Thursday, June 26, 2014

একাত্তরের দিনগুলি : মুক্তিযুদ্ধের গায়ের মাপে তৈরি অ্যাপ্রোন

জীবদ্দশায় কবি-সাংবাদিক সাইয়িদ আতিকুল্লাহ সচিত্র সন্ধানী পত্রিকার মাধ্যমে ‘একাত্তরের দিনগুলি’ প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, “’৭১-এর ঢাকা শহরের অবস্থা এবং গেরিলা তৎপরতা বুঝবার জন্য এই বইটি অত্যন্ত মূল্যবান বলে বিবেচিত হবে। ঢাকায় গেরিলাদের তৎপরতা নিয়ে এত ভাল বই এখন পর্যন্ত আর কেউ লিখেছেন বলে জানিনে। দলিল-প্রমাণাদি সম্পর্কে উদাসীন বাঙালিদের জন্য জাহানারা ইমাম এক অমূল্য দলিল উপহার দিয়েছেন।” তাঁর এই ভাষ্যকে আক্ষরিকভাবে মেনে না নেবার মতো কারণ এখানে এখনো অনুপস্থিত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা তৎপরতা বিষয়ে জানা মতে এ গ্রন্থটি আজো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

দিনলিপি দেখে দিনের চোখে দিন ও রাতকে, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতাব্যাপী ব্যাপ্ত তার পরিসরকে। এই তার নৈমিত্তিক শৈলীপনা। কখনো যে এই রীতির ব্যত্যয় ঘটে না, এমন নয়। মাঝে মধ্যে এই নৈমিত্তিকতার সমতলে উড়ে এসে ঢুকে পড়ে অতীত দিনের দুয়েকটা ঝরাপাতা; চাই কী কখনো উঁকি মারে সম্ভাবনামাখা ভবিদিনও, আশঙ্কা বা স্বপ্নপাখি হয়ে। এই দ্বিবিধ ব্যতিক্রমী ডানা ঝাপটানিসহ বাংলাভাষায় রচিত অবিস্মরণীয় দিনলিপি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ মধ্যবয়সে ফের এসে সামনে দাঁড়ায় লোনাগর্জন হয়ে। চোখ বুজে এ গর্জনে কান পেতে চার দশকেরও অধিক প্রাচীন এক রক্তনদীর ছলাচ্ছলের মুখে পড়ে আমি নতুন করে চুরমার হয়ে যেতে থাকি। ফের গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াই। সুউচ্চ একেকটা ঢেউকে এগিয়ে আসতে দেখে বুক পেতে রাখি। ফেনা ও বুদ্বুদসহ বুকের সৈকতে তীব্র শক্তিতে তা আছড়ে পড়ে। এ আঘাত সয়ে সয়ে আরো কোনো প্রকাণ্ড ঢেউয়ের আঘাত সইবার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এক-দু’পা করে সামনে এগোই। ভেঙেচুরে ভেসে যাই, আবার উঠে দাঁড়াই আমি সমুদ্রের সমান বয়সি। জানি ক্রমে লীন হয়ে যাব একদিন, তবু সতত প্রবহমান এ রক্তনদীর ছলাচ্ছল কখনো থামবে না বলে ধারণা হয়।

একাত্তরের মার্চের প্রথম দিনে থেকে এ গ্রন্থের শুরু, সমাপ্তি ডিসেম্বরের সতেরোয়। যেন ন’মাস দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধের গায়ের মাপে তৈরি এ অ্যাপ্রোন। যেদিক দিয়েই একে উন্মোচন করা যায় সেদিক দিয়েই অগ্নিহল্কা, গেরিলাপ্রয়াসের সাফল্য-ব্যর্থতা, আকণ্ঠ উদ্বেগ। যেদিক দিয়েই তাকানো যায়, সেদিক দিয়েই রক্তক্ষত, স্তব্ধতার আওয়াজ। আশা-নিরাশা-আশঙ্কার দোলাচলে বর্ণিল ভাষানির্মিত এ এক সময়শরীর।

পহেলা মার্চ রেডিওতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণার মাধ্যমে বাঙালির মনে যে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে, সে আগুনের হল্কা ছড়ায় ঢাকাসহ গোটা বাংলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পূর্বাণী হোটেল, পল্টন ময়দানের রূপচেহারা মুহূর্তে বদলে যায়। হরতাল-কারফিউর আশঙ্কায় নিত্য প্রয়োজনীয় চাল-ডাল খরিদ করতে দোকানপাটে ভিড় বাড়ে মানুষের। পরিস্থিতির আঁচ লাগে ঘরে ঘরে। সংগত কারণে বদলে যায় ইমাম-পরিবারের স্বাভাবিক নৈমিত্তিকতাও। এই অশান্ত পরিস্থিতির শান্ত বর্ণনা দিয়ে গৃহপ্রবেশ ঘটিয়ে গ্রন্থটি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-সাহস-শৌর্য, রক্ত-কান্না-হতাশা-অসহায়ত্বের ভেতর দিয়ে নিয়ে গিয়ে অবিস্মরণীয় বীরত্বগাথা শুনিয়ে বিজয়ের পতাকা হাতে ধরিয়ে পরে পাঠককে নিস্তার দেয়।
   
এই দিনলিপির একটি গুরুত্বপূর্ণ, বলা যায় প্রধান আলোকেন্দ্র জাহানারা ইমামের তারুণ্যস্পর্ধী বড়ো ছেলে শফি ইমাম রুমী। ততদিনে সে আইএসসি পাস করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছে। একইসঙ্গে ভর্তি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে, যেখানে ক্লাস শুরু হবে দোসরা সেপ্টেম্বর। এই ফাঁকে বাবা শরিফ ইমামের প্রতিষ্ঠানে মাঝেমধ্যে ড্রইংয়ের কাজ করে। পাশাপাশি বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনোমিকস বিভাগের ক্লাসে যুক্ত হয়েছে। মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-মাও ভেজে খাওয়া সমাজতান্ত্রিক আদর্শের একজন সৈনিক সে। বিতার্কিক হিসেবেও নিজের দক্ষতা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে। তার এ দক্ষতা প্রকাশ পায় বাসার চায়ের টেবিলেও। এরকম একটি ছেলের পড়াশোনা, খেলাধুলা, বন্ধুদের সাথে মাস্তি করা ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক কাজকর্ম নিয়ে যেভাবে মত্ত থাকবার কথা, দেশের আকাশে যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে আসায় সে জীবনে ব্যত্যয় ঘটেছে। রুটিনে জায়গা নিয়েছে অন্য কিছু, দেশমুক্তির উপায় অনুসন্ধান। তাই পড়ার টেবিলে বা খেলার মাঠে নয়, সময় কাটে মিছিল-মিটিংয়ে, বিক্ষোভে, গোপন যুদ্ধ পরিকল্পনায়, কারফিউপ্রবণ সময়ের আড়ালে প্রয়োজনীয় ফিসফিসানিতে।

বিক্ষুব্ধ জনতা কারফিউ ভেঙে নেমে এসেছে পথে, পথে পথে ব্যারিকেড তৈরি হচ্ছে, বিক্ষোভ চলছে। ক্ষুব্ধ জনতাকে দমাতে ওই পক্ষ থেকে প্রতিদিন গুলি চলছে, প্রতিদিন শহীদ হচ্ছে কেউ না কেউ। শহীদদের মরদেহ নিয়ে আবার বিক্ষোভ হচ্ছে। দেশদ্রোহিতার ভয়ে ভীত না হয়ে স্বাধীন বাংলার প্রস্তাবিত পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। বক্তৃতায় স্বাধিকারের দাবি তোলা হচ্ছে। এর মধ্যেই কারফিউ-গুলির পাশাপাশি সামরিক ফরমান জারি করে পাকিস্তানের সংহতি বা সার্বভৌমত্ব পরিপন্থী খবর, মতামত বা চিত্র প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এদিকে রেডিওকর্মীদের সব ধরনের প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও বিশেষ ফরমান বলে ৭ মার্চে রেসকোর্সে দেওয়া শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণ রেডিওতে সরাসরি প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আসে। প্রতিবাদে কর্মীরা সব ধরনের প্রোগ্রামই বন্ধ করে দেন। পরদিন সকালে এ ভাষণ প্রচার সম্ভব হয়। এরকম পরিস্থিতিতে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে যেখানে একটি মাত্র গুলির ব্যবধান, সেখানে মা হিসেবে জাহানারা ইমাম চান ছেলেকে বুকের কাছে আগলে রাখতে। কিন্তু যার স্বপ্নে জায়গা নিয়েছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, তাকে যুদ্ধের মাঠের পরিবর্তে ঘরে ধরে রাখা অসম্ভব। পারেন নি জাহানারা ইমামও।

স্বাধিকার না স্বাধীনতা এই নিয়ে সর্বত্র তুমুল তর্ক। অনেকেই আশা করেছিলেন, শেখ মুজিব রেসকোর্সে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। কিন্তু তিনি স্বাধীনতা প্রশ্নে “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”-এর মতো পরোক্ষ উক্তি করে তাঁর ভাষণ শেষ করেন। তাঁর এই ভূমিকায় অনেকেই নাখোশ। যাঁরা এর পক্ষে তাঁরা মনে করেন এটাই সঠিক ছিল, ওই মুহূর্তে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হতো, যেখানে আলোচনা চলমান। এই দ্বিধা-সংশয়ের মধ্যেই মওলানা ভাসানী ৯ মার্চে পল্টনের সভায় সরাসরিই স্বাধীনতার প্রশ্নটি তোলেন, “বর্তমান সরকার যদি ২৫ মার্চের মধ্যে আপসে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা না দেয়, তাহলে ‌'৫২ সালের মত মুজিবের সঙ্গে একযোগে বাংলার মুক্তিসংগ্রাম শুরু করব।” রুমী ভাসানীর ভূমিকাকেই সমর্থন করে। তার মানে সে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হয়ে গেছে যুদ্ধে যাবার জন্য। বুঝে গেছে, আলোচনা কোনো সুফল বয়ে আনবে না। আলোচনার অজুহাতে ওরা সময় নিচ্ছে মাত্র। তাই মায়ের সাথে আলাপে তার মত এভাবে প্রকাশ পায় : “ওরা আমাদের স্বাধীনতা দেবে না। স্বাধীনতা আমাদের ছিনিয়ে নিতে হবে সশস্ত্র সংগ্রাম করে।”
  
মায়ের বিবেচনায় রুমীর আচরণ দিনকে দিন রহস্যময় হয়ে উঠতে থাকে। ওর চালচলনে একটা উদভ্রান্ত ভাব জায়গা নিয়ে নেয়। মায়ের চোখ এসব এড়ায় না। অ্যাস্ট্রলজি নির্ভরযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না জেনেও পারিবারিক বন্ধু কথাসাহিত্যিক ও অ্যাস্ট্রলজার অজিত নিয়োগীর কাছে তাঁর কপালে পুত্রশোক আছে কি না সে ব্যাপারে জানতে চান। তিনি ‘রুমীর মঙ্গল খুব প্রবল’ ও ‘মঙ্গল যুদ্ধের রাশি’ জানিয়ে ওকে সাবধানে রাখবার কথা বলেন।

আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে দিনে দিনে ঢাকায় এসে পৌঁছে অজস্র পাক সামরিক অফিসার, সাদা পোশাকে হাজার হাজার সাধারণ সৈনিক। চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ে অস্ত্রভর্তি জাহাজ, যদিও বীর চট্টলাবাসী অস্ত্র খালাসের আয়োজন প্রতিহত করে দেয়। এদিকে খোদ প্রেসিডেন্ট ঢাকায় উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও অফিস-আদালত-ব্যাঙ্ক কার্যত চলতে থাকে মুজিবের নির্দেশে। টিক্কা খানকে কোনো বিচারপতি শপথ পড়াতে রাজি না হওয়ায় তাঁর গভর্নর হওয়া হয় না, বরং মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। সেনাবাহিনীর কাছে কোনো বাঙালি খাবার বিক্রি করছে না, ফলে পাকিস্তান থেকে প্লেনে করে খাবার আনতে হচ্ছে। এরকম অবস্থায় বড়ো ধরনের অপারেশনের নির্দেশ দিয়ে আলোচনা অমীমাংসিত রেখে ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কাউকে না জানিয়ে পাকিস্তানে ফিরে যান। পথে পথে আর্মি নামে। রাতে শুরু হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ-- অপারেশন সার্চ লাইট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু এলাকাকে শ্মশানে পরিণত করে ফেলা হয়। কালরাতের এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে ও কয়েকদিন ধরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখে-শুনে স্বাভাবিকভাবেই রুমীর ভেতরে ভাংচুর শুরু হয়। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পূর্বাহ্নেই ওর এমন কিছু ঘটতে পারে।

যুদ্ধে যাবার ব্যাপারে মায়ের অনুমতি পাবার জন্য সে নিয়মিত বিতর্ক চালিয়ে যেতে থাকে। অনেক ছেলেই বাবা-মাকে না জানিয়ে পালিয়ে যুদ্ধে গেছে। কিন্তু ওর পারিবারিক শিক্ষাটাই এমন যে, সবকিছুই অভিভাবককে বলেকয়ে করতে হবে। এ কারণেই সে সর্বোচ্চ যুক্তির মারপ্যাঁচ চালায় : “আম্মা শোন, ছাত্রজীবন লেখাপড়া করার সময় এসবই চিরকালীন সত্য; কিন্তু ১৯৭১ সালের এই এপ্রিল মাসে এই চিরকালীন সত্যটা কি মিথ্যা হয়ে যায় নি? চেয়ে দেখ, দেশের কোথায় সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনধারা বজায় আছে? কোথাও নেই। সমস্ত দেশটা পাকিস্তানি মিলিটারি জান্টার টার্গেট প্র্যাকটিসের জায়গা হয়ে উঠেছে। রোমান গ্ল্যাডিয়েটরের চেয়েও আমাদের অবস্থা খারাপ। একটা গ্ল্যাডিয়েটরের তবু কিছুটা আশা থাকত, একটা সিংহের সঙ্গে ঝুটোপুটি করতে করতে সে জিতেও যেতে পারে। কিন্তু এখানে? সেই ঝুটোপুটি করার সুযোগটুকু পর্যন্ত নেই। হাত আর চোখ বেঁধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, কট্কট্ করে কতগুলো গুলি ছুটে যাচ্ছে, মুহূর্তে লোকগুলো মরে যাচ্ছে। এই রকম অবস্থার মধ্য থেকে লেখাপড়া করে মানুষ হবার প্রক্রিয়াটা খুব বেশি সেকেলে বলে মনে হচ্ছে না কি?”

মা প্রতিশ্রুতি দেন তাকে কিছুটা আগেভাগেই আমেরিকায় পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু এতে ছেলে খুশি হয় না। বলে : “আম্মা, দেশের এ অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়ত বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবো; কিন্তু বিবেকের ভ্রূকুটির সামনে কোনদিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও আম্মা?”

এবার মা যুক্তির কাছে পুরোপুরি পরাস্ত। তিনি ইতোমধ্যে নিশ্চিত যে, তাঁর ছেলে হুজুগে মেতে নয় বরং মনেপ্রাণে প্রয়োজন উপলব্ধি করেই যুদ্ধে যেতে চাইছে। তিনি জোরে দুই চোখ বন্ধ করে বলেন, “না, তা চাইনে। ঠিক আছে, তোর কথাই মেনে নিলাম। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে। যা, তুই যুদ্ধে যা।”

এবার রুমী প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ভারতে যাবার উপায় অনুসন্ধানে রত হয়। কিন্তু সঠিক যোগাযোগের লোক খুঁজে পেতে বিলম্ব হয়। শুরুতে বর্ডার ক্রস করা সহজ ছিল। এতদিনে বেশির ভাগ জায়গায়ই পাকিস্তানি সৈন্যদের কড়া প্রহরা। তবে তেসরা মে মায়ের জন্মদিনে রুমী জানায় যে, ওর ঠিকমতো যোগাযোগ ও যাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। কবে, কাদের সঙ্গে যাবে, মা জানতে চান। জবাব পাওয়া যায়, “তিন-চারদিনের মধ্যেই। কাদের সঙ্গে-- নাম জানতে চেও না, বলা নিষেধ।” মায়ের মনে হয় “লোহার সাঁড়াশি দিয়ে কেউ যেন পাঁজরের সবগুলো হাড় চেপে ধরেছে।” মা তাঁর অনুভূতির প্রকাশ ঘটান এভাবে : “নিশ্চিদ্র অন্ধকারে, চোখের বাইরে, নিঃশর্তভাবে ছেড়ে দিতে হবে। জানতে চাওয়াও চলবে না-- কোন পথে যাবে, কাদের সঙ্গে যাবে। রুমী এখন তার নিজের জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, তার একান্ত নিজস্ব ভুবন, সেখানে তার জন্ম-দাত্রীরও প্রবেশাধিকার নেই।” তাঁর তখন মনে পড়ে কাহলিল জিবরানের ‘প্রফেট’-এর পঙক্তিরা : ‘তোমাদের সন্তানেরা তোমাদের নয়’। কার তবে?

