে উড়িয়ে দেই আকাশে আকাশে, নদীকে পুড়িয়ে দেই মাছের যৌনতাসহ, যেহেতু কাজটা যথার্থেই সংঘটিত হওয়ার দরকার হচ্ছে না, শব্দ-বাক্যের কারসাজিতেই ঘটিয়ে দেয়া যাচ্ছে সব; দোষ কি আছে তাতে? আছে। এটা ফ্রি পেয়ে মাথার বাঁ’পাশে বাড়তি আরেকটা মাথা জুড়ে নেয়ার মতো ব্যাপার। পাঠকচিত্ত কতটা স্বস্তি পাবেন এহেন ভোগচর্চায়? এজন্য মাঝেমাঝে মনে হয়, সীমা বোধকরি এরও আছে কোথাও। যাই কল্পনা করি না কেন মানব ধারণায় তাকে সম্ভব মনে হতে হয়, অন্তত পরোক্ষে, তাহলেই কেবল সেখানে সৌন্দর্য ভর করবার ফুরসৎ পায়, অন্যথায় সৃষ্টি হয় অসামঞ্জস্যতা, যা কবিতার এক নম্বরের শত্রু।

যেখানে মনছবির প্রশ্ন, সেখানে মনই গুরু। যার মন যেরকম ছবির জন্ম দিতে সক্ষম, তিনি তেমনি আঁকবেন। পাগলামি বা উন্মত্ততার ব্যাপারটাও এখানে উল্লেখ্য। পাগলামি অনেক উৎকৃষ্ট মনছবি আঁকতে পারে, আবার এ বৈশিষ্ট্য প্রলাপেও নিপতিত হতে পারে। যিনি পাগল বা উন্মাদ, তাঁর সামনে কোনো সীমারেখা বেঁধে দেয়া যায় না, সেটা সম্ভবও নয়। মনছবি আঁকবার ওই বিশিষ্ট সময়ে তাঁর মন-মস্তিষ্ক যে অবস্থায় বিরাজ করছে, সে অবস্থারই উৎপাদন সামনে আনবেন তিনি। ওটা কদ্দূর মানুষের পারসেপশনের আওতার মধ্যে থাকল না-থাকল, সেটা পরে বিবেচ্য। তবে হ্যাঁ, একটা মাত্রার সূক্ষ্ম উন্মাদনা ভালো মনছবি আঁকবার জন্য খুবই দরকারি বিবেচ্য হতে পারে। এ অবস্থা যুক্তিশৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে পারে, স্বাভাবিক অবস্থা যে সুযোগটা মোটেই দিতে চায় না।

১০.

কবিতা সময়ের জীবনছন্দ টের পায়। জীবন যে মাপে এগোয়, সময় যেভাবে হাঁটে, কবিতাকেও সেভাবে হাঁটতে হয়। তা নইলে সময়ের কবিতা লিখিত হয় না। একজন কবি সমসময়ে যাপনধর্ম পালন করে পঞ্চাশ বা একশ’ বছর আগের কবিতা লিখুন, তা চান না পাঠক। এটা শুধু বিষয়ের মামলা কী শব্দার্থেরও মামলা নয়, মামলা ছন্দেরও। প্রতিদিন কবিতায় যুক্ত হচ্ছে নতুন বিষয়, শব্দে যুক্ত হচ্ছে নতুন মানে, ছন্দ কেন পুরানোটাই থাকবে? নতুন মোড়কে পুরানো জিনিস যেমন প্রার্থিত নয়, তেমনি নয় পুরানো মোড়কে নতুন জিনিসও। কাজেই ভেঙেচুরে ওর বারোটা বাজিয়ে দিতে হয় যেকোনোভাবে। একটা কথা ওঠে প্রায়, যে, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দকে ভালো করে জানলেন না বুঝলেন না তিনি ভাঙবার অধিকার পাবেন কোন বিবেচনায়? খুবই সংগত কথা। জেনে ভাঙাই ভালো। কিন্তু যিনি ওটা ভালো করে জানবার তাড়নাই বোধ করলেন না ভিতর থেকে, ভাবলেন একটা শৃঙ্খল, তাকে ব্রাত্য চিহ্নিত করবার অধিকারও কেউ রাখেন না। প্রয়োগের উদাহরণসহ ভালো করে প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দ শেখা এক সপ্তাহের ঘটনা মাত্র। নিজে প্রয়োগে স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠতে মোটমাট তিন মাস। একজন লেখক তাঁর লেখক জীবনে কাড়ি-কাড়ি জটিল বইয়ের এদিক দিয়ে ঢুকে সম্পন্ন হয়ে যদি ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন, তার কাছে এক সপ্তাহের ওই কথিত আয়োজনটা যে গুরুত্বপূর্ণই মনে হলো না, এর কারণ অনুসন্ধান করে দেখাও জরুরি বৈকি। কবিতা বস্তুত মুক্তি চায়। তা এমনকি বিখ্যাত কবিতাবলিঘনিষ্ঠ কাব্যিক ঐতিহ্য-- তার আবহ, শব্দরুচি, বাক্যগঠন শৈলী, বিষয়ভাবনা থেকে শুরু করে তাত্ত্বিক ভার, আভরণের ঘটা, ছন্দ সবকিছু থেকেই। এই মুক্তির মন্ত্রে যিনি বুঝেশুনে দীক্ষা নেন, তাঁর কাছে খোঁয়াড়প্রতিম একটা আয়োজনকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতেই পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দের নিটোল ব্যবহারে শাসিত অনেক কবিতার দিকে ভালো করে তাকালে দমবন্ধকর অনুভূতি হয়। মনে হয় ওখানকার শব্দেরা, বাক্যেরা যেন মাত্রাতিরিক্ত শাসন সয়ে রীতিমতো কাঁচুমাচু হয়ে আছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না। বনসাই বনসাই একটা চেহারা। এ অবস্থা থেকে যত দ্রুত বেরোনো যাবে ততই মঙ্গল। একটা কথা বলা হয় যে, ছন্দ কবিতাকে স্মৃতিতে রক্ষিত হতে সাহায্য করে। সে তো করেই। কিন্তু এ বিবৃতি কি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক তিন প্রবীণ ছন্দের বেলায়ই প্রযোজ্য? যিনি এই ছন্দগুলোর খড়্গের নিচে গলা বাড়িয়ে রাখেন না, তিনিও কি কবিতা ছন্দেই লিখেন না এক ধরনের? কবিতা হতে হলে টেক্সটের মধ্যে ভাষার যে সামঞ্জস্য তৈরি হতে হয়, গতি অব্যাহত রাখতে হয়, পাঠস্বাচ্ছন্দ্য স্থাপিত হতে হয়, এ কি কোনো ছন্দ তৈরি করে না? জীবনছন্দ কি ছন্দ নয়?

সবিশেষ, আমাদের দরকার ভালো কবিতা। কবিতাটা কোন প্রক্রিয়ায় হয়ে উঠল, শৃঙ্খলের ভিতরে থেকে নাকি বাইরে এসে, সেটার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। কিন্তু শৃঙ্খল ছিল বলে মুক্তির পক্ষে কিংবা মুক্ত ছিল বলে শৃঙ্খলের পক্ষে দাঁড়িয়ে তরবারি শানানো অবশ্যই বন্ধ হওয়া আবশ্যক। একটা ভালো কবিতা পেলে বলে বসাও যায় যে, ‘সাত খুন মাফ’। কিন্তু ভালো কবিতা কোনটাকে বলে? ভালো কবিতা সেটা, যে কবিতা নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে অন্য কবিতাকর্মীকে সংক্রামিত করতে পারে, এমনকি প্রভাবিতও।

ঢাকা, জুন ২০০৯

মৃত্যুর আগে : জীবন খুঁজিয়া ফেরে জীবনের তল

আরো অনেক পরে জীবনানন্দ দাশ ‘মানুষের মৃত্যু হলে’ কবিতায় যে বোধের প্রকাশ করেছিলেন ‘মানুষ মরে গেলে তবুও মানব থেকে যায়’, ধূসর পাণ্ডুলিপির ‘মৃত্যুর আগে’ শেষ হয়েছে মূলত সেই খবর দিয়ে। সবকিছু ফুরিয়ে যাবে কিন্তু রয়ে যাবে মানুষ... তার জন্যে আলোও রয়ে যাবে। রোদকে যদি জীবন বলে ধরে নিই আমাদের, তাদের জন্যে স্থির আলো আছে জীবনধারণের : যা কখনোই যাবে না নিভে।

‘মৃত্যুর আগে’ কাজেই নিশ্চিত মৃত্যুর ভীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখায়। মায়া বেড়ে যায় দেখা সব ছবির প্রতি। যেগুলো আবারও দেখার মতো, বারেবারে যে সৌন্দর্য ছুঁয়ে দেবার মতো। ধূসর পাণ্ডুলিপি পড়ে রবীন্দ্রনাথ বইটিতে মুদ্রিত ১৭টি কবিতা ব্যাপারে সাধারণ যে মন্তব্য করেছিলেন তার দু’টো ব্যাপ্তিসম্পন্ন শব্দ বা শব্দবন্ধ কারো নজর এড়িয়ে যায় না। ‘চিত্ররূপময়’ ও ‘তাকিয়ে দেখার আনন্দ’ আবিষ্কার করেছিলেন তিনি এ বইতে।

দূর থেকে কবিতাটির দিকে যদি তাকানো যায় তবে মনে হবে বিশাল এক আটচল্লিশ কুঠুরীর আটতলা, প্রায় সমান খাপে যার শরীর বাধা। বাইশ থাম প্রতিটায় বলা যেত, কিন্তু নিম্নদিকের তিন অষ্টাংশে শক্তি বাড়িয়ে নিতে প্রতিটিতে ছাব্বিশ থাম-- অথচ অদ্ভুত এই, এ স্থাপত্যে যাহা শেষে নির্মিত তাহাই মূল, যাকে বলে ফাউন্ডেশন-- ইটের তৈরি ভবনের থেকে এর পার্থক্যটা ঠিক এ জায়গায় নির্দিষ্ট।

দ্বিতীয় পাঠ

ইহা কবিতা, ইহা খাপে পুষে রাখে জীবনের গল্পসমুদয়...
ইহা কল্যাণী, আনন্দ-অদ্ভুত রঙে পুড়ে পুড়ে
সংশয়ায়িত স্তব্ধ-ঘুমে
গানেদের দেশে দেশে নির্জলে ওঠে বিকশিয়া

তাকিয়ে দেখার আনন্দ বলে একে
ভরা বাট যেন কোনো ঘোড়াদৌড় মাঠ
টইটম্বুর রসে ভরা চিত্রে বিচিত্র
যাতে মাখা আছে রাশি রাশি কল্পব্যঞ্জন

এ-ও তো রূপময় বিদ্যুৎ
ঝিলিকে ঝিলিকে শুধু ঝিলকায়ে চলা
গোটা ঝিলপারে মহাধুম
জ্যোৎস্নায় সবুজের গোধুমের বনে...
ধূসর আজ ধূসরিম আরো ফিকে কুয়াশায়
কলকল গ্লানির জলধি

প্রাণ তবু গতিমান

স্থাপত্যিক নকশা করেও যদি কাজটি শুরু করা হয়ে থাকে (যদিও কবিতা কখনো এইভাবে শুরু হয় না) তবে তাতে থাম বা ইটের ব্যবহার হবার কথা ছিল (২২ো৪৮)=১০৫৬টি। কিন্তু ব্যবহৃত হয়েছে সর্বমোট ১০৬৮টি। এরকম হয়েছে তিনটি কুঠুরিতে ৪টি করে ইট বেশি ব্যবহৃত হওয়ায়। এর কারণ আমরা চিহ্নিত করতে পারি কম করেও দুটো। ১. বাইশ ইটে কুঠুরি তিনটি নির্মাণে নির্মাতার অক্ষমতা। ২. কোনো সূক্ষ্ম অর্জনকে সম্ভব করতে নিজের পরিকল্পনাকে অবলীলায় ভেঙে ফেলা।

প্রথমোক্ত সম্ভাবনাটিকে আমরা শুরুতেই বাতিল করে দেব। যার শক্তিমত্তার সামনে আমরা প্রতি-মুহূর্তে থমকে দাঁড়াই; বিস্ময়াঘাতে হই ক্ষতবিক্ষত; তাকে অক্ষম বলে খাটো করাটা ঔদ্ধত্যের শামিল।

স্বাভাবিকতাকে ছাড়িয়ে যাওয়া তিনটি অবস্থাকে এবার একটু কাছ থেকে নিরিখ যাক--
১. যত নীল আকাশেরা রয়ে গেছে খুঁজে ফেরে আরো নীল আকাশের তল
২. পৃথিবীর কঙ্কাবতী ভেসে গিয়ে সেইখানে পায় ম্লান ধূপের শরীর
৩. ধূসর মৃত্যুর মুখ ;-- একদিন পৃথিবীতে স্বপ্ন ছিলো-- সোনা ছিলো যাহা

তৃতীয় পাঠ

জীবনানন্দের পাঠকমাত্র বুঝবেন যে, এই তিনটি কুঠুরিই ২২ ইটের ব্যবহারে নির্মাণ করা যেত ; এবং তা জীবনানন্দীয় ঢঙ বজায় রেখেই। আর এটা করার যৌক্তিকতাটাও সহজানুমেয়।

আটচল্লিশজনের কাতারে তিনজন বেয়াড়াকে কে আর সুচোখে দেখে। তাহলে? এই স্খলনের ব্যাপারটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় বা করা উচিত? তবে কি সত্যিই আটতলা এই ভবনের নিচের দিককার তিনতলার বিশেষভাবে নির্মিত কুঠুরিত্রয় আলাদা কোনো ব্যঞ্জনা ধারণ করে রেখেছে?

উপরদিককার পাঁচতলায় এত সরলভাবে ইট বিছানো হয়েছে যে, সাধারণ একজন আবাসিকের পক্ষেও তার গতি প্রকৃতি বোঝা সম্ভব। কিন্তু নিম্নদিকের তিনতলা, যে তিনটিতে তিনটি বিশেষ কুঠুরি সন্নিবেশিত, সেখানকার ইটের শয্যা অতটা সবুজ সহজ নয়; যেকোনো চোখের-দেখার হাত সেই মায়াবীর প্রয়োজনকে উপেক্ষা করতে জানবে না। উত্তর খুঁজবে, কিন্তু পাবে না। তখন তাকে নিরুত্তরেই খুঁজে নিতে হবে শান্তি।

মৃত্যুর ঠিক আগে মুমূর্ষু, মৃতপ্রায়, মরমর একটা অবস্থা থাকলেও বস্তুতপক্ষে জীবনই থাকে। জীবনানন্দের ‘মৃত্যুর আগে’র ও আ-পাদ (উড়ে গেছে কাক) মস্তক (আমরা হেঁটেছি যারা) চিত্রময় জীবন। এবং তা স্তব্ধ নয়, স্থির নয়-- অস্থির এবং গতিশীল। চঞ্চল। যেন জীবন খুঁজিয়া ফেরে জীবনের তল। এমনকি বাস্তবত যার প্রাণ নেই-- তার ভেতরেও এখানে প্রাণানুভূতি বাঙ্ময় হয়ে আছে।
১. ... যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে
চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ...