‘তারা জীবনের সন্তানসন্ততি
জীবনের জন্যই তাদের আকুতি।
তারা তোমাদের সঙ্গেই আছে
তবু তোমাদের নয়।
তারা তোমাদের ভালোবাসা নিয়েছে
কিন্তু নেয় নি তোমাদের ধ্যান-ধারণা,
কেননা তারা গড়ে নিয়েছে
তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা।
তাদের শরীর তোমাদের আয়ত্তের ভেতর
কিন্তু তাদের আত্মা কখনই নয়
কেননা, তাদের আত্মা বাস করে
ভবিষ্যতের ঘরে,
যে ঘরে তোমরা কখনই পারবে না যেতে
এমনকি তোমাদের স্বপ্নেও না।

তাদেরকে চেয়ো না তোমাদের মত করতে
কারণ তাদের জীবন কখনই ফিরবে না
পেছনের পানে।’

রুমীকে রওয়ানা হতে হবে ৭ মে তারিখে। গোছগাছ করে দেবার জন্য মায়ের প্রস্তুতির যেন শেষ নেই। নিজহাতে রুমীর প্যান্টের কোমরের কাছে ভেতর দিকের মুড়ি খুলে কয়েকটা একশো টাকার নোট সেলাই করে দেন। বাইরে কোথাও থাকলে সার্চ করে রেখে দিতে পারে। কাপড়-জামা রাখার জন্য এয়ারব্যাগ এবং তার মধ্যে দু’সেট কাটা কাপড়, তোয়ালে, সাবান, স্যান্ডেল এবং জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা ও সুকান্ত সমগ্র পুরে দেন।

যাবার আগের দিন রাতে রুমী মায়ের কাছে বেশিক্ষণ চুলে হাত বুলিয়ে দেবার আবদার করে। দুই ছেলের মাথায়ই মা প্রায় প্রতিদিন হাত বুলিয়ে দেন। আজ ছোট ছেলে জামী চাইল না মাকে। মাথার চুল টেনে দেবার সময় ওইদিন রুমী গেয়ে ওঠে, ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’। নির্দিষ্ট দিন জাহানারা ইমাম নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে রুমীকে যাত্রাবিন্দুতে পৌঁছে দেন। পেছনের সিটে রুমীর সাথে বাবা শরিফ ইমাম। পরিকল্পনা অনুযায়ী গাড়ি গিয়ে থামে সচিবালয়ের সেকেন্ড গেটে। আলগোছে নেমে যায় রুমী। এখান থেকেই বন্ধুদের সঙ্গে মিলে গোপনে শুরু হবে ওর যুদ্ধযাত্রা।

অপ্রত্যাশিতভাবে ১১ মে ফিরে আসে রুমী। কামাল লোহানী, প্রতাপ হাজরা, মনু, ইশরাক ও বাফার কয়েকজন কর্মচারী মিলে দলটি ভারতের উদ্দেশ্যে যে পথে যাত্রা করেছিল, সে পথে ঘাপলা হয়েছে। নতুন পথের সন্ধান না-জানা থাকায় ফয়েজ আহমদের পরামর্শে দলটি পরবর্তী অভিযানের পরিকল্পনা করে প্রত্যাবর্তন করে ঢাকায়। ১৪ মে বন্ধু নাদিমসহ পুনর্যাত্রা করে রুমী। মা উদ্বিগ্ন থাকেন। ৩০ জুন প্রথম খবর পান রুমী আগরতলার কাছাকাছি মেলাঘর ক্যাম্পে আছে। খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ২ নম্বর সেক্টরে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ছেলে রণাঙ্গনে কিন্তু মা-ও বসে নেই। ঢাকা শহরে থেকে প্রতিমুহূর্তে পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করে যান তিনি। ছেলের খবর জানবার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন। মেলাঘর থেকে খবর নিয়ে আসে জিয়া, মনু, দুলু, পারভেজ। ওদের কাছে জানতে পারেন রুমী ভালো আছে, তবে ওদিকে এখন ভয়ানক চোখ-ওঠা রোগ। পাঞ্জাবিরা যাকে ‘জয় বাংলা চোখ-ওঠা’ নামে ডাকে। ভাইরাল কনজাংটিভাইটিস। পারভেজ বলে, হোমিওপ্যাথিক ঔষধ বেলেডোনা-৬ শুরুতেই খেলে রোগটি আর হয় না। ২০ জুলাই পারভেজ রওয়ানা দেবে মেলাঘরে। মা এবারও সুযোগ নেন। পারভেজের কাছে কয়েক শিশি বেলেডোনা-৬, কয়েকটা নেইল কাটার, তিনটা সানগ্লাস এবং দু’শো টাকা দিয়ে দেন। বলে দেন, একটা নেইল কাটার, একটা সানগ্লাস এবং একশো টাকা রুমীর। একশো টাকা পারভেজের। বাকি জিনিসপত্রগুলো যেটি যার যখন লাগে, তারই। এর পরেও নানাজনের কাছে নানা সময়ে টাকা, সিগারেট, ওষুধ, কাঁচি, ব্লেড ইত্যাদি পাঠান; যেন তিনি সকল মুক্তিযোদ্ধা ছেলের মা বা মায়েদের প্রতিনিধি।

৮ আগস্ট রুমী ঢাকায় আসে। সে কী উচ্ছ্বাস মায়ের মনে! দীর্ঘদিন পর ছেলেকে কাছে পাওয়ায় বাড়িতে উৎসব লেগে যায়। সেটা শুধু ছেলেকে কাছে পাওয়ার জন্যেই নয়, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বয়ান শোনা যাবে এ কারণেও। এবার রুমীর ঢাকায় আসা বেড়াবার জন্য নয়। ইতোমধ্যে সে পুরোমাত্রায় প্রশিক্ষিত গেরিলা যোদ্ধা। অপারেশনের প্রয়োজনেই দুই নম্বর সেক্টর থেকে অন্যান্যের সঙ্গে সে প্রেরিত হয়েছে ঢাকায়। মা এখন আর আগের মতো কড়াকড়ি করেন না। বেশিক্ষণ কাছে পাবার জন্য সামনে সিগারেট খাবারও অনুমতি দিয়ে দেন তিনি। তাছাড়া, সঙ্গী গেরিলা যোদ্ধাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করবার জন্য বাড়িতেই জায়গা করে দেন, ক্ষণে ক্ষণে নাস্তার জোগান দেন। নিজে কোনো কোনো বৈঠকে উপস্থিতও থাকেন। বৈঠকে অপারেশনের পরিকল্পনা ও তার নকশা তৈরি হয়।

কখনো দু’তিনদিনের জন্যও রুমীকে বাড়ির বাইরে চলে যেতে হয়। মা অপেক্ষা করতে থাকেন কোনো বড়ো ধরনের অপারেশনে সফল করে সবান্ধবে ফিরে আসবে তাঁর রুমী। কখনো-বা অপারেশন শেষে নিজে গিয়ে রুমীকে গাড়ি করে এগিয়ে আনেন। স্টেনগানের ফায়ারের আগুনের আঁচে ঘাড়ে তৈরি হওয়া ফোস্কা ডেটল দিয়ে মুছে দেন, ওষুধ লাগিয়ে দেন। প্রয়োজনে ছেলের সঙ্গে গাড়ি ড্রাইভ করে গিয়ে অস্ত্র নিয়ে আসেন, রাখেন বাসায় যত্ন করে।

মা-ছেলে মিলে এরকম যৌথ গেরিলা-তৎপরতা চলতে পারত দীর্ঘসময় ধরে। কিন্তু না, যতি পড়ে এই অভিযানে। চড়াও হয় বজ্রের মতো দুঃসময়। ২৯ আগস্ট একদল মিলিটারি এলিফ্যান্ট রোডের বাড়ি ঘেরাও করে। ঘর সার্চ করে এমপিএ হোস্টেলে নিয়ে যায় স্বামী শরিফ ইমাম, ছেলে রুমী-জামী ও ছেলের বন্ধু হাফিজ-মাসুমকে। মায়ের বুক হু হু করে ওঠে।

এক-দেড় ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেবে বলে নিয়ে গেলেও দেড়দিন যায় ওরা কাউকে ছাড়ে না। ফোনে যোগাযোগ করে স্যান্ডউইচ ও জামাকাপড় নিয়ে সশরীরে এমপিএ হোস্টেলে যান তিনি। কিন্তু কারোরই কোনো খোঁজ পান না। ৩১ আগস্ট ফিরে আসে রুমীকে ছাড়া দলের বাকি সবাই। এবার মায়ের উদ্বেগ আরো তীব্র হয়।

২৫ আগস্টের একটি সফল গেরিলা অপারেশনের বিপরীতে ছিল এই জিজ্ঞাসাবাদ। ধানমণ্ডির একটি বাড়ির গেটের ওই অপারেশনে অর্ধডজন পাকসেনা ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় দশম শ্রেণিতে পড়া কিশোর জামীসহ চরম নির্যাতন করা হয় সবাইকে। রুমীর কৃতকর্ম সম্পর্কে পাকসেনারা আগে থেকেই তথ্য পেয়েছিল, ফলে ওর পক্ষে ঘটনা অস্বীকার করবার কোনো জো ছিল না। ওর স্বীকারোক্তিতে প্রমাণিত হয় যে ওকে ছাড়া আর কেউ এ অপারেশনের কিছুই জানে না। সুতরাং অন্যেরা ছাড়া পেলেও রুমী ছাড়া পায় না।

এ বিপদে জাহানারা ইমামের প্রগতিশীল মনও সংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ করে। মিষ্টি নিয়ে হাজির হন পাগলা পিরের দরগায়। শোনা যায়, এই পিরের কাছে যা চাওয়া যায়, তাই মেলে। তাঁর আর্তি ছেলে রুমীকে ফিরে পাওয়ার। না, তিনি একা নন। পিরের দরগায় গিয়ে দেখতে পান রাজশাহীর ডিআইজি মামুন মাহমুদের স্ত্রী মোশফেকা মাহমুদ, রাজশাহীর এসপি শাহ আবদুল মজিদের স্ত্রী নাজমা মজিদ, চট্টগ্রামের এসপি শামসুল হকের স্ত্রী মাহমুদা হক, ঢাকার আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী ঝিনু মাহমুদসহ আরো অনেকেই। সবারই আর্তি আপনজনকে ফিরে পাওয়ার। কোরান খতম করান। মিলাদ পড়ান। জানের সদকা হিসেবে খাসি কোরবানি দেন। পিরকে বাসা অব্দি নিয়ে আসেন। পাগলা পির রুমীর ঘরে গিয়ে দু’রাকাত নামাজ পড়ে মোনাজাত করে ঘাবড়াতে নিষেধ করে শিগগির ওকে বের করে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। পরের আশ্বাসের যেমন কমতি নেই, নজরানারও ঘাটতি নেই। প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে পঞ্চাশ টাকার নোট, পাঁচ-সাত সের মিষ্টি, এক কার্টুন ৫৫৫ সিগারেট নজরানা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু না, পিরের পেছনে প্রচুর অর্থ ও সময় অপচয় করে, প্রচুর ধরনা দিয়ে, পায়ে পড়েও কোনো কাজ হয় না। এবার আজিমপুর সলিমুল্লাহ এতিমখানায় গরু কোরবানি দেন। যে যা পরামর্শ দেয়, তাই করেন। প্রিয় পুত্রের জন্য মায়ের প্রত্যাশা যে ফুরাবার নয়।

বিজয়ের দিনকয় আগে ১৩ ডিসেম্বর হার্ট অ্যাটাকের ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় শরিফ ইমামকে। ব্ল্যাকআউটের কারণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চালানো যায় নি। ১৪ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। বিজয়ের দিন কুলখানি। জেনারেল নিয়াজি নব্বই হাজার পাক সেনা নিয়ে বাঙালির বীরত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করেন; জাহানারা ইমাম আত্মসমর্পণ করেন বর্তমান পরিস্থিতির কাছে, বাকি জীবন একাই সব কষ্ট বহন করবার প্রতিজ্ঞায়।
                         
শরিফ ইমাম ছিলেন রাশভারী স্বপ্লবাক মানুষ। সরকারি চাকুরে, ইঞ্জিনিয়ার। সংসারে তাঁর খবরদারির কোনো প্রমাণ গোটা বইয়ে মেলে না, বরং যেকোনো প্রয়োজনে সহযোগী হিসেবে তাঁর বাড়িয়ে রাখা উদার হাতের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। তাঁর হাত অকৃপণ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনেও। যখন তখন অর্থ দিয়েছেন যুদ্ধের রসদ হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সবচেয়ে বড়ো যে কন্ট্রিবিউশন, সেটা দেশের ৩৫০০টি সেতু ও কালভার্টের তালিকা ও নকশা সরবরাহের। খালেদ মোশাররফ ব্রিজ ও কালভার্টের তথ্য চেয়ে পাঠান, যাতে পাকবাহিনীর চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে ওগুলো এমনভাবে এক্সক্লুসিভ বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া যায় যে, দেশ স্বাধীন হবার পর সহজে মেরামত করা যায়। অনেক ঝুঁকি ডিঙিয়ে শরিফ ইমাম তাঁর সহকর্মীকে নিয়ে সবকটা ব্রিজের তালিকা, বিভিন্ন টাইপের ব্রিজের ড্রইং করে প্রত্যেকটির স্পেসিফিকেশন লিখে দেন। এরকম একজন যোদ্ধার বিজয় দিবসের দুই দিন আগে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করা খুবই বেদনাকর। তিনি কেবল তাঁর পার্টনার জাহানারা ইমাম ও কিশোরপুত্র জামীকে একা করে যান নি, কার্যত যোদ্ধাদেরও হতাশ করে গেছেন।
 
একাত্তরের দিনগুলি গ্রন্থটি কেবল ইমাম পরিবারের ঘটনাবলির ডকুমেন্টেশন নয়, এটা মুক্তিযুদ্ধেরই একাংশের ডকুমেন্টেশন। কারণ বাংলার স্বাধিকারের সপক্ষে হওয়া নানা তৎপরতা ও এর সাথে যুক্তদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য এখানে টুকে রাখা আছে। নমুনা হিসেবে এর কয়েকটি এখানে তুলে ধরা যায়; যেমন ১৪ মার্চের নোট থেকে জানা যায়, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে ঢাকার কবি-সাহিত্যিকদের ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ গঠন করবার কথা। হাসান হাফিজুর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটিতে ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর, আহমদ শরীফ, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, বদরুদ্দিন উমর, রণেশ দাশগুপ্ত, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, রোকনুজ্জামান খান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সুফিয়া কামাল, জহির রায়হান, আবদুল গণি হাজারীসহ আরো অনেকে। জানা যাচ্ছে, বেতার-টেলিভিশন, চলচ্চিত্র সব মাধ্যমের শিল্পীদের সমন্বয়ে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হবার কথাও। আলী মনসুরকে সভাপতি, সৈয়দ আবদুল হাদীকে সম্পাদক ও লায়লা আর্জুমান্দ বানুকে কোষাধ্যক্ষ করে গঠিত পরিষদে সদস্য হিসেবে ছিলেন মোস্তফা জামান আব্বাসী, জাহেদুর রহিম, ফেরদৌসী রহমান, বশির আহমেদ, খান আতাউর রহমান, বারীন মজুমদার, আলতাফ মাহমুদ, গোলাম মোস্তফা, কামরুল হাসান, অজিত রায়, হাসান ইমাম, কামাল লোহানী, জি. এ মান্নান, আবদুল আহাদ, সমর দাস, গহর জামিল, রাজ্জাক ও আরো অনেকে।

১৫ মার্চের এন্ট্রি থেকে জানা যায়, বাঙালি বিশিষ্টজনেরা পাক সরকারের বাংলা ও বাঙালিবিরোধী আচরণে তাদের দেওয়া খেতাব বর্জন করতে শুরু করেছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বর্জন করেছেন তাঁর ‘হেলালে ইমতিয়াজ’ খেতাব। অধ্যক্ষ মুনীর চৌধুরী বর্জন করেছেন ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব। এছাড়াও জাতীয় পরিষদ সদস্য ডাঃ শেখ মোবারক হোসেন, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শেখ মোশারফ হোসেন ও দৈনিক পাকিস্তান সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন বর্জন করেছেন যথাক্রমে ‘তমঘা-এ-পাকিস্তান’, ‘তমঘা-এ কায়েদে আযম’ ও ‘সিতারা ই খিদমত’ খেতাব।
  
১৮ মার্চের এন্ট্রি থেকে জানা যায়, স্বাধিকার চেতনাকে তুঙ্গে তুলে দেবার জন্য ঢাকা টেলিভিশনের অভিনব গানের অনুষ্ঠানের সংবাদ। এই অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রথম সারির নামকরা শিল্পী ফেরদৌসী রহমান, সাবিনা ইয়াসমীন, শাহনাজ বেগম, আঞ্জুমান আরা বেগম, সৈয়দ আবদুল হাদী, খোন্দকার ফারুক আহমদ, রথীন্দ্রনাথ রায় ও আরো কয়েকজন শিল্পীর উপস্থিতিতে গাওয়া ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবেই দিনরাত অবিরাম’ গানটিকে যন্ত্রপাতির সৃজনশীল ব্যবহার দিয়ে কয়েক হাজার মুখে গাওয়া গান হিসেবে দেখানো হয়। আয়না ব্যবহার করে এ অসাধ্যটি সাধন করেন মোস্তফা মনোয়ার।

১৯ মার্চের নোটে পাওয়া যায়, পটুয়া কামরুল হাসানকে আহ্বায়ক করে ‘বাংলার পটুয়া সমাজ’ নামে সমিতির গঠনের সংবাদ, যে সমিতির শিল্পীরা কার্টুন, ফেস্টুন, পোস্টার ইত্যাদি তৈরি করে স্বাধিকার আন্দোলনের বাণী-বার্তা বৃহত্তর জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার উদ্যোগ নিয়েছে। শাপলা ফুলকে সংগ্রামী বাংলার প্রতীক হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব এই সমিতির সভাতেই নেওয়া হয়।

২২ মে তারিখের এন্ট্রি থেকে জানা যায়, গ্রামের মানুষের আন্তরিক ভালোবাসার কথা। গ্রামের অনেক বুড়ো মানুষ কিছু পর পর পথের ধারে গুড় আর মটকাভর্তি পানি নিয়ে বসে থেকেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে উদ্বাস্তু বা অন্য যারা ওই পথ দিয়ে যাবেন, তারা যাতে তৃষ্ণা মেটাতে পারেন। তাছাড়া, অনেক বাড়িতে রাত দুপুরে মুরগি জবাই করে খাওয়ানো ও মাঁচায় তুলে রাখা কাঁথা-বালিশ নামিয়ে শরণার্থীদের থাকতে দেওয়া হয়েছে।
   
১৪ অক্টোবরের এন্ট্রিতে মোনেম খাঁকে তাঁর বাসায় গুলি করে মারার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সন্ধ্যার পর মোনেম খাঁ ড্রইংরুমে বসে প্রাক্তন প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেন, কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা ও তাঁর জামাই জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেলের সাথে কথা বলছিলেন। তখন ড্রইংরুমের দরজা খোলা ছিল। তিনি দরজার দিকে মুখ করে বসে ছিলেন। তখন তাঁকে বাইরে থেকে গুলি করা হয়। হাসপাতালে নিয়ে অপারেশন করেও তাঁকে বাঁচানো যায় নি। মোনেম খাঁর মৃত্যুতে মানুষ এত খুশি হয় যে, উল্লসিত জনতা হৈচৈ করে মিষ্টি কিনে-খেয়ে সব দোকান ফাঁকা করে ফেলে। ২৮ অক্টোবরের এন্ট্রিতে জানা যায়, মোনেম খাঁর লাশ কবর থেকে উঠিয়ে ফেলানো হয়। এজন্য যে, তাঁর মতো বেঈমানের লাশ এদেশের মাটিতে থাকতে দেওয়া হবে না।

একইভাবে বইটি পাক কর্তৃপক্ষ ও পাকবাহিনীর অজস্র অপকর্ম ও বিভৎসতার ছবিও ধরে রেখেছে; যেমন ২৯ এপ্রিলের এন্ট্রিতে আছে বিহারীদের বিভৎসতার বর্ণনা; ১ মে-তে আছে আহত পাকবাহিনীর চিকিৎসার জন্য সুস্থ-সবল বাঙালিদের গা থেকে জোর করে রক্ত সংগ্রহ করার ভয়ঙ্কর খবর; ১৭ মে-তে আছে বিখ্যাত ও পদস্থ ব্যক্তিদের জোর করে ধরে নিয়ে রেডিও-টিভিতে প্রোগ্রাম করানো এবং বেয়নেটের ভয় দেখিয়ে স্বাক্ষরকৃত ৫৫ জন বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীর নামে প্রকাশিত ভূয়া বিবৃতির তথ্য; ১৬ জুনে আছে পাক কর্তৃপক্ষের দ্বারা ঢাকার রাস্তার নামের মুসলমানিকরণ ও বই নিষিদ্ধের খবর; ১ জুলাইয়ে আছে গোপালপুর সুগারমিলের হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ; ২ জুলাইয়ে আছে ধর্ষণের বিভৎসতা-সম্পর্কিত বর্ণনা; ৪ সেপ্টেম্বরে আছে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে সম্মানিত ফ্লাইট লেফটন্যান্ট মতিয়ুর রহমানের বীরত্বকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ‘বিশ্বাসঘাতকের নাম মতিয়ুর রহমান’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের তথ্য। এই তালিকা অশেষ।