...মাঠ, চাঁদ কারোরই তো আমরা প্রাণ জানি না কিন্তু এ বাক্য প্রাণ দিয়েছে দুয়েরেই।
২. খড়ের চালের’ পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার ;--
কার? তা আমরা জানতে চাই না। আমরা বরং দিব্যানুমান করি যে ইহা খড়ের চালেরই ডানা।
৩. হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলি করিয়াছে খেলা
--কে ভাবতে পারে যে এখানে আলোও জীবন্ত নয়?
৪. চালের ধূসর গন্ধে তরঙ্গেরা রূপ হয়ে ঝরেছে দুবেলা--
--কী বিস্ময়কর প্রাণই না ঝলকাচ্ছে এখানে জলতরঙ্গে; এবং তার সাথে সাথে চালে, যার গন্ধ (তাও আবার ধূসর, গন্ধেরও বর্ণ বিভাজন জীবনান্দকে ছাড়া কে কবে করেছে এমন?) জলকে তরঙ্গায়িত করে দিনে দু’বেলা।
৫. মিনারের মতো মেঘ সোনালী চিলেরে তার জানালায় ডাকে--
--মেঘ যেখানে বিশেষ্য, ক্রিয়া সেখানে ডাক; অথচ এ বজ্রপাতরূপী হুঙ্কার নয়, ভালোবাসার ইশারা-- যা কেবল প্রাণেই শোভন।
৬. নরম জলের গন্ধ দিয়ে নদী বারবার তীরটিরে মাখে
অথবা
নির্জন মাঠের ভীড় মুখ দেখে নদীর ভিতরে ;
--যেখানে কোনো জনই নেই, সেখানে কেমন দেখাও হচ্ছে মাখাও হচ্ছে। যেন কোনো টিনেজারের প্রসাধনপর্ব। অদ্ভুত সব প্রাণময়তা, অপ্রাণে।

চতুর্থ পাঠ

এটি যদি একটি নির্মাণ, ভবন বা বাড়ি যাই বলি, তবে তার নিচের তিন অষ্টাংশের আঠারোটি কক্ষ দখলে রেখেছে বাড়িওয়ালা, যেখানে গোটা ভবনের সব মেইন সুইচ-- তা সে পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ যা কিছুরই হোক। উপরের পাঁচতলার ত্রিশটি কক্ষে নীরিহ ভদ্রলোক ভাড়াটিয়ারা থাকে। সবার উপরে চিলেকোঠা মতো একটা জায়গা, যা ভবনটির অতি নির্মাণ, অন্য দশটি বাড়ির ভিড়ে আলাদা হবার চিহ্ন; যাকে কখনো আলাদা একটি তলা হিসেবে গণ্যই করা যায় না-- ঠিক সেখানেই চুপিসারে বাস করে মৃত্যু, ম্রিয়মাণ অতি। যার চোখ ও মুখের আকৃতি দেখেই বোঝা যায়-- এ তল্লাটে সে বেশ সুবিধে করতে পারছে না। এখানের ভাড়াটিয়ারা যতটা জীবনবাদী তাতে মৃত্যুর চিলেকোঠাবাস বন্ধই হয়ে যেত-- যদি না বাড়িওয়ালার ছেলেপুলেদের সাথে তার অল্পবিস্তর বন্ধুত্ব থাকত।

পেকে ওঠা বিষফোঁড়ায় কণ্টকাঘাত : কিছু পুঁজ, কিছু দুর্গন্ধ

বিনয়ভূষণ আর নয়

মানুষ হিসেবে যিনি বেশ বিনয়ী ও সজ্জন-- এই সমাজব্যবস্থায় হঠাৎ করেই তিনি নিজেকে বড়ো ধরনের সমস্যাগ্রস্ত বলে আবিষ্কার করে বসতে পারেন। তখন যারা তাকে এতদিন বিনয়ী বলে প্রশংসা করেছিলেন, তাদেরকেই সমস্ত সর্বনাশের মূল বলে মনে হতে পারে। এসব ইতিউতি প্রশংসার প্রভাবে মানুষের ক্ষেত্রে বিনয় একটি বিরল গুণ মনে করে বেচারা বিনয়ীরা অস্ত্রহীন ঢুকে পড়েন শ্বাপদসংকুল জনারণ্যে। পরে তিনি বুঝতে পারেন, বাহ্য বেশভূষায় একটু আলাদাত্ব থাকলেও ‘জন’ ও ‘শ্বাপদ’ অনেক সময়ই প্রায় অবিকল গুণপনা রাখে; কথা বলে, হাগে-মুতে একই কায়দায়। বানরদেরও যে ময়ুরপুচ্ছ থাকতে পারে, ভালো মানুষ হয়ে সেটা সবসময় বুঝতে পারা যায় না বস্তুত।

এ প্রজাতির বানরেরা, সুযোগ পেলেই জনের ছদ্মাবরণে নিকটে এসে দশাসই পোদ মেরে ফার্লংখানি দূরে দাঁড়িয়ে যেভাবে দাঁত কেলায়, তাতে পোদাঞ্চল প্রতিরোধে সবিশেষ ব্যবস্থা সম্পন্ন করে অস্ত্রভাণ্ডারকে সহজোন্মোচনযোগ্য উপায়ে ঢেকে সদাপ্রস্তুত হয়ে থাকা ছাড়া বেচারা বিনয়ীদের এখন আর কোনো গত্যন্তর নেই-প্রায়। প্রয়োজন হলেই যাতে জিপার টেনে পোদাভীপ্সায় কাতরদের চোখমুখ লক্ষ্য করে জোরসে মুতে নষ্টজলের বান নামিয়ে দেয়া যায়, সেরকম রেডিমেড ব্যবস্থা সম্পন্ন করে রাখাটাই এখন জরুরি। নইলে এ ভবসংসার বেচারাদের কাছে অসহনীয়রকম তিক্ত অভিজ্ঞতায় দীর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ছোটোকাগজ বিক্রির পয়সা ঠকান যেসব পুস্তক ব্যবসায়ী প্রকৃতপক্ষে তারা সাহিত্যের শত্রু। মনে রাখা জরুরি যে, সাহিত্যকে ভালোবেসে তারা এ ব্যবসায় আসেন নি, তারা এমনকি জুত বুঝলে চামড়ার ব্যবসাও করবেন। লেখকদের মধ্যেও এরকম গোবেচারা আছেন, থাকেন। পুরানো খোলস ঝেড়ে তাদের এখন নতুন করে জেগে ওঠবার কাল আসন্ন। এ না-হলে লেখালেখি করতে এসে নিজে তো বটেই বাপদাদা চৌদ্দগোষ্ঠীসহ ভুল করেছে-- এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে খাতা-কলমের সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে এফডিসিতে গিয়ে এক্সট্রা হবার জন্য চেষ্টা করাটাই তাদের শেষোদ্ধারের একমাত্র পথ হয়ে যেতে পারে। যে লেখালেখির জন্য সমতল ও সহজহাঁট্য বহু রাস্তা রেখে বেচারা দীর্ঘদিন বন্ধুর পথে পদচারণা করেছে, যার জন্য নিজের ও নিকটজনের কাড়ি কাড়ি বঞ্চনাকে মাথা পেতে নিতে হয়েছে, তাকে পরিত্যাগ করে কেনই বা একজন হাতে পেরেক ঠুকতে যাবে? পর্বতচূড়ায় উঠে আকাশ না-ছুঁয়ে একজন নামবে কেন-- ও স্থান তো কারো বাপের একার নয়! কেউ কেউ অবশ্য সব স্থানকেই নিজের বা তার বাপের বলে মনে করে। পা ফাঁক করে বেদখল দিয়ে রাখে অন্যের হাঁটবার সমস্ত পথ, কিংবা গোপনে পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখে।

সাহেব কহেন...

বাংলাদেশে যৌনকর্মীর অধিকার নিয়ে আন্দোলন আছে, আছে ভিখিরির-- নেই কেবল লেখকের। সেজন্য যারা সাহিত্যের খেদমত করে খান-দান, তারা বনে গেছেন দেবতাস্য দেবতা। তাদের যখন যা ইচ্ছে, তারা তা-ই করেন। করেন, করতে পারেন বলেই। ট্রেড ইউনিয়ন না-থাকলে কারখানাভ্যন্তরে শ্রমিকগণ যেভাবে মালিক-কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ব্যবহৃত হতে বাধ্য হন, লেখদের শক্তসমর্থ মেরুদণ্ড কিংবা ঐক্য কিংবা আন্দোলন কোনোটাই না-থাকায় তারাও দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক ও তথাকথিত ছোটোকাগজের সম্পাদক কর্তৃক যখন-তখন যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহৃত হন। কোনো কোনো লেখকের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয় যে এভাবে ব্যবহৃত হতে পারায় তারা বরং পুলকই অনুভব করেন। যেন ব্যবহৃত হবার জন্যেই তাদের জন্ম ও যাত্রা। যেন চোখেমুখে মোসাহেবি একটা ভাব ঝুলিয়ে দেহরক্ষীর মতো সর্বক্ষণ সাহিত্য সম্পাদকের লেজে ঝুলে থাকাটাই লেখক জীবনের চরম ও পরম সার্থকতা।

এবার একটু খুলে দেখি চলুন

অনেক আগে (৩০ মে ১৯৯৭) লেখা চেয়ে দ্রোণাচার্য সম্পাদকের পাঠানো এক চিঠির জবাবে একটি কবিতার খসড়া করেছিলাম, শেষপর্যন্ত সেটি ডাকে দেয়া হয় নি। পরবর্তী সময়েও কোনো কাগজে ওটি ছাপার কথা ভাবি নি। লেখাটি লিখতে পেরেই মনের ঝাল অনেকখানি মিটে গিয়েছিল। সুতরাং চুপ মেরে গিয়েছিলাম। ঘন ঘন যখন একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে এবং যখন এ বিষয় নিয়ে একটি লেখা লিখব বলেই মনস্থির করেছি, তখন মনে হচ্ছে চলতি প্রেক্ষিতের সাথে সম্পর্কসূত্র বিবেচনা করে ওই লেখাটিকে এখানে অস্ত্র হিসেবে ছুড়ে দেয়াও যেতে পারে।
একটি ঠোঁটকাটা কবিতা কিংবা শিমুল আজাদের কাছে খোলা চিঠি

শিমুল আজাদ আপনাকে জবাবি লিখছি
শিমুল আজাদ আপনাকে কুশল জানাচ্ছি
শিমুল আজাদ দ্রোনাচার্যে লেখা পাঠাচ্ছি

শিমুল
আজাদ
লেখালেখিতে আপনার চরিত্র কী
দ্রোনাচার্যের উদ্দেশ্য কী
রক্তাক্ত প্রজন্মের মেনিফেস্টোটা কী
এসব আমাদের
(আমার
অন্যদের
দ্রোনাচার্যের লেখকদের...)
জানা থাকা দরকার
জানাবেন

দ্রোণাচার্য আমার ভালো লাগে না
--উহা লাল কালিতে ছাপা হয়
--উহা বিজ্ঞাপনের ব্যবসা করে
--উহা বাজারিদের লেখা ছাপে
(আশিক-মোস্তাক-শুভঙ্কর এরা কী ভাবেন)

শিমুল
আজাদ
আপনি গ্রাফিত্তিতে যান আবার টিভিতেও
আপনি লিটল ম্যাগে যান আবার দৈনিকেও
আপনি টুপি পরেন আবার পৈতাও

যেদিকে বৃষ্টি সেদিকে ছাতা আপনি
যেদিকে স্বার্থ সেদিকে ঝোল আপনি
যেদিকে প্রসাদ সেদিকে পুরোহিত আপনি
আপনার কাগজে আমি পুষ্পিত হতে চাই না

আপনি বিবরের লেখা নিয়ে দ্রোনাচার্যে ছাপেন
লেখকগণ তা জানেন না
আপনি দ্রোণাচার্যকে প্রজন্মের মুখপত্র বানান
লেখকগণ তা জানেন না
আপনি লেখকগণকে ব্যবহার করেন
তারা তা জানেন না

আমি নিয়মিত লিখে থাকি
তবু দ্রোণাচার্যের জন্য আমার কোনো লেখা নেই
আমার প্রচুর অপ্রকাশিত লেখা আছে
তবু দ্রোণাচার্যের জন্য আমার কোনো লেখা নেই
অপ্রকাশের ভার আমি সইতে পারি না
তবু দ্রোণাচার্যের জন্য আমার কোনো লেখা নেই

আমাকে মাফ করবেন আর এ কবিতাটা দ্রোণাচার্যে ছাপবেন
আমাকে মাফ করবেন আর এ কবিতাটা দ্রোণাচার্যে ছাপবেন

লক্ষ করুন

লেখাটির যেখানে যেখানে শিমুল আজাদ নামটি আছে সেখানে সেখানে শহিদুল ইসলাম কিংবা শামীম রেজা কিংবা জামিল আকতার বীনু কিংবা অন্য কোনো নাম এবং যেখানে যেখানে দ্রোণাচার্য আছে সেখানে সেখানে দৈনিক যুগান্তরের শুক্রবারের সাময়িকী কিংবা দৈনিক আজকের কাগজের সুবর্ণরেখা কিংবা কথকতা কিংবা অন্য কোনো পত্রিকার নাম পড়লে প্রতিক্ষেত্রেই এটি প্রাসঙ্গিক হতে পারে। এই লেখাটির প্রাসঙ্গিকতাকে আমরা উসকে দিতে চাই দিকে দিকে, আমাদের এবং অন্যদের জন্য।

নিজের দিকে ঝোল টানা

মানুষের জীবনটা হলো ক্রমশুদ্ধাভিযান। যারা গোড়া মতাদর্শ নিয়ে বিশুদ্ধ ছোটোকাগজের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে লেখালেখি শুরু করেছেন এবং সময়-সুযোগে ফাল দিয়ে বড়োকাগজের ডালে ডালে বাদুড় হয়ে ঝুলে পড়েছেন, তাদের থেকে কারো কারো গমনপথটা ঠিক বিপরীত দিকে প্রসারিত। এরা যেখান থেকে চ্যুত হয়েছেন, অন্য একজন সেখানে আসীন হবার চেষ্টাটাই চালিয়ে যেতে পারেন দেহেমনে। একের পরিত্যক্তটা অন্যের কাম্য হতেও পারে। এখানে কোনো অপমান লুকিয়ে আছে মনে করার কারণ নেই। এটা মনে হয় শুদ্ধাশুদ্ধি ধারণায় পার্থক্যের কারণে। আমাদের এবং আমাদের যৎপরোনাস্তি লেখালেখির জন্য স্বল্পায়োজনের এ দীর্ঘ যাত্রাপথটিই যথোপযুক্ত ও সঠিক। আপাতক্ষুদ্র এ টেকসই পথপরিসরে ব্যাপক স্বাধীনৌজ্জ্বল্য জ্বলজ্বলায়মান। নির্মোহতায় ব্যাপ্ত যে শুদ্ধিসম্ভাবনা, মোহগ্রস্ততায় হতে পারে তার বিপুল বিনাশ।

যারা দমবন্ধকর বিশাল প্রান্তর থেকে শ্বাসস্বস্তিপ্রদ ছোট্ট আঙিনায় এসে দাঁড়ান বা দাঁড়াতে চান, যারা ঝকমারির বিপরীতে ভালোবেসে সৃষ্টি করে নেন স্বয়ম্ভূ আড়াল-- উভয় মতাদর্শীয়রাই তাদেরকে জানতে-বুঝতে বরাবর ভুল করেন। তারা প্রায়শই অন্যদের স্বজন হিসেবে পরিগণিত হন না কিংবা অন্যরা তাদের, যদিও একই ধরনের চাষবাসে নিমগ্ন বলে আনেকের সাথেই মোলাকাত হয় পথেপ্রান্তরে। সমসময়ের লেখক হয়েও অন্যদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হয় যে কারণে টক-ঝাল-মিষ্টি, ‘পথে হলো দেখা’ জাতীয়।