দীর্ঘদিন ধরে সংঘটিত ইতিহাসের বড়ো ঘটনাগুলোর বর্ণনামূলক ইতিহাস গ্রন্থ সাধারণত লেখা হয় ঘটনা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে, ঘটনার তীব্রতা থিতিয়ে এলে। তাবৎ ঘটনাকে সামনে নিয়ে আঁকা হয় তার আনুপূর্বিক রূপরেখা। বর্ণনাকারী বিভিন্ন দলিলপত্রের সহায়তায় ঘটনার আদ্যোপান্ত জেনে তার ভিত্তিতে ভাষাকে গতি দেন, বাক্য রচনা করেন। কিন্তু দিনলিপিতে ঘটমান ঘটনার সমস্তটা বিবেচনায় নিয়ে কথা বলবার সুযোগ থাকে না। দিনলিপি লেখকের কাছে তথ্য হিসেবে থাকে স্মৃতিতে সঞ্চিত নিকট অতীত এবং নতুন ঘটনাংশ বা তার একটা খণ্ড ঝলক। এই সুবাদে ঘটনার ব্যাপক বিস্তারণ সম্ভব হয়। যার উৎস হয় স্বচক্ষে দেখা, অন্যের কাছ থেকে শোনা ও গণমাধ্যমবাহিত হয়ে আসা তথ্য। এর মধ্যে বর্ণনাকারীর স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা তথ্যই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। যুদ্ধকালীন রটনামালা থাকে নানা গুজবে ভরা, গণমাধ্যমও থাকে অস্থিরতায় আক্রান্ত। এরকম পরিপ্রেক্ষিতে দিনলিপি লেখক ঘটনাকে উপলব্ধি করার সক্ষমতা ও তার কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে গ্রহণ-বর্জন চালিয়ে সত্যকে ছুঁতে পারেন ও ছুঁয়ে থাকেন। আর ভবিষ্যৎ তাদের কাছে ধরা দেয় এসবের ভিত্তিতে জন্ম নেওয়া আশঙ্কা ও স্বপ্ন হয়ে। সংগত কারণে জাহানার ইমামের বর্ণনায়ও কোথাও কোথাও শোনা কথায় ভর করে গুজব জায়গা পেয়েছে। তবে তাঁর সত্যনিষ্ঠার কারণে পরবর্তী কোনো এন্ট্রিতে আবার তার সংশোধনীও উঠে এসেছে। এই লক্ষণদৃষ্টে একাত্তরের দিনগুলিতে সন্নিবেশিত তথ্য ও তথ্যকণাকে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব তথ্যকে সূত্র হিসেবে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানোর সুযোগ এখানে অপরিসীম।
   
এ গ্রন্থ চেনায় তৎকালীন বাংলার, বিশেষ করে ঢাকার জনসমাজের ওপরে ফেলা মুক্তিযুদ্ধের বিপুলাভার একাংশ আলো-অন্ধকার। এর নানা পৃষ্ঠা থেকে ভেসে আসে ফিসফাস ধ্বনি, পাকবিরোধী গোপন প্রস্তুতি, আকস্মিক বিধ্বংসী আওয়াজ ও অস্ফুট আর্তনাদ। এই বই পাঠে ঢাকার অভিজাত এলাকার বাসিন্দা এক গেরিলা যোদ্ধা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যোদ্ধামায়ের জবানিতে পাঠক হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ে সময়ের ভাষিক উত্তাপ। এ উত্তাপে মন তাতিয়ে চিনে নেওয়া যায় নিজেকে, তুলনার গণিতে। এ যাবৎ অজস্র পাঠক এই আলোতে চিনেছেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকেও। আগামীতে চিনবেন আরো শতসহস্র জন, না-চিনে উপায় নেই বলে।

মুহাম্মদ শাকেরউল্লাহ সম্পাদিত 'ঊষালোকে'-র 'একাত্তরের দিনগুলি' সংখ্যার জন্য লিখিত

যুগপৎ পাঠকের মন ও চেতনার পড়শি

পৃথিবীর সর্বশেষ কবি
প্রথমগ্রন্থ তিন রমণীর ক্কাসিদার সূচনা কবিতা ‘প্রার্থনায় নম্র হও পাবে’র ছত্রান্তরে খোন্দকার আশরাফ হোসেন একদা ঘোষণা করেছিলেন, ‘পৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি, অহংকার আমার কবিতা’। এই উচ্চারণ তাঁর পাঠকেরা মনে রেখেছেন। কিন্তু এই উচ্চকিত ঘোষণার কথা ভুলে ইতোমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন কথিত এই খাতামুন শায়ের; রেখে গেছেন ৯টি কাব্যগ্রন্থজুড়ে তাঁর বিস্তৃত শায়েরি। তাঁকে সর্বশেষ কবি হিসেবে আমাদের মানা না-মানা কোনো জরুরি বিবেচনা নয়, কারণ এ ধরনের কথার আক্ষরিক কোনো ওজন থাকে না, আমরা জানি। তবে ওই পঙক্তিসুপ্ত ইঙ্গিতকে যদি আমরা মান্য করতে চাই, তাহলে যেসব ধারণায় উপনীত হওয়া যায়, তা হলো : ১. তাঁর আগে বাংলা ও অন্য ভাষায় কবি ছিলেন, ২. বাংলা ও অন্য ভাষায় তাঁর পূবসূরি কবিদের অবদান অনস্বীকার্য, ৩. তাঁর কবিতায় সবিশেষ তারুণ্যের স্ফূরণ ঘটেছে, ইত্যাদি।

লক্ষণীয়, নতুনভাবে উত্থান ঘটে যাঁদের, লেখায় বা বলায় তাঁদের কেউ কেউ ঢালাওভাবে পূর্বসূরি কবি ও তাঁদের কাব্য-অবদানকে অস্বীকার করেন। নিদেনপক্ষে তাঁদের সিংহভাগকে হেয় করে দেখেন এবং এই ভিত্তির ওপরে দাঁড় করাতে চান তাঁদের নিজেদের কাব্যকর্মকে। ‘কেন লিখেন’ ধরনের প্রশ্নের মুখেও কারো কারো কণ্ঠে এমন কথা ধ্বনিত হতে আমরা শুনি যে, মৃতপ্রায় কবিতাসম্ভারে নবপ্রাণ সঞ্চার করার প্রয়োজনেই তাঁরা লিখে থাকেন। এটা এক ধরনের অহংকার। নববিকশিত ও বিকাশমানদের কণ্ঠে ধ্বনিত এ ধরনের অহংভাষণকে পাঠকদের একাংশ সহজভাবে মেনে নেন। নিয়ে আশায় থাকেন নতুন সৃষ্টির। তাঁরা সবাই হতাশ করেন তা নয়। সবাই মুখ রাখতে পারেন তা-ও নয়।

এঁদের অবস্থানের থেকে নিরাপদ দূরে এক উলটোপ্রান্তরে দাঁড়িয়ে খোন্দকার আশরাফ হোসেন যা বলেছেন, সেটাও নিঃসন্দেহে অহংকারই। তবে এ অহংকারে পুরানোমাত্রকে অস্বীকার করা হয় নি, বরং সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি প্রকাশ পেয়েছে। এই প্রকাশে তাঁর কাব্যপ্রবণতারই একটি শর্তের বয়ান নিহিত রয়ে গেছে। প্রাচীন রত্নসম্ভারের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেই তিনি নিজের কবিসত্তাকে গড়ে তুলেছেন। কবিতার ঐতিহ্যপরম্পরাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। যেজন্য প্রায়ই তাঁর কণ্ঠে বেজে উঠেছেন পূর্বসূরিরা, খণ্ডে ও সর্বাংশে। একে ঘাড় কাত করে নিন্দামন্দ করবার প্রয়াস একটা কাঁচা কাজ। সাহিত্যের ইতিহাসে এই দেওয়া-নেওয়া স্বীকৃত। সেতুসম্ভব এই যাত্রাকেই মূলের সাথে সংযোগ রক্ষা করে চলা বলে ধরা হয়। যেমন সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর-এর শুরুর কবিতা ‘বেহুলা বাংলাদেশ’-এর ভেতর দিয়ে যেতে যেতে স্বরে ও সরগমে আমাদের গায়ে এসে জীবনবাবুর ‘অন্ধকার’-এর আঁচ লাগতে পারে। ‘সবুজ বিষয়ক’ কবিতার পঙক্তি ‘আমার স্বদেশে সুখ্যাতি আছে সবুজের’ স্বরেও বেজে উঠতে পারে আরেক পূর্বকবির ধ্বনি। ওই স্বরে ইনিও এখানে যেন বাংলার কিংবদন্তীর কথাই বলছেন নিজস্ব ভাষায়।

বিশ্ব কবিতার সুপরিসর শস্যপ্রান্তরে তাঁর বিচরণের একাংশ পেশাতাড়িত, একাংশ নিঃসন্দেহে নেশাতাড়িত। কবি হবেন বলে। ওই বিচরণের ছাপও তাঁর কবিতায় দুর্নিরীক্ষ্য নয়। এ কথার প্রমাণ হাজির করতে তাঁর কবিতাসংগ্রহ ঘেঁটে বিস্তর নজির হাজির করবার দরকার নেই। কারণ আমাদের উদ্দেশ্য এ প্রবণতার নিন্দা করা নয়। আমরা কেবল দেখাতে চাই যে, বাংলা কবিতার মতো বিশ্বকবিতার প্রাচুর্যময় ঐতিহ্যের প্রতিও তিনি উদ্বাহু ও সশ্রদ্ধ এবং ওই প্রাচুর্যের প্রতি এক ধরনের উত্তরাধিকারবোধও তাঁর ছিল। লক্ষ করলে আমরা দেখব, সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর বইয়ের কয়েকটি কবিতার নামকরণও কিছু সুবিখ্যাত বিশ্বকবিতার কথা মনে রেখে করা; যেমন, টি. এস. এলিয়টের ‘দি লাভ সঙ অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রুক’-এর স্মরণে তাঁর ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’, কোলরিজের ‘দি রাইম অব দা অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার’ স্মরণে তাঁর ‘বুড়ো নাবিকের প্রেমগীতি’। তিনি কবিতা লিখেছেন শেক্সপিয়ার, কীটস, জীবনানন্দ, প্রমুখকে নিয়ে। এসব তাঁর সর্বব্যাপী বিহার ও পূর্বসূরিদের প্রতি শ্রদ্ধারই প্রকাশ।

বিহারের এই আওতা তাঁর কবিতার জগৎকে দিয়েছে অসামান্য ব্যাপ্তি। সৌন্দর্যকে চিনিয়েছে গভীর থেকে, শিখিয়েছে শাসন করবার কলাকৌশল। দখলিস্বত্ব দিয়েছে বাংলা কবিতার একখণ্ড ফসলি ভূমির। বেদনার এই যে, লব্ধ ভূমির পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করে ওঠবার আগেই কর্মময় জীবনে সমাপ্তি টানতে হয়েছে বাংলা কবিতার এই সুদক্ষ চাষিকে।

তারুণ্যের সাথে আমরণ সহবাস
এ তো গেল দেশ-বিদেশের পূর্বসূরিদের কথা। সমসাময়িক ও পরবর্তী সময়ের কবিতা ও কবিদের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রটি কেমন ছিল, তাও খোঁজ নিয়ে দেখা যেতে পারে। এ খোঁজ নেবার আমাদের সহজ উপায় আছে দুটি : ১. তাঁর বিস্তৃত কাব্যসমুদ্রে জাল ফেলা, এবং ২. তারুণ্যগর্বী কবিদের সাথে তাঁর সাহিত্যিক-যোগাযোগের ধরনটি পর্যবেক্ষণ করা। প্রথমটি ক্রমপ্রকাশ্য। শিকারে নামলেই আমরা দেখব তাঁর কাব্যসমুদ্রে কেবল ঝকমক করছে তারামাছ, যা কেবল তারুণ্যকেই মানায়। ২০১৩-এর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ কুয়াশার মুশায়েরায় পাওয়া যায়, ‘মেলার হট্টগোলের মধ্যে আমি বসে বাজাই আমার এস্রাজ/ তোমার কানেই পৌঁছায় না’ কিংবা ‘আমি পাতার ঠোঙায় ঝরাফুল নিয়ে তোমার পেছনে দৌড়াই/ তুমি ততক্ষণে পেরিয়ে গিয়েছো নক্ষত্রবীথিকা’। এমন প্রেমকাতর পঙক্তি কি ৬৩ বছরের প্রৌঢ়ের মুখে মানায়, যদি না ভেতরবাড়িতে তারুণ্যের জ্বলজ্বলে আগুন থাকে? আমাদের মনে হয়, এমন পঙক্তি তখনই লিখে ওঠা যায়, যখন কবিতারাজ্যের তরুণ থেকে তরুণতর প্রতিনিধির সাম্প্রতিকতম কবিতাটিরও খোঁজ রাখা যায়; যে খোঁজ তিনি রাখতে পেরেছিলেন বলেই প্রতীয়মান হয়।

আমাদের প্রস্তাবিত দ্বিতীয় উপায়টি অবলম্বনের জন্য প্রায় কোনো পরিশ্রমই দরকার হয় না। কেবল এই তথ্যটি জানলেই চলে যে, সত্তরের কবিতার স্লোগানমুখরতা ডিঙিয়ে আশির তৎকালীন তারুণ্যস্পর্ধী নিরীক্ষাকে স্বাগত জানাতে, তরুণপ্রাণের নবতর কাব্যপ্রয়াস ও কাব্যচিন্তনকে জায়গা করে দিতে তিনি ১৯৮৫-তে ‘একবিংশ’ নামক কবিতা ও নন্দনভাবনার কাগজটি সম্পাদনা করতে লেগেছিলেন। বিংশ শতকের শেষপাদেই কোনো কাগজের নাম ‘একবিংশ’ রাখতে পারেন তো স্বপ্নময় তরুণপ্রাণই! শুরু থেকে একই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জারি রেখে কাগজটির ২৭টি সংখ্যার গৌরবদীপ্ত প্রকাশ সুসম্পন্ন করে গেছেন তিনি, যার সর্বশেষ সংখ্যাটি বেরোয় মাত্র ২০১৩-এর ফেব্রুয়ারিতে। নিজের শেষ সময়ে, তাঁর ৬৩ বছর বয়সে, প্রকাশিত সর্বশেষ সংখ্যা ‘একবিংশ’-এও পুষ্পিত হয়েছে অন্য অনেকের সঙ্গে দ্বিতীয় দশকের কবিদের কবিতা, যে বৈশিষ্ট্য সূচিত হয়েছিল কাগজটির সূচনা সংখ্যাতেই। সূচনা সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিল, “‘একবিংশ’ কেবল নতুন প্রজন্মের কবি-লেখকদের জন্য নির্দিষ্ট। যারা অপ্রতিষ্ঠিত, যৌবনাবেগে টলমল, প্রতিভাবান, উদার অভিনিবিষ্ট, শ্রমী এবং নির্ভয়, আমরা তাদের জন্য পাটাতন নির্মাণ করতে চাই। কবিতা, শুধু কবিতা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ক প্রবন্ধ, কবিতালোচনা, কাব্যগ্রন্থ ও কাব্য বিষয়কগ্রন্থ সমালোচনা প্রতি সংখ্যা একবিংশ-র সূচীতে থাকবে।”

তাঁর এই তারুণ্যঘনিষ্ঠতা এবং নিজের মধ্যে বাস করা স্পর্ধাকে তিনি সযত্নে লালন করতে পেরেছিলেন শেষ পর্যন্ত, সর্বশেষ সংখ্যা ‘একবিংশ’-এর সম্পাদকীয় থেকে কয়েক লাইন তুলে দিলেই তা বোধগম্য হবে বলে আশা করা যায় : ‘একবিংশ আবার বের হলো বেশ কিছুকাল গড়িমসি ক’রে। সম্পাদকের এর জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হওয়ার কথা, তবু ক্ষমাপ্রার্থনা তাঁর ধর্ম নয়। পাঠকরা আমাদের ভালোবাসার মানুষ, তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দরকার করে না। একবিংশ খেয়ালখুশির রঙধনু; হরেক বর্ষণের পরই রঙধনু আশা করা বৃথা।’

চাইলে আরো পড়া যেতে পারে : ‘আমাদের ঢোল নেই, তাই ক্লান্তিও নেই। ঐ যে খেয়ালখুশি, ওটা যতক্ষণ থাকবে, যতক্ষণ প্রকাশ করার, কবিতাকে সঙ্গ দেয়ার, নতুনদের সঙ্গ পাবার খুশিটা মনে ওম ছড়াবে, ততক্ষণ একবিংশ-র যাত্রা স্তব্ধ হবে না। ... একবিংশ ২৭ বের হলো একঝাঁক তরুণ কবির কবিতা নিয়ে। এই সময়কার কবিতার তরুণতম প্রতিনিধি তাঁরা। তাঁদের উচ্চারণগুলো বুকে ধরতে পেরে একবিংশ গর্বিত।’

শেষ সময় পর্যন্তও যে এই সদাতরুণ ব্যক্তিত্ব নিজের কবিতাকে সতেজ রাখতে পেরেছিলেন, এই হয়ত তার গোপন ধন্বন্তরি!  

দেশ ও মানুষের মুখের দিকে চেয়ে
এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ যে, তাঁর নন্দনভাবনাটি গড়ে উঠেছে কেবল ভাষা-শব্দ-ছন্দকে ঘিরে নয়, বরং মানুষ, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার বোধ থেকেও। এ বোধ থেকে তিনি তাঁর গোটা কবিজীবনেও চ্যুত হন নি। এই অবস্থানে থেকে ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও যখনই বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের গায়ে স্বাধীনতা ও দেশবিরোধীদের চক্রান্তের কলুষ লেগেছে, তখনই তিনি জেগে উঠে জানান দিয়েছেন যে, এ ব্যাপারে তাঁর বিশেষ স্পর্শকাতরতা রয়েছে। তাঁর কবিতায় সে বোধের প্রত্যক্ষ রূপায়ণও ঘটেছে। যেখানে তিনি রোমান্টিক হয়ে উঠেছেন, শব্দ-ছন্দের ঘোড়ায় চড়ে বেড়িয়েছেন, সেখানেও তিনি দেশেরই একজন চেনামানুষ হয়ে থেকেছেন। কবি তাঁর ভেতরে গজিয়ে ওঠা গাছপালাকে লুকাতে পারেন না। নানা আঙ্গিকে সেসবের ডালপালা উঁকি দেয় পঙক্তিতে-পঙক্তিতে, শব্দে-শব্দে এবং শব্দ ও বাক্যের ফাঁকে। ফলত, তাঁর কবিতাভুবনে ভ্রমণে বেরোলে যেকোনো ভ্রামণিক উপলব্ধি করতে পারবেন যে, আপন অনুভবের কলসি কাত করে ঢেলে দিয়েছেন তিনি তাঁর কাব্যসমুদয়ে; এবং তা অবহেলায় নয়, প্রেমে-ভালোবাসায়। দেশের বেদনায় কেঁদেছেন, উদ্বেলিত হয়েছেন, হতাশ্বাস ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু কখনোই উল্লসিত হন নি। দেশকে যখন অন্তরে ধারণ করা যায়, তখন তার প্রতি প্রেম বোঝাতে উচ্ছ্বসিত হওয়া লাগে না। সন্তানের মন্দে উদ্বিগ্ন হওয়াই যেমন তাদের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ, তেমনি স্বাভাবিক মেজাজে থেকে নন্দনচিন্তা ও নন্দনপ্রয়াসের মত্ততায়ই দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা প্রমাণিত হয়েছে। উদাহরণ-কণ্টকিত করে এ বক্তব্যের প্রমাণ হাজির করা জরুরি নয়। যেখানে তাকালেই নমুনা, সেখান আঙুল উঁচিয়ে বলার দরকার নেই যে, এদিকে বা ওদিকে তাকান। চট করে যেতে চাইলে জীবনের সমান চুমুক-এর ‘স্বাপ্নিকের মৃত্যু’, সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর-এর ‘বেহুলা বাংলাদেশ’ ও ‘কালপূর্ণিয়া’, প্রভৃতি কবিতা পড়ে দেখা যেতে পারে। তবে এখানে এটা বলাই যথার্থ হবে যে, এমনকি তাঁর বর্ষাও দেশবিরহিত কিছু নয়।

কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার মতো গৌরবের একজন ভাগিদার। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং তাঁর সতীর্থ যোদ্ধাদের বীরকাহিনির ধারাক্রম বর্ণনা করেও তিনি কিছু কবিতা লিখেছেন, যেগুলো বাংলা কবিতার অমূল্য সম্পদ। পার্থ তোমার তীব্র তীর-এর ‘বাউসী ব্রীজ ৭১’, ‘সাহেবালি যুদ্ধে গিয়েছিলো’, ‘নোটনের জন্য শোক’; জন্মবাউল-এর ‘বধ্যভূমি থেকে’ এই ধারার কবিতা। তাঁর অন্য অনেক কবিতার মতো এসব কবিতায়ও এক ধরনের গল্পময়তা আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বর্ণনার গুণে এগুলো কবিতাই। যেমন সাহেবালির বর্ণনায় কবি বলছেন ‘কার চুল চরের ঝাউয়ের মতো অন্ধকারে ওড়ে?’; নোটনের বর্ণনায় পুথিকিতাবের সৌন্দর্য মাখিয়ে লিখছেন, ‘কাশেম ফিরবে বলে দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকে মেহেন্দি সখিনা’।

যমুনাপর্ব গ্রন্থের ‘নূরজাহান’ সিলেটে পাথর ছুড়ে মারার জঘন্য ফতোয়ার শিকার কৃষককন্যা নূরজাহানকে নিয়ে লেখা কবিতাটি একটি মাইলফলক। এখানে কোনো সাংবাদিকসুলভ ট্রিটমেন্ট লভ্য নয়। বরং বিষয়বস্তুর অন্তর্গূঢ় শক্তির সাথে শব্দপ্রতীকের সুষম মিশ্রণে এখানে তিনি তৈরি করেছেন অনন্য এক স্পর্শকাতরতা। বলেছেন, ‘ঐ মেয়ে একদিন আবাবিল হবে’। প্রকৃতই নূরজাহান তা হোক বা না হোক, তাঁর এই অভিপ্রায়টি পাঠককে এক টুকরো স্বস্তি দেয়, ফতোয়াবাজদের জনপ্রত্যাশিত ভয়ানক পরিণতির প্রতি ইঙ্গিত করে।

এসব বৈশিষ্ট্য পাঠকসমাজে তাঁকে এমন এক কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যিনি মানুষ ও তাদের আপামর সুখ-দুঃখঘেঁষা।

শব্দছবির মহারাজ
খোন্দকার আশরাফ হোসেনের শব্দছবি আঁকার বাহাদুরি মনোমুগ্ধকর। প্রায়-কবিতায়ই তাঁর এত ছবি এদিক-ওদিক নানা দিক থেকে দেখা ও আঁকা যে, দেখতে দেখতে মনে হয় তিনি শব্দছবির মহারাজ। ছবির, শব্দছবির, কল্পছবির এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার যেন তাঁর কবিতা। এক জীবনে এত কল্পছবি এঁকে ওঠবার সক্ষমতা পাঠকের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। ৬৩ বছরের জীবনটার একটা বড়ো অংশ যে তিনি ব্যস্ত থেকেছেন নন্দনঘোরেই, বিষয়বাসনায় নয়, এসব দক্ষতা তা ভাবতে প্ররোচিত করে।
 
তিন রমণীর ক্কাসিদা-র ‘উন্মথিত নাভিমূলে জেগে ওঠে মেঘনার চর’ (‘দুর্বোধ্য নায়ক’), পার্থ তোমার তীব্র তীর-এর ‘পড়ে আছি রাজপথে ঈশ্বরের রুগ্ণ বীর্য’ (নুলো ভিখিরির গান); জীবনের সমান চুমুক-এর ‘কে যেন বিপুল ঠ্যাং ফাঁক করে আকাশ উঠোনে/ ছপছপ জলস্রাবে ডুবিয়ে ভাসিয়ে দিল/ প্রান্তর’ (হনন) বা ‘শুকনো বালির কুকুরছানারা এসে চুমু খাচ্ছে গোড়ালিতে’ (বেলাভূমিতে শেষবেলায়) বা ‘একসারি ভল্লুকের মতো ধীর পায়ে এগোচ্ছে কুয়াশা’ (নকটার্নগুচ্ছ ১); যমুনাপর্ব-এর ‘হুইসেল বাজাচ্ছে বাতাস, শালাকো পাকাড় লো--/ দৌড়ুচ্ছে বেদম ঝরাপাতা, প্রেমপত্র ঠোঙার শহর’ (চাদরের স্বৈরাচার); জন্মবাউল-এর ‘সবুজ গদ্যের বিরামচিহ্নের মতো/ জেগে আছে খোড়ো বাস্তুকলা’ (জীবনানন্দের চিল) বা ‘সকাল যখন পুচ্ছ নাচাতে নাচাতে যায় ইশকুলে’ (নীল সোয়েটার)-- আমাদের বিশেষভাবে চমকিত করে। ভাষাকে, ঘটনাকে, ঘটনার বর্ণনাকে কবিতা করে তুলবার এই সুপরিচিত কৌশলটি তিনি বেশ দক্ষতার সাথে রপ্ত করে উঠেছিলেন।

কোনো কোনো শব্দছবি তাঁর এতই ভালোলাগা ও নিজস্ব যে, ঘুরেফিরে এসেছে তাঁর কবিতা থেকে কবিতায়, বই থেকে বইয়ে; যেমন তিনি যে ‘তারাদের হল্কায়ে জেকের’ শুনেন সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর-এর ‘তাসের খেলা’য়, তাই আবার শোনেন ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’তে। আবার ওই ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’তে যেমন দেখেন ‘শূন্য/ রাজপথে ফিগার স্কেটিং করে বাদামের খোসা’, তেমনি ‘কবিতা কোলাজ’-এর ‘অদ্ভুত’জুড়েও দেখতে পান ‘প্রান্তরের এপার থেকে ওপারে/ ফিগার-স্কেটিং করছে মেঘ’। হলকায়ে জেকেরের প্রসঙ্গ উঠে আসতে দেখি অন্য গ্রন্থগুলোতেও। যমুনাপর্ব-এ পাই : ‘আলখাল্লায় আবৃত বুজুর্গরা/ ঝিমায় আর অস্ফুট হলকায়ে জেকের গায়’ (হরতাল ৯৬); জন্মবাউল-এ পাই, ‘হলকায়ে জেকের গেয়ে ভরে তোলে কোর্টের প্রাঙ্গণ’ (শেক্সপিয়ারের দস্তানা)। এদিকে একই আলখাল্লাকে তিনি কত ঢঙে কত বিচিত্রভাবেই না ব্যবহার করেছেন তাঁর কবিতায়! জীবনের সমান চুমুক-এ পাই, ‘মানুষকে কেউ ধারণ করতে পারে না/ না নিসর্গ না ঈশ্বরের দিগন্ত-প্রসারী আলখাল্লা/ না নদী না জন্মভূমি’ (মানুষ) বা ‘কেবল তারার উঠোনে/ জমা হচ্ছে দীর্ঘ আলখাল্লা-পরা অন্ধকার, শ্মশ্রুময় পুরুষেরা/ একাকার’ (নকটার্নগুচ্ছ ১)। এই শব্দছবির মহারাজের হাতে কবিতামাত্র রঙচঙে ও বর্ণিল হয়ে উঠেছে, তা যখন তিনি দেশের জন্য কেজো কবিতা লিখেছেন তখনো।

নারী নয়, রমণীখচিত
এটা এক অদ্ভুত আবিষ্কার যে, ‘নারী’ খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতায় ব্যাপকভাবে উপস্থিত; তবে তা যতটা ‘নারী’রূপে হাজির, তার চেয়ে কম নয় ‘রমণী’ভঙ্গিতেও। অর্থাৎ তাঁর কবিতাবিশ্ব রমণীখচিত। কেন এমন? আমরা বলতে পারি না। ‘রমণী’ না থেকে যদি ‘নারী’ই উপস্থিত থাকতেন বেশি, তা-ও প্রশ্ন করা যেত, কেন এমন? তার জবাবও হতো হয়ত এই যে, আমরা জানি না। তবে ‘রমণী’স্থলে ‘নারী’ হলে আমরা যেভাবে খুশি হতে পারতাম, ‘নারী’স্থলে ‘রমণী’ থাকায় আমরা সেভাবে খানিক অখুশি। কারণ শব্দগতভাবে ‘রমণী’ ‘নারী’র যে রূপ হাজির করে, তা রমণঘনিষ্ঠ, ভোগলগ্ন। নারীর প্রকৃত মাহাত্ম্য তার রমণগুণে স্পষ্ট হয় না, হয় নারীত্বগুণে। আমরা দেখি, তিন রমণীর ক্কাসিদার ‘এলিয়েন’ কবিতায় তিনি ‘রমণী’র আমাদের জানা সংজ্ঞাই লিখেছেন, ‘রমণযোগ্যা বলে রমণী যার নাম’। তবু তাঁর কবিতা থেকে কবিতায় রমণীর সসন্দেহ উপস্থিতি : ‘দেখেছি রমণীকুল শুভ্রবেশ, করতলে জন্মান্তর-পথ/ বুক জুড়ে ধাপাল সন্তান নয়, সদ্য কেনা শাড়ির মোড়ক/ মধ্যরাত যেই নারী খুলে দেয় কারো কাছে অজানা সড়ক/ দিবাভাগে তার মুখে কি সলজ্জ পবিত্র শপথ!’ (‘সুখ তুমি সঙ্গে যাবে’, তিন রমণীর ক্কাসিদা)। পার্থ তোমার তীব্র তীর-এর ‘ফেব্রুয়ারিতে জনৈক বাগান মালিক’ কবিতায় পাই ‘আমাদের রমণীরা কোনো কালে ধর্ষিতা হয়েছে কিনা/ তাদের ভ্রূভঙ্গি দেখে হাসির ফোয়ারা দেখে/ ভুলেও পড়ে না মনে’। কেন তিনি আশা করেন যে, জীবনের সমস্ত আনন্দ-হাসি বিসর্জন দিয়ে ধর্ষিতা তার ধর্ষণের লক্ষণকে সারাজীবন কপালে ধারণ করেই ফিরবেন? করেন কারণ তিনি ভাবেন ধর্ষণকে উদযাপন করাও সম্ভব! ‘কেননা মৃত্যু আর ধর্ষণ/ ঠেকাতে না পারা গেলে উদযাপনই ভালো’ (‘আগন্তুক’, যমুনাপর্ব)। পাঠক হিসেবে আমরা বেশ আহতই হই, তাঁর এমন নারীচিত্রণে।

তবে হ্যাঁ, চোখ রাখলে দেখা যায় তাঁর রমণীরা ক্রমশ নারী হয়ে উঠেছে পরের কবিতাগুলোয়। কিন্তু তবু, অক্ষরবৃত্তে তিনমাত্রার যে চাহিদা তাঁর থেকে গিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন কখনো কখনো রমণীর নিকট-আমেজেরই জন্ম দিয়েছে; যেমন যমুনাপর্ব-এর ‘ওড টু জনাব কীটস’-এ তিনি বলছেন, ‘বিয়োবার দেরি নেই যে-সুন্দরীর’। এখানে তিনি প্রসবের কলোক্যুয়াল ‘বিয়ানো’ দিয়ে প্রসবঘটনাকে তাচ্ছিল্য করার পাশাপাশি নারীকে রমণী নয়, একেবারে সুন্দরীতে নিয়ে ঠেকিয়েছেন! এটা ঠিক যে সুন্দরী নারীরাও প্রসব করেন। তবে আমরা কী করে ভুলে যাব যে, প্রসবঘটনা এমন ঘটনা যেখানে সুন্দরী বা অসুন্দরী হওয়া কোনো আলাদা গুরুত্ব বহন করে না?

লোকায়ত বাগভঙ্গিতে ছন্দচিচিত্রা
খোন্দকার আশরাফ হোসেন আমূল বাঙালি কবি। বাংলাকে তাঁর কবিতায় নিবিড়ভাবে পাওয়া যায়। লোকমানসের অন্তরস্পর্শ করবার মতো বিষয় ও ভাষা তাঁর মধ্যে বরাবরই কম-বেশি লক্ষণীয় হলেও সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর থেকে পরের কয়েকটি গ্রন্থে লোকায়ত বাগভঙ্গিটা তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। পাশাপাশি এ সময় থেকে তাঁর মধ্যে সুফি দর্শনের সরল-গভীর রূপটিও জায়গা করে নেয়।
 
তিন রমণীর ক্কাসিদা-র ‘চতুষ্পদ দর্শন’, সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর-এর ‘বৌমাছ’, ‘যাত্রা’, ‘ধানরমণী’, যমুনাপর্ব-এর ‘কৈবর্ত্যপুরাণ’সহ অনেকানেক কবিতায় বাংলার মাঠঘাটের বিশ্বস্ত ছবি, বাঙালিয়ানার সুবাস মাখিয়ে রেখেছেন তিনি। গ্রিক ও সেমেটিক পুরাণের পাশাপাশি বাংলার লোকপুরাণেরও ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায় তাঁর কবিতায়। বাংলার লৌকিক পুরাণের অনেক চরিত্র তাঁর কবিতায় স্বরূপে হাজির হয়েছে। যমুনাপর্ব-এর ‘বাসন্তীকথা’, জন্মবাউল-এর ‘সদানন্দের পদাবলী’তে পদাবলীর ঢঙে আধুনিক চিন্তাচেতনতাকে স্থাপন করে তিনি উত্তরাধুনিক সময় যাপনের ছবি এঁকেও কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। পয়ারের বিভিন্ন দোলা সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে এসব কবিতায়।

তিনি প্রধানত বিচিত্রমাত্রিক অক্ষরবৃত্তেই তাঁর কাব্যালাপ সেরেছেন। তবে অন্যান্য ছন্দে লেখা কবিতাও তাঁর ভাণ্ডারে লভ্য। মাঝে মাঝে স্বরবৃত্তের ঘোড়ায় চড়েও পরিকল্পিত ভ্রমণ সেরেছেন তিনি। যেমন পার্থ তোমার তীব্র তীর-এর ‘আত্মপক্ষ’, ‘পরকীয়া দুয়ার খোলো’, জীবনের সমান চুমুক-এর ‘ঝাপুই খেলা’, অংশত ‘শ্রাবণযাপন’ সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর-এর ‘ঘৃণার ঘুঙুর’, অংশত ‘চিকিৎসা’, ‘কবিতা কোলাজ’-এর ‘পদাবলী’পথে যেতে আমরা নেচে উঠি, নাচতে নাচতে ফের থামি আত্মতুষ্ট হয়ে। মাত্রাবৃত্তের চমৎকার দোলাও তৈরি করেছেন পার্থ তোমার তীব্র তীর-এর ‘নীল সাবানের প্রেম’, জীবনের সমান চুমুক-এর ‘কসাই’, সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর-এর ‘বুড়ো নাবিকের প্রেমগীতি’ প্রভৃতি কবিতায়। কারো কারো কাছে তাঁর এমন ছন্দবিচিত্রাও মনোযোগ দিয়ে কাছ থেকে দেখবার জিনিস বলে মনে হতে পারে।

উপসংহার নয়, যাত্রার শুরু
কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের জীবন ফুরিয়েছে, শুরু হয়েছে তাঁর কবিতার জীবন। কর্মীষ্ঠ মানুষের, তথা শিল্পী-কবি-সাহিত্যিক-বিজ্ঞানীর জীবন কেবল তাঁদের দৈহিক জীবনলগ্ন নয়, কর্মলগ্নও। ফলে তাঁরা চলে গেলেও তাঁরা যে কর্ম রেখে যান, তা যদি মানুষের মধ্যে বাঁচে, তবে তার মাধ্যমে তাঁরা নিজেরাও বেঁচে থাকেন।

আমরা নিশ্চিত করতে পারি না যে, খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কাব্যকর্ম পাঠকের মধ্যে বেঁচে থাকবেই। এসব ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। পাঠকের বিবেচনাই এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখে যদিও, তবে তার প্রেক্ষাপটে কাজ করে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত। প্রতিকূল প্রেক্ষিতের কারণে যেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী-কবিও সাময়িকভাবে বিস্মৃত হয়ে যেতে পারেন, তেমনি আবার অনুকূল প্রেক্ষিতে দীর্ঘ বিস্মৃতির পরও কেউ কেউ নতুন করে ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে শুরু করতে পারেন। আমরা এর সম্ভাব্যতাকে কিছুটা বাজিয়ে দেখতে পারি মাত্র, যদিও তাঁর এক সম্পন্ন ধমক সয়ে, যে, ‘আমাকে বুঝতে চাও এ সাহস কবে থেকে হলো?’ (‘দুর্বোধ্য নায়ক’, তিন রমণীর ক্কাসিদা)!

আমাদের উপলব্ধি এমন যে, যেসব কবিতা কোনো আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক উদ্দেশ্যতাড়িত নয়, যেসব কবিতা মানুষের নীরবতাকে, একাকিত্বকে, যাপনবিস্ময়কে শব্দ ও ধ্বনিরূপ দেয় মাত্র, তাদের কাছে পাঠকেরা উদ্দেশ্যহীনভাবে যায়। গিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবেই মগ্ন হয়ে থাকে। কিন্তু যেসব কবিতা উদ্দেশ্যতাড়িতভাবে লিখিত হয়, সেসবের কাছে উপলক্ষ নিয়ে যেতে হয়, পাঠকেরা সেভাবেই যান। খোন্দকার আশরাফ হোসেনে সমানভাবে দু’রকম কবিতাই লভ্য, কোনোটাই কম বা বেশি নয়।

যেসব কবিতার কাছে যেতে প্রয়োজনতাড়িত হওয়া লাগে, গিয়ে প্রয়োজন মিটলে সটকে পড়তে হয়। আবার প্রয়োজন অনুভূত হবার আগে আর ও-মুখো হওয়া যেখানে হয়ে ওঠে না, সে ধরনের কবিতা একইসঙ্গে অমূল্য ও মূল্যহীন। যুতসই প্রয়োজনে লাগে এমন বস্তুরাজির ওপর সমাজ অপরিসীম মূল্য আরোপ করে থাকে। বৈষয়িক সমাজ বিষয়ভাবনার বাইরে আর সবকিছুকে অর্থহীন গণ্য করে, ফেলনা ভাবে; এবং তার সমুদয় পক্ষপাত জারি রাখে প্রয়োজনীয় বস্তুর প্রতি। এভাবে কেজো লেখাগুলো অমূল্য হয়ে যায়। আবার জৈবনিক প্রয়োজনে বিষয়ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকা মানুষ মাঝে মাঝে অবৈষয়িক হয়ে উঠতে চায়। মানুষমাত্রের মধ্যেই কমবেশি এ চাওয়া থাকে। যাদের মধ্যে বেশিমাত্রায় থাকে, তাদের মধ্যে যাঁরা কবিতালগ্ন, কবিতাপ্রেমিক, তাঁরা তাঁদের অবৈষয়িকতাকে মহিমান্বিত করা যায় এমন ধারার কবিতা খুঁজে ফেরেন। এ অনুসন্ধানক্রিয়া কখনোই এ ধরনের কবিতার কাছে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে না। কাজেই তাঁদের কাছে এ ধারার কবিতা একেবারেই মূল্যহীন। সে অনুযায়ী এ ধরনের পাঠকের তাঁর কেজো কবিতার কাছে যাবার কথা নয়। কিন্তু যেহেতু তিনি এ ধারার পাঠকের উপযোগী কেবল শব্দে-ছন্দে ঘোরাচ্ছন্ন কবিতার চর্চাও করেছেন, অর্থাৎ তাঁর ভাণ্ডারে যেহেতু এদের প্রসাদও লভ্য, কাজেই ধারণা করা যায়, খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতা, আখেরে, দুই মেরুর মানুষেরই যাতায়াতবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ আমাদের বিবেচনায়, পাঠক পরিসরে তাঁর টিকে থাকার সম্ভাবনা, প্রকটতর।

যাই হোক, কোনোরূপ ভালোমন্দের উদাহরণ হিসেবে নয়, কোনো পাদটীকা যুক্ত না-করেই, এমনি এমনি, তাঁর ছোট্ট একটি কবিতা পড়ে আমরা আমাদের এ কিস্তির কথাবার্তা শেষ করতে চাই। ‘ভূয়োদর্শন’ নামের এই কবিতাটি তাঁর জন্মবাউল বই থেকে নেয়া :