অভিজ্ঞতা, আতংক এবং সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ

একজন নিষ্কলূষ কিশোরীকে পতিতা বানাবার জন্য আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ঘৃণ্যপ্রয়াস যেরকম বিরামহীন, মুক্তবাণিজ্যের যুগে সবাইকে বাজারি লেখক বানাবার জন্যও কতিপয় সম্পাদকের সেরকম চেষ্টার কমতি নেই, লক্ষ করি। পূর্বাদর্শচ্যুতদেরও গোপনে এতে ইন্ধন ও সহযোগিতা থাকে। কে না জানে এসব অন্যায়। নারীর অধিকার যেমন মানবাধিকার, লেখকাধিকারও তেমনি। অথচ অনেক লেখকই সে অধিকার লঙ্ঘনের শিকার। এখন এসব অধিকারলঙ্ঘনৈতিহ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোটা জরুরি হয়ে পড়েছে। সেটা এজন্যে যে, নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করবার মানসিকতাসম্পন্ন সম্পাদকের চ্যালারা এরপর এমনকি নিজেরাই একখানা যাচ্ছেতাই লেখা লিখে অন্য কারো নামে ছাপিয়ে রাখবে বাজারমাৎ কোনো কাগজে। পাঠকগণ একদিন হয়ত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করবেন যে গল্পকার সেলিম মোরশেদ কিংবা কাজল শাহনেওয়াজ কিংবা তপন বড়ুয়া কিংবা কামরুল হুদা পথিক কিংবা সরকার আশরাফ কিংবা রোকন রহমান কিংবা রবিউল করিম কিংবা শেখ লুৎফরের নামে কোনো গল্প অথবা ফারুক সিদ্দিকী কিংবা শোয়েব শাহরিয়ার কিংবা আহমাদ মিনহাজের নামে কোনো প্রবন্ধ হাজারটা ভুল বাক্যে সমাচ্ছন্ন হয়ে আজকের কাগজের অপরিচ্ছন্ন সাহিত্য সাময়িকীতে ফুটে রয়েছে। অথবা হয়ত দেখা যাবে যে শান্তনু চৌধুরী কিংবা স্বদেশ বন্ধু সরকার কিংবা শোয়েব শাদাব কিংবা বিষ্ণু বিশ্বাস কিংবা শরিফ শাহরিয়ার কিংবা আহমেদ নকীব কিংবা শাহেদ শাফায়েত কিংবা ঈশান জয়দ্রথ কিংবা আশিক আকবর কিংবা মজনু শাহ কিংবা মোস্তাক আহমাদ দীন কিংবা জ্যাকি ইসলাম কিংবা মাসুদ আশরাফ কিংবা সুহৃদ শহীদুল্লাহর নামে কোনো কবিতামতো লেখা আনন্দ নগর, একদিন প্রতিদিন, ইসলাম ও জীবন এবং অজস্র বিজ্ঞাপনে ল্যাপ্টানো যুগান্তর সাময়িকীতে মুদ্রণপ্রমাদসহ শোভা পাচ্ছে। এমনকি এ-ও অবিশ্বাস্য নয় যে এরা প্রয়াত কবি সাবদার সিদ্দিকী কিংবা শামীম কবীরের ভাবমূর্তিকেও বাজারকাষ্ঠে বলি দিয়ে বসতে পারেন। এ আতংক এখন রাত পোহাতে একবার, দিন ফুরাতে আরেকবার জাগে। কারণ উল্লিখিতগণ শ্রেণীতে সংখ্যালঘু। বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিতে সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে বসেছে বলেই এ ভীতিটা এখন বেশি করে পাত্তা পাচ্ছে।

লেখকের অনুমোদন ব্যতিরেকে তার কোনো রচনা ছেপে দেবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদটা এখন আমরা লিখেই জানাচ্ছি, পরে প্রয়োজনে চিৎকার করে জানাব। এ ইস্যুতে সমর্থন থাকলে অন্যেরাও আমাদের এ চ্যাঁচনযজ্ঞে শামিল হবেন, না থাকলে হবেন না। সেক্ষেত্রে আমাদের বিকল্প নীতিপন্থা ‘একলা চলো রে’।

আরো একটি গণবেদনা

কাগজের নাম উত্তরপুরুষ। সম্পাদক হামিদ রায়হান। জানুয়ারি ২০০২-এ প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছে। প্রত্যেকেই মানবেন যে শুধু কবিতা বিষয়ক গদ্য কাগজের বিশেষ প্রয়োজন আছে, যেরকম কাগজের সংখ্যা আমাদের দেশে শূন্যের কোঠায় পরিগণিত। কবিতা বিষয়ক গদ্যের কাগজ করবার কথা নিজে অনেক ভেবেছি, করতে পারি নি। শেষপর্যন্ত অন্যের হাতে যদিও বা হলো-- আশান্বিত হবার কোনো কারণ ঘটে নি। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, এ কাগজটি কোনো জাতেই পড়ে না।

এটি বাদ দিয়ে কাগজটিতে কোনো শিক্ষণীয় ছিল না যে, কোনো আলোচনায় লেখকের বিনানুমতিতে তার কোনো রচনা অংশত বা সম্পূর্ণত উদ্ধৃত করার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা জরুরি। যারা বইয়ে এরকম ঘোষণা যুক্ত করে দেন তারা ভালোই করেন। আমার নিজের অভিজ্ঞতাটি এক্ষেত্রে খুব তিক্ত।

উত্তরপুরুষ-এ মুদ্রিত একটি লেখায় আমার রূপকথা নামধেয় একটি কবিতা অংশত উদ্ধৃত হয়েছে (কবিতা-- প্রসঙ্গ কিংবা অনুষঙ্গ, সমকালীন কিংবা দূরকালীন : মাহবুব হাসান), যে কবিতাটি আমার সবেধন গ্রন্থ মমি উপত্যকাভুক্ত। কবিতাটির ওপর ওখানে কী মন্তব্য করা হয়েছে, সে ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। আমার বলার হলো এই যে, ওই উদ্ধৃতাংশের প্রশ্রয়ে ব্যাপক প্রমাদ সংঘটনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কবিতা রূপকথাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হয়েছে, যে অধিকার কোনো সম্পাদকের থাকতে নেই। উদ্ধৃতিতে কবিতার পঙক্তি ও স্পেসবিন্যাসেও সম্পাদক বেশ সৃজনশীলতার ছাপ রেখেছেন। প্রমাদ সংঘটনের মাধ্যমে ‘ঘুমমত্ত’কে ‘ঘুমন্ত’ বললে না হয় অর্থগত কোনো বিভ্রাট ঘটে না কিন্তু যদি ‘ঘাসস্থান’কে ‘বাসস্থান’, ‘শুলে’কে ‘শুনে’ এবং ‘রোদন’কে ‘রোপন’ (আসলে হবে রোপণ) লেখা হয়, তখন সে কবিতায় কিছুই থাকে না বস্তুত। বরং কবি শুদ্ধ বাক্য রচনা করতে পারেন কি না এ নিয়েই সংশয় তৈরি হয়। এসবের ভিতর দিয়ে বুঝে-না-বুঝে লেখকের বিশেষ ক্ষতি করা হয় বলেই আমাদের মনে হয়।

মুদ্রিত হবার পর প্রমাদের আধিক্য দেখে কাগজ সামনে নিয়ে কেঁদে ফেলবার ইচ্ছা আমার মতো আরো অনেক লেখকেরই জেগেছে-- আমি জানি। ছররা গুলির মাধ্যমে নির্বিচারে পাখিহত্যা করে শিকারির যেরকম আনন্দ, লেখকদের এভাবে যন্ত্রণা দিয়ে কোনো কোনো সম্পাদক সেরকম আহ্লাদই বোধ করেন মনে হয়। বিপরীতে লেখকগণ কষ্টে জর্জরিত হয়ে গোপনে কাঁইকুঁই করেন। গোপনে করেন এজন্যে যে সমাজে তাদের সাপোর্ট নেই-প্রায়, তারা অনেকের চোখেই না-জাত, কুত্তার বাচ্চা আর সম্পাদকরা তাদের মা-বাপ। এ অবস্থা ঘুচানো যেতে পারে কেবল লেখকদের মধ্যে কোনো চলমান আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করা গেলে। প্রয়োজনই যেকোনো আবিষ্কারের নেপথ্য সূচনাবিন্দু। প্রয়োজন যখন দেখা দিয়েছে, আজ-কাল-পরশু সেটা হবে আশা করি।

এ ধরনের ঘটনার শিকার আমরা হামেশাই হই। এখানে ভূতপূর্ব গুণধরের মতো ‘এর আগে তুমি কোথাও ছিলে না, এবারই প্রথম তুমি’ বলবার কোনোই জো নেই। যে কারণে কোথাও কোনো প্রান্তরে পুষ্পিত হবার অফার এলেই আগে জেনে বুঝে দেখা দরকার-- প্রান্তরটা কেমন প্রশস্ত ও খোলামেলা, মাটিটা কেমন ধাঁচের, চাষীরা কেমন, কেন্দ্রীয় চাষী বপনপ্রণালি ঠিক বোঝে কি না ইত্যাদি। এ তো গেল স্বেচ্ছায় নিজের লেখা ছাপতে দেবার পূর্ব বিবেচনা কিন্তু কেউ কারো লেখা ভুলভাবে উদ্ধৃত করলে সেটা ঠেকানো কী করে? এখানে তো কাগজ সম্পর্কে প্রাক জরিপের কোনো অবকাশই থাকে না। সম্পাদকগণ কি এক্ষেত্রে লেখকদেরকে কোর্টাভিমুখে চালিত করতে চান নাকি? কপিরাইট আইন বলে কি এদেশে কিছুই নেই?

সিকদার আমিনুল হককে একটি উপদেশ

যে কাগজ ভাষার শুদ্ধ ও সঠিক প্রয়োগের ব্যাপারে নিজেরাই শ্রদ্ধাশীল নয় এবং অতি প্রায়শই যেখানে ভুল বাক্যের দেখা মেলে-- সেখানে অন্য কারো লেখা বাক্য ভুল প্রমাণ করতে যাওয়ার ফল হিতে বিপরীত হয়।

শিঁরদাড়ার প্রথম সংখ্যায় মুদ্রিত

খ্যাপা হাওয়ার ঢেউ উঠেছে চিরব্যথার বনে

শুদ্ধাভিযান একটা তপস্যা, প্রার্থনাতুল্য নৈমিত্তিক ক্রিয়া। সদ্যপ্রয়াত সংস্কৃতিসর্বজ্ঞজন ওয়াহিদুল হক আজীবন এই শুদ্ধাভিযানেই ব্রতী ছিলেন। সে অভিযানের উচ্চতা ছিল গান, সুর, উচ্চারণ, আচরণ, ক্রিয়া থেকে শুরু করে মানুষ হওয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত এবং যার ভূগোল ব্যাপ্ত ছিল আপন থেকে পর অবধি। অর্থাৎ নিজে শুদ্ধ হবার সাধনাই শেষ নয়, শুদ্ধ মানুষ বানানোও তাঁর জীবনাভীষ্টের অন্তর্গত ছিল। সারা বাংলার প্রতিটি প্রান্ত ছিল তাঁর সম্ভাব্য মানুষ খোঁজার ক্ষেত্র এবং সেই ক্ষেত্রের সম্ভাবনাময় অঙ্কুরগুলোকে অ্যাকোম্পানিমেন্ট সাপোর্ট বা সহগ সহায়তা দিয়ে, চিটা নয়, ধাপে ধাপে সোনার ফসল বানিয়ে তোলা ছিল তাঁর সাধনা। এহেন জাতশুদ্ধ ভ্রামণিক সাধকজন সম্পর্কে একজন অশুদ্ধাচারী জীবমাত্রের কিছু বলবার চেষ্টাকে তাঁর স্বহস্তে বানানো হাজার হাজার নারী-পুরুষ (মানুষ) কীভাবে গ্রহণ করবেন, তা ভেবে আমি সংশয়ান্বিত। কিন্তু যেহেতু তাঁর বিহনে হাজার হাজার বাঙালি নারী-পুরুষের মতো আমারও মনের বনে খ্যাপা হাওয়ার চিরব্যথার ঢেউ গেয়ে উঠেছে, তাই কিছু না বলাটা ব্যক্তি আমার জন্যে প্রশান্তিদায়ক নয়। এই সহেতু-প্রচেষ্টা কেবল এজন্যেই।

কিন্তু কী বলব আমি তাঁকে নিয়ে ? এটা, যে, তাঁর নিবিড় সংস্পর্শ পেয়ে এক জীবনে শুদ্ধ হওয়া হলো না আমার ? এটা, যে, তাঁর লেখায়-বলায় অনুভূতি প্রকাশে বাংলাভাষার উচ্চাঙ্গের ক্ষমতা প্রকাশিত ও প্রমাণিত হয়েছে ? এটা, যে, শুধু বেঁচে থেকে নয়, মরেও তিনি মানুষের কাজে লেগেছেন ? কিংবা এটা, যে, তাঁর মৃত্যুর পরের আনুষঙ্গিক ক্রিয়াদি, ‘ইসলাম’ রাষ্ট্রধর্ম ঘোষিত একটি দেশে চরম এক বিপ্লবের প্রতিধ্বনি ?

ঢাকা শহরে, নিকটে অবস্থানসূত্রে, যতটা তাঁর সংস্পর্শে যাওয়া জরুরি ছিল, ততটা যাওয়া আমার হয় নি। কিন্তু যতটা তাঁকে পাওয়া হয়েছে, তার মূল্যও অপরিসীম। যদিও সে পাওয়া, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমার শুদ্ধ হবার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। এক জীবনে এই অপ্রাপ্তি নিয়েই আমাকে বাঁচতে হবে।

আমরা দেখেছি, যত না তিনি লিখতেন, বলতেন তার চে’ অনেক বেশি, বলতে হতো বলে। আর এই বলা এতটাই শুদ্ধ উচ্চারণে এবং মৌলিক কেতায় যে, শ্রোতারা তা অমৃতের মতোই গিলত। আমিও গিলেছি আর ভেবেছি, মানুষ এক জীবনে এমন অজস্র গুণ লাভ করেন কীভাবে ? বাকপটু মানুষ ম্যালাই আছে আমাদের চারপাশে। তাঁরা এমনকি সম্মোহনও জানেন। তবে বলতে একদমই দ্বিধা নেই যে, তাদের অনেকে বাকসর্বস্ব। বাকে অর্থসারত্ব আছে এমন বাকপটু মানুষ আমাদের চারপাশে খুবই কম। ভাবি, অন্তত সারগর্ভ তাঁর সব আনুষ্ঠানিক কথামালারও যদি লৈখিক রূপ থাকত, কালপরম্পরায় উপকৃত হতে পারত বাঙালি জাতি। ৭৪ বছরের কর্মময় জীবনে তাঁর মাত্র তিনটি গ্রন্থ-- গানের ভিতর দিয়ে, চেতনাধারায় এসো এবং সংস্কৃতি জাগরণের প্রথম সূর্য ; এবং একটিমাত্র অ্যালবাম-- সকল কাঁটা ধন্য করে। অথচ তাঁর অর্ধেকমাত্র বয়সে কারো কারো ডজন দুয়েক গ্রন্থেরও রেকর্ড আছে আমাদের দেশে। এত কম লিখতেন কেন তিনি? লেখার চেয়ে বলায় স্বাচ্ছন্দ্য বেশি পেতেন বলে? এ প্রশ্নের প্রকৃত জবাবটি কী তা তাঁর মুখ থেকে জানার সুযোগ আমাদের আর নেই। আমরা এখন ধারণা করতে পারি মাত্র।

দৈনিক জনকণ্ঠ ও ভোরের কাগজে তিনি যে কলামগুলো লিখেছেন, অচিরেই আমরা সেগুলোরও গ্রন্থরূপ হয়ত দেখব-- কিন্তু বলতেই হবে যে, এসবের ভিতর দিয়ে তাঁর জানাশোনার এক রত্তিও আমরা ধরে রাখতে পারি নি ভবিষ্যতের জন্য। আমাদের প্রকাশকরা যদি কেবল ব্যবসায়কেই বড়ো করে না দেখতেন, তবে তাঁকে দিয়ে তাদের মাধ্যমে আরো কিছু লিখিয়ে নেয়া হয়ত সম্ভব ছিল। কোন বিষয়ে তাঁর বিশেষায়িত জ্ঞান না ছিল ? ভাষা (বাংলা ও ইংরেজি), সাহিত্য, বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, শিল্পতত্ত্ব, চারুকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, দর্শন, নিসর্গ, রাজনীতি, ইত্যাদি ছিল তাঁর আগ্রহের বিষয় ; এবং এসব বিষয়ে তাঁর প্রভূত পাণ্ডিত্য ছিল বলে সর্বজনে একটা স্বীকৃতিও আছে। অথচ এই জানাশোনার সিংহভাগই আমরা ২৭ জানুয়ারি ২০০৭-এর অপরাহ্ণ বেলায় চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। তাঁকে আরো প্রয়োজন ছিল বাঙালি সংস্কৃতির, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের, সংগীত ও থিয়েটারের, নির্যাতিত ও নিপীড়িতের, মানুষ-আধামানুষ-ঊনমানুষের। কাজেই এই প্রয়াণ, আমাদের, বাঙালি জাতির এক অপূরণীয় ক্ষতি।