দুঃখ হলো এক গিটার যে বাদকের আঙুল কেটে
নিজের তারের ধার পরীক্ষা করে;
সুখ এমন বাড়িঅলা, ঘর খালি নেই তবু টু লেট
নামায় না; দুঃসময় এমন বিরাট গেট
যার ভেতর দিয়ে দেখা যায় বন্ধুর আসল মুখ;
আর প্রেম হলো এমন বালিশ, মাঝেমধ্যে
যাকে খাওয়াতে হয় রোদের আদর, না হলে
দুর্গন্ধ ছোটে; আর বিরহ একটি ফেলে-যাওয়া সুটকেস
যার চাবি চলে গেছে মালিকের সাথে, ডুপ্লিকেট নেই।

বৌ হলো আপনার পুরনো অ্যাকাউন্ট, প্রতিবার
টাকা উঠাতে ঝামেলা হয়, কেননা স্বাক্ষর মেলে না; আর
আপনার সন্তানেরা? আপনার কবরের দূরত্বমাপক :
এমন পথিকের পায়ের ছাপ যাকে বাঘে নিয়ে গেছে॥

রচনাকাল : অক্টোবর ২০১৩।  সরকার আশরাফ সম্পাদিত 'নিসর্গ'-এর খোন্দকার আশরাফ হোসেন সংখ্যায় ফেব্রুয়ারি ২০১৪-এ প্রকাশিত।

Friday, January 10, 2014

মাহবুব কবিরের কবিতার দিকে তাকিয়ে

বিবিধ দূষণ, আচরণের ক্রূরতা-বক্রতা, নিকটজনের তীর্যক বাক্যবাণ, পারস্পরিক অবিশ্বস্ততা, সন্দেহ, প্রভৃতি যখন দারুণভাবে ক্লান্ত-শ্রান্ত করে তুলছে, যখন শ্বাসকষ্ট গেড়ে বসছে ফুসফুসে-মনে, বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই যখন খুঁজছি গ্রামকে হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে-দেয়া-যায় ধরনের ছোট শহরের আবডাল, তখন অন্তর্গত প্ররোচনাবশত আরো একবার মাহবুব কবিরের কবিতার শুশ্রূষা নিতে গিয়ে শৈশব-কৈশোরকে স্পর্শ করতে পারার আনন্দে যেন নতুনভাবে বেঁচে উঠছিলাম আমি। জানি, ওটি দুধের স্বাদ নিছক ঘোলে মেটানো। তথাপি কবিতার এ মনোসামাজিক গুরুত্বকে নিজের মতো করে উপলব্ধিতে আনতে পেরে ভিতরোৎসারিত অন্যরকম এক আহ্লাদবোধে তাড়িত হচ্ছিলাম। সেটি বছর দশেক আগের কথা, যখন আমি এই ঘোরে সমর্পিত হই। তৎকালে ঘোরটিকে আবিষ্কারের একটা ইচ্ছেও জাগে মনে। এরকম সদিচ্ছা থেকে কৈ ও মেঘের কবিতাসমৃদ্ধ আমার ভাণ্ড পূর্ণ করে তুলি কবিবন্ধু অলকা নন্দিতার সংগ্রহ থেকে ধূলির বল্কল ধার করে এনে। তখনকার ভালোমন্দ লাগাগুলোর দুয়েকটা সূত্রকথার ভার কী-বোর্ডে আঘাতও করেছিল। কিন্তু মাত্র ওই পর্যন্তই। আর এগোনো যায় নি। সাহিত্যদর্শনজাত একটি বৈপরীত্য আমাকে হঠাৎই শাসাতে লাগে। ফলে ঘোরটি ভিন্নদিকে মোড় নিয়ে নেয়। ব্যস্ত হয়ে পড়ি অন্য হাজারো কাজে।

ব্যাপার এমন হয় যে, মাহবুব কবিরকে আমরা কম দেখতে থাকি, এমনকি ওর কবিতাকেও। কবিতার জন্যে ওত পেতে থাকা ওর স্বভাবেও খানিক পরিবর্তন আসে। একা হলেই জীবন ওকে বেশ ধমকাতে শুরু করে। এই ধমকের ভয়েই ও সংসারী হবার দিকে তাকায়। আর সম্ভাব্য প্রয়োজনে ওকে গলা বাড়িয়ে দিতে হয় পরাধীনতার যূপকাষ্ঠে। সাপ যেমন মাথার মণিকে নিরাপদ স্থানে রেখে খাদ্যাহরণে যায়, তেমনি মাহবুবও কবিতার ঘোরকে ব্যাগে অথবা অন্য কোথাও রেখে পত্রিকা অফিসে যাতায়াত শুরু করে। স্বর্ণালী পর্বটি ওর সমাপ্ত হয়ে যায়।

২.
২০০৫-এ আমাকে হাওর বিষয়ে একটি ধারণাপত্র তৈরি করবার দায়িত্ব নিতে হয়। এ-বিষয়ক সংশ্লিষ্ট, আধাসংশ্লিষ্ট, ঊনসংশ্লিষ্ট সব সেকেন্ডারি ইনফরমেশনের এক বিশাল ভাণ্ডের নিচে আমি প্রায় চাপা পড়ে যাই। প্রায় তিন মাস সময় নিয়ে ওই স্তূপ থেকে বেরোতে বেরোতে দেখতে পাই যে আমার পরিকল্পিত ধারণাপত্রটি একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থে রূপ পরিগ্রহ করেছে। যেটি ওই বছরই ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইইডি) একটি গ্রন্থমর্যাদায় হাওর : জলে ভাসা জনপদ নামে প্রকাশ করে। তো, ওটি লিখবার সময় বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতিতে হাওর কীভাবে উপস্থিত তা খুঁজে দেখবারও একটা চেষ্টা চালাই। এজন্য প্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট গ্রন্থগুলোর সঙ্গে আমি আমূল ময়মনসিংহ গীতিকাও চষে ফেলি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে হাওরের ছেলে মাহবুব কবিরের কবিতার দিকে তাকাবার কথা তখন আমার একেবারেই মনে পড়ে নি। ওর ‘হিজল-জন্ম’ কবিতায় হাওরকে যে নিবিড়ভাবে আবিষ্কার করা আছে, সেটি তখন স্মরণ করতে না-পারার আমার যে অক্ষমতা, তা গ্রন্থটির প্রকাশপরবর্তীকালে আমার জন্য দারুণভাবে পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে। অনেক সজ্জন পাঠক বাংলাভাষায় হাওর বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ও সফল গ্রন্থ হিসেবে ওই পাঁচ ফর্মা পরিসরের প্রকাশনাটিকে গুরুত্ব দিলেও ‘হিজল-জন্ম’-এর পুনর্পাঠে আমি তুলনা করে দেখেছি যে, মাহবুব কবিরের ওই ৯৫ শব্দের কবিতাটি আমার ২৫ হাজার শব্দের গ্রন্থটির চেয়েও সফল। হায় সক্ষমতা!

৩.
যন্ত্রকঠিন নিষ্ঠুরতার অকুস্থল এ চোখধাঁধানো আপাতউজ্জ্বল নগর বারবারই মনে করিয়ে দেয় যে, এ স্থান অন্তত আমার জন্য নয়, যার মনোমূল ছড়িয়ে রয়েছে গ্রামদেশে। প্রতিদিনই তাই ভালোবাসার পাল্লাটা হেলে যাচ্ছে পিছে ফেলে আসা গ্রামসীমানার দিকে। সুখজাগানিয়া স্মৃতিবোধ মুচড়ে উঠছে তার মাঠ-মধ্যিখানে থাকা পক্ষীকূজনিত একলাএকা গাছকে নিয়ে, ঘাসকার্পেটে মোড়িত মাছরাঙারঙিন পুকুরপাড়কে নিয়ে, শাপলাসুন্দর বিলহাওরের অনিন্দ্যসুন্দর ইশারাকে নিয়ে, খলবল লাফিয়ে ওঠা ছোট-বড়ো মোলা-ডানকিনে মাছকে নিয়ে, ধুলোওড়া দিনের খেজুরগাছের সীমানা আঁকা উলুঝুলু কাঁচারাস্তাকে নিয়ে, কুয়াশাজর্জর রাত্রি-লেপে-দেয়া অন্ধকারে অস্তিত্বময় লণ্ঠনের আলোয় দেখা পালাগানের নায়িকাকে নিয়ে। এই সবকিছু এবং এর বোনবেরাদর সহযোগে গড়ে ওঠা গ্রামসংস্কৃতির যে বিস্তৃত পাঠশালা, তার অনেক টুলবেঞ্চিপাঁচিলধারাপাতই খুঁজে পাওয়া যায় মাহবুব কবিরের কবিতায়। এ মন্তব্যের বিশ্বস্ত সাক্ষ্য বহন করে ওর ফৃ প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ কৈ ও মেঘের কবিতা। গ্রন্থটি বাংলা কবিতার বিচিত্রলক্ষ্যী বহুস্বরব্যঞ্জিতঘোরকালসীমানায় একটি ঘাড়-কাত-করা হিজলগাছের মতো হাওরদেশের আলোহাওয়াজল গায়ে মেখে ধ্যানস্থ নিতান্ত সহজ-সরল এক নালায়েক মেধাবী তরুণের চকিত উত্থানের বিন্দুবিসর্গ অঙ্গে ধারণ করে মহীয়ান হয়ে আছে।

৪.
একজন পাঠক কবিতার কাছে যান কীসের অন্বেষণে? মাহবুব কবিরের কবিতায় যা সহজলভ্য সেসবের অন্বেষণেই কি? এর উত্তরে বলা যায়, হ্যাঁ সেসবও, তবে অবশ্যই সেসবই নয়। আরো অনেক কিছুই কবিতার কাছে প্রত্যাশার থাকতে পারে, থাকেও। আমরা যখন অন্যভাষায় রচিত কবিতা পড়ি, পড়তে যাই, তখন তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকে একরকম, আর যখন বাংলাভাষায় রচিত কবিতা পড়ি তখন আরেকরকম। কোনো কবিতা যে-ভাষায় রচিত সে-ভাষাসংস্কৃতির একটি আন্তর্স্বর সে কবিতায় থাকাই সংগত। মাহবুব বাংলায় লিখে থাকে, ওর কাছে আমাদের প্রত্যাশা কাজেই বঙ্গভূমির-বঙ্গবাসীর আনন্দবেদনাউন্মাদনার ভাষিক অভিঘাত। আমাদের সে প্রত্যাশা মাহবুব পূরণ করে অনেকাংশে। যে ধন ওর কবিতামালার আনাচেকানাচে গচ্ছিত সে ধন বাংলা কবিতার চিরকেলে মৌলসম্পদ। বহমান বাঙালি সংস্কৃতির এ রূপগুণরেখাবলির ছাপ আমরা বাংলা কবিতার কাছে অবশ্যই প্রত্যাশা করি।
কিন্তু কোনো কবিতার সর্বস্ব যদি হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার বিশ্বস্ত ফটোগ্রাফ, তখন কি সে কবিতার প্রতি আমরা একটু সন্দেহের চোখে তাকাই না? মুখটাকে আলগোছে একটু এদিক-সেদিক বাঁকাই না? সে-জাতের কবিতার প্রতি আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারি না, যা বস্তুত প্রদর্শন করে ক্যামেরার শৈলীচারিতা। পারি না, কারণ কবিতার কাছে আমরা যাই ক্যামেরার পারদর্শিতা দেখতে নয়। দেখতে যাই ফটোগ্রাফকে ছাড়িয়ে সৃজিত এমন এক পুঞ্জীভূত রূপ, যা কল্পনারঙিন অন্তরাকাশের শাদাকালো মেঘাবরণীমোড়িত, যা চিন্তনের ওইপারে চরের মতো জেগে ওঠা আবেগের ধ্রুপদী বদ্বীপ; যেই অভীপ্সারাশি পাঠককে দেয় নেচে ওঠবার মন্ত্রণা, সাঁতারস্বস্তিপ্রদ মৃদুকম্প জলের অনুকম্পা, নস্টালজিক ঝিনুক কুড়োবার তাৎকালিক ফুরসত। এসব লক্ষণসম্পৃক্ত প্রশ্নের সদুত্তরও যদি মাহবুবের কবিতা করুণা করতে সক্ষম হয়, তবে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারব যে, ঈদৃশ মাহবুব কবিরীয় স্বরন্যাস বাংলা কবিতায় খুব প্রয়োজনীয় কিছু করতে উপগত। আশার কথা কৈ ও মেঘের কবিতার পাতা উলটে আমরা সে দাবির সপক্ষে দাঁড়াতে-পারে-ধরনের তথ্যউপাত্তকে সগৌরবে সমুপস্থিত দেখতে পাই।

৫.
আমরা যারা কবি মাহবুব কবিরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি-জানি, ওর কবিতা পড়ে মনে হয় মাহবুব কবিরের পক্ষে এরকম কবিতা লেখাই সম্ভব। মগ্নতার যে পর্যায়ে থাকলে একজন মানুষের কোনো শত্রু উৎপাদিত হয় না (যদি অবশ্য হাঁটাচলার পথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হবার ব্যাপারটাকে শত্রু উৎপাদনের কারণ ভাবা না-হয়), একান্তে প্রেম নিবেদন করবার মতো সুযোগও বর্তমান থাকে না কোনো কবিমুগ্ধ তরুণীর, ধ্যান ভেঙে যাবে ভেবে হাত ধরে সাঁকো পার করে দেবার তাড়না বোধ করে না কোনো সঙ্গীপথিক; মাহবুব কবির বলতে গেলে ততখানিই নিমগ্ন। এই মগ্নতা যদি কারো নিজের মধ্যে কেবল নিজেকে নিয়ে হয়, তবে তার সৃষ্টিতে কখনো বেজে উঠতে পারে না পৃথিবী নামক গ্রহে বিরাজিত আপামর জীবনের নিগূঢ় যাপনধ্বনি, যা একদিন মহাকালিক ব্যঞ্জনা লাভে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। যেহেতু মাহবুবের কবিতায় নড়েচড়ে ওঠে বৃহৎঅর্থে বিচিত্ররূপী জীবনেরই খলবলতা, কাজেই গজকাঠি ফেলতে হয় ভিন্ন বিবেচনায়, যে, এ মগ্নতা প্রকৃতঅর্থে নিজের মধ্যে হলেও নিজেকে নিয়ে মন্ময় নয়, বরং বিস্তৃত প্রাণিকুলের সমূহতা নিয়ে তন্ময়।

আমরা জানি, কোনো কোলাহলেই প্রায় ওকে পাওয়া যায় না মধ্যমণিরূপে। স্বার্থদ্বন্দ্বে নিমজ্জিত সাহিত্য-রাজনীতির যে দুর্গন্ধ-কলুষতা প্রতপ্ত সাহিত্যপাড়ার ধুম্রোদ্গারী বিবর্ণ আকাশে দমবন্ধকর ল্যাংমারাখোঁচাখুচিনিন্দার অক্সাইড ছড়িয়ে যাচ্ছে শতকে-শতকে ও দশকে-দশকে, তার থেকে যোজন-যোজন দূরের সরু আলপথ দিয়ে ও পথ হাঁটে। মিডিয়াবাজির মতো নিন্দার্হ বায়ুযানভ্রমণে ও বরাবর অনুৎসাহী এবং অতৎপর। এহেন একজন ভাবুক কবিকে খুঁজেখেটে ওর কবিতার কাছাকাছি থেকে ভালোবেসে যাওয়া ছাড়া উৎকৃষ্ট কর্মটি আর হয় না বলেই মনে করি। যদিও আমরা কেবল ততক্ষণই এটি করে যেতে পারব, যতক্ষণ আমাদের কাছে ওর কবিতাকে প্রয়োজনীয় মনে হবে কোনোরূপ বাহ্য প্ররোচনাহীনভাবে এবং যতদিন স্বস্ব যোগ্যতায় ওর গ্রন্থসমূহ আমাদের সংগ্রহে অচর্চার ধূলিমলিনতামুক্ত থাকতে পারবে। 

৬.
১৯৯৬ সালে ওর প্রথম গ্রন্থ কৈ ও মেঘের কবিতা প্রকাশিত হলে পরে যে মুগ্ধবিস্ময় ঝরে পড়েছিল পাঠকের চোখ-মুখ-চিত্ত থেকে, ১৯৯৭-এ প্রকাশিত ওর দ্বিতীয় গ্রন্থ ধূলির বল্কল তার কোনো ক্ষতিবৃদ্ধিই ঘটাতে পারে নি বস্তুত। কারণ তিনটি কবিতা বাদে আনুপূর্বিক কৈ ও মেঘের কবিতাকলাপই ধূলির বল্কল-এ ধৃত হয়ে নিজস্ব রূপ-চেহারাসমেত আসন গ্রহণ করেছে সামনের সারিতে। পেছনের সারিতে বসা নগরের অনেকটাই নষ্টচতুরতাজ্ঞানমিশ্রিত কবিতাসমূহ যেন জরাগ্রস্ত বৈকল্য নিয়ে পিটপিট করে তাকিয়ে জানান দিচ্ছে যে, আছি বলেই এটা আমাদের একরকম থাকা, না-থেকেও-থাকা বা থাকার মতো থাকাটা আমাদের চরিত্রধাতে নেই। এ কবিতারাজিতেও কৈ ও মেঘের কবিতার মাহবুব কবির বর্তমান, তবে ওর সঙ্গে আছে সেই চতুরতা, সেই নাগরিকতা, চিন্তার সেই সঙ্করতা, যা অনেক কিছুর ব্যানারে হাতে ধরিয়ে দেয় শেষপর্যন্ত ফাঁকির হাওয়াই মিঠাই।

এখানে মাহবুব কবির বউকে মা ডাকার পক্ষে অ্যাডভোকেসি করেছে। বুঝি না, জনসাধারণ্যে কবিতা করে এটা বলা দরকার কেন? কবিতায় বিষয়টা নতুন সন্দেহ নেই। কিন্তু বউকে মা কিংবা স্বামীকে বাবা বললে সমাজপ্রতিষ্ঠান আরোপিত বিবাহসম্পর্কের নেতিশৃঙ্খল থেকে মানুষ নামের জীবেদের উত্তীর্ণ হবার পক্ষে কী এমন বিপ্লব সাধিত হবে তা আপাতত বোধগম্য নয়, যেটির উদ্বোধন মাহবুব ওর ‘মা বাবা’ নামক কবিতায় ঘটিয়েছে। যার কাজ কৌতুক করা, সে করলে তা সবার কাছেই স্বাভাবিক বোধ হয়, কিন্তু আমরা যতটা বুঝি, তাতে মাহবুব কবিরকে মোটেই কৌতুক করবার মতো হালকা স্বভাবের মানুষ মনে হয় না। ওর এ প্রতিপাদ্যে এজন্য আমরা খানিক চমকেই উঠি বস্তুত।

৭. 
এই লেখাটুকু বেশ কয়েক বছর আগে মাহবুব কবিরের কবিতা নিয়ে লিখিত আমার একটি দীর্ঘ মুসাবিদার অংশ। সে সময়কার সমস্ত বিবেচনার সঙ্গে হাতে হাত রেখে এখন আর এগোনো যাচ্ছে না। সুতরাং লেখাটা কিছুটা ঝেড়েমুছে নিতে হলো। সেটা মাহবুবের কবিতা এতদিনে খানিকটা বদলে গেছে বলে যতটা, তার চেয়ে বেশি আমার বিবেচনাবোধের বদলে যাওয়ার কারণে। শেষপর্যন্ত যা থাকল, তা কবি মাহবুব কবিরের কবিতাবিষয়ক নোট হিসেবে রীতিমতো অসম্পূর্ণ। এই সেই কারণ, যেজন্য দমবন্ধকর ব্যস্ততার মধ্যেও আরো দু’কলম খুচরো আঁকিবুকির চেষ্টা।