ব্যাপক জানাশোনার ছাপ থাকত তাঁর প্রতিবার বলায়, প্রতিটি লেখায়। বলতেই হবে, ভাষার অতিশয় মজবুত কিন্তু স্বচ্ছ এক নিজস্ব গাঁথুনি আছে তাঁর প্রতিটি গদ্যের। ওই গদ্যের স্তরে স্তরে অর্থ স্থাপন করা। আর অর্থগুণেই বিশেষ মনোযোগ দাবি করে সেসব লেখা। কিন্তু তাঁর লেখা বিষয়ে অলস ও অমনোযোগী পাঠকের অনেক নিন্দামন্দও স্বকর্ণে শুনতে হয়েছে আমার। তাদের অভিযোগের মূল প্রতিপাদ্য হলো বুঝতে না পারা। ওই একই ধরনের অভিযোগ আমার নিজের লেখা নিয়েও অনেকে করে থাকেন। কাজেই আমাকে সেসব অভিযোগের প্রতিবাদ করতে হয়েছে প্রেমবশত যেমন, তেমনি আত্মরক্ষার্থেও। ওয়াহিদুল হকের গদ্যে আমি বরাবরই বিশেষভাবে মুগ্ধ। ওই মুগ্ধতা, আমার চর্চার ঘর-গেরস্থিতেও হয়ত জায়গা করে নিয়েছে। হতে পারে তাঁর গদ্যরচনার বিরল মুন্সিয়ানার কোনো প্রভাব আমার গদ্যশৈলী সঙ্গোপনে ধারণ করে থাকবে।

আমরা সবাই জানি, তাঁকে ধর্মীয় রীতিতে দাফন করবার সুযোগ তিনি নিজেই রেখে যান নি। চোখ দু’টো মৃত্যুর পরপরই চলে গিয়েছিল সন্ধানীর চক্ষু ব্যাংকে, তাঁর ইচ্ছেমতো। দেহটাও, তাঁরই ইচ্ছেয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে নিবেদিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভাবতে কেমন লাগে, যে, সদাভ্রাম্যমাণ তাঁর বহুদর্শী চক্ষুদ্বয় অন্য কাউকে আলো বিলাবে, দেখতে পারার ক্ষমতা যার রহিত অথবা রহিত হবার উপক্রম! ওই চোখ কি তাঁর দেখা বাংলাদেশের রূপছায়া ধরে রেখেছে কোথাও? এবং এহেন দেখাদেখির ভিতর দিয়ে দর্শনজাত যে জ্ঞান, তাও কি ওই চক্ষুদ্বয়ে কোনো-না-কোনোভাবে সংস্থিত আছে?

চিকিৎসাবিজ্ঞান এরকম বলে না, কিন্তু কবিকল্পনায় এরকম ভাবতে ভালো লাগে যে, সেই একজন কেউ, অথবা দু’জন, যে বা যারা তাঁর চক্ষু পরবেন, তারা তাঁর মতোই অন্তর্দৃষ্টি লাভ করবেন। করুন, সেটা বাংলাদেশের জন্যে খুবই দরকারি।

আমরা দেখেছি, মৃতের সৎকারে ধর্মীয় যাবতীয় আচারকে উপেক্ষা করে কেবল কবিতা ও গানে গানে তাঁর প্রতি বিদায়াঞ্জলি নিবেদিত হয়েছে। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম এমন একটি দেশে এটি সত্যিকারার্থেই একটা বিপ্লব। আমাদের জানামতে, এটি এ ধরনের দ্বিতীয় বিপ্লব। ২৪ ফেব্র“য়ারি ১৯৯৯-এ প্রয়াত প্রগতিশীল প্রাজ্ঞজন ড. আহমদ শরীফের বেলায়ও অনুরূপ ইতিহাস স্থাপিত হয়েছিল। মাত্র গতবছর সংঘটিত একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুঘটনার পরবর্তী ক্রিয়াদিতেও আমরা একটি নীরব বিপ্লব দেখেছিলাম, এই ঢাকায়ই। নারীনেত্রী নাসরীন হকের জানাজায়। তাঁর বেলায় জানাজা হয়েছিল ইসলামি কেতায়, কিন্তু একই জানাজায় পুরুষের পাশাপাশি অংশ নিয়েছিলেন নারীরাও। বাংলাদেশে এরকম ঘটনা এর আগে ঘটেছে বলা জানা যায় না। ওয়াহিদুল হকের কোনো জানাজাই হয় নি, যেমন হয় নি আহমদ শরীফের বেলায়। মৃতের শিয়রে ইনিয়ে-বিনিয়ে ভিনদেশী ভাষায় পারাপারের মন্ত্রপাঠের জন্যে কাউকেই ওখানে ডাকা হয় নি। তার বদলে একের পর এক নিবেদন করা হয়েছে তাঁর প্রিয় যত রবীন্দ্রসংগীত, জাতীয়সংগীত তক এবং কবিতা। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রানুরাগী সংগীতান্তঃপ্রাণ-- একাধারে শিল্পী, শিক্ষক, পরিচালক এবং বিশেষজ্ঞ। তাঁর শবদেহকে ঘিরে এই আয়োজন কাজেই যথোপযুক্ত। তাঁর আত্মা (যদি থেকে থাকে কোথাও) এতেই শান্তি পেয়েছে, ধারণা করি। বিষয়টি এদেশের প্রেক্ষিতে অনেক বড়ো করে দেখবার ও দেখাবার আছে। এ কারণে যে, হাইব্রিড কায়দায় ধর্মান্ধতার বিষ অজস্রাজস্র মানুষকে আক্রান্ত করলেও এদেশে এখনো এরকম মানুষ অনেক আছেন, যাঁরা ধর্মাচারের চেয়ে বড়ো করে জাতিত্বকে দেখেন, দেখে স্বস্তি পান এবং তাকে উচ্চে তুলে ধরেন। বারডেমের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সামনে, ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে, শহীদ মিনারে, প্রেসক্লাবে এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আয়োজিত শোকসভাসমূহে-- সেসব মুখেরই দেখা মিলেছে। এঁরাই একদিন ধর্মীয় মৌলবাদকে ঠেকাবে। ধর্মান্ধতার বিকাশের বিরুদ্ধে এঁরাই সেই শক্ত দেয়াল। বাহ্যিক সাম্প্রদায়িক রূপচেহারাধারী এদেশ যে আদৌ সাম্প্রদায়িকতাসর্বস্ব নয়, এ ঘটনা তারই সাক্ষ্য হয়ে রইল।

আমরা যারা নতুনতর, তারা আজকাল রবীন্দ্রনাথকে পড়া-শোনা-দেখা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি অথবা কখনোই আমরা চেষ্টা করি নি আমূল রবীন্দ্রনাথকে জানবার-বুঝবার-- প্রগতিবাদিতার আমাদের নানাবিধ ভান আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর কর্মকে চর্চা, আমরা জানি, শেষ বয়সেও তিনি ছাড়েন নি। যতদিন গেছে রবীন্দ্রনাথের প্রতি তিনি আরো বেশি করে আসক্ত হয়েছেন। তাঁর যে জীবনদৃষ্টি তার অনেকটাই রবীন্দ্রনাথ-উৎসারিত, অনেকে বলেন। রবীন্দ্রনাথের গানকে, গানের মহিমাকে সকল প্রাণে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টার তাঁর অন্ত ছিল না। ছায়ানটের অন্যতম কাণ্ডারি তিনি ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকের রবীন্দ্রবিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে অন্য অনেকের সঙ্গে যে লড়াই করেছিলেন, সে লড়াই রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রসংগীতের শুদ্ধতার প্রশ্নে, কাজী নজরুল ইসলামকে অবিকৃতভাবে চর্চার প্রশ্নে, বাঙালি সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে তিনি জারি রেখেছিলেন আমরণ।

রবীন্দ্রনাথের গান শুদ্ধ করে তিনি নিজে গাইতেন যেমন, চাইতেন অন্য সকলেও তাই করুক। ছায়ানটের মাধ্যমে তো বটেই, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের মাধ্যমেও এই শুদ্ধতার মন্ত্র তিনি ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন দেশময়। আজ জয়পুরহাট তো কাল তিনি ফরিদপুরে, পরশু কুমিল্লায় তো তরশু ময়মনসিংহে। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েও তিনি কারো আহ্বান ফেলেন নি কখনো। যেখানেই সম্ভাবনাময় সংগীতানুরাগী পেয়েছেন, সেখানেই তাকে হাত ধরে দীক্ষা দিয়েছেন শুদ্ধতার অভিযানে। এ প্রসঙ্গে তাঁর প্রতি একটি নিন্দাপ্রস্তাব উত্থাপনেরও সুযোগ আছে। সেটি এই যে, রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর কর্মাদর্শ বিষয়ে তিনি বরাবরই খুব গোঁড়া ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-সংগীত-চিত্রকলা ও ভাবাদর্শের কোনো ধরনের নেতিবাচক মূল্যায়ন তিনি একদমই বরদাশত করতেন না বা করতে পারতেন না। কারো কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীতের নির্দিষ্ট স্বরলিপি অনুযায়ী সুর-তাল-লয়ের কোনো খেলাপ হলে, গায়কীতে অর্থানুগ প্রাণ প্রতিষ্ঠা না পেলে কখনোই তাকে ছেড়ে কথা বলতেন না তিনি। আমাদের চারপাশের প্রতিজন মানুষ আলাদা সময়সংস্কৃতি ও পরিপার্শ্বে বেড়ে ওঠেন। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় তাই মানুষে মানুষে বিশেষ ফারাক থাকে। জনে জনে এজন্য রুচি, বিবেচনা ও সৃজনাভীষ্টও আলাদা। সুতরাং এটি ভাবা একান্তই গোঁড়ামি যে, সবাই বিনাপ্রশ্নে সম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথকে যথাযথভাবে নিতে পারবেন। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ প্রশ্নে সবাই তাঁর মতো করে ভাববেন এটা আশা করা অসঙ্গত। কিন্তু তিনি, ওয়াহিদুল হক, সারাজীবন ধরে রবীন্দ্রনাথকে চর্চা করে, সবটা বুঝে বা না বুঝে, তাঁর জানাটাকেই প্রকৃত জানা ভেবে, সর্বদাই একটি অধিকার বোধ থেকে কথা বলতেন। তর্কে-বিতর্কে কারো মন্তব্য তাঁর থেকে অন্যরকম হলে সবার সামনে না হোক আলাদা ডেকে নিয়ে হলেও তিনি এ মর্মে প্রশ্ন উত্থাপন করতে ছাড়তেন না যে, কতটুকু পড়েছ-শুনেছ তুমি তাঁকে (রবীন্দ্রনাথকে)?

সারাদেশে বিভিন্ন বয়েসি যে হাজার হাজার শিষ্যসাবুদ ও ছাত্রছাত্রী রয়ে গেছে তাঁর, তাদের মাধ্যমে তিনি অনেকদিন বাঁচবেন। বাঁচবেন ছায়ানট দিয়ে, বাঁচবেন কণ্ঠশীলন, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, ব্রতচারী সমিতি, নালন্দা, শিশুতীর্থ, আনন্দধ্বনি, প্রভৃতি সংগঠন দিয়ে। সংগঠন গড়া ও নিবিড় পরিচর্যা দিয়ে তাকে স্বাস্থ্যবান করে তোলার অসাধারণ এক গুণপনা ছিল তাঁর। আর এর মূল লক্ষ্যই ছিল শুদ্ধ মানুষ গড়া। সে চেষ্টা যে তাঁর বৃথা যায় নি, বাঙালি সংস্কৃতি আন্দোলনে ওয়াহিদুল হক সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের তাৎপর্যপূর্ণ অব্যাহত কর্মকাণ্ডই তার সাক্ষ্য দেয়।

নগরজীবনের খাঁচায় বদ্ধ বাঙালি এতদিনে ভুলে যেতে পারত তার সংস্কৃতির অনেককিছুই। এই মহানের কর্মকাণ্ড অতটা ব্যাপ্ত না হলে পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের অবশ্য আয়োজন, বসন্ত উৎসব, বর্ষা উৎসব ইত্যাদি থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন পর্যন্ত যাবতীয় আয়োজনের কী হতো কে জানে! এখানে তাঁর সহকর্মী অন্য কাণ্ডারিদের মোটেই খাটো করে দেখা হচ্ছে না, তাঁরাও সমানভাবে স্মরিত-বরিত। তবে ওয়াহিদুল হকের যুক্ততা এসব কর্মকাণ্ডে ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছে, সন্দেহ নেই। নাগরিক বাঙালিকে বাংলার রূপ-রস-গন্ধ উপহার দিয়ে তিনি বাঙালিত্বকেই বড়ো করে তুলে ধরতে চেয়েছেন সবার ওপরে। বাঙালি যে সংস্কৃতিহীন দীনমাত্র নয়, তার মূল যে ছড়িয়ে আছে এ ভূমির অনেক গভীরে, তাই যেন প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করে যাচ্ছে এসব কাণ্ডকীর্তি।

আমরা সবাই জানি, মুক্তিযুদ্ধে কালচারাল ফ্রন্টের সম্মুখ সারির যোদ্ধাদের অন্যতম তিনি। একাত্তরে সেই যে তিনি শত্রু চিনেছিলেন, তাদের আর কখনো মিত্র বলে জানেন নি। চিনতে ভুল করেন নি নব্য শত্রুদেরও। এদের বিরুদ্ধে অক্লান্ত যুদ্ধ করে গেছেন লেখায়-বলায়। যাকে শত্রু বলে জানতেন, তার/তাদের বিরুদ্ধে তিনি সর্বদাই খুব কঠোর থেকেছেন। লক্ষণীয় যে, সাংবাদিক-কলামিস্ট ওয়াহিদুল হকের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু যে বা যারা ছিল, আমরা দেখেছি, তারা অতি প্রায়শই দেশ ও দশের শত্রু। অর্থাৎ তাঁর এই কলমযুদ্ধ নিছক মনের ঝাল মেটানো ছিল না, ছিল দেশের জন্য লড়াই।

ন্যায় ও মানবাধিকারের পক্ষে তাঁর অবস্থানে তিনি বরাবরই অটল ছিলেন। দেশের যেকোনো স্থানে যখনই কোনো সাম্প্রদায়িক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, নির্যাতিত হয়েছে কোনো সংখ্যালঘু নারী-পুরুষ, অচিরেই তিনি তার প্রতিকারের পথ খুঁজেছেন, কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন, অন্যদের সাথে সে স্থানে গিয়ে নির্যাতিতের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটি কম বড়ো কথা নয়! বিভিন্ন সময়ে এদেশে পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যত ঘটনা ঘটেছে ও ঘটছে, অমানুষদের সেসব নিন্দনীয় কর্মকে ঠেকাবার জন্যে একদল মানুষ যদি সর্বদাই সক্রিয় না থাকত, তাহলে ধারণা করি, এতদিনে মুসলমানের বাইরে অন্য কোনো জাতি-ধর্মের মানুষ এদেশে নির্বীজ হয়ে যেতে পারত। ভাগ্যিস তাঁরা ছিলেন। আজও তাঁরা আছেন। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে একজন ওয়াহিদুল হকের মৃত্যুতে ওই দলের একজন মানুষ মাত্র কমে গেলেন। তাঁর গড়ে তোলা শুদ্ধ-আধাশুদ্ধ-ঊনশুদ্ধ মানুষের সবাই ওই মানবিকজনদের সারিতে যুক্ত হয়ে অমানুষদের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে আরো বড়ো দেয়াল গড়ে তুললে গুরু ওয়াহিদুল হকের প্রতি তাদের যথাশ্রদ্ধাই প্রকাশ পাবে বলে মনে করি।

থিয়েটারওয়ালায় মুদ্রিত