আমরা অবগত যে, ইতোমধ্যে ধূলির বল্কল-এর গ্রন্থমর্যাদা কবি-কর্তৃক প্রত্যাহৃত হওয়া ছাড়াও কৈ ও মেঘের কবিতার পুনর্মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে। ২০০৯ ও ২০১২-এ বেরিয়েছে যথাক্রমে ওর আরো দুটো কাব্যগ্রন্থ ফুলচাষি মালি যাই বলো এবং বেসরকারি কবিতা। বই দুটি এতদিন পর্যন্ত মাহবুব কবিরের প্রায়-আন্ডারগ্রাউন্ড কবিপরিচিতকে টেনে হ্যাঁচড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে জনসমক্ষে। পাঠকের শতধাবিচ্ছিন্ন মনোযোগকে এরা বাধ্য করেছে তাদের দিকে ফোকাসটাকে ঘুরিয়ে দিতে। কিন্তু কী দিয়ে? অত্যাশ্চর্য সারল্য ও দায়বদ্ধতাবোধ দিয়ে, প্রায় নিরলংকার বলনকেতার অনাড়ম্বরতা দিয়ে, কথাকে কবিতা করে তুলবার অনায়াস ভঙ্গি দিয়ে। এসব বৈশিষ্ট্য মাহবুব কবিরের কবিতায় আগেও ছিল। ফুলচাষি মালি যাই বলোর প্রেক্ষাপটও প্রায় অবিকল কৈ ও মেঘের কবিতার অনুরূপ গ্রামীণআবহে মোড়িত। তবে বেসরকারি কবিতার পরিসরে নগর তার শুভপ্রবেশ নিশ্চিত করে নিয়েছে; তবে অবশ্যই চাকচিক্যপূর্ণ অবয়ব নিয়ে নয়, আনাচকানাচের মালিন্য নিয়ে। এই দুই গ্রন্থে ওর কথার ধার আরো বেড়েছে, বোধের আগাটা আরো সুচালো হয়েছে, মানুষ ও সমাজ-সভ্যতা নিয়ে ওর ভাবনাটা আরো স্পষ্টতর হয়েছে।

মাহবুব কবির কবিতায় কথা বরাবরই কম বলে। গল্প করার জন্য গল্প বলে না, কিন্তু প্রায় কবিতায় গল্পচূর্ণ ছড়ানো ছিটানো থাকে ওর বিশেষ কাব্যশৈলীর চাহিদা অনুসারে। ফলে ওর কবিতার ভরা জনপদে খালি চোখে তাকালেও বিপন্নপ্রায় চরিত্রের বিষণ্ন মুখ দেখা যায়। হুমকির শিকার গাছপালা, প্রাণী, প্রান্তিক জনতাকে ঘিরেই প্রধানত ওর ভাবনারা ডালপালা মেলে। যেসব মানুষ ওর কবিতার মূল মনোযোগের কেন্দ্রে তারা সামাজিক মর্যাদায় তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির বা তারও চেয়ে হীন ব্রাত্যজন। বাসনকোসনের ফুটো সারাইকারী, মেথর, দরিদ্র পাখিশিকারি, যৌনকর্মী, ভাগ্যগণনাকারী, কুসংস্কারান্ধ পিরভক্ত, ওঝা, পাঁঠা দেখানেঅলা, মড়া সৎকারকারী ও শ্মশানচণ্ডাল, চোর ও খোঁড়া চোর, পাতকাকুড়ানির ধর্ষিতা মেয়ে, অগ্নিদগ্ধ নির্যাতিত নারী, জুয়াড়ি, হিজড়া, মাদকাসক্ত যুবক, ছিনতাইকারী প্রভৃতি পরিচয়ের নারী-পুরুষের মুখ ওর কবিতার মুখের দিকে তাকিয়ে অতি ঘনিষ্ঠভাবে চেনা যায়। আছে এদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত উন্নত মর্যাদার মানুষও-- বিপন্ন আদিবাসী, উদ্বিগ্ন পিতা, মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত, নিষ্কর্মা কল্পনাচারী, চিত্রকরের নগ্নিকা মডেল প্রভৃতি। এমন নয় যে, অন্য কিছু বলতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে এই দুই পর্যায়ের মানুষের কথা ওর কবিতায় উল্লিখিত। বরং এরাই সংশ্লিষ্ট কবিতাগুলোর কেন্দ্রীয় বিন্দু, যে বিন্দুকে কেন্দ্র করে কবিতাময় অন্য কথার বৃত্ত অঙ্কিত হয়েছে। এ যেন অজান্তেই কবিতার বর্ণাবলেপনে নিম্নবর্গের মানুষের সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনা করে যাওয়া।

৮.
মাহবুব কবির কবিতা করে তুলবার জন্য কোনোরকম বল খাটায় না। শব্দ ও বাক্যের ব্যায়াম করে না। মাহবুব সাধারণ অভিজ্ঞতার বিশেষায়িত পর্যবেক্ষণসমূহ সহজ করে বলে যেতে থাকে মাত্র। ওর মূল কারিগরিটা মনে হয় বলাবলির নিরাভরণ রূপ এবং পরম্পরা বিন্যাসে। সাধারণত মাহবুব যা দেখে তাই বলে। কখনো কখনো এই দেখায় চর্মচক্ষু ছাপিয়ে মনশ্চক্ষুর ভূমিকা বড়ো হয়ে ওঠে; যেমন, ‘আকাশ থেকে আকাশে ছুটে পালাচ্ছে দলে দলে মেঘ/ যেন হরিণের পালের ওপর হামলে পড়েছে বাঘ’ (বৃষ্টি হবে) বা ‘স্বর্গ পুরুষতান্ত্রিক পল্লি’ (স্বর্গে যাবো না)। এরকম উদাহরণ সত্ত্বেও, তাকালে দেখা যায় ফুলচাষি মালি যাই বলোতে চর্মচক্ষুর উজ্জ্বল কীর্তিই পরিমাণে বেশি। তবে আমরা এরকম বলতে চাইছি না যে, এই দেখা একবার এক ঝলক তাকিয়ে পাতার কাঁপন দেখার মতো একমাত্রিক কোনো দেখা। বরং এসব দেখা দীর্ঘদিন ধরে পর্যায়ক্রমে দেখতে দেখতে দেখনক্রিয়াকে সম্পূর্ণ করে তোলা; যে দেখাকে তাৎপর্যময় করে তোলে পূর্বার্জিত তথ্য ও নিবিড় জ্ঞানযোগে একটি বিন্দুকে আরেকটি বিন্দুর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভুজ অঙ্কনসাপেক্ষে মিলিয়ে দেবার দক্ষতা। ‘আদিবাসী হদি পরিবাটির সবকিছু আজ ইসলাম’ (সন্ধ্যাকুড়া) বা ‘পৃথিবীতে মানুষ আসলে বেশিদূর এগোয় নি/ মানুষ তো আজো সাম্প্রদায়িক রয়ে গেল’ (সাম্প্রদায়িক) বা ‘আমাদের নদীটি খালের মধ্যে ঢুকে গেছে’ (উন্নয়ন) ধরনের পর্যবেক্ষণসমূহকে জীবন-পরিবেশলগ্ন একেকটা মাইলস্টোন বলে মনে হতে পারে। বেসরকারি কবিতায়ও এমন দৃষ্টান্ত অবিরল। ‘যুবতীর আত্মহত্যার প্রশ্নে যৌনতা ল্যাপ্টে থাকে’ (আত্মহত্যা) বা শরণার্থী শিবির আর মহানগর ঢাকার/ গন্ধ কিন্তু একই’ (গন্ধবিষয়ক) ধরনের পর্যবেক্ষণকে অগভীর সাব্যস্ত করে তাচ্ছিল্য করবার সাহস আমাদের কমই হবে।

আমরা মাহবুব কবিরের কবিতার সারল্যের প্রশংসা করি। করে যাব। পড়ে যাব সারে সারে ওরে। বলে যাব সারল্যের জয় হোক। কিন্তু মাঝে মাঝে নিন্দা করবার শক্তিও যদি আমরা অর্জন করে না উঠি, তাহলে তাকে মনে হবে আত্মপ্রতারণা। আমাদের কাছে মনে হয়, ওর ফুলচাষি মালি যাই বলোর ‘কে প্রথম’ বা বেসরকারি কবিতার ‘নবজাতকের প্রতি’র মতো কবিতার জন্মনিয়ন্ত্রণ কাম্য। অন্যদিকে ওর কৈ ও মেঘের কবিতার ‘পৃথিবী’, ‘হিজল-জন্ম’, ‘কৈ ও মেঘের কবিতা’, ‘হত্যামুখর দিন’ (ঈদুল আজহার দিনের জাতীয় কবিতা) ও ‘আমার মাংস’; ফুলচাষি মালি যাই বলোর ‘মদন সরকার’, ফুলচাষি মালি যাই বলো, ‘সাম্প্রদায়িক’, ‘উন্নয়ন’ ও ‘সস্তা মানুষজন’; বেসরকারি কবিতার ‘হিরালাল’, ‘বেসরকারি কবিতা’, ‘নক্ষত্র’, ‘অভয় পৃথিবী নেই’ ও ‘আমাদের গ্রাম’-এর মতো কবিতার সঙ্গে সহবাস করে অধিকাংশ কবিতা পাঠক পরিপূর্ণ তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারে।

অনিকেত শামীম সম্পাদিত 'লোক'-এর নভেম্বর ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত

স্বদেশাপ্লুত ভালোবাসার শব্দছবি

খোন্দকার আশরাফ হোসেনের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’-এ আর যাই থাক ঘৃণা নেই, আছে সবিশেষ স্বদেশাপ্লুত ভালোবাসা; কাঁচা-পাকা, হিসেবি-বেহিসেবি, মাত্রাময়-মাত্রাছাড়া। মানবীরূপী একজন কোনো সুন্দরী এখানে উপস্থিত আছে কি না, যার প্রতি নিবেদিত এসব পঙক্তিমালা, তা নিয়েও সংশয় জাগতে পারে। অবশ্য স্বদেশই যদি কথিত সুন্দরী হয়, তবে তা ভালোভাবেই আছে। আর সে কারণেই হবে হয়ত যে, গ্রন্থভুক্ত অনেক কবিতাকে বেজায় কেজো মনে হয়। নিরর্থকতার যে সীমায় অনেক পাঠক কবিতাকে একান্ত নিরলে একা পেতে চান, সেরকমটি এখানে কালেভদ্রে ঘটে। তাতে অমন কবিতানুরাগীরা এ গ্রন্থপাঠে নাখোশ হবার ভাব করলে আমরা তাদের প্রবোধ দেবার অজুহাত খুব কমই খুঁজে পাই। অবশ্য তাদের উদ্দেশে এ কথাটি বলবার সুযোগটুকু আমরা যৌক্তিকভাবেই নিতে পারি যে, ‘কেজোকথা সর্বদা হেলাফেলা করিবার নয়’। বরং দেখা যায় এর নদীতীর ধরে যথেচ্ছ হেঁটে, এর বিষণ্ন প্রাঙ্গণে নিবিড়ভাবে বসে, যে, মাথার ওপর দিয়ে কত কী পাখি উড়ে যায়, মিথের। অতীতের চেনা-অচেনা নানা পৌরাণিক ও লোকচরিত্র, লোকবাচন, নির্বিঘ্নে পাশের গোপাট বেয়ে ধেয়ে যায়, বাংলার পথে। এ সময়ের নানাকিছুর তারা অংশী হয়। কবিতার এটা এক গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বটে। এটা করে দেখাতে পারা ছেলেখেলা নয় কিংবা নিবিড়ভাবে কাছে থেকে একে দেখতে পারাও কোনোভাবে আকামের নয়।

এর বাইরে আমরা কথা বিশেষ খুঁজে পাই না এ বই নিয়ে বলবার। কিন্তু তবু কথা বলতে হবে। অন্তত হাজার শব্দ তো বটেই। কেউ কেউ কথা ভালোবাসে। কেউ কেউ কথার ওজন নয় পরিমাণ মাপে। কেউ কেউ অর্থ নয় আওয়াজেই কাঁপে।

আমরা অগত্যা গ্রন্থধৃত কতিপয় কবিতার জানালায় উঁকি দেবো বলে ভাবি। পারি তো দরজা ঠেলে ভেতরেও ঢুকে যাব, বসব কতক। গৃহবাসীর সাথে ভাববিনিময় করব। তাতে যদি কিছু কথা রোচে যায়, ওই দিয়ে হয়ত-বা মুখরক্ষা হবে। সবেধন একটাই মুখ, আমাদের, তা যদি হারাই এসে এইখানে খেলা খেলা কথা বলে, কেজোকথার গরমাগরম দিনে লজ্জার একশেষ হবে।

২.
গ্রন্থযাত্রার শুরু ‘বেহুলা বাংলাদেশ’-এ; মিথিক বাস্তবতায় স্বদেশপ্রেমের জোয়ার বইয়ে দিয়ে। সংগতভাবেই বেহুলা বাংলায় লখিন্দর আছে, আছে দুর্বাসা, দ্রৌপদী ও ইন্দ্র। দায়িত্ব পেয়েছেন এখানে অর্ফিয়ুসও। কিন্তু এসব তথ্যে আমাদের মন ভরে না, যতক্ষণ না আমরা ‘আলোর বর্ষণে গর্ভবতী’ হওয়া বা ‘পিপাসার অশ্ব’ ছোটানোর মতো মেটাফরের সামনে পড়ি। বুঝি যে তিনি কবিতাই করতে বসেছেন, দেশগাথা বর্ণনার ছলে। দু'কূল রক্ষার এই সচেষ্টতাই কবিকুলে তাঁকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। এ কবিতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে স্বরে ও সরগমে আমাদের গায়ে এসে জীবনবাবুর ‘অন্ধকার’-এর আঁচ লাগে। ‘নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না’র অ্যালিউশন হাজির করে আমাদের তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, একটা জগদ্দল পাথরের সামূহিক ক্ষয়ক্ষতির লেজের অন্ধকার বর্ণনা করাই তার এখানকার প্রধান অভীষ্ট।

এই বিষাদময় অন্ধকারই বোধকরি তার চৈতন্যকে শাসন করতে থাকে। তা নইলে কেন সুকান্তের মতো এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবার ‘সুশোভন প্রতিশ্রুতি’ না-দিয়ে তিনি তার উলটোটাই করবেন? বৈশ্বানর, কৃষ্ণ, অর্জুন, স্পার্টাকাসকে হাজির-নাজির রেখেও কেন প্রিয় পুত্রকে সাহসী অভিমন্যু করে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেবেন, যেখানে তার ট্র্যাজিক পরিণতির কথা আমরা জানি? কী এমন সংগত কারণ আছে এই বিষাদবয়ানের? এর জবাবও দেখা যায় তিনি নিজেই দিয়ে রেখেছেন ‘বর্ষা ১৩৯৫’ কবিতায়। বলছেন, ‘এখন উদ্ভটতার ব্যাকরণ হাতে দীর্ঘ আলখাল্লা-পরা অন্ধকার/ আলোর উঠানকে খুব শাসাচ্ছে’। কারণ ‘(ঘোড়সওয়ারেরা চলে গেলে প্রান্তরের ভাওয়া ব্যাঙ-ও/ হানড্রেড মিটার রেসে জিতে নেয় সোনার পদক)’। যেজন্য তাঁর মনে হয় ‘বাংলার বর্ষা বড় মরিচাপ্রবণ’। আশ্চর্য লাগছে তো! লাগবারই কথা। বাংলার কবিকুল মাতোয়ারা থাকেন যে বর্ষায়, তাতেও তিনি মরিচা দেখেন? এমন তাঁর মনে হয় কারণ তাঁর কাছে বর্ষাও দেশনিরপেক্ষ কোনো অস্তিত্ব নয়; কারণ ‘নিরন্নের ভাতের থালায় কানকোতে হেঁটে আসা/ সুরভিত কৈ মাছের রূপকথা’ আজ নির্বাসিত। বইয়ের ‘বৌমাছ’, ‘যাত্রা’, ‘ধানরমণী’সহ অনেকানেক কবিতায় বাঙালিয়ানার সুবাস মাখিয়ে রাখেন তিনি। এসব আয়োজনে আবারো দেখা হয়ে যায় বেহুলার সাথে, খুল্লনা ও লহনার সাথেও। ‘কালপূর্ণিয়া’য় বন্দনা করেন দেশমাতার। ওই ট্র্যাজেডির বয়ানে তাঁর আকাশের চাঁদ হয়ে যায় ‘মর্মমূলে গাঁথা/ সারাসিন চাকু’ ! বটেই তো। তা নইলে রক্তপাতের এমন ভয়াবহতা দেখত কী করে বাংলার মানুষ?

কবিতায় তাঁর এ ধরনের ট্রিটমেন্ট দেখে মনে পড়ে যায় তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশানুরক্তি তাঁর অন্যতম চেতনানির্মাতা। এ বই প্রকাশের সময়কার ২১ বছরের পরিণত বয়সি বাংলার গায়ের নানা ক্ষতস্থানের দিকে চোখ পড়ামাত্র তাঁর প্রাসঙ্গিক প্রতিক্রিয়া ব্যঞ্জিত হয়ে ওঠাকে আমাদের কাছে কাজেই কোনো আরোপন মনে হয় না। তাঁর কবিচৈতন্যের গঠনপ্রক্রিয়ারও এ এক মৌল উপাদান। কবির সমুদয় সৃজনোল্লাস এই পথ বেয়েই তার গন্তব্যে পৌঁছেছে। ফলত এখানে দেখা হয়ে যায় বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, আইল-বাতর, রূপকথা-লোকাচারের সাথে।

ঈর্ষণীয় সবুজ বিষয়ে তাঁর কিছু বলবার থাকে, বাংলার; বলেনও। কেননা ‘চোখের দৃষ্টির জন্য সবুজের মতো ভালো/ চিকিৎসা নেই’। ‘আমার স্বদেশে সুখ্যাতি আছে সবুজের’ স্বরে আমরা শুনি পূর্বকবির ধ্বনি, তিনিও যেন বাংলার কিংবদন্তীর কথাই বলছেন নিজস্ব ভাষায়। মনে হয়, আবারও সেই দেশগাথা, আবারও কেজোপ্রেম। কিন্তু না, কেজোকে তিনি কেজো করেই রাখেন না, উতরাতে জানেন। সততই মেটাফর খুঁজে ফেরেন তিনি। অদ্ভুত সব চিত্রকল্পের প্রেমে পড়ে যান। একই ছবি এঁকে বসেন একাধিক কবিতায়। একইসঙ্গে ‘তারাদের হলকায়ে জেকের’ দেখেন-শুনেন ‘তাসের খেলা’ ও ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’তে। আবার ওই ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’তে যেমন দেখেন ‘শূন্য/ রাজপথে ফিগার স্কেটিং করে বাদামের খোসা’, তেমনি ‘কবিতা কোলাজ’-এর ‘অদ্ভুত’জুড়ে দেখতে পান ‘প্রান্তরের এপার থেকে ওপারে/ ফিগার-স্কেটিং করছে মেঘ’। কোথায় বাদামের খোসা, আর কোথায় মেঘ। দুইয়েরই এক আচরণ। বারণ নেই। দেখবার চোখটাই এখানে আসল, দেখানোরও। এই ছবি চিরন্তন। আর চিরছবির এই বলনকেতা তাঁর এমনই নিজস্ব যে, বারবার বলে তার নিশান উড়িয়ে রাখা প্রয়োজন মনে করেন। হয়ত না। আসলে বোধহয় মালিকানাবোধ থেকে নয়, বরং ওসব মনোমুগ্ধকর ছবির কাছে যে ধরা খেয়ে থাকে তাঁর আমূল কবিচিত্ত, তারই এ স্বতঃপ্রকাশ।

৩. 
পেশাগতভাবে ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ঘর করেছেন তিনি। কিন্তু এ সম্পর্ক পেশার গণ্ডিতেই আবদ্ধ রাখেন নি, মাখিয়ে নিয়েছেন আমূল অস্তিত্বের সঙ্গে। এর মাধ্যমে বিশ্বকবিতার যে আঁতের খবর তিনি জেনে ফেলেছিলেন ও জানছিলেন, তা নিয়মিত জানিয়ে গেছেন বাংলা কবিতার পাঠকদেরও। এই পরিসরে তাঁর হাতে যে সোনালি শস্যগুলো রূপ বদলে নিয়েছে বাংলাভাষায়, তা ঋদ্ধ করেছে বাংলা কাব্য ও প্রবন্ধ সাহিত্যকে। এ সংবাদ এখানে প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে, প্রত্যক্ষ ওই আয়োজনের গভীরে সহজাতভাবে আরেকটি আয়োজনও সেরে নিয়েছিলেন তিনি, তা হলো, নিজের কবিতাবোধকে দিতে পেরেছিলেন একটি সমীহজাগানিয়া উচ্চতা। ওই উজ্জ্বলতা অনুপস্থিত নয় ‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’-এও। কবিতা তো বটেই, এ বইয়ের কিছু কবিতার নামকরণও অনেক বিখ্যাত বিশ্বকবিতার কথা মনে রেখে করা; যেমন, টি. এস. এলিয়টের ‘দি লাভ সঙ অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রুক’-এর স্মরণে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘প্রুফ্রকের প্রুফকপি’, কোলরিজের ‘দি রাইম অব দা অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার’ স্মরণে তাঁর ‘বুড়ো নাবিকের প্রেমগীতি’। কবিতায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনের যে বিবেচনা হাজির করেছিলেন টি. এস. এলিয়ট তাঁর ‘ঐতিহ্য ও ব্যক্তিপ্রতিভা’ নামক সুবিখ্যাত প্রবন্ধে, খোন্দকার আশরাফ হোসেন সেই মেলবন্ধন রচনা করেছেন। নিজের কবিতাদেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার অনুরণনও ছড়িয়ে পড়েছে যথাসাধ্য, যে খবর ইতোমধ্যে এ লেখায়ও মূর্ত হয়েছে।

৪.
আলোচ্য বই থেকে কবিতার পর কবিতা হাজির না-করে কম কথায় আলাপ সারবার পরিকল্পনার এ পর্যায়ে এসে মনে হয়, বলবার কথার পুঁজি আমাদের, এবার বুঝি সত্যিই ফুরালো। কৌতূহলী পাঠকের আকাঙ্ক্ষা এ দিয়েই নিবৃত্ত হবে কি না, এরকম ভাবনা যদিও জাগে মনে। তখন মনে হয়, গৌণ হোক তবু আরো কিছু তথ্য হয়ত এখানে উঠিয়ে রাখা যায় বইটি সম্পর্কে; যেমন, দেশবিষাদমণ্ডিত কবিতাভাণ্ডারে সমৃদ্ধ এ কবিতে প্রেমিকসুলভ আত্মবিশ্বাস এবং অহঙ্কারও দ্রষ্টব্য বটে। আর সেটা ‘(লাউডুগি যেমন মিশে থাকে জলঘাসের হৃদয়ে)’, ঠিক তেমন করে। যেহেতু ‘ভালোবাসিয়াছি ভালোবাসিয়াছি ভালোবাসে নাই ভালো’ বা ‘এ শরীর আজ বহু বসন্তের প্রেমের আগুনে পোড়া’, তাই জ্বরাক্রান্তের প্রেমের উত্তাপ নিয়ে শীতলতায় যাবার বাসনা থাকা এ পরিসরে নিতান্ত সংগত। কিন্তু তবু কারো উদ্ভট করুণা না-নেবার দৃঢ়তা তিনি মুহূর্তের জন্যও হারান না। ফলে আমরা একইসঙ্গে দেখি এ বইয়ে কবির ‘হৃদপিণ্ডের শব্দ থেকে গড়িয়ে পড়ছে ভালোবাসার জবাফুল’। কিংবা বলা যায়, এ বইয়ে প্রধানত খোলা অক্ষরবৃত্তেই সেরেছেন তিনি তাঁর কথালাপ। মাঝে মাঝে স্বরবৃত্তের ঘোড়ায় চড়েও পরিকল্পিত ভ্রমণে বের হয়ে গেছেন তিনি ‘ঘৃণার ঘুঙুর’, অংশত ‘চিকিৎসা’ ও ‘কবিতা কোলাজ’-এর ‘পদাবলী’পথে। স্বরবৃত্তে জগতোদ্ধার যাত্রায় তাঁর পথে পথে পালকি দোলা, বনে বনে ময়ালভীতি। এসবে আমরা নেচে উঠি, ফের থামি আত্মতুষ্ট হয়ে। পাশাপাশি এ বইয়ে মাত্রাবৃত্তের সফল প্রয়োগও তাঁর হাতে হয়েছে ‘বুড়ো নাবিকের প্রেমগীতি’র ছলে। বলা যায় এ কথাও যে, মুগ্ধ হতে হয় তাঁর প্রয়োগকৃত সৌন্দর্যময় কিছু শব্দবন্ধের দিকে চেয়ে; যেমন, ‘জলকরঙ্কবাহি’, ‘কণ্টকঝোপাবৃত’; কিংবা এই ভয়ঙ্কর ছবিতে যে, ‘সুর্মা-পরানো আয়ত চোখের কুহকিনী এক নারী/ শিশ্নমুণ্ডে পরিয়ে দিয়েছে অষ্টধাতুর বালা’। এখানে এটা উল্লেখের ইচ্ছে পোষণও হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ‘ধূমশলাকার শ্যামপীরিতি ছাড়তে হবে’র মতো পঙক্তি লিখে তিনি এ পীরিতাঘাতে কাতর সহস্রজনের গোপন আকাঙ্ক্ষাটিও মূর্ত করে রেখেছেন। যদিও তাঁকে কখনোই ধূমশলাকায় বুঁদ হয়ে থাকতে দেখি নি দু’চোখে।

‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’-এ ব্যাপকভাবে পাঠকপ্রিয় হবার মতো মোহটান নেই, প্রকাশিত হবার পরের ২১ বছরজুড়ে তা স্বতঃপ্রমাণিত। তবে একজন গুরুত্বপূর্ণ কবির নাতিদীর্ঘ যাত্রাপথের এ মধ্যঘাট তাঁর সমুদয় কাব্যবৈশিষ্ট্যের লক্ষণ ধারণ করে বিশিষ্ট হয়ে আছে; যার দিকে ফিরে ফিরে তাকানোয় আমাদের কোনো দায়মুক্তি নেই।

মুহম্মদ মুহসিন সম্পাদিত 'ধানসিড়ি'র অক্টোবর ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত

Sunday, January 1, 2012

প্রভাব বিষয়ে প্রমিত আলাপ


প্লেটো মনে করতেন কাব্য সত্য থেকে তিন ধাপ দূরে অবস্থান করেসত্য হলো কতগুলো ভাব বা আইডিয়া, আর বস্তুজগ তার অনুকরণ বা প্রতিফলনকাব্যের আদর্শ যেহেতু বস্তুগজগ, কাজেই কাব্য অনুকরণের অনুকরণপ্লেটোর এ মতের প্রতি তাঁর সুযোগ্য শিষ্য অ্যারিস্টটলের ভিন্নমত ছিলতবে তা এ অর্থে নয় যে, কাব্য অনুকরণ নয়; বরং এ অর্থে যে, কাব্য সত্য থেকে তিন ধাপ দূরের বিষয় নয়অর্থা এই দুই গ্রিকচিন্তকের মতেই কবিতাকরা বস্তুজগতের অনুকারিতাএ কথার পুরোটা হয়ত আমরা মানব না এতদিন পরেকারণ কবিতার আদর্শ কেবল বস্তুজগ, এ মতটিই আমাদের সমর্থন পায় নাসে কারণে কথাটি নিসর্গ ও অন্যবিধ দৃশ্যবস্তুর দোষগুণ বর্ণনাকারী কবিতাগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা খাটলেও, মনোভাববর্ণনমূলক কবিতার ক্ষেত্রে অচলএটা সত্য যে, মানুষ ও মানুষের মনও প্রাকৃতিক বস্তু, কিন্তু মনোভাব প্রাকৃতিক নয়কাজেই তা নিয়ে লিখিত কবিতা কী করে বস্তুজগতের অনুকারিতা হবে? যদি কিছুর অনুকারিতা একে বলা হয়ই, তবে তা হয়ত ভাবনার অনুকারিতা, যে ভাবনার কোনো বাস্তবিক রূপই নেইকাজেই নিজস্ব আবেগে চালিত হয়ে নিজ ভাবনার ছকানুযায়ী আমরা যখন কবিতা করি, তখন আমরা কারো অনুকারিতা করি না বস্তুতকিন্তু মুশকিল হলো, ভাবনার অনুকারিতা করে সেই ভাবনাটা আমরা যখন ভাষায় প্রকাশ করি, তখন তা অবয়ব পায় নানা বস্তুসূচক শব্দের সহায়তায়ইঅর্থা একবার অস্বীকার করেও ঘুরেফিরে আমাদের একভাবে প্লেটো-অ্যারিস্টটলের মতের আশ্রয়েই গিয়ে দাঁড়াতে হয়সে যাই হোক, এ ধরনের অনুকারিতায় গ্লানি নেই, কারণ এটাই এক্ষেত্রে দাগায়িত সর্বশেষ সীমাকেননা সকল অর্থপূর্ণ বক্তব্যই শেষপর্যন্ত দৃশ্য-অদৃশ্য বস্তুর গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়আমাদের উদ্বেগ কাজেই প্রকৃতির অনুকারিতা নিয়ে নয়, বরং মানুষ ও তার কর্মের অনুকারিতা নিয়ে

ইতোমধ্যে আমরা নিজের ভাবনা নিয়ে গর্বিতভাব ব্যক্ত করেছিকিন্তু নিজস্ব ভাবনা বলে আমরা যাকে গ্লোরিফাই করতে চাচ্ছি, সেটা কতদূর নিজের তা-ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বটেইউরোপের প্রথম সমালোচকরূপে খ্যাত জার্মান নাট্যকার লেসিংয়ের একটা বক্তব্য ছিল এরকম যে, ‘মাসুল না দিয়ে কেউ পাম গাছের তলায় হাঁটতে পারে নাগ্যাটে তাঁর ইলেকটিভ এফিনিটিজ গ্রন্থে উদ্ধৃতিটি একই অর্থে ব্যবহার করেছিলেনএর মানে হলো আমরা প্রতিনিয়ত যা দেখি-শুনি-পড়ি-করি তার কিছু না-কিছু প্রভাব আমাদের ওপর পড়েই, যা আমরা এড়াতে পারি নাএসব প্রভাবের বলেই আমরা চিন্তাভাবনা করি ও আমাদের মধ্যে অনুভূতির জন্ম হয়ওই অনুভূতিই যদি আমরা লিখি তাহলেও কি বলা যাবে যে, আমরা অনুকারিতা করছি? বলা যাবে, কিন্তু আমরা বলি না ও বলব নাকিন্তু যদি আমরা অন্য কারো ভাবনা, ধারণা, বক্তব্যকে লুটেপুটে নিই, তাহলে সেটা অনুকারিতাইএক্ষেত্রে আমরা হয়ত নিজেদের ভাবনার অনুকারিতাসূচক ধরনটাকে গ্রহণ করলেও পরের ভাবনার অনুকারিতাসূচক ধরনকে নিয়ে নীতিগতভাবে আপত্তি করবকখনো কখনো আমরা আইডিয়া চুরির অভিযোগ কোথাও কোথাও নিম্নস্বরে উঠতে শুনেছিও, কিন্তু এ অভিযোগও কোথাও কখনো বড়ো হয়ে উঠেছে বলে শোনা যায় নিকাজেই শিল্পনির্মাণ প্রশ্নে এটিকেও অগর্হিত আচরণ হিসেবেই গণ্য করা হয়

ধরা যাক, কবি তাঁর বিভিন্ন পেশার পাঁচজন বন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা করেন; তাঁদের মধ্যে আছেন অধ্যাপক, সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, চিত্রকর ও ব্যবসায়ীপ্রত্যেকেই তাঁর তাঁর জগ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আড্ডায় নানা কথা বলেন, প্রতিক্রিয়া জানানএসব কথা থেকে এমনসব ক্লু বেরিয়ে আসে বা আসতে পারে, যা জন্ম দিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কবিতার বীজহয়ত ওই আড্ডায় মিলিত না-হলে, উপর্যুক্ত আড্ডাসঙ্গীরা নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলাপ না-করলে, একজন বিশেষ একটি বাক্য উচ্চারণ না-করলে ওই বীজটি খুঁজে পাওয়া যেত না এবং কখনোই লিখিত হতো না বিশেষ একটি কবিতাকিন্তু এই প্রক্রিয়ায় লিখিত কবিতাটিকে আমরা কেউই বলব না অনুকৃতকারণ কবিতাবীজ আহরণের এ পন্থাটিও দোষের নয়

অনেকের কাছে শুনেছি, কোনো কোনো কবি-লেখককে তাঁরা বিশেষভাবে রিসোর্সফুল বলে ভাবেনতাঁদের কবিতা-গল্প-উপন্যাস ও অন্য লেখাপত্র পড়লে বিশেষ বিশেষ কবিতার সম্ভাবনা জাগ্রত হয়সব অগ্রজ কবি-লেখক পরবর্তী লেখকদের ইন্ধন সরবরাহ করতে পারেন নাকারণ প্রভাবসঞ্চার করবার গুণ সবার থাকে নাসে কারণে বিশেষ বিশেষ কবি-লেখকের জীবন ও কর্ম সাধারণ পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে গৃহীত না-হলেও সতীর্থ লেখকদের কাছে নিত্যচর্চার বিষয় হয়ে ওঠেকবিতাবীজ সংগ্রহের এই পন্থাটিও স্বীকৃত ও বহুজনজ্ঞাতএ ব্যাপারে ফরাসি লেখক ও কূটনীতিক আঁদ্রে মোরোয়ার বিশেষ ওকালতি আছেতিনি উপদেশ দিয়েছেন, ‘যে সকল বড়ো লেখক মনে ভাবাবেগ সৃষ্টি করেন নবীন লেখক শুধু তাঁদেরই বেছে নেবে এবং তাঁদের গ্রন্থরাজিই সে পুঙ্খানুপুঙ্খ বারবার পাঠ করবেকাজেই এটাকে এমনকি প্রভাব বলে নিন্দা করবারও রেওয়াজ নেইকিন্তু কাউকে পড়তে গিয়ে তাঁর বিশেষায়িত শব্দরাজি, তাঁর শব্দ ব্যবহারের ধরন, কবিতাকে কবিতা করে তুলবার প্রক্রিয়া, ইত্যাদি সবই যদি আমরা আমাদের কবিতায় কাজে লাগাই বা লাগাবার চেষ্টা করি, তবে আমরা নির্ঘা একটা ঝুঁকির দিকে পা বাড়িয়ে দেবোএ অবস্থাটাকে নিন্দনীয় ভাববার সুযোগ আছেসমাজচক্ষু বলবে, আমরা ওখান থেকে চুরি করেছি; ভয়ানক ক্ষতিকরভাবে প্রভাবিত হয়েছি; ইত্যাদিতাছাড়া আমাদের নিজেদের দিক থেকেও সেটা হবে নিজের পায়ে কুড়াল মারবার মতো ব্যাপারকারণ এই প্রবণতা আমাদের নিজস্ব স্বর তৈরির অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে, আমাদের কবিতার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিকূলতা তৈরি করবে। 

বছর কয় আগে প্রথম আলো সাময়িকীতে শাহীন মমতাজের একটা কবিতার বইয়ের আলোচনায় তাঁর কবিতার ভূয়সী প্রশংসা শেষে আলোচক সাজ্জাদ শরিফকে বলতে শুনেছিলাম, শাহীনের এখন উচিত উপল কুমার বসুর হাতটা ছেড়ে দিয়ে নিজের মতো করে হাঁটা বা এ জাতীয় একটা কথাএখানে সাজ্জাদ শরিফ সম্ভবত এটাই পরিষ্কার করতে চেয়েছেন যে, এ ধরনের প্রভাবে প্রভাবিত হওয়া যাবে কবির বেড়ে ওঠবার লগ্নে, কিন্তু এক সময় তার থেকে বেরিয়ে নিজের স্বর তৈরি করবার দিকে মনোযোগ দেয়া জরুরি, নইলে রহিত হয়ে যাবে তাঁর স্বতন্ত্র লেখক হিসেবে বেড়ে ওঠাএ প্রশ্নে আঁদ্রে মোরোয়ার স্বরও প্রায় একইরকম; তিনি বলেন, ‘অন্যের রচনা-শৈলীর সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হবার পর নবীন লেখক নিজস্ব রচনা-শৈলী গড়ে তুলবেন। 

প্রভাবের পক্ষে বিশ্বখ্যাত ফরাসি-লেখক অঁদ্রে জিদেরও ব্যাপক ওকালতি আছেতিনি সাহিত্যে প্রভাবনামে একবার একটা দীর্ঘ বক্তৃতাই দিয়েছিলেন, যাতে তিনি সব ধরনের প্রভাবেরই পক্ষ নিয়েছিলেনপ্রভাব যে লেখকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই প্রতিপাদন করেছিলেন তিনি তাঁর বক্তৃতায়তখন প্রশ্ন জাগে, তাহলে আমরা মেধাস্বত্ব বা ন্যায়ের প্রশ্নে সীমাটা টানব কোথায়? একটা সীমা নিশ্চয়ই কোথাও-না-কোথাও থেকে যাওয়া সংগত, তা নইলে চিরকালই আমাদের অঁদ্রে জিদ বা আঁদ্রে মোরোয়াই লিখে যেতে হবে, নতুন কিছু কেউ লিখবেন না। 

অঁদ্রে জিদ বলেন, ‘প্রভাবকে ভয় করে যাঁরা দূরে বসে থাকেন তাঁরা আত্মার দৈন্যকেই তুলে ধরেনতাঁদের মাঝে নতুন কিছু খোঁজা বৃথাএবং তিনি জানান, ‘মহামান্য ব্যক্তিদের আমরা প্রভাবের ভয়ে শঙ্কিত হতে দেখি না বরং প্রভাব সংগ্রহের অদম্য আগ্রহ তাঁদের কাছে অনেকটা বাঁচার আগ্রহের মতোইশুনলে শিহরণ জাগে! উদাহরণ হিসেবে যে মহজ্জনের নাম তিনি সামনে আনেন তা শুনে ভিমড়ি খাবার জোগাড় হয়এঁদের মধ্যে আছেন মিকেলেঞ্জেলো, মঁতেন, রাসিন, গ্যাটে, গোগোলের মতো শিল্পী-সাহিত্যিকতখন মনে হয়, আমাদের হয়ত এরকম করে ভাবাই সংগত যে, মহদের কথা আলাদা! মহজ্জন প্রভাবকে মহ উপায়ে কাজে লাগাতে জানেন, মৌমাছির মতো নানা ফুল থেকে একটু একটু করে মধু আহরণ করে মধুভারে টইটম্বুর মৌচাক বানিয়ে তোলেনআমরা অতটা পরিশ্রম করতে পারি না বা করতে রাজি হই না, বরং শর্টকাট রাস্তা খুঁজিএই শর্টকাটওয়ালাদের কথাও তিনি বলেছেন বটে তাঁর বক্তৃতায়জানিয়েছেন, ‘প্রভাব ভালো-মন্দ দুরকমেরই হতে পারে।...প্রভাবের ভালোমন্দ নির্ধারিত হয় যিনি প্রভাবিত হন তাঁর ভালো-মন্দের আপেক্ষিকতায়আমরাও কাজেই এই আপেক্ষিকতায় দাঁড়িয়েই আমাদের আলাপ বিস্তৃত করবার প্রয়াস করবকারণ আমরা সাধারণআমরা সমুদ্রজল ছুঁতে জানি, কিন্তু গা না-ভিজিয়ে সে জলে অন্তর সিক্ত করে নেয়া আমরা শিখি নি

কবিতার একটা ডিভাইস বা অলংকার আছে পরোক্ষ উদ্ধৃতি বা উল্লিখন নামেপৃথিবীর অনেক খ্যাত-বিখ্যাত কবিই এ অলংকার ব্যবহার করেছেন, যেজন্য তাঁরা নিন্দিত হন নিইংরেজি ভাষার বিখ্যাত কবি এলিয়টের কবিতায় দেশ-বিদেশের বিস্তর ক্লাসিকসার ব্যবহৃত হয়েছিলবাংলা কবিতার তিরিশের দশক থেকে যে আধুনিকতার সূচনা তাতে এলিয়টসহ প্রধান প্রধান ইউরোপীয় কবির সুস্পষ্ট প্রভাব কাজ করেছেশুধু বাংলা কবিতা নয়, জানা যায়, অন্যত্রও এলিয়টের প্রভাব অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিলমার্কিন কবি স্ট্যানলি ক্যুনিটজ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রায় তিন দশক এমন কোনো তরুণ কবি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ছিল যার পেছনে তাঁর (এলিয়টের) কণ্ঠস্বর শোনা যেত নাবিশের ও তিরিশের দশকে খ্যাতি অথবা শ্রোতা জোটাতে হলে এলিয়টকে অনুসরণ করতেই হতোএরকম অবস্থায় দেশি বা বিদেশি উসের দ্বারা প্রভাবিত হওয়াকে দোষারূপ করবার কোনো সুযোগ থাকে নাবিদেশি শিল্পউস থেকে প্রভাব সঞ্চয় করাকে যে দোষারূপ করা যাবে না, তা এমনকি রবীন্দ্রনাথও তাঁর সহিত্যবিচার নামক প্রবন্ধে জানিয়েছেন, ‘সাহিত্যবিচারকালে বিদেশী প্রভাবের বা বিদেশী প্রকৃতির খোঁটা দিয়ে বর্ণসংকরতা বা ব্রাত্যতার তর্ক যেন না তোলা হয়তবে এটা উল্লেখযোগ্য যে, একই প্রবন্ধে তিনি প্রভাবের ভালোমন্দ তথা দোষগুণের সীমাটাও আমাদের জন্য স্পষ্ট করে রেখেছেনবলেছেন, ‘অনুকরণই চুরি, স্বীকরণ চুরি নয়মানুষের সমস্ত বড়ো বড়ো সভ্যতা এই স্বীকরণশক্তির প্রভাবেই পূর্ণ মাহাত্ম্যলাভ করেছেঅর্থা আমাদের স্বীকরণের অনুমতি আছে, অনুকরণের নেইস্বীকরণের বিস্তর নমুনা আছে তাঁর নিজের রচনাকর্মেওইউরোপ-আমেরিকার সোনার খনি তো বটেই, সংস্কৃত ও প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের রত্নরাজি থেকে শুরু করে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য (সুফি-বাউল-বৈষ্ণব) দর্শন ও কবিতার ভাঁড়ার পর্যন্ত ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণস্থল

আমাদের উদ্বেগ এখানে যে, এটুকু স্বীকৃতিকে নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে আমরা অনেকেই পরোক্ষ উদ্ধৃতি বা উল্লিখন নামক ডিভাইসটির যথেচ্ছ অপব্যবহার করে একে চুরির লাইসেন্স হিসেবে কাজে লাগাতে প্রয়াসী হয়েছিএজন্য কখনো কখনো মনে হয়, ডিভাইসটি কেবল তাঁদের জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত, যাঁরা দায়বদ্ধ কবি হিসেবে ইতোমধ্যে স্বীকৃত হয়েছেননতুনদের হাতে এই অস্ত্র বিপদ ডেকে আনতে পারেএঁদের মধ্যে যাঁরা অস, যাঁরা সস্তা খ্যাতি চান, তাঁরা এ সুযোগটিকে একটি ভয়ংকরতার দিকে নিয়ে যেতে উদগ্রীব হন, হতে পারেনএই স্বীকৃতির সুযোগে অনেকে বিপুল পাঠ দিয়ে সমস্ত ক্লাসিক কবিতার মনের কথাগুলো টুকে নিয়ে নিজের কাব্যজগ ভরিয়ে তুলতে পারেন ও তোলেনতাঁদের কবিতা কবিতায় অভ্যস্ত পাঠকের ভালো লাগেকারণ পাঠকের স্মৃতিতে উতরে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসিক কবিতার যে স্বরটা আলতোভাবে লেগে থাকে, সেটাই ধ্বনিত হয়ে ওঠে ওই ওই কবিতাপাঠেএঁরা যতটা কবি, তারচেবেশি কারিগর বা ক্রাফটসম্যানক্রাফটসম্যানশিপের কাজটি এঁরা মনোযোগ দিয়ে করেন এঁদের কবিতায়নানা জায়গা থেকে কাঠখড় আহরণ করে সুনিপুণ দ্রষ্টব্যবস্তু তৈরি করে লোকজনের সামনে হাজির করেন নিজ নিজ সৃষ্টবস্তু হিসেবেডিসকভারিই তখন হাজির হয় ইনভেনশন হিসেবেদীর্ঘ ঐতিহ্যের সমর্থনে এটিও কবিতার ক্ষেত্রে নিন্দিত হয় না বিশেষকিন্তু অধিকাংশ কবি কি এই-ই করে যাবেন জীবনভর? এঁরা কি ইনভেন্ট করে দেখাবেন না কিছু? আমরা জানি, সেটা করার কিছু ঝুঁকি আছেকবিতাপাঠকদের কাছে তা সম্পূর্ণত অচেনা লাগবে, দ্রুত জনপ্রিয় হবে নাবাহবা পাবার যে রুচি কবির তৈরি হয়েছে, তাঁর সে রুচি আহত হবেকিন্তু তা হলেও পুরানোকে ভেঙে খাওয়ার চাইতে নতুন কিছু তৈরি করাই আমাদের কবিতার জন্য বেশি জরুরি মনে হয়, আজ; যখন সিংহভাগ কবিই কৈয়ের তেলে কৈ মাছ ভাজার প্রবণতায় আবিষ্ট হয়ে আছেন

কবিদের মধ্যে একটা দল আছে, যাঁরা পাঠককে ফাঁকি দিতে গিয়ে নিজেদেরই ফাঁকি দিয়ে ফেলেনএঁদের কৌশল একটু ভিন্নএঁরা কম জনপ্রিয়, কম পঠিত কবির কবিতাকে সম্পূর্ণত বা অংশত মেরে দিয়ে বালিতে মাথা গুঁজে থাকেনধরা পড়ে গেলে পরোক্ষ উল্লেখ বা উপলব্ধির ঐক্যের দোহাই দেনদিয়ে পার পান অথবা পান নাকিন্তু প্লাজিয়ারিজম বা তস্করবৃত্তি কেন অলংকারের বরাতে মাফ হয়ে যাবে? কখনো কখনো দেখা যায়, এঁরা দ্রুত একটা খ্যাতি-পরিচিতি পান, আবার হঠা চুরিতথ্য আবিষ্কৃত হয়ে গেলে নিন্দিত-ভর্সিতও হন, পাঠক হারানজানা কথা যে, এঁরা প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কবিতার কাজ করতে আসেন নাতাঁদের সাময়িক বিশেষ মিশন থাকেমিশনে সফল হবার জন্য এঁরা ওই পন্থা নেনএঁরা বস্তুত কিছু সৃজন করতে আসেন না, সৃজিত বাগানে লুণ্ঠনযজ্ঞ পরিচালনা করে নিজ নিজ সাম্রাজ্যের পরিধি বাড়াতে চান মাত্র

জুলফিকার নিউটন নামের একজন কবিযশোপ্রার্থী ১৯৮৪ সালে হারানো অর্কিড নামে একটি কবিতার বই-ই প্রকাশ করে ফেলেন, যে বইয়ের সম্পূর্ণ প্রায়-একটি কবিতাও তাঁর নিজের লেখা ছিল না; ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্র, অরুণ মিত্র, দিনেশ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখ কবিদের লেখাপরের বছর এই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণও বেরিয়েছিলধরা পড়ার পর তিনি আর কবিতা না-লিখে অন্যত্র গর্ত খুঁড়তে শুরু করেনইতোমধ্যে তথ্য-প্রমাণযোগে স্পষ্ট হয়েছে যে, তিনি নিজের অনুবাদ বলে একের পর এক যেসব বই বাজারে ছেড়েছেন ও ছাড়ছেন, ওগুলোর প্রতিটিও আগে করা অন্য কারো অনুবাদ নতুন করে কম্পোজ করে বই বানিয়ে ফেলানো মাত্রওসবে প্রায় কিছুই নতুন নেই, কেবল প্রশংসা করে কবীর চৌধুরীর লেখা একটা করে ভূমিকা/ফ্ল্যাপ ছাড়া (কবীর চৌধুরী প্রয়াত হওয়ায় ভবিষ্যতে এই লোক কিছুটা ভূমিকা-সংকটে পড়বেন বলে মনে হয়!)এমনকি তিনি ভারতীয় বিখ্যাত লেখকদের প্রবন্ধগ্রন্থও একটু এদিক-ওদিক করে নিজের বই হিসেবে ছেপে দিয়েছেন। 

ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব থেকে গত দশকে প্রকাশিত একটা প্রকাশনায় গাউসুর রহমানের একটা কবিতা ছাপা হয়, যেটি তরুণ কবিতাকর্মী শাহিন লতিফের বিশেষ ভালো লাগায় পড়তে পড়তে সে ওটা মুখস্থই করে ফেলেকয়েক মাস পরে ঢাকার পল্টন থেকে একগাদা পুরানো দেশ পত্রিকা কিনে ময়মনসিংহে ফেরার পথে গাড়িতে বসেই লতিফ পত্রিকাগুলোর পাতা উলটাচ্ছিলহঠা বিকাশ গায়েনের একটা কবিতায় তার চোখ আটকে যায়, যেটা ও আগে কোথাও পড়েছে বলে মনে হয়কীভাবে সম্ভব? ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ে যে, গাউসুর রহমানের নামে যে কবিতাটা লতিফ প্রেসক্লাব-প্রকাশনায় পড়েছিল, সেটির সাথে এর একটা মিল থাকলেও থাকতে পারেবাসায় গিয়ে দুটো কবিতা মিলিয়ে লতিফ তার সন্দেহ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়এরপর শহরে খবরটা রাষ্ট্র হয়ে গেলে গাউসুর রহমান জানান, তিনি কবিতাটা দেশ-এ ছাপতে পাঠিয়েছিলেনওখান থেকেই এটা চুরি হয়েছেকিন্তু তিনি যাই বলুন, ওখানকার সবাই নানা কারণে বুঝে নিয়েছিল যে, গাউসুর রহমানই বিকাশ গায়েনের কবিতাটায় হাত চালিয়েছিলেনপ্রকৃতপক্ষে এখানে কে কারটা মেরেছেন, আমরা তা বিশেষভাবে তলিয়ে দেখতে যাই নিকাজেই সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিতও নইকিন্তু এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত যে, যে-ই মারুন, কাজটা ছিল নিন্দনীয়

সম্প্রতি তরুণ কবি শিমুল সালাহদ্দিনের নামে ফেসবুকে কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে যে, তাঁর তোকে অনু, তোকেনামক দীর্ঘকবিতাটিতে প্রতিভাস থেকে প্রকাশিত কবি সুমন গুণের অন্যমনস্ক ও রূপবান নামক বইয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছেঅভিযোগকারী শিমুলের কবিতার পাশে সুমন গুণের কবিতার উল্লেখ করার পর কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিষয়, শব্দ ও বাক্যে দূরান্বয়ী সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়কালেকটিভ আনকনশাসনেসের কথা তুলে শিমুল তাঁর ওপর অর্পিত সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং জানান তিনি কখনো সুমন গুণের কবিতা পড়েন নি পর্যন্তউপলব্ধির ঐক্য দুটো ভিন্ন ভূগোলে অবস্থিত দুজন শিল্পীর শিল্পকর্মে কোনোভাবে লক্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে না, এরকম বলবার কোনো সুযোগ নেইএমনটি হামেশাই ঘটে; কিন্তু এক্ষেত্রে কোনটা ঘটেছে, আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। 

উল্লিখিত তিনটা ঘটনাই পরস্পর থেকে আলাদাতিনটিকেই আমরা অপরাধ হিসেবে নিলেও স্বীকার্য যে, একটি আরেকটির সমগোত্রীয় নয়শিমুলেরটিকে যেখানে অপরাধ হিসেবে না-নিলেও চলে, সেখানে নিউটনেরটা অমার্জনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। 

এবার অন্যরকম একটি ঘটনার কথা বলা যাক : আমাদের এক কবিবন্ধু বিস্তর পাঠ করতপাঠে পাঠে যে চিত্র-সৌন্দর্যময় বিরল শব্দের সাথে তাঁর সাক্ষা হতো, তাকে সে পিক আপ করত ও সেই শব্দকে কসাইয়ের দোকানে খাসির উরু ঝুলিয়ে রাখার মতো করে নাকের ডগায় কিছুদিন ঝুলিয়ে রেখে ভাবতে থাকতঝুলতে ঝুলতে ওই শব্দদোলনটি একসময় একটি স্বাধীন কবিতার দিকে যাওয়া-আসা শুরু করতআমরা মানি, কোনো ভাষার কোনো শব্দই কোনো লেখকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়এমনকি নিজে শব্দ তৈরি করে নিলেও তা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয় নাতৈরি করা শব্দটি যখন অন্যেরা ব্যবহার করে, তখনই বোঝা যায় যে ওই বিশেষ শব্দটি ভাষায় কার্যকর জায়গা পেলঅন্যথায় মৃত সন্তান প্রসবের মতো ব্যাপার হয়ে ওই জন্ম বেদনাই বাড়ায়কাজেই আমাদের বন্ধুর এই কবিতাভিযানকে দোষ দেবার কোনো সুযোগ নেইখুবই নিরাপদভাবে প্রভাবিত হবার একটা শৈলী এটাকিন্তু বন্ধুটি যখন পূর্বে পাঠ করতে গিয়ে তাড়িত হয়েছিল, এমন কোনো কবিতাপঙক্তি একসময় নিজের পঙক্তি হিসেবেই লিখে বসতে থাকল, একই অর্থে একই লক্ষ্যে কেবল শব্দবিন্যাস ১০-১৫ শতাংশ আলাদা করে, তখন আমাদের কাছে তাঁকে বিশেষভাবে অনিরাপদ মনে হয়েছিলতখন তাঁকে একথা বলা প্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল যে, সাবধান হও বন্ধু, সাবধান হও। 

আমরা অঁদ্রে জিদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আঁদ্রে মোরোয়ার বিপরীত প্রান্তে দাঁড়ানো অবস্থায় জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ারকে এ ব্যাপারে আমাদের মতোই উদ্বিগ্ন দেখতে পাইগ্রন্থরচনা ও রচনা-রীতিনামক প্রবন্ধে তিনি লেখকের শ্রেণিভেদ করতে গিয়ে এক ধরনের লেখকের কথা বলেন, ‘যাঁহারা লিখিবার পূর্বে নিজেরা কোনো চিন্তা করে নাই; হয়, কবে কি দেখিয়াছে বা শুনিয়াছে তাহাই ব্যাখ্যান করে, নয়, সরাসরি অপর লেখকের লেখা হইতে তাহাদের চিন্তা সংগ্রহ করে।...ইঁহারা, নিজেদের চিন্তার খোরাক বা প্রেরণার জন্য অপরের চিন্তার উপরে নির্ভর করেনএইজন্য ইঁহারা কখনও পরের প্রভাব এড়াইতে পারেন না, ইঁহাদের রচনা সম্পূর্ণ মৌলিক হইতে পারে না

এইরূপ অমৌলিক রচনার প্রাদুর্ভাব থেকে আমরা মুক্তি চাইদিকে দিকে তেমন রচনার প্রাচুর্য তৈরি হোক, যা পাঠকদের অভ্যস্ততায় নেইপ্রথমে নাক সিঁটকালেও পড়তে পড়তে পাঠকগণ একসময় ওই নতুনে অবগাহন করবেনই করবেন, দুদিন আগে কিংবা পরে, যদি রচনায় কোনো সারবস্তু থেকে থাকেসাহিত্যের সুস্বাস্থ্যের জন্য এটাই বিশেষভাবে মঙ্গলজনকঅর্থা অন্যের গোলাঘরে হামলা না-চালিয়ে নিজের অন্তর খুঁড়বার শক্তি, রুচি ও সাহসে বলীয়ান লেখক দরকার আমাদেরঅবশ্য বলে রাখা ভালো যে, এ দিয়ে কিছুতেই আমরা পাঠাভ্যাস রহিত হতে বলছি নাপাঠ আরো বাড়লেই বরং মৌলিকত্বের সম্ভাবনা বাড়বেদরকার নিজের কাছে স কলমচি, যার কাছে স্বীকরণমাত্র গ্রহণীয়, অনুকরণ কিংবা চুরি নয়স্বীকরণ শক্তির তাপর্যপূর্ণ ব্যবহারে সক্ষম ব্যক্তিদের আমরা দোষারোপ করব না, তবে স্বপ্রতিভার ঔজ্জ্বল্যে নতুন আকাশ-মাটি গড়ে তুলবেন যেসব লেখক তাদের বেশি করে সম্মানিত করবসেরকম লেখকের আধিক্য আমাদের মনে আশা জাগাক, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য লাভ করুক শ্লাঘনীয় মহিমা। 

দাঁড়াবার জায়গা
  • কাব্যতত্ত্ব : এরিস্টটল, শিশিরকুমার দাশ অনূদিত, প্যাপিরাস ১৯৭৭, কলকাতা
  • সাহিত্যে প্রভাব, অঁদ্রে জিদ, তিনটি ফরাসি প্রবন্ধ, মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ সম্পাদিত ও অনূদিত, পড়য়া ২০০৭, ঢাকা
  • লেখকের শিল্প-কৌশল, আঁদ্রে মোরোয়া, লেখার শিল্প লেখকের সংকল্প, মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম ও হামীম কামরুল হক সংকলিত ও সম্পাদিত, সংবেদ ২০১১, ঢাকা
  • গ্রন্থরচনা ও রচনা-রীতি, আর্থার শোপেনহাওয়ার, লেখার শিল্প লেখকের সংকল্প, মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম ও হামীম কামরুল হক সংকলিত ও সম্পাদিত, সংবেদ ২০১১, ঢাকা
  • সাহিত্যবিচার, সাহিত্যের পথে, রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড), ঐতিহ্য ২০০৪, ঢাকা
  • সাহিত্যে কুম্ভীলকবৃত্তি, দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে, রেজাউল করিম সুমন, আর্টস বিডিনিউজ২৪ডটকম ২০০৮, ঢাকা
  • ইঙ্গ-মার্কিন কবিতায় আধুনিকবাদ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, একবিংশ, ২৫ বছর পূর্তি সংখ্যা, ফেব্রয়ারি ২০১০, ঢাকা
  • কবিতাপ্রেমীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হোন, কৃশ অ্যাডামসের নোট, ফেসবুক ২০১